একটি পারিবারিক অপ্রেমের গল্প

হুসাইন হানিফ



রোজ ওরফে রইচ আলী, আমার বড় ভাই এই গান গায়- ‘ আর আমারে মারিস নে মা, আর আমারে মারিস নে মা...’ গাইতে গাইতে একদিন সে তার হাতের বাঁধন খুলে ফেলে চলে যায়- যায় যে দিকে দুই নয়ন। কিন্তু যাবার আগে সে এই গান আমাদের অথবা মাকে শোনায়। বড় করুণ কণ্ঠে সে গায়। কিংবা গানটাই করুণ। অথবা সুর। সে যখন এই গান ধরে সব কিছু কেমন করুণার্দ্র হয়ে ওঠে- রাতে ধরলে রাত আরো নিস্তব্ধ হয়; নিঃসঙ্গ দুপুরে ধরলে খা খা দুপুরের নৈঃসঙ্গতা আরো প্রকট হয়। গান গেয়ে যখন সে নীরব হয় তখন তার করুণাবহ অবস্থা আরো কঠিনতম সময়ের দ্যোতনা ছড়ায় দ্বিগুণ মাত্রায়: নীরবতার নৈঃশব্দ বিষের বাঁশি হয়ে বেজে ফেরে অনন্তকাল। কিন্তু গানটি থেকে যায়। যদিও রোজ ওরফে রইচ আলী আমার বড় ভাই একদিন হাতে বাঁধা অদৃশ্য বাঁধন ছেড়ে নেয় কিংবা খুলে ফেলে- চলে যায়, যায় যেদিকে তার দুই নয়ন। অবশ্য তার দুই নয়ন কোথায় যায় তা আমরা দেখি কিন্তু তার যাওয়াটা নয় মুখ্য হয়ে ওঠে তার গাওয়া গানটি- আর আমারে মারিসনে মা! কেননা, তার যাবার কিছুদিন পর আমরাও আবিষ্কার করি এই গান গাওয়ার বয়স আমাদের হয়ে উঠেছে কিংবা এই গানের অর্থ আমরা বুঝে উঠতে শুরু করেছি। অতএব আমরাও তার সাথে তাল মিলাই আর আমারে মারিস নে মা। কিন্তু আমাদের তাল কেটে যায়। কেন কে জানে। যদিও আমরা লালনের অন্যান্য গানের সাথে এই গান আর আমারে মারিস নে মা প্রায়ই গেয়ে উঠি বারবার এর মর্ম বোঝার চেষ্টা করি কিন্তু বুঝে উঠতে পারি না। হয়তো এখনো আমাদের সময় আসে নি এই গান গাইবার; তাই যতই আমরা তাল মিলানোর চেষ্টা করি কোন মেওয়া ফলে না। কিন্তু গানটা আমাদের গাইতে হয়। কেননা, প্রায় আমাদের গান গাইবার অবস্থা ফিরে আসে- কখনো দিনে কখনো রাতে কখনো বা আমাদের রাত আর দিন একাকার হয়ে যায় তাই কখন গান গাইতে হবে আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। অতএব সার্বক্ষণিক একটা প্রস্তুতির মধ্য দিয়েই আমাদের দিন পার করতে হয়: হঠাৎই কোন এক সময় আমাদের গান গাওয়ার জন্য শরীর-মন ব্যাগ্র-ব্যাকুল হয়ে ওঠে এবং আমরা যতটুকু সম্ভব কণ্ঠকে করুণায় আর্দ্র করে গেয়ে উঠি ‘ আর আমারে মারিস নে মা’।
কিন্তু মা আমাদের মেরেই চলে- লালনের অথবা আমাদের অথবা লালন-দুঃখী সবার সম্মিলিত কণ্ঠে এই গান ‘আর আমারে মারিস নে মা’ প্রাণর্প্রাথনা হয়ে সুরে সুরে জাগরূক থাকলেও মা আমাদের এই দুঃখ গায়ে মাখে না- অনবরত আমাদের মেরেই চলে। এবং মার মারার ফাঁকে ফাঁকে আমাদের মনে পড়ে যায় অগ্রজের দুঃখ ভারাক্রান্ত স্মৃতিকথা- কীভাবে দিনের পর দিন সে মার সহ্য করে গেছে মুখ বুজে। যদিও তার মার খাওয়ার