স্পর্শক

সুমী সিকানদার



সাইকেলের টুং টাং আওয়াজ টা বেশ জোরে জোরে কয়েকবার বাজতেই ধুম করে ঘুম ভেঙ্গে গেল আলটপকা ।সুলতান সাহেব ফিরলেন তার টুংটাং নিয়ে। বেড়ার গেইট মৃদু ধাক্কা দিয়ে সাইকেলটা রেখে চেইন দিয়ে লক করলেন যত্ন করে। তার হাতে কাপড়ের তৈরী বাজারের ব্যাগ, তাতে নুয়ে পড়া শাকের সবুজ উঁকি দিচ্ছে। আর আছে একহাত লম্বা শোল মাছ । তার মানে এখন শোল মাছ রান্না হবে নতুন আলু দিয়ে।
সুলতান সাহেব দরজার কাছে দাঁড়াতেই হাসিমুখে ভেতর থেকে ছিটকিনি খুলে দেন তার স্ত্রী বিবি ।


বিবি রান্না ঘরে বাজারের ব্যাগ উপুড় করে ঢাললেন কুলার ওপর। একটা মোটামোটি বড় শোলমাছ। আঙ্গুলের সমান শিং মাছ, সিমের বিচি , পুইশাক আর আলু , পেয়াজ, জিরে।
ছাই হাতে নিয়ে বটি পেতে মাছ কাটতে বসলেন বিবি ।রাত প্রায় তিনটা ছুঁই ছুঁই । এই রাতে মাছ কাটা তার অভ্যাস , খারাপ লাগে না। আর ছেলেমেয়েরাও টাটকা খবার খেতে ভালোবাসে। নইলে দেখা গেছে শুধু ডাল আলুসেদ্ধ দিয়ে অনেক দিন খেয়ে উঠে গেছে।


আলু দিয়ে শোলমাছের ঝোল, পুঁইশাক এই তরকারি চুলায় থাকতে থাকতে বিবি হাঁক ডাক শুরু করলেন। শাম্মি , ওমা শাম্মি ওঠ।
লাফ দিয়ে উঠে পড়ে শাম্মি । দ্রুত মুখ ধুয়ে রান্না ঘরে ঢোকে। মেজ বোন শিউলি বাকি ভাইবোনদের ঘুম থেকে ডাকতে থাকে। সবার ছোটটা কিছুতেই উঠবে না। তকে ঘুম থেকে তোলাটাই একটা যুদ্ধ। সবাই খেতে বসলেও ছোটটা না খেয়ে ফের ঘুমিয়ে পড়ল। বাকিরা মেঝেতে আসন পেতে বসেছে ।


শাম্মির কোলে শিরিন। সে কিছুতেই বুবুর কোল থেকে নামবে না। মা'র কাছে বসো বুনাই। আমি খাবার আনি তুমার জন্য, ' নাহ সে গ্যাট মেরে আরো জোরে তার বুবুকে ধরে আছে।


বাড়ির মেজ মেয়ে শিউলি সবার পাতে মাছ তুলে তুলে দিচ্ছে । ভাইরা আব্বাসহ আগে বসেছে। বুবু , শিরিন, মা'সহ সে পরে বসবে। সে খেতে বসার সময় আধা জাগা ছোটভাই মুরাদ কে তুলে নিয়ে এলো। সামান্য আয়োজনের ঘর অসামান্য ভিটার খুঁটি ছাউনি বেড়ার বন্ধন।


খাওয়া শেষ করে বাচ্চারা তোমরা পড়তে বসো। শিউলি তোমার অংক খাতা দিয়ে যাও। আমি দেখিক'টা ঠিক হয়েছে। সুলতান সাহেব আদেশ দিয়ে বসে রইলেন।


বিবি একবার মিন মিন করে বলছিলেন 'থাক এখন , সকালে দেখেন না হয়।' কিন্তু সুলতান সাহেব কঠোর মানুষ। তার কথার সামনে কোন কথা নাই।


