আত্মপ্রহর এবং আমাদের তিতগল্প

শান্ত জাবালি



দ্বিতীয় কথা হলো আরবের সাথে সন্ধি চুক্তি বাতিল হবার পর থেকে কেমন অস্থিরতা পরিস্ফুটিত হচ্ছে । সন্তরণের পর অগ্নিপিন্ডের অন্তিমের কালে শ্বাপদের ছায়ায় প্রথম বার দেখেছিলাম তাঁকে । দ্বিতীয় বার দেখি রাজ শকুনের ডানায় ভর করে মাইলকে মাইল হেঁটে যেতে । তৃতীয় বার দেখি মিছিলের সামনে যখন সে লম্বা ঘোন্টা দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছিল । চতুর্থ বার আর সাক্ষাত্ পেলাম না বাস্তব কিংবা অবাস্তব স্বপ্নের মাতাল ভঙ্গিমায় । হাওরের হিল্লোলে কয়েক জোড়া স্যামন মাছকে উচ্চ সন্মানিতে নিয়োগ দেওয়া সত্ত্বেও তার খোঁজ আর পাওয়া গেল না । রাজশকুন , স্যামন মাছ ও জোনাকিদের দেওয়া অসংখ্য আত্মঘাতী আত্ম চিৎকার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্তের এই মর্মে পৌঁছানো গেল যে , তার কিংবা তাঁদের অস্তিত্ব এখন বিলুপ্ত হচ্ছে না । তমালের অন্তরালে এখন নিয়মিত দক্ষযজ্ঞের আয়োজন করে যাচ্ছে তাঁদের একটি দল । তার কয়েকবার ব্যর্থ হলেও সফলতার ব্যান্ডেজের খবরটা একটু বেশিই আশে ।

ভাবনগরে পাস নম্বর (08) ঠিকানায় আত্ম নির্মাণ করা প্রসঙ্গ - অপ্রসঙ্গত অথবা বিতর্কিত আত্মনির্মাণে করা বাড়ির অন্দরমহলে তার কায়দাদুরস্ত ভঙ্গিমায় আলোচনা বেশ জমেছিল । তার আকুতি ফেলে দেবার মতো আনন্দ নাকি এখন ও সৃষ্টির জন্মায়নি । নিলামের আড্ডাঘরে তার নাকি বেশ কয়েকবার ডাক পরে ছিল । নিজস্ব ক্রোধ ক্রমশ উচ্চাকাঙ্ক্ষী হওয়ায় আত্মহত্যা বসত তিনি আড্ডায় অংশগ্রহণ করতেন না । তার মুরিদদের দিয়ে ব্যক্তিগত করিডোরে একটি রাষ্ট্র নির্মাণে বর্হিবিশ্বের সাথে তার আলোচনা চলছে । চাঁদা সংগ্রহ এখন ও দাতব্য সংগঠনের মাধ্যমে চলমান রয়েছে । আরো আরো । আমি বুঝতে পারতাম তার প্রতারণার ইতিহাস কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ সৃষ্টির অনুষ্ঠানে আমি একথা তাঁদের বুঝাতে ব্যর্থ হয়েছি । তাই এখন আমাকে বাধ্য হয়ে তার এ পোষা হাস্যকর সব উপাখ্যান শুনতে হচ্ছে । কথা হলো জৌষ্ঠ্যের মাঝামাঝিতে বৃষ্টির যাতায়াত নিয়ে । আলোচনার অন্তিমের আগের দিকে আমার ও আমার বাঙলার মন্ত্রমুগ্ধ গুণকীর্তন করতে করতে নিজে বেশ কয়েকবার ঘেমে ঘেমে উঠেছিল । নিন্মগোত্রের এক কায়স্থকে ডেকে বললেন, পাখা দোলাতে । ঠিক হলো পরের বার আবারও কথা হবে । জোনাকরোডে বাড়ি যাবার পথে মনে পড়লো কায়েস্তের শিল্পনৈপুণ্যে মুখের সুদক্ষ কারুকাজ । আমি তাদের প্রপঞ্চবাদে স্বীকৃত । ব্যাগে হাত দিয়ে দেখি অগ্নিনির্মাণে তৈরি করা গান্ডিব আর ঘুংঘুর নেই । বাড়ি ফিরে গদ্য অথবা ভাষার হাঁড়ি থেকে করলার শরবত খেয়ে শয্যাশায়ী হওয়ার ইচ্ছে ছিল । কিন্তু শন্তুকে কাছে পেলাম না । পোষ্যকে সেই কখন পাঠিয়েছিলাম জল্লাদখানায় , কিছু হাড়ভাঙা আর গোক্ষুরের ঢাল সংগ্রহের জন্যে । নিজেকে অনুভব হচ্ছিল চা পাতার কোন এক কলেস্টরে কনেস্টবলের ভূমিকায় ।

