দাগ ভালো যদি সাথে থাকে তেমন...

তমাল রায়



গগণেন্দ্র প্রদর্শনশালায় প্রদর্শনী চলছে...যেমন চলে সারা বছর। একরাশ বিপদের মাঝখানে শুয়ে আছে,কানাঘুষো শোনা যায় বসন্ত এসে গেছে...মৃদু গান বাজছে...ছোট্ট শোকেসের মধ্যে বসে ওরা তিনজন। কি যেন বলতে চাইছে...দাগ মোছার চেষ্টায়,কারা যেন জান লড়িয়ে দিচ্ছে অবশ্য...

দাগ ভালো। সে বলছিলো দাগ ভালো। সে মানে বছর পাঁচ,বা সাত। ভোম্বল বা কম্বল । সে বয়সটা কাদা মাখার। কাদা ইচ্ছেমত মাখার। সে’টা একটা মাঠ। ক্রিকেট মাঠ। ওরা ম্যাচটা হেরেছিলো। হার ওদের দমাতে পারেনি। পারেওনা সকলকে। সে কাদা মাখছিলো। ওরা দল বেঁধে কাদা মাখছিলো। ছেলের দলেরা। দলের ছেলেরা । দাগ ভালো।

বসন্ত এসে গেছে
ঈষিকার এমন হতে পারে কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। ভাবার কথাও না। মানে বসন্ত এসে গেছে। লাইব্রেরী ফ্রেম তো অবসলিট। যেমন এ পোড়া গ্রীস্মের দেশে বসন্তও। তবু ঈষিকার চশমাটা ভারী কাঁচের। যা বোঝায় ওর পড়াশুনা,বিদ্যে বুদ্ধির বহর। আর বসন্ত না বুঝলেও সে আসে। এই যেমন ঈশ্বর বা শয়তান! মাঝ রাতে কোকিল ডাকে। গাছে সবুজ পাতা জন্মায়। হ্যাঁ,এখনও! তো ঈষিকা বি টি করার সুবাদে নারায়ণপুর বুনিয়াদী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকার চাকরিটা পেয়ে গেছিল। শিক্ষকের পুং/ স্ত্রী হয় না। তবু দেশ যখন ভারত। রাজ্য যখন প.বঙ্গ আর নারায়ণপুর শহর নয় মফস্বল । তখন ঈষিকা শিক্ষিকাই। ঈশিকার ভালো লাগে অনেক কিছু,বিউলির ডাল,আলু পোস্ত,কাঁচা আম,নারায়নপুর ,বুনিয়াদী বিদ্যালয়ের গরীব ছাত্র ছাত্রীদের আর সৌরভকে...হুম সৌরভদা। মালিনীর দাদা। কলকাতার কলেজে পড়ায়। নারায়ণপুরে আসে বছরে দুবার। দুর্গাপূজো,আর বসন্তে, যখন অন্নপূর্ণা পূজা হয় । হাত চিঠি দেওয়ার রেওয়াজতো আর নেই। থাকলে দিত ঈষিকা। রোজ নানান রকম চিঠি লিখতো মনে মনে। না,পৌঁছত না। তবে সৌরভ এখন তার ফেসবুক বন্ধু। কথাও হয়। গতকাল সে জানিয়েছে,তার সৌরভকে ভালো লাগে। আর সৌরভ একটা বিশাল ইয়ে পাঠিয়েছে। হুঁ ...বসন্ত এসে গেছে...সৌরভ আসছে ক'দিন পর অন্নপূর্ণা পূজোওওও