সময় আমাদের মনে কখনোই জাগেনি যে সে মার খাচ্ছে এবং এটা এক মানসিক ভারসাম্যহীন মায়ের নিছক খেয়াল মাত্র; কিন্তু এখন আমাদের মনে হয়- যখন আমরা মার খাই- ভাই ছিল নিরীহ, এবং এতটাই ভাল যে কাছে কোথাও তুলনা দেবার মত মানুষ দেখি না। কেননা, মাদরাসা পড়–য়া আমরা কেউ তার সাথে পথ চলতে গেলে লোকজনকে সালাম দেয়া বা কুশল জিগানোর মত আদর্শিক কাজটা তাকেই যখন হাসিমুখে করতে দেখি- এবং এটা তার এক অভ্যাসই বলা চলে- আমাদের মনে হয় আমাদের চেয়ে যথেষ্ঠ ভাল সে। যদিও তার এই ভাল মানুষি আমাদের মায়ের কাছে এলে হয়ে যায় কচু পাতার পানি- অবশ্য যখন সে সপতিœক। না, এর আগে আমাদের এই অগ্রজ রোজ ওরফে রইচ আলী বাবা-মার শ্রেষ্ঠ সন্তান বলে ঘোষিত থাকে এবং সত্যসত্যই তাই হয়ে থাকলেও, একদিন, যখন সে বিয়ে করে, আমার মায়ের কাছে হয়ে যায় সে ম্যানকা শয়তান। যদিও তার ভেতর শয়তানির লেশমাত্র দেখা যায় না; শুধু বউকে তালাক না দেয়া ছাড়া- এটাও আমাদের মায়ের মতে।
অতএব রোজ ওরফে রইচ আলী আমাদের অগ্রজ স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসে- কখনো চেয়ার হয়ে, কখনো মুরগীর রান হয়ে, কখনো মোবাইলের সংলাপ হয়ে, কখনো বা রাতে দিনে ছত্রিশবার উল্লেখিত অভিশাপে জর্জরিত আমার মায়ের হাসি আর কান্নার খেয়াল হয়ে টাটকা নতুন স্মৃতিতে ফিরে ফিরে আসে, আসতেই থাকে। যদিও বিস্মৃতির দূরত্বে নয় তার অবস্থান; কিন্তু আমাদের মনে হয় কেবলি মনে হতে থাকে সে যেন অতটাই দূরে চলে গেছে যতটা দূরে গেলে সত্যিকারের যাওয়া বলা যায়। কাছে হোক বা দূরেÑ সে যে গেছে এটাই বড়। কেননা, তার যাবার কথা নয়। তবু সে গেছে।
অতএব আমরা ব্যথিত হই; আর তাই আমরা তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য নানারকম ফন্দি আঁটি। কিন্তু সে আমাদের এই মায়া-কান্না আর আলগা মোহাব্বতের থোরাই পরোয়া করে থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তবু আমাদের খেয়ালী জননীর খেয়াল হয়ে অনেক সময় আম আর কাঠাল আর শাক আর সবজি আর দুইশ টাকা নিয়ে কখনো আমাকে ভাইয়ের মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু হায়, ভাই আমাদের শাক খায়, কাঠাল খায়, আম খায়, খায় শাক, খায় সবজি- দুইশ টাকা আর নেয় না; বরং যেদিন দুইশ টাকা হাতে আমি ভাইয়ের পেছনে গিয়ে দাঁড়াই, বলি ভাই, মা তোমার জন্য দুইশ টাকা দিছে; ভাই টাকা দুইশ হাতে নেয়; বলে, টাকা দিছে তো, না; এই যে ফেলে দিলাম; যা, যায়া কবি, এই সব আলগা মোহাব্বত আর না দেখাতে। হায়, হায়, ভরা বাজারের মধ্যে ভাই এটা করল কি! ভাই মার ওপর রাগ করতে পারে, ফকিরের ওপর রাগ করতে পারে, মমিনের ওপর রাগ করতে পারে, এমনকি রাগ করতে