বেলা অনেক হলেও পৌত্রের সাক্ষাত্কার পাচ্ছি না । প্রভিতীদের দলেও নেই । প্রফুল্লচন্দ্রের ছেলের সাথে রৌদ্র ছোড়াছুড়িতে কিঞ্চিত থাকার সম্ভাবনা যদিও থাকতে পারতো কিন্তু সম্পাদকের সম্পাদকীয়তে সেই আশা হতাশায় বন্যে যাত্রা করলো । এদের প্রতি আমার বিশ্বাস পুনঃক্রয় বন্টিত যখন হতে লাগলো তখন স্বয়ং গান্ধীজিও এদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর সমালোচনা মুখর বক্তব্য দিয়েছিলেন । আনন্দবাজার পত্রিকায় তাদের অহমিকার সংঙ্গতিপূর্ণ মনোভাব ছিলো বেশি । পূর্বের প্রত্যাবর্তনে নৈরাশ্য বা দুঃখজনিত আবেগে দুই ছেলে ফোঁকা ও প্রসন্নকে দংশনদন্তে প্রহার করেছিল । মাছের ফুলকায় ছিদ্রবহুল অসংখ্য শূন্য জরায়ু থাকায় সর্দির মতো সব পানি চুষে নিল । জৌষ্ঠ্যের মাঝামাঝিতে দেহত্যাগ করলো শরফরাশি শস্য । তারা শুধু মেরেই ক্ষান্ত হয়নি অগ্নিবর্ষার স্বরগ্রাম দিয়ে কান্ড থেকে বের করে নিয়েছিল অবশিষ্টাংশ পানি । পূর্ণিমার মধ্যেরাতে রক্ত পোড়া গন্ধে ঘুম ভেঙে গেল ।দূর থেকে ভেসে আসছে কান্নার হাট বসানো একদল নারীর স্বরগ্রাম । উত্তরাধিকার কিংবা অন্য কোন উৎস হতে এই গন্ধের উৎপত্তিস্থল খুঁজে পেতে ব্যর্থ আমার স্মৃতি কোষাগার । পৌত্র আমাকে দেখা মাত্র বর্ষনসুরে ডেকে যাচ্ছে । তার ভাণ্ডারের পানিও অন্তিমের পথে । খই মিশ্রিত দুই গন্ডুস তরল পানীয় দিয়ে ছুটে এলাম ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে । নিলামের ডাকে পাওয়া ডাইরিতে লিখে নিলাম ইতিহাসের নোংরা রাতটি । অতিরঞ্জিত নৈরাশ্যবাদে আবহাওয়াকে রামাবলিতে বেঁধে ছুটে গেলাম দক্ষিণ পশ্চিম কোণে ।