বসন্ত চলে গেছে
ঈষিকার ভালো লাগে না অনেক কিছুই, যেমন মর্তমান কলা, সয়াবিন, কুমার শানুর গান, কলকাতা শহর, ছাত্রদের বকাবকি, আর তপনকে। স্কুলটা অনেকটা ভেতরের দিকে... প্রথমে ভ্যান রিক্সা, তারপর হাঁটা প্রায় হাফ কিমি। এই হাঁটার সময়েই তপন পিছু নেয়। তপন কী কেমন ঈষিকা তেমন খবর রাখে না। কেবল জানে সে শাসক দলের নারায়ণপুর অঞ্চলের যুব নেতা। তাতে ঈষিকার কী। সে কিছু না বলে এক মনে হেঁটে যায়, কানে গোঁজা ইয়ার ফোন। বিক্রম সিং গাইছেন রবীন্দ্রসংগীত। কিন্তু তপন তো তপন। সে সামনে এসে দাঁড়ায়। হাত ধরে টানতে যায়। অশ্লীল কথা ছুঁড়ে দেয়। মালিনী বলছিলো ঘুরিয়ে একটা চড় মারিস না কেন? নেড়ি কুকুরগুলোকে দেখিসনি? তুই যাবি তোর পেছনে কেঁউ কেঁউ। ঘুরে দাঁড়াবি, থমকে দাঁড়াবে ওরা। তুই এগোবি, ওরা পিছোবে। ইঁট তুলবি, পালাবে। ঈষিকার মনে ধরেছে কথাটা। আজও হাঁটছিলো স্কুলের পথে। গ্রামের রাস্তা, এমনি শুনসানই থাকে। তপন এসে জাপ্টে ধরেছিলো। ঈষিকা সপাটে একটা চড় কষিয়েছে। জানোয়ারটার উচিৎ শিক্ষা হয়েছে। মালিনীকে হোয়াটস এপ করে জানিয়েছেও সে কথা। মালিনী থাম্বস আপ পাঠিয়েছে। গ্রেট জব ডান! স্কুল থেকে ফেরার সময় এটা। ঈষিকা তার চিরাচরিত ভঙ্গিমায় হেঁটে চলেছে,... নেট অন করতেই পিরিং পিরিং সৌরভের মেসেজ ঢুকছে। কলা গাছে দুটো শালিখ বসে। অজান্তেই কপালে হাত উঠলো। একটু দূরে যেখানে আলপথটা নেমে গেছে সেখানে পৌঁছনোর পর বিকেলটা কেমন বদলে গেল। বিকেল হয়ত বদলানোই ছিল, সে একটু পর টের পেল। একটা বাইক। আরোহীর গামছা ঢাকা মুখ। একটা বোতল...কী যেন ছুঁড়ে দিলো ঈষিকার মুখ লক্ষ্য করে। তারপর যা হয়, ভটভটির আওয়াজ... আর সে আওয়াজকে ছাপিয়ে যাচ্ছে ঈষিকার চীৎকার। সারা মুখ গলা, কাঁধ জ্বলছে...

দাগ ভালো। ওরা সারা মাঠে পাইপে করে জল ছেটাচ্ছে। আর শুয়ে গড়াগড়ি। কাদা মাখছে। গড়াগড়ি। মুখে হাসি। দাগ ভালো!