পারে হাসির ওপর; কিন্তু আমার ওপর কেন? এই ভরা বাজারের ভেতর এইভাবে অপমান করবে কেন? কেনই বা অমন করে টাকা ফেলে দিয়ে গটগট করে হেঁটে যাবে পেছন ফিরে চাবে না? হায় খোদা, করুণাময় পৃথিবী তো আমাকে গ্রহণ করবে না, আকাশও তো আমাকে জায়গা দেবে না, সান্ত¡না দেবে না এই সমস্ত লোকদের কেউ! আমি এখন কই যাই! আমি তো মুখে টু শব্দটিও করি না। কিন্তু আমার বুক কথার চাপে ভেঙে পড়ার দশা। আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, ভাই, ও ভাই, তোমার কি মনে পড়ে না ওই সব দিন, যেগুলোতে আমরা জড়াজড়ি করে ঘুমিয়ে আছি গায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে; যেগুলোতে আমরা ঘুরে বেরিয়েছি সারা শহর; ও ভাই, তোমার কি মনে পড়ে না জামিল মাদরাসার আমাকে হিঁক তুলে তোমার বুকে মুখ ঢেকে কেঁদে চলেছি নিরন্তর; ও ভাই তোমার কি মনে পড়ে না সেই সব বৃষ্টি ভেজা দিন তোমার পিছু পিছু খালোই ধরা আমি মাছের খোঁজে চষে বেড়াচ্ছি সারা নদীময়; ও ভাই, তোমার কি মনে পড়ে না বাবা-মামার কথা উপেক্ষা করে তোমার বউকে নিয়ে গিয়ে তুলে দিলাম তোমার হাতে আর তাই আমার পড়াশোনার টাকা বন্ধ ছিল ছমাস; ও ভাই তোমার কি মনে পড়ে না এই সব হাসি আর কান্নার দিন, তোমার কি মনে পড়ে না! অথচ আজ তুমি আমাকে কীভাবে ভরা বাজারে নিঃসঙ্গ একাকী ফেলে রেখে যাও অপমানিত, ভাই, ও ভাই!
এখন আমি কী করি! কোথায় যাই! আজ যদি মার কথা না শুনতাম তাহলে কি আর এইভাবে হেনস্থা হতে হয়। কিন্তু মার কথা যে শুনতেই হয়। তা না হলে যে উপায় নাই। মমিনের উপায় আছে: মুখ ঝামটা দিয়ে সরে যাবে; ফকিরের উপায় আছে: ফকিন্নির বাচ্চা বলে গালাগালি শুরু করে দিবে; কিন্তু আমি তো তা পারি না- মুখ ঝামটা দিয়ে সরে যেতে পারি না, গালিগালাজও সম্ভব না; নীরবতা আমাকে অধিকার করে রাখে; মা এই নীরবতাকে সম্মতির লক্ষণ নিয়ে ব্যাগ বোঝাই করে দেয়, সাইকেল বের করতে বলে; আমি মাটির দিকে দৃষ্টি রেখে একে একে পালন করি মার সব আদেশ- সেই আমি যদি এরকম পাটা-চেছা না হই তো আর কে হবে! পাড়া পড়শি!
আমি তো সেই নিজেকে নিজের ভেতর ঢুকিয়ে চোখ বুকে আটকিয়ে বাড়ি আসি। এসে আর কারু সাথে টু শব্দটি করি না। মা ডেকে চলে- হোসেন, আ হোসেন, ভাত খাব্যা না; ভাত খায়া যাও। আমি চুপ মেরে থাকি। ভাবি, আজ এত দরদ কোথা থেকে আসে, আহা রে, দরদ কত, এত মধু ওই মুখে বুঝি আর আটে না, এরকম তো অন্য কোনদিন করো না, আজ কেন, হুঁ, যত পারো আমাকে জ¦ালাও, পোড়াও, আজ আবার দরদ দেখ, উপচে পড়ে, যদি এত দরদই থাকবে তো আমাকে ওগুলো দিয়ে পাঠাবে কেন, বেটাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে আবার এই ধরণের করুণা দেখানোর মানে কী, হাঁ?
