স্লিপিং রুম

নিবেদিতা ঘোষ রায়

অ্যালেন মেমোরিয়াল ইন্টিটিউট । মন্ট্রিল কানাডা ।ঘোলাটে আকাশ আর ধুধু সাদা বরফের
প্রান্তর , বিক্ষিপ্ত ঝাউ পাইনের সারি ।শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটা থেকে ঠেলে বরফের ওপর ছিটকে পড়ছে কর্কশ চিৎকার।বন্ধ সার্সি গুলোর বাইরে সাদাটে শীর্ণ হতাশ আলো থমকে আছে ।করিডরে হলুদ ক্লান্ত এক বাতিদান অতল অন্ধকারের ভেতর অজ্ঞাত কোন আনন্দসুত্র জীবনকে জাগিয়ে রাখে কিনা দেখছে ।বাকি সব নীল মাছির মত পুঞ্জ ডুমো ঘুমে লীন।কয়েক জন ডাক্তার নার্স ব্যাস্ত ।অদ্ভুত নিরীক্ষা চলছে এখানে । কাঁচ ঢাকা ছোট ছোট ঘরগুলোর খাঁচায় মানুষ ।
ইউএস গভরমেন্টের স্পেশাল অপারেশান ডিভিশানের আর্মি কেমিক্যাল ক্রপস্ CIA ( স্পেশাল ইন্টেলিজেনস্ এজেন্সি ) র নজরদারিতে গোপন কাজ চলছে । কি কাজ ? চলছে হিউম্যান বিহেভিয়ারল ইঞ্জিয়ারিং । হীরক রাজার দেশে যন্তরমন্তর ঘরে যা চলত । মগজ ধোলাই।মস্তিস্কের স্নায়ুতন্ত্র কে নিয়ন্ত্রন করে কিভাবে পুরো খোপড়ি তে ভরে ফেলা যায় অন্যের অভিমত ।রক্তমাংস চামড়া ঢাকা পুতুল মানুষ হাঁটবে ঘুরবে , সন্দেহ নেই , প্রশ্ন নেই , প্রতি মুহূর্তে সংঘাত অভিজ্ঞতাজাত প্রতিক্রিয়া , ক্রোধ ,
চিৎকা্‌র , দুঃখ , প্রতিবাদ নেই ।আছে শাশ্বত অখন্ডতা অস্তির আলোয় সদাপ্রাপ্তি।সব আছে ,ঠিক আছে ,ঠিক চলছে ।প্রজেক্টের নাম ‘ MKULTRA ’ আর মগজ ধোলাই এ ব্যবহার করা হয়েছিলো LSD ড্রাগ ।যার একাধিক নাম অ্যাসিড , ব্লটা্‌র , ক্যালিফর্নিয়া সানসাইন , ডোটস ,ইলেকট্রিক কুলএড । ভাড়া করা হয়েছিল প্রস্টিটিউটদের । তাদের কাজ ছিল রাতের অন্ধকারে লোক ধরে এনে ছলে , বলে তাদের বাধ্য করা LSDর সিরিঞ্জ নিতে । তাদের বেঁকে চুরে ভেঙে যাওয়া দেহরৈখিক জটিলতা ,তাদের মস্তিক্সের ক্ষণবিভাজনের সমস্ত কার্যবিধির গোপন রিপোর্টে পৌঁছে যেত CIA-র দপ্তরে ।