বসন্ত এসে গেছে

জামুরিয়া থেকে কিছুটা এগোলে নিয়ামতপুর বাজার। এতদ অঞ্চলে অনেক স্পঞ্জ আয়রন ফ্যাক্টরি গড়ে উঠেছিল দীর্ঘ সময় ধরেই। কারণ আকরিক লোহা ও কয়লার সহজলভ্যতা( আসলে চোরাই কয়লা আর লোহার সহজলভ্যতা!) গরীবগুর্বো থেকে বড়লোক ফ্যাক্টরি মালিক চুরিবিদ্যেকেই মহাবিদ্যেতে পরিণত করে ,কামানোর ধান্দা খোঁজা আর কি। বিহারি মুসলমান দলিত হিন্দু মিলে মিশে সে কবে থেকেই। যার কিছু নেই, তার আবার ধর্ম! ফুঃ ! তবু মসজিদ। মন্দির। ফি শুক্রবার মসজিদে নামাজের পর দরিদ্র সেবা হয়। আর সেটা হয় মৌলবি নিশান আল সিদ্দিকীর ইচ্ছেয়। তেমন কিছু না। একটু ডাল ভাত লাবড়া। বলে রাখা ভালো, হিন্দুত্ববাদীদের এ তল্লাটে আনাগোনা বেড়েছে। যেমন হচ্ছে সারা দেশেই। মৌলবি সাহেবের ছেলে ইমন পরিশ্রমী, উদ্যোগী। ফর্সা লম্বা নয়। মাঝারি, শ্যাম বর্ণ। নিম্ন মধ্যবিত্ত যেমন হয় আর কি। ততটা ধর্মপ্রাণ নয় যতটা বাপ। তবু মৌলবি তার তিন কন্যার পর জন্মানো এই পুত্রকে বিশেষ সুনজরেই দেখেন। কারণ পরিশ্রমী, উদ্যমী, পরোপকারী। রক্তদান উৎসবেও আছে আবার মহল্লায় দীপাবলি হলে, তাতেও মাতে। রমজান এবার এপ্রিলেই। ইমন টাকা তুলছে লোডেড লরি দাঁড় করিয়ে। যে যেমন পারে। হতদরিদ্রদের জন্য জামা কাপড় দিতে চায়। তার ইচ্ছে, কিছু সাকরেডও জুটিয়েছে। হিন্দু বস্তির লোকদেরও শাড়ি জামা দেবে। গরীবের আবার ধর্ম কী?

বসন্ত চলে গেছে
শুরুটা কিভাবে হল জানা যায় না। তবে ইমনের তুতো ভাই আরিফকে না'কি নিয়ামতপুর বাজারে গোরুর দর করতে দেখা গেছিল। ওদের পাশের বস্তিতে কৃষ্ণ ওরফে কিসানদের দরজার বাইরে না'কি পড়েছিল গোরুর মাংস। কাক - টাক মুখে করে নিয়ে এসেছিলো হয়ত। অত ছোট টুকরোতে কি গোরু না শুয়োর বোঝা যায়? ব্যস ফিস ফাস। ফিসফাস ও না’কি বাতাসের থেকেও দ্রুত ছড়ায়... উত্তেজনা আঁচ করে মৌলবি নিজে দাঁড়িয়ে বলেছেন, এসব ঝুটা বাৎ! গুজবে কান দেবেন না। এ ইলাকামে হামরা যেমন হিন্দু মুসলিম এক জোট হয়ে ছিলাম, এইসাই থাকব। বাদ সেধেছে বাইক। আর রাম নবমীর মিছিল। মাথায় জয় শ্রী রাম ফেট্টি বেঁধে যারা ঘুরছিলো, সাথে , তরোয়াল, বল্লম আর লাঠি, তারা আরিফকে বেধড়ক মেরেছে। আরিফ হাসপাতালে।
ঝামেলা আর গুজবের চিরকালীন সেই স্নো বল থিওরি... শুরু হলে আগুনের থেকেও দ্রুত ছড়ায়। সন্ধ্যে হয়েছে অনেকক্ষণ। মৌলবি সাহেবের শরীরটা জ্বর জ্বর। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। উঠেই খোঁজ করেছেন ইমনের। ইমন না'কি বেরিয়েছিল পঞ্চায়েত প্রধানের কাছে, যদি কিছু টাকা তিনিও দেন। কিন্তু সেতো অনেক আগে। এখন সে কোথায়? বাইরে অকাতর বোমা গুলি চলছে। কারা মারছে আর কারা যে মার খাচ্ছে বোঝার উপায় নেই। কাউকেই তো চেনা যায় না। বাইরের লোক ? একটা জটলা দেখে এগিয়ে গেলেন মৌলবি। রক্তে ভেসে যাচ্ছে। ইমন কাতরাচ্ছে। তার কাঁধ থেকে কাটা হাত তখন ও শরীরের পাশে পড়ে। নড়ছে তির তির করে।

দাগ ভালো। ওরা সারা মাঠে পাইপে করে জল ছেটাচ্ছে। আর শুয়ে গড়াগড়ি। কাদা মাখছে। গড়াগড়ি। মুখে হাসি। দাগ ভালো!