অতএব আমাকে গান গাইতে হয়, গাই, আর আমারে মারিস নে মা... যদিও মনির খান কি ফরিদা পারভিন হয়ে লালনের সুর অন্তরে অন্তরে বাজে ব্যাপক বিষেঁর বাঁিশ হয়ে ... কিন্তু কণ্ঠে কোন স্বর ফোটে না, নির্বাক নিরুত্তর থাকি নতুন করে পাশ ফিরে। তবে গান বা গান সম্পর্কিত অন্য কোন ভাবনা আমাকে ভাবায়; আমি ভাবি, কী এমন কষ্ট পেয়েছিল লালন যে তাকে এই এত কষ্টের একটা গান গাইতে হল! শুনি লালনকে তার মা বাবা নাকি রাস্তায় ফেলে যায়; তারপর অন্য কেউ দত্তক নেয়; জানি না অন্য কেউটা কে; সেই কে কি লালনকে বেঁধে মেরেছিল ননী চুরির দায়ে; তার তাই লালনকে গানটা গাইতে হয়! সেই কেকে না হয় জানি না চিনি না; কিন্তু আমার ভাই রোজ ওরফে রইচ আলী যে কেন গান গাই তা তো জানি। সে কিংবা আমি অথবা ভাবী বা আরো অনেকে মনে করতে পারে আমার মা সেই গানের কারণ। কিন্তু শুধু শুধু মাকে দোষে কি লাভ। মা না হয় একটু মাথা গরম টাইপের মানুষ, কিন্তু তোমরা তো ঠা-া মস্তিষ্কের মানুষ, পড়ালেখা করা বুদ্ধিমান, তোমরা কি একটু ধৈর্য ধরতে পারো না, করতে পারো না একটু সবর, হতে পারো না আরেকটু বিনয়ী, কথার পিঠে কথা না বাড়িয়ে থাকতে পারো না চুপ, তাহলেই তো হয়ে যায়।
আর মা না হয় একটু বেশি কথা বলে, তোমাদের শান্তিতে থাকতে দেয় না, বাবা তো তোমাদের সাথে কখনো অন্যায় অন্যায্য কথা বলে নি; কিন্তু তোমরা তো সেই বাবাকে ত্যাগ করেছো, তাকে অশ্রুসজল রেখে গেছো পথে, ফিরিয়ে দিয়েছো তার বাড়ানো হাত, শোনোনি তার কথা, চলে গেছো নিজেদের জন্য নির্ধারিত করা কল্যাণের পথে!
মনে পড়ে সেই বাবাকে! আমার রইচ আলী আমার রইচ আলী বলে গর্ব করত যে লোকটি, বলত এলাকার ভেতর আমার রইচ আলীর মতন একজন ভাল ছেলে নাই, সেই স্বপ্নবাজ লোকটা যে কি না স্বপ্ন দেখত তার ছেলে তাকে সাত তলা দালানে রাখবে, তার ছেলে তাকে হজ করতে নিয়ে যাবে, যে কি না স্বপ্ন দেখত ছেলে আমার ইঞ্জিনিয়ার হবে, নিজের সব্বোর্চ শ্রম দিয়ে যে বাবা তোমাকে মানুষ বানাতে চেয়েছিল, যে বাবাটি ভয় পেত নিজের ছেলে মাশা কামলা হবার, যে বলত আমি মরছি মরছি আমার ছেলেদের আমি মরতে দিমু না, নিজে চোখ থাকতে অন্ধ, বেটারা আমার মানুষ হবে, বেটারা আমার নাম করবে, বেটারা আমার দুই চাকা চালাবে না চার চাকা চালাবেÑ সেই স্বপ্নবাজ মানুষটিকে কীভাবে খালি হাতে ফিরিয়ে দাও, সেই মানুষটিকে কীভাবে বলতে বাধ্য করো তুই আমার বেটা না, তোর মুখ আমি দেখতে চাই না!