ছোট্ট একটা ওলট পালট । ১৯৩৮ সাল । ডাক্তার আলবার্ট হফম্যান কাজ করছিলেন সুইজারল্যান্ডের স্যানড্রোজ ল্যাবোরেটরিতে।কাজ শুরু হয়েছিল প্যারাসাইটিক ফাঙ্গাস ergot নিয়ে । মধ্যযুগে রাই নামে একধরনের তৃণশস্য থকে পাওয়া যেত ergot যা ঘোড়ার খাবারে রুটির উপাদান হিসেবে ব্যবহার হত । ধাত্রীরা প্রসূতির লেবার পেন তাড়াতাড়ি করার জন্যও অল্পমাত্রায় ব্যাবহার করত । নিউইয়র্কের রকফেলার ইনস্টিটিউটের রিসার্চাররা ১৯৩০ সালে ergot থেকে lysergic acid তৈরি করেছিল।আর হফম্যান নিজে কম রক্তচাপ, মস্তিক্সের কার্যকারিতার উন্নতি শ্বাসপ্রশ্বাস স্টিমুলেট করার ওষুধ তৈরি করার জন্য lysergic acid নিয়ে কাজ করছিলেন।সৃষ্টি হল লাইসারজিক ডাইথ্যালামাইড অ্যাসিড
( lysergic diethylamide ) । আর্গলাইন( argolain )ফ্যামিলির সেমি সিনথেটিক ড্রাগ ।এরপর পাঁচ বছর পর ১৯৪৩ সালে আবার ফিরে এলেন LSD তে ।২৫ মাইক্রো গ্রাম নিজের জিভে স্পর্শ করালেন । এরপর তিনি চলে গেলেন অদ্ভুত জগতে অভূতপূর্ব সব ছবি , ক্যালিডস্কোপিক বর্ণচ্ছটার অবিরল স্রোত ।রাস্তায় ধাবমান ট্রাফিকের মত ছোটাছুটি করছে চিন্তা ভাবনা স্মৃতি বিস্মৃতি যেন অলীক সিনেমার
পর্দা । সানন্দপূর্ণ হৈ চৈ জনক মেজাজে ভরা গ্যাস বেলুনের মত তিনি ভাসতে
লাগলেন । পরদিন নিলেন ২৫০ মাইক্রো গ্রাম প্রায় দশগুন বেশি ।একই রেজাল্ট পেলেন।ভয় পেয়ে প্রথমে ডাক্তার ডেকেছিলেন । ডাক্তার দেখলেন তার ব্লাড প্রেশার হার্ট রেট , শ্বাসপ্রশ্বাস সবই ঠিক ছন্দে চলছে । সহকর্মীরা সকলরই স্বাদহীন বর্ণহীন রংহীন সেই সাইকেডেলিক ড্রাগ টেস্ট করে এক মত হলেন এ এমন এক নতুন জিনিস যা চিন্তা ভাবনা কে প্রভাবিত করে অন্য বিজন মুক্ত দুনিয়ার খোঁজ দেয় ।