শাম্মি আস্তে আস্তে বাবার সামনে এসে বসে। হাতে তস্তরি, তাতে সাজানো পান।
'আব্বা , জমিরচাচা কাল দেখা করতে বলেছেন রেডিও তে। '


সুলতান সাহেব হোমওয়ার্ক দেখছিলেন মুখ তুললেন না। বললেন যাও , অনুষ্ঠান দিয়েছে তোমার চাচা। লাইভ পড়ে এসো। শাম্মি চুপ করে মাটির দিকে তাকিয়ে পায়ের বুড়ো আঙ্গুল খুঁটছে।অযথা আঁকিবুকি। সুলতান সাহেব বড় ছেলেকে বললেন কায়েস কাল শাম্মীকে নিয়ে রেডিও তে যাবে । তার অনুষ্ঠান আছে।


শাম্মী রান্না ঘরে কাজ শেষ করে আলো নিবিয়ে নিজেদের ঘরে এসে ঢোকে। তার একারই সিঙ্গেল খাট । সে ঘরে গিতে টেবিল ল্যাম্প নিভিয়ে আস্তে করে শুয়ে পড়লো।


শিউলি ছোটগুলোকে নিয়ে শুয়েছে। প্রায় পুরো ঘরজুড়েই বিছানা করা। সব ভাইবোন পাতালে শোয়। কোনার দিকে তক্তা দিয়ে সব ভাল হাড়ি পাতিল উঠিয়ে রাখা । এক পাশে দুইটা বড় সুটকেস তাতে কাপড় রাখা। ছোট্ট একটা পড়ার টেবিল । যার লেখার দরকার সেই শুধু টেবিলে বসে। বাকিরা সবাই বিছানায় ।


শান্ত ভালো ছাত্র সে এ বাড়ির মেঝ ছেলে , যেমন পড়া শুনায় তেমন চেহারায়। সে হঠাৎ বললো বুবু, দাদা না ,আমি যাবো তোমার সাথে।


শান্ত ভেবেছিলো কাচের এপাশ থেকে বুবুর পড়া শোনা যাবে বুবুকেও দেখা যাবে। কিন্তু না। তাকে অন্য একটা এসি ঘরে বসিয়ে রেখেছে একটা লোক। সামনে এক পিস কেক আর পানি রেখে গেছে। শান্ত চুপ করে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে।


বাড়ি ফেরার পথে জিজ্ঞেস করলো 'বুবু আমাকে দেখতে দিলো না কেন? । '
আচ্ছা সামনের দিন আমি আগেই বলে রাখবো।
'কিন্তু আমাকে এতটা সময় একা একা বসিয়ে রাখলো। আমি তো দেখতে পারতাম । ''
'আজ আমাদের সবার বার বার ভুল হচ্ছিল । তাই আর তোকে ডাকেনি শান্ত। আমি বলে দেবো সামনের দিন।''
শান্ত তার শান্ত চোখে বুবুর দিকে তাকিয়ে আছে। বুবুর দৃষ্টি রিকশার বাইরে।


এইটাই প্রথম নয়। জমির চাচা সব সময় তার রেকর্ডিং রাখে একা। কিছু কাগজে লেখা পড়তে দেয়। এবং পাশে বসে থাকে। চুলে হাত দেয়। চাচা পিঠে হাত রেখেছে। হাত সারা পিঠে নড়াচড়া করছে। ব্রা'র হুক খুঁটছে। শাম্মি ঝট করে উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথে চাচাও উঠে দাঁড়ায়। যেন কিছুই হয়নি।


জমির চাচা ফের অনুষ্ঠান দিয়েছে। আব্বা কি কিছু বোঝে না? শাম্মি কিভাবে আব্বাকে বলবে বুঝতে পারে না। কিন্তু কিছু বললে যদি টাকাটা না দেয়। চাকরী পেতে তো বছর যাবে।
মা' কে রাতে শাম্মি একা পেয়েছে। খুব সতর্ক ভাবে সে জামির চাচার অপকর্ম জানালো।
'আব্বা কে বলে দিয়েছি মা , আব্বা ব্যবস্থা করবে। ''


''নিজের কাজ নিজে কর শাম্মি। তোমার আব্বা কিছু করবে না''
একথা শুনে থমকে যায় শাম্মি। ''
আব্বা কি কোন অন্যায় করেছে মা তোমার সাথে?''