হায়! বাবা আমার মরার আগে বারবার তোমার ছবি দেখত টুলটুল করে, কিছু বলত না, শুধু ছবির দিকে তাকিয়ে থাকত, তার বলার মুখ তুমি রাখোনি, কত ঠকিয়েছো, যখন যা চেয়েছো বাবা আমার সব এনে দিয়েছে; সেই বাবাটাকে কোন হৃদয়ে ফেলে গেলে; কীভাবে তাকে তুমি আশাহীন করলে!
খুব বেশি কি চেয়েছিল তোমার কাছে! শুধু তো বউটাকেই তালাক দিতে বলেছে; আর তোমার সেই সাধের বউটা, আলকাতরা সুন্দরী বউটা, হায় তোমার খুব সুরত বিবি, পরকীয়ায় আসক্ত স্ত্রী, যে কিনা সাবেক প্রেমিকের বাড়ি যায় বিষ খেতে, তাকে গ্রহণ না করায় ধরে মারে, ক্ষেতের ধান টেনে তোলে, ডাইনিটা রাগে মেশিন পিটিয়ে ভাঙে, সেই বউই তো তোমার, যার জন্য তুমি বাবা মা ভাই বোন সবাইকে ছেড়ে চলে গেছো, যে তোমার পাশে শুয়ে আরেকজনের স্বপ্ন দেখে, প্রেমিকের সাথে প্রেমালাপ করে, সেই বউই তো তোমার, যার জন্য তুমি বাবাকে ত্যাগ করো, যে বাবা তোমার জন্য নিজের জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে মাঠে নামত, মাকে ত্যাগ করো যে মা দশ মাস দশ দিন পেটে ধরেছিল, ত্যাগ করো ভাইকে যে ভাই তোমার জন্য অপেক্ষা করে থাকে, ত্যাগ করো বোনকে যে বোন একমাত্র আদরের; তুমি বলো কিনা নবীজী বলেন, তোমাদের মধ্য থেকে যে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে সে আমার উম্মত না; নবীজী কি বলেন যে বাবার সাথে কোন আত্মার সম্পর্ক হয় না, হয় বউয়ের সাথে, নবীজী কি বলেন, মায়ের সাথে কোন সম্পর্ক হয় না, হয় বউয়ের সাথে, নবীজী কি বলেন, ভাইবোন আত্মীয় না, আত্মীয় কেবল বউ আর শ^শুড় শ^াশুড়ি, আত্মীয় কেবল শালা শালী!
আজ তুমি কোন মুখে বলো আমার কোন আত্মীয় স্বজন নাই! কেন তোমার তো শ^শুড় শ^াশুড়ি আছে শালা শালী আছে; তারা কি তোমার আত্মীয় স্বজন নয়; যাদের আত্মীয় স্বজন মনে করে চলে গেছো; তারা কি তোমাকে বাবার মত ভালবাসে না, মার মত আদর করে না, ভাইয়ের মত সঙ্গ দেয় না, বোনের মত মায়ায় রাখে না! খুব কি প্রয়োজন আত্মীয় স্বজনকে! যাদেরকে পথের কাঁটা ভেবে সরে দাঁড়িয়েছো, তাদের কি আজ আপন মনে হচ্ছে!
আমার বাবা, হ্যাঁ হানিফ শেখ, সারা জীবন যে অন্যের ঘর বেঁধে দিত, সেই লোকটি, যে গরীব অসহায় লোকদের যুবতী মেয়েকে ভাল পাত্র দেখে বিয়ে দিয়ে দিত, নিজে একে ওকে ধরে টাকা জোগার করত, নিজের চাল ডাল দিয়ে অন্যের মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করত, সেই লোকটি, হ্যাঁ আমার বাবা, চেয়েছিলেন একটি বিচ্ছেদ, যে লোক সারা জীবন চাইত মিলন, সেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে চেয়েছিল একটি বিচ্ছেদ! কী সূক্ষ্ম তীক্ষè দৃষ্টি তার! তিনি বলেছিলেন, বেটা এই মেয়ের সাথে জীবনেও তুই সুখী হতে পারবি না! এর ভেতর মনুষ্যত্ব নাই! যত টাকা লাগে আমি দিমু শুধু তুই তালাকটা দে! তার সেই ভবিষ্যদ্বাণী কি সত্য প্রমাণিত নয়! একটা দিনও শান্তিতে কাটাতে পেরেছো?