চুষে নিল মাটির সমস্ত লবণ পানি , সমূলে উচ্ছেদ করে নিল আমার সমস্ত সন্তানদের । মৃত্যুমুখী পদযাত্রায় কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তাঁদের চোখ থেকে ঝড়ে পরছে কৃতজ্ঞতার অশ্রু । তার ক্রোরাল গ্রাসে সেই জলটুকু পর্যন্ত বাষ্পরুদ্ধে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বাতাসে । আগুন সাগরের গা ঘেঁসেই দাঁড়িয়ে রয়েছে হাজার হাজার ফুট উঁচু কালো ধোঁয়ার পাহাড় । পাহাড় খাঁজ এঁকেছিলেন পূর্ণিমার আলোকচিত্রকে । একবার হাওয়া বদল নিলে পাহাড়ের বিপরীতমুখী ঝাঁপসা আগুনের প্রতিফলনে দেখতে পেয়েছিলাম অন্দরমহলের ব্যক্তিটির হাঁটাচলা । আর আরো কিছু দূরে দেখেছিলাম রাজশকুনদের অডিটোরিয়াম । আগুনের আলোয় দক্ষযজ্ঞের মতো জ্বল জ্বল করছিলো তাদের চোখ । এদিকে আবার সকালের আসার শব্দ শোনা যাচ্ছে । তার আগুন শেষ হলো । শেষ হলো বাবুই পাখিদের কান্নাকাটি । রাজশকুনরাও চলে গেল । আমাদের বিপরীতে বসে এখনও কান্নার কল চেঁপে যাচ্ছে রমনিরা । কিন্তু হঠাৎ ধ্বনির অজুহাতে অর্ধ শতাধিক ধর্মপ্রাণ ঠেঙ্গা নিয়ে এগিয়ে এসে বললো -
-কান্দন থামানো হোক । আমাগতো কাম কাইজ করতে হইবো নাকি । বলে সে সবার মুখের দিকে তাকালে ও কোন নারী তার মুখের দিকে একবারের জন্যও তাকালো না ।
আদতে আমরা মুক্ত হলেও একজাতের একজাম্পল ক্রীতদাস । বিরুদ্ধ মতাবলম্বীদের শান্তিপূর্ণ পালনে আমরা অনেক কষ্টে রমণীদের মিনিট যাবত বোবা করে রেখেছিলাম । সময় পার হতেই আবারও শুরু হলো কান্নার ঝংকার ।

এরপরে আসলো ছয়টি ঋতু । মাঝে এল রসবিগ্রহ বা বিগ্রহ সেবার নামে সন্ধি বিগ্রহ । বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিঘার মাপে যথেষ্ট হেরফের লক্ষ্য করা যায়নি । তবে যা এক একরের এক তৃতীয়াংশের সমপরিমাণ অথবা হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি থেকে কনিষ্ঠাঙ্গুলি পর্যন্ত সব চুষে নিল উত্তর মেরুর অভিকর্ষজ ত্বরণের মতো । সাক্ষাতে যখন কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি ধ্যান্যাদির বীজ নিয়ে বিগত স্মৃতির সাথে একটু গোলযোগ দেখা দিলে তিনি তার সৃষ্টি কর্তার দোহাই দিয়ে চলে যেতে চাইলেন । আমি বিস্মিত হলাম , ভুলে গেলাম তার সৃষ্টির রহস্য । যদিও সে তার সৃষ্টিকে করে তুলেছে বিশ্রী , কদর্য, কুৎসিৎ ও লজ্জাজনক । তাদের জ্ঞান বিচ্ছুর মতো ক্ষুদ্র কিন্তু তার বিচ্ছিরি ভয়ঙ্করী ব্যাপার । এরা পরিচালিত হয় সর্বনাশা লোক, অত্যন্ত ধূর্ত, যারা অনুলিপন ও মৃত বস্তু পাঠে বিশ্বাসী । ক্ষুদ্রকার সিগারেট, পশুপাখি প্রভৃতি ধরায় ফাঁদ , জাল , খাঁচার উপর এরা ভিত্তিহীন বিচার করে । মাঝে মাঝে সুপরিচিত গৃহপালিত প্রাণী বিশেষ বিড়ালকে গলা টিপে হত্যা করে ধূমপানের জন্য । যা পূর্বে নিবন্ধিত ছিল তলোয়ারের মুন্ডে । এরা তত্ত্ব জ্ঞান, সঙ্গীতশিল্পাদি শাস্ত্র, ধারাবাহিক পর্যবক্ষেণ ও গবেষণার ফলে কোন বিষয়ে প্রাপ্ত ব্যাপক ও বিশেষ জ্ঞানকে মৃত বস্তুর সাথে চুন বেষ্টনী করে জনসাধারণকে জানাবার জন্যে ঘোষণা করেন বা লেখেন মোদ্দা কথা ব্যবসা করেন ।

তিনি তার শাস্ত্রের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে বললেন , বৃষ্টি হবে । ভাগ্য ক্রমে অপ্রত্যাশিত ভাবে সে আমার, আমাদের কাছ থেকে নিয়ে নিল অনেকগুলি টাকা । টাকা নেওয়ার কি অপূর্ব নিয়ম !!তামাক পাতায় মুড়িয়ে তার উপর সালু কাপড় , ভেতরে টাকা ।।