যদি বলি জীবনান্দ দাস ছিলেন একজন সাইকাডেলিক কবি তাহলে ব্যাপারটা হাস্যকর ও বেঠিক বলা হল না ।
আমরা যাইনি মরে আজো তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয় /
মহীনের ঘরাগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে
প্রচলিত যৌক্তিকতা ও তার নির্দিষ্ট পারম্পর্য প্রায়ই মুছে দিয়ে এক অদ্ভুত অর্থময়তার সৃষ্টি হয়েছে । একদিকে জ্যোৎস্নায় প্লাবিত প্রান্তরে প্রস্তর যুগের প্রাচীন ঘোড়াদের মত মহীনের ঘোড়াগুলোর চড়ে বেরানো , আর অন্যদিকে সস্তার রেস্তোরাঁতে হিমঘুমে স্তব্ধ বিড়ালছানার মত কটি পেয়ালা ,ঘেয়ো কুকুরের লেহন , আস্তাবলের অন্ধকার মগ্নচৈতন্যের চমকপ্রদ শৈল্পিক প্রকাশ ।১৯২০ - ৩০ এ সাড়া ফেলেছিল পরাবাস্তবতাবাদ বা সুরিয়ালিসম।তার আগে ছিল রোমানটিসিসম্।একটা প্রচলিত বাদকে বারবার ভাঙ্গা , অতিক্রম করা হল কাউন্টার কালচার মুভমেন্ট ।১৯৬০ সালে এই মুভমেণ্টেই LSD অনুঘটকের কাজ করেছিলো ।এতদিন যা সৃষ্টিকর্তার কাছেই কেবল ছিল দৃশ্য ,এবার পাঠক বা উপভোক্তাও তার স্বাদ নিলো।বীট জেনারেশনের সঙ্গে হিপি কালচারের সমন্বয় স্থাপন করে কাউন্টার কালচার মুভমেন্ট পেল এক নতুন রূপ এবং তার প্রধান পুরোহিত বা হোতা ছিলেন লেখক জার্নালিস্ট কেন কেসি ।যে নিজেও যুক্ত ছিল MKUltra র সঙ্গে । MKUltra যা চেয়েছিল বুদ্ধিজীবীরা এই বিষামৄত দিয়ে সমস্ত দুনিয়ার ‘ দ’টাই পাল্টে দিল মস্তিস্কের বাঁকাচোরা বহুরৈখিক উদ্দীপ্ত গতিশক্তিতে ।তারা ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নিউইয়র্ক ‘ further ’ নামে একটা বাসে ঘুরে বেড়াত । বাসটির রং ,চং ডেকরেশান সবই সাইকাডেলিক পেন্টিং এ সাজানো ।এরা জনসাধারনকে ছুঁড়ে দিয়েছিলো একটা বাক্য “ ক্যান ইউ পাস দ্যা এসিড টেস্ট ? ” ১৯৬৫ সালে ২৭ নভেম্বার ক্যালিফোর্নিয়ার আসিড পার্টিতে জেফারসন এয়ারপ্লেন গেয়েছিল তাদের বিখ্যাত গান “ সং ফর অল সিজনস্ ”। LSD জন্ম দিলো সাইকাডেলীক মিউজিকের ।পূর্ববর্তী গানের থেকে যা ছিল একেবারেই অন্যরকম । রেকর্ডিং টেকনলজি ছিল একেবারেই ভিন্ন ,মূল আওয়াজের সঙ্গে মিশ্রিত হতো অনেক এফেক্ট – ডিলে ,রিভার্ব ,
ওয়া – ওয়া , কোরাস , ফেসার , রাগা ড্রোন ( গীটারে সেতারের এফেক্ট ) , তবলা । এই সম্মিলিত মিশ্রণে পুরো সাউণ্ডটা বদলে গেলো ।গীটারের আওয়াজে শুধু গীটারকেই চেনা যেতো এখন তার থেকে বেরিয়ে এলো ভয়ঙ্কর কর্কশ অস্থিরতা ,অনাস্থা মানুষের রাগের বহিঃপ্রকাশ ।
দ্যা বীটলস্ গাইল
Cellophane flowers of yellow and green
Towering over your head
Look for the girl with the sun in her eyes
And she's gone
Lucy in the sky with diamonds

দ্যা ডোরস গাইল
The blue bus is callin ' us
The blue bus is callin ' us
Driver, where you taken ' us

সাইকাডেলিক এক্সপেরিয়েন্স শুধুই সংগীত না সিনেমাকেও প্রভাবিত করেছিলো । জ্যাক নিকেলসন অভিনীত “ One flew over the kuku ’s nest ”বিখ্যাত সিনেমা যার স্ক্রিপ্ট লিখেছিল কেন কেসি ।LSD প্রভাবিত আর সিনেমা তৈরি হয়েছিল । ‘ fear and lothing in lasvega s’, ‘ the trip ’, ‘
easy rider ’ , ‘ the man who stare at goats ’, ‘ hervard man ’.
প্রকৃত সৃষ্টিশীলতা যে চেতনাকে ধারন করে থাকে তা সংক্রামক এবং সক্রিয় । Mkultra প্রজেক্ট যে ভাবে মানুষের মগজ ধোলাই শুরু করেছিল তা সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে বাধা পড়ে থাকেনি ,সামগ্রিক স্পিরিটের কারনে মানুষের চেতনাকে লুঠ করা যায় নি ।LSD তীব্র অভিঘাতের দাহবলয় সৃষ্টি করেছিল । শীর্ন সংস্কৃতির পেছনে সজোরে আলটপকা লাথি কষিয়ে দিয়েছিল LSD খোর - রা ।
স্যাঁতাপড়া দেশলাই বাক্স ঠুকে চলেছি বহুদিন । কয়েকটা টাটকা বারুদ কাঠি যদি পাই খুলে দেব সব জানলা । বহুকথা পড়ে আছে , বহু গান আছে ,আছে পার্পল বাতাস .... আঃ বাতাস ।