বসন্ত এসে গেছে
শহরের রঙ নীল আর সাদা হলে তা কলকাতা। বড়বাজার থেকে সল্টলেক, হাবড়া থেকে পৈলান, হুঁ কলকাতাই! পার্কস্ট্রিটে আলো ঠিকরোলেও মুচিপাড়া বস্তি কিন্তু অন্ধকারই। যেমন ট্যাংরা, তপসিয়া বা রাজারহাট পেরিয়ে রেকজুয়ানি হয়ে বিষ্ণুপুর। বহুধাবিস্তৃত এ শহরে বসন্ত স্পেসিফিকালি আসে, বা যায় টের পাবার উপায় একমাত্র ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, প্যানসেক্সুয়ালিটি অথবা নান্দনিক যুগলবন্দী। সাবিয়া সেই রাজারহাট থেকে তাই এখানেই আসে। ওই অতনু একটু ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁবে, আর সে ইতস্তত করে হাত রাখবে অতনুর কাঁধে। তবে এসব খেলা ওই কৃষ্ণের বাঁশি শোনা ইস্তক। সিকিউরিটিরা এসে তারপর টর্চ মারে মুখে। বার করে দেয়। আর ওরা যে যার বাড়ির পথে... অতনু যাবে বেহালা। সাবিয়া ঠিক রাজারহাট না,অনেকটা ভেতরে রেকজুয়ানি। ওটাও কলকাতা। গ্রাম পঞ্চায়েত। রেকজুয়ানির মোড়ের পলাশ গাছের ফুলগুলো অবশ্য শুকনো। কেন কে জানে?
ভেতরে বিষ্ণুপুরের দিকে যেতে কিছুটা টোটো, বাকিটা পা'ই ভরসা। সাবিয়ার মনটা আজ ভালো দুপুর থেকেই। তারাতলার যে ফ্যাক্টরিতে সে কাজ করে, মাইনে খুব কম। তবু করতে হয়। কারণ বাবা অসুস্থ দীর্ঘদিন। প্রাইভেট কোম্পানির সিকিউরিটি ছিলেন। জমানো অর্থ থাকার কথা নয়। ভাইটা সামনের বার মাধ্যমিক দেবে । মা মারা গেছেন বছর দুই আগে। মা যাবার আগে সাবিয়ার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, বুড়ো বাপ আর ভাইটাকে দেখিস সাবু। অগত্যা ঘর বাহির দু তরফই সামলাতে হয়। আর এই ধ্যারধ্যারে গোবিন্দপুর থেকে তারাতলা যাবার খরচাও কি কম? আজ দুপুরেই মাইনে বাড়ার খবরটা পেয়েছে। বিষ্ণুপুর মোড়ে নেমে মিষ্টি কিনে হাঁটা দিলো। আজ হাঁটা শর্টকাট করতে ,ও ধরেছিল ওলাইচন্ডীর রাস্তাটা। রাত তো হল ভালোই। বাড়ি ফিরে আবার রান্নাও করতে হবে। শুনেছে এই অঞ্চলটা ভালো না। চোলাই আর জুয়ার ঠেক আছে। তবু বুকে বল নিয়ে ও হাঁটছিল দ্রুত...