আমি এখনো ভেবে বিস্ময় মানি, একটা মূর্খ মানুষ কেমন করে এতটা শিক্ষীত হতে পারে, কেমন করে এতটা ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে, এতটা রসিক, এতটা বুদ্ধিমান, এতটা কর্মঠ, এতটা বিচক্ষণ! কীভাবে একজন মানুষ এত সহজে অন্যকে আশ্রয় দিতে পারে, নিজের ঘরে অন্যকে ঠাঁই দিতে পারে, একজন হিন্দুকে ভাই বলে বুকে জড়িয়ে নিতে পারে, খৃস্টানকে আপন করে নিতে পারে খেতে পারে একই থালায়! কে তাকে এই শিক্ষা দিল! সারাজীবন বইয়ে মাথা গুঁজে দিয়েও কত লোকই তো গেঁয়ো থেকে যায়, কত মানুষ সাম্প্রদায়িক হয়ে যায়, মানবতা থেকে দূরে থাকে, মানুষ হতে হতেই এক জীবন পার হয়ে যায়; অথচ একজন সাধারণ চাষা মানুষ, যে নিজের নামটা পর্যন্ত ঠিকমত স্বাক্ষর করতে পারে না, স্কুলের বারান্দা মাড়ায় নি কোনদিন, সে এতটা মননশীল হল কী করে!
তার শিক্ষক ছিল প্রকৃতি; এমন হাজারো লোক পৃথিবীতে ছিল, আছে, থেকে যাবেÑ যারা স্বশিক্ষিত, প্রকৃতি যাদের পাঠশালা, যারা নিজেরাই উদ্ভাবন করে বিজ্ঞানের প্রাথমিক ধারণা সূত্রাবলী!
আমি বলি না যে তুমি আমাদের সাথে থাকো, আমাদের জন্য তোমার জীবন থামিয়ে রাখো, নিজের লাভালাভ বিসর্জন দাও, ক্যারিয়ার নষ্ট করো; বরং বলি আমাদেরকেও একটু সময় দাও, ভাই বলে ডাকো, কাছে টানো মাকে, বোনকে একটু শান্ত¡না দাও, ধৈর্য ধরতে বলো আমাকে, স্বপ্ন দেখবার বরাভয় দাও, বলো সামনে এগিয়ে চল হুসাইন, আমি তোর সাথে আছিÑ দেখবে পৃথিবীকে কীভাবে নত করি পায়ের নিচে, দুরন্ত ষাঁড়কে কীভাবে পোষ মানাই, সমস্ত সাগর ছেঁচে নিয়ে আসি মুক্তো, প্রতিটি স্বপ্নকে বাস্তবের রূপ দেই কী সফলতার সাথে!
অথচ তুমি এইসব করো না, তুমি দূরে দূরে থাকো, কলা খাও মনে মনে, পেরে ওঠো না বউয়ের সাথে, আপনকে পর মনে করো, আর পরকে মনে করো আপন, এবং গান গাও আর আমারে মারিস নে মা!
এ গান তোমার কণ্ঠে আর মানায়, খুব একঘেঁয়ে বেসুরো লাগে, তুমি বরং অন্য কিছু গাও, আমার অনুরোধ তুমি আর কোনদিন এ গান গাইবে না, বরং আমাদেরকে সুযোগ দাও, এবার আমাদের পালা, যে জীবনের তুমি সম্মুখীন হয়েছো, আমাদেরকে তার জন্য প্রস্তুত হতে বলো, বলো তিলে তিলে ক্ষয় হওয়া কাহিনীর রচয়িতা হতে, বলো করুণ দহনে দগ্ধ হতে, বলো গান গাইতে, বলো গান গা তোরা, এবার তোদের পালা, নে সুর ধর, বল, আর আমারে মারিস নে মা...!



(উৎসর্গ: বাবাকে)