মা'র হাসিমুখ নিমেষে কালো হয়ে গেছে। সে শুধু বলে ঘরে কিছু হতে দেই নি মা , তোরা সবাই বড় হচ্ছিস। এই কথা বলেই মা মুখ বন্ধ করেন । আর এই প্রসঙ্গে কিছু বলেন না।


পরের দিন শাম্মি ক্লাস থেকে বাসায় ফিরে দেখে বাবা বারান্দায় বসা। সে সরাসরি সুলতান সাহেবের কাছে যায়।
''আব্বা, জমির চাচার স্বভাব ভালো না , আমি আর তার অনুষ্ঠান করবো না। ''
ঘটনার আকস্মিকতায় বাবা চুপ । কথা বলছেন না।


''জমির চাচা আজ আমার বুকে হাত দিয়েছে অসভ্য ইঙ্গিত করেছে আমার খুব খারাপ লাগছে।'' কান্না চাপার চেষ্টা করছে শাম্মি।'প্রায়ই সে এরকম করে । আমি তাকে তোমার বন্ধু ভেবে ভুল করেছি। তুমি নাকি তার কাছ থেকে মোটা টাকা নিয়েছো ? কি কারণে আব্বা? ...


কিছুক্ষণ নীরবতা চলে । নীরবতার উপরে আরো কিছু নীরবতার সহাবস্থান দুজনের মানসিক অবস্থান কে অঙ্গুলি নির্দেশ করে।


' এসব জগতে তো একটু আধটু এসব চলে সবাই জানে।। নইলে তোমার কতটাকা পাবার কথা আর সে কত দেয় , তুমি বোঝো না? আমি জমিরের সাথে কথা বলবো ।''


আব্বাকে আর চিনতে পারে না শাম্মি।তার আব্বা। গা গুলাচ্ছে তার বিবমিষায়। জমির চাচা আজ তাকে কন্ট্রাসেপটিভ ইউজ করতে রাজি কি না জিজ্ঞেস করছে। । এই লোকের কাছে আব্বা তাহলে জেনে শুনে পাঠিয়েছে। কি করে বিশ্বাস হয় !


মায়ের জন্য হঠাৎ খুব মায়া হয়। মা বলেছিলো , 'বাসায় কিছু হতে দেইনি।' তার মানে তার পরমপ্রিয় পিতা ঘরের আড়ালে অনত্র লিপ্ত। রাতদুপুরে বাজার করে নিয়ে আসা, ছেলেমেয়ে নিয়ে খাওয়া এসব তাহলে ভড়ং।
শাম্মি আর কিছু ভাবতে পারে না। সারারাত জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। চোখে অড়ে পাতাগুলির ফাকে দূরের আকাশ। কালো থেকে আকাশ ফরসা হবার আগে আগে কমলা একটা চিকন রঙ আসে। সেই রঙ সারা আকাশ ছড়ায়। সেই অপার্থিব মুগ্ধকর দৃশ্য তাকে সিদ্ধান্ত নিতে এগিয়ে নেয়। যে বর্তমান তাকে স্থানু করে দেয় সে বর্তমান কে সে চায় না। ভোরের দিকে চোখ লেগে আসে শাম্মির।


সকালে নাস্তার টেবিলে মৃদু গলায় সে সুলতান সাহেবের সাথে কথা বলে। '' চড়া দামে বিক্রি হতে চাইলে হও বাবা। আজ থেকে তুমি মুক্ত । আমি আর মা আমার ভাইবোনদের দায়িত্ব নিতে পারবো। ''


ঘরের দুয়ারে মা এসে দাঁড়িয়েছে কখন যেন , তার সরলপ্রাণ মমতাময়ী মা। দাহকাল ফুরিয়েছে মায়ের।