বসন্ত চলে গেছে
ওলাইচন্ডীতলায় চোলাই এর ঠেক কবে তৈরি হয় কেউ জানে না। পুলিশ সব জানে। মাসোহারা করা আছে। তাই বিরক্ত করে না। মাঝে মাঝে রুটিন ধরপাকড়। তার অগ্রিম খবর পুলিশের সোর্সই জানিয়ে দেয় ওদের । সে রাতের মত ব্যবসায় ঝাঁপ ফেলে সকলেই। পুলিশ তবু উপরমহল কে সন্তুষ্ট রাখতে কয়েকজন ছিঁচকেকে তোলে। ধরা পরে অবশ্য ছিঁচকে চুল্লুখোররাই। ব্যাটনের গুঁতো টুঁতো দিয়ে ফের ছেড়ে দেয়, কিছু টাকা পয়সা হাতিয়ে। বেশি না ওই হাজার দুয়েক হয়। চুল্লুখোরদের আর পয়সা কই? তো পেট্রোল ভ্যানে চারজন থাকলে , ৫০০ করে এক এক জনের। মাগ্গিগন্ডার বাজারে মন্দ কি! এখন এখানে এসে জুটেছে কিছু বিলিতি মদের কারবারিও। এলাকায় ড্রাই ডে হলে এখানে যে মদ পাওয়া যায় সবাই জানে। ফলে কিছু ভুঁইফোড় প্রোমোটার আর তাদের সাকরেদ বালি সিমেন্ট সিন্ডিকেট মেম্বাররা ভীড় জমায়। এদের নিয়েই সমস্যা। চুল্লুখোরেরা নিজেদের স্ট্যাটাস জানে। তারা নিজেদের মধ্যে চুনো ঝগড়াঝাঁটি করে। এ শালা প্রোমোটারের বাচ্চারা না ঘরকা না ঘাটকা। কদিন আগে একটা দশ বছরের মেয়ের হাত ধরে টানছিলো। এক চুল্লু ঠেকের মালিক দেখতে পেয়ে বাঁচায়। আরে বাবা ব্যবসাটা তো করতে হবে। ফালতু ক্যাঁচালে কে জড়ায়! সে বোধ অবশ্য প্রোমোটারের বাচ্চাদের নেই। তবু থেমেছিলো। আজ ভর ভরন্ত সাবিয়া এ রাস্তায়। একা। একাইতো! ভাগ্যিস তবু অতনু ছিল! আকাশে ফুটফুটে চাঁদ। পেটে স্পিরিট মেশানো বিলিতি। দু নম্বর জোনের সিন্ডিকেট হেড বাচ্চু আর তার দলবল মিঠে খুনসুটিতে ব্যস্ত । সাবিয়া হাঁটছিলো দ্রুত। চোখে পড়েছে ছোট কালু আর গেঁড়ে ভবনের। কাঁহাতক আর মালয়ালাম পর্ণ দেখবে...অতর্কিতে ঝাঁপ দিলো সাবিয়ার ওপর। আকাশে ফুলটুস চাঁদ, বসন্ত বাতাস, আর নীচে ঝটপটি। একে একে পাঁচজন...সাবিয়ার বাড়ি ফেরা হল, তবে রক্ত, ভাসছে কোমরের নীচ থেকে সমস্তটা। ঠোঁটের মাংস খুবলে গেছে...

ভ্যান রিক্সায় বাড়ি যেতে যতটা সময়, কেবল গোঙানির শব্দ....

দাগ ভালো। ওরা সারা মাঠে পাইপে করে জল ছেটাচ্ছে। আর শুয়ে গড়াগড়ি। কাদা মাখছে। গড়াগড়ি। মুখে হাসি। দাগ ভালো!

একরাশ বিপদের মাঝখানে শুয়ে আছে, কানাঘুষো শোনা যায়...

স্যার চলে যাচ্ছিলেন। স্যার মানে ক্রিকেট প্রশিক্ষক। পরাজয় মেনে নেওয়াতো কঠিন। স্যারেরা নিশ্চিত তেমন হন না। যে হেরে গেলে ছেড়ে যাবেন! রাজনীতিতে এটাই দস্তুর, তবে বিবেকবান মানুষ হয়ত হারের দায় নেন... ঈশ্বর দায় নেন? নাস্তিকরা অবশ্য অন্য কথা বলে , প্যালেস্টাইন, সিরিয়া... ঈষিকা, ইমন, সাবিয়া - ঈশ্বর নেই? নাস্তিকদের ঠাঁই অবশ্য নরকে। গরম তেলে কড়া করে ভাজা ভাজা করা হবে।

স্যার ফিরছেন…কী হল মাঠ নোংরা করছ কেন? টুর্নামেন্ট কি শেষ?

