মুঠোবন্দি মাঠ

শীলা বৃষ্টি



মোটামুটি সব কিছুই সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়; কাজের চাপ, সহকর্মীর খোঁচা, প্রতিবেশীর কৌতূহল,পাশের যাত্রীর অসভ্যতা, বুয়ার অখাদ্য রান্না, কিন্তু সন্তানের মুখ নিঃসৃত, 'আমার কিছু ভাল্লাগেনা!' বাক্যটিতে শুধু অসহায় নয়, আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। কারণ শব্দটির নিঃসরণ পৌনঃপুনিক হারে বৃদ্ধি পাবে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না তার ভালো লাগার মতো কোনও উপাদানের যোগান আমার দ্বারা প্রদান করা সম্ভব হবে। কখনও দশ টাকা মূল্যের ডেইরিমিল্ক চকলেট, কখনও দশ মিনিটের মোবাইল ফোনের গেইম, কখনও নির্ধারিত সময়ের দশ-বিশ মিনিট আগে নীচে খেলতে যেতে দিয়ে আমি এই আতঙ্ক থেকে মুক্তি পাই। তাই আজ যখন ও তার 'ভাল্লাগেনা... ' নামক ভাঙা তানপুরাতে তান তুলল, আমি আগুপিছু না ভেবেই বলে উঠলাম, 'বাপ, আমারে মাফ কর! যাহ্। নীচে খেলতে যা!'
-'কই খেলব! উঠানটায় তো বাড়ি বানিয়ে ফেলতেসে!'
-'ঐ কলকব্জার ফাঁকফোকর দিয়েই খেলগে, যা।'
-'এহ্, যান! গিয়া দেখেন, আজ সেই উপায়ও নাই। সব জায়গায় সিমেন্টের ঢালাই।'
-'তাইলে মনোয়ার সাহেবের মাঠে যা।'
-'তুমি জানো না বুঝি, মনোয়ার সাহেবের মাঠে খেলতে গেলে উনি সবাইকে ধরে ধরে বকেন খালি! ওদিককার বাচ্চারা এখন মাঠের পাশের রাস্তাটায় খেলে।'
আমি আর কী কী পরামর্শ ওকে দিতে পারি তাই ভাবছিলাম। একটু পর সে নিজমনেই বলে উঠল, 'বার্ডের ভেতর কী সুন্দর খেলার মাঠ আছে, কিন্তু দাড়োয়ান ভেতরে ঢুকতে দেয় না।' হাতের সবুজ সুতো তর্জনীতে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে আবার বলে, 'নীল বিল্ডিংটার সাথে ছোট্ট একটা খেলার জায়গা আছে কিন্তু বিল্ডিং-এর আন্টিরা উপর থেকে খালি ধমক মারে শব্দ হয় বলে। নীচের আন্টিরা আমাদের বল লুকিয়ে ফেলে। কেউ খেলতে দেয় না, পৃথিবীর সবাই মিলে আমাদের খেলার এমন দুশমন হয়ে গেল কেন!' এবার কাঁদোকাঁদো শোনায় তার গলা। 'এত্ত এত্ত খেলার জায়গা তারপরও কেউ খেলতে দেয় না, কোথায় খেলব আমরা!' ঝাঁজের সাথে বলে ওঠে আবার সে।
আমি কী বলব ভেবে পাই না। খেলার বিকল্প হিশেবে দশ টাকা ধরিয়ে নরম গলায় বললাম, 'যাও বাবা, ডেইরি মিল্ক কিনে খাওগে।'

