রীতা

রঞ্জনা ব্যানার্জী



রীতা মারা যেতই। মৃত্যু তো অনিবার্য। জীবনের সাথেই শব্দহীন সমান পায়ে চলে কিন্তু রীতার বেলায় ওর পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিলো। রীতার পাকস্থলীতে ক্যান্সার ধরা পড়েছিল, এক্কেবারে শেষ সময়ে। রিপোর্ট পেয়েই টাটাতে চলে গিয়েছিল ওরা। খবরটা বাবুল দা’ই আমাকে জানিয়েছিল। বাবুলদা’ রীতার স্বামী।
বাবুলদা’র সাথে আমার তেমন করে কথাবার্তাই হয়নি কখনো। তাই ভোর রাতে ওর ফোন পেয়ে অবাক হয়েছিলাম। আরো অবাক হয়েছিলাম যে বাবুল দা’ কোন কুশল বিনিময় ছাড়াই সরাসরি রীতার অসুখের খবরটা জানিয়েছিলেন। ওভারসিস কলের প্রতি মুহূর্তের ন্যায্য ব্যবহার করছিলেন যেন। জানিয়েছিলেন টাটাতে রীতার চিকিৎসা করানোর মত সংগতি নেই ওর। আমি যেন অবিলম্বে অন্তত পাঁচ লাখ টাকা পাঠিয়ে দি ওর এ্যাকাউন্টে। এ্যাকাউন্ট নম্বরটাই কেবল ধীরে সময় নিয়ে বলেছিলেন এবং ঠিকঠাক লিখলাম কিনা নিশ্চিত করতে সময় নিয়েছিলেন।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে রীতার অসুখের খবরটাই ধাতস্থ করতে কষ্ট হচ্ছিলো টাকার ব্যাপারটা নিয়ে ঠিক মাথা ঘামানোর মত অবস্থা ছিল না আমার। উনি ফোন রেখে দেয়ার পরেও আমি অনেকক্ষণ ঘোরের মধ্যে ছিলাম। খবরটা পুরোপুরি বিশ্বাস হচ্ছিলো না আবার বাবুল দা’র সাথে আমার শালা জামাইবাবুর ঠাট্টা মশকরার সম্পর্কও ছিলনা । অবাক হচ্ছিলাম এমন একটা খবর বাড়ি থেকে কী কারণে কেউ জানালো না!
আমাদের যৌথ পরিবার । রীতা আমার মেজ জ্যাঠার মেয়ে। আমরা পিঠাপিঠি। ও আমার চার মাসের বড়। সকাল হতে না হতেই বাড়িতে বড়দা’কে ফোন দিয়েছিলাম। খবরটা ঠিক। বড়দা’ বলেছিলেন সব এতটাই দ্রুত ঘটে গেল যে জানাবার মত পরিস্থিতি ছিল না। মেজ জ্যাঠিমাকে নিয়ে টানাটানি চলেছে ক’দিন। খরচপাতির ব্যাপারটা নিয়ে পরে কথা বলবেন তিনি। লাগলে অবশ্যই জানাবেন। সেজদা’ যাচ্ছে মুম্বাইয়ে পরের সপ্তায়। টাকা লাগলে সেজদাই আমাকে জানাবে। টাকা যেন রীতার চিকিৎসাতেই লাগে সেটা নিশ্চিত করতে হবে তো! আমি তাও বড়দা’কে না জানিয়েই দুই লাখ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম বাবুলদা’র এ্যাকাউন্টে। টাটাতে মাস খানেক ছিল রীতা। ওরা জবাব দিয়ে দিয়েছিল। কেমো নেয়ার মত অবস্থা নেই ওর। অতঃপর রীতা শান্তিতে মরতে ফিরে এসেছিল দেশে।
দেশে ফেরার দিন তিনেকের মধ্যেই ওকে বাবার বাড়ি নিয়ে আসা হয়েছিল। জোর করে। যদিও ও তখন যন্ত্রনা কমাতে হাইডোজে ব্যথানাশকের ঘোরে তাও প্লেনে ওঠানো নামানোর সময় নাকি তীব্র প্রতিরোধ করেছিল। ঢাকায় ওর দেখভালের লোক ছিল না। রীতার একটাই ছেলে।
রীতার বিয়েটা হঠাৎ করেই হয়েছিল। একটা ছবি আর উড়ো চিঠি বাবা কাকাদের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। রীতার ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল মেজ জ্যাঠা। ন’দিকে রেখে ওর পাঁচ বছরের ছোট রীতার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল ঘরোয়াভাবে।
শ্বশুর বাড়ি যাবার সময়ে এ বাড়ির মেয়েরা কেঁদে চোখ ভাসায়। রীতার আগে আমাদের তিন দিদির বিয়েতে এমনই দেখেছি আমরা। কিন্তু রীতা গটগট করে বরের গাড়িতে উঠে বসেছিল। পেছনে মা,কাকী, জ্যাঠিমা এবং দিদিরা বিলাপ করে কাঁদছিল। এমনকি ওর বাবা মেজ জ্যাঠাও। রীতা গোঁজ ধরে মাথা নিচু করে বসেছিল বরের পাশে। যেন এ বাড়ি থেকে ও যেতে পারলে বাঁচে। একবারও পেছনে ফেরেনি। মাথার ওপর খই উড়িয়ে পিতৃঋণ শোধ করে সব দায় থেকে মুক্তি নিয়েছে যেন। সেই মুহূর্তে আমার ইচ্ছে হয়েছিল একটান দিয়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনি ওকে। বিয়েটা ভেঙে দি। বাবুলদা’কে খুন করি।
রীতার শ্বশুরবাড়ি নারায়ণগঞ্জে। কাপড়ের ব্যবসা ওদের। বাবুল দা’ ডাচ বাংলা ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। দেখতে খারাপ নয় তবে রীতার প্রায় দ্বিগুণ বয়েস। দ্বিরাগমনে যখন রীতা এলো তখন ওর গাল ভরা হাসি। ফরফর করে কথা বলছিল। যে জেঠু