- না,স্যর। তাহলে আপনি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন কেন? টুর্নামেন্ট তো শেষ নয়।
- তাহলে?

- স্যার, আজ হেরেছি। কাল তো জিততেও পারি!

গগণেন্দ্র প্রদর্শনশালায় এগজিবিশন চলছে। একটি কাঁচের ছোট শোকেস। ভেতরে আপাতত তিনটি চেয়ার। বসে ওরা। ঈষিকা, ইমন, সাবিয়া। শোকেসের বাইরে লেখা। মিরর অব দ সোসাইটি। কাচ, দর্পণও। ওরা মুখে কিছু বলছিলো না। না'কি বলছিলো। শোনা যায় না। কেবল শোকেসের ভেতরের দেওয়ালে ওরা কি সব আঁকছিলো। বাইরে আঁকলে যদি আবার মুছে দেয়...মানুষতো! গ্রাফিত্তি? না ম্যুরাল... ইমন আঁকছিলো মুখে তুলি দিয়ে। ছবিটা চেনা লাগে? অনেকটা যেন দালির প্রিমনিশন অব সিভিল ওয়ার!
হলের ভেতর মৃদু ভলুমে গান বাজছে-
'এ লড়াই মহাকালের খুলবে দুয়ার
এ লড়াই সূর্য ওঠার আনবে জোয়ার'
ওদের চোখে করুণা, মুখে হাসি। দৃষ্টি কঠিন। বাইরে তখন আলোর ঝলকানি..
না'কি বিদ্যুৎ...
স্যার ফিরে আসছেন। টুপিটা পরে নিলেন ফের। না'কি কুর্নিশ? টুর্নামেন্ট তো শেষ হয়নি। তাহলে?
রাত অন্ধ হলে শোকেস থেকে গুটি গুটি বেরিয়ে পড়ে ওরা তিনজন। ঈষিকা, ইমন আর সাবিয়া। হাঁটতে ওদের অসুবিধে, তবু হাঁটতেও তো হয়। আর টুর্নামেন্টতো শেষ হয়নি। ওরা আজ পৌঁছেছে, বয়রাতলার মোড় থেকে বাঁদিকে যে রাস্তাটা,তার তিন নম্বর ফ্ল্যাট বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরে। বাইরে দাঁড়িয়ে ওরা। যেখানে আর কিছু পর ভিকটিম হতে চলেছে, মনীষা।
মনীষা গৃহবধূ। নিম্নবিত্ত অবাঙালী পরিবার। তবু মনীষা সুন্দর! স্বামী প্রভূত অত্যাচার করে মদ খেয়ে এসে। তবু মনীষা সুন্দর! এখন অবশ্য স্বামী নেই। মনীষার জা কদিন হল দেশের বাড়ি। ভাসুরের বহুদিনের লোভ মনীষার ওপর। ওই যে মনীষা সুন্দর! কিছু পর ভাসুর মনীষার তিন বছরের ছেলেকে ওপাশের ঘরে বন্ধ করবে। মনীষার ঘরে ঢুকবেন। ঝাঁপিয়ে পড়বেন...কলিং বেল বেজে উঠলো...

গগণেন্দ্র প্রদর্শনশালায় প্রদর্শনী চলছে...যেমন চলে সারা বছর। একরাশ বিপদের মাঝখানে শুয়ে আছে, কানাঘুষো শোনা যায় বসন্ত এসে গেছে...
দাগ তোলার সর্বাত্বক প্রচেষ্টায় একটা গোটা জাতি, দেশ অথবা গোটা দুনিয়াটাই, সব দাগ কি আর ওঠে...?
তবু দাগ ভালো। ওরা সারা মাঠে পাইপে করে জল ছেটাচ্ছে। আর শুয়ে গড়াগড়ি। কাদা মাখছে। গড়াগড়ি। মুখে হাসি। দাগ ভালো! যদি সাথে থাকে তেমন সাবান...