ছোট বেলায় ফেইরি টেলসে পড়েছিলাম গল্পটি। আবছা মনে পড়ে, দৈত্যের বিশাল বাগান ছিল, সারা শহরে বসন্তের ফুল ফুটলেও সেই বাগানে ফুল ফোটা তো দূরের কথা, শীতকালই কখনও যেত না, দৈত্য বাগানে শিশুদের খেলতে দিত না বলে। শিশুদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে দৈত্য তার বাগানের চারপাশে বিশাল পাঁচিল তুলে দিয়েছিল। একদিন অবাক হয়ে দৈত্য দেখে তার বিশাল বাগানের এক কোণায় বসন্ত এসেছে। চেরি, লাইলাক, রডোডেনড্রন, ম্যাগনোলিয়া প্রভৃতি ফুলে ফুলেল সেই কোণা। এ কী করে সম্ভব! ভাবতে ভাবতে যখন দৈত্য এগিয়ে গেল সে-বরাবর, তখন দৈত্যের সাথে সাথে পাঠকও অন্তরালের ঘটনা বুঝতে পারল। বাগানের সেই কোণায় পাঁচিলের ছোট্ট একটি ফোঁকরকে খানিকটা বড় করে কিছু শিশু বাগানে ঢুকে পড়েছে। শিশুদের কলরোলেই এতোদিন ঘুমিয়ে থাকা ফুলগুলো আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেছে। সহজ সরল গল্প । এর পরেই দৈত্যের বোধোদয় হয়, পাঁচিল ভেঙে সবার জন্যে বাগান উন্মুক্ত করে দেয়। দৈত্য ভালো হয়ে যায় । প্রতিদিন বারান্দায় বসে সে শিশুদের খেলা দেখে। দৈত্যের মৃত্যু দৃশ্যের যে বর্ণনা পেয়েছিলাম বিদেশি বইয়ের সেই অনুবাদে, তাতে সেই বয়েসে চোখে জল চলে এসেছিল।

আমাদের মনোয়ার সাহেব অবশ্য রূপকথার দৈত্য নন। বাস্তবের ভালো মানুষ। এই রোজায় মাঠের এক পাশে রঙিন টিন দিয়ে চমৎকার একখানি মসজিদ বানিয়ে দিয়েছেন এলাকার মুসুল্লিদের সুবিধার্থে। আমাদের শিশুরা সেই মসজিদে নামাজ পড়ে ভক্তিভরে, জুম্মাবারে দু-হাত ভর্তি করে জিলেপি নিয়ে ঘরে ফেরে।

কিন্তু আমাদের শিশুরা তাদের খোলা জায়গায় ছুটোছুটি করতে না পারার দুঃখ ভোলে না, অনবরত ঘ্যান-ঘ্যান করে কানের পাশে। আমরা বিরক্ত হই প্রচণ্ড! তাদের যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য হাতে দশ টাকা ধরিয়ে, 'চিপস কিনে খাও বাবা।' বলতে-বলতে কেউ কেউ নিজেদের ফেলে আসা ছেলেবেলা নিয়ে ভাবতে বসি। অবারিত ধান কিংবা পাটের ক্ষেত, নাড়ায় লুকোচুরি খেলা, বউচি, কানামাছি কিংবা বরফপানি খেলার হাঁকডাক, মা-খালাদের বকুনি, সন্ধ্যায় হাত-পা ধুতে গিয়ে পানির স্পর্শে খড়ের গাদায় গড়াগড়িজনিত জ্বলুনি, দাদির গল্পের আসর....কিছুই ঝাপসা নয়, সব সুদূর অতীত হয়েও আজ সিনেমার পর্দার মতোই জ্বলজ্বলে আর রঙিন। অথচ আমাদের শিশুদের চাক্ষুষ বর্তমানও কেমন ঝাপসা আর বিবর্ণ লাগে।
আমাদের শিশুরা তাদের রঙহীন পৃথিবীতে আলগা রঙের প্রলেপ লাগানোর চেষ্টা করে বসার ঘরে উপুর হয়ে ছবি আঁকতে আঁকতে। কেউকেউ টিভিতে মটুপাতলু আর শিংশ্যান নামের কার্টুন দেখে, খুব অল্পই খুব অল্পের তরে গল্পের বই পড়ে। অধিকাংশই নিজেদের শৈশবকে উন্মুক্ত করে দেয় ভার্চুয়াল খেলার মাঠে। স্মার্টফোনের মসৃণ মাঠ কিংবা রাস্তায় গাড়ি কিংবা বাইক নিয়ে ছুটতে থাকা আমাদের উত্তেজিত শিশুদের চেহারা দেখতে দেখতে মনে হয় তাদের এই অবাস্তব খেলার জগত নিয়ে তাদের কোনও অভিযোগও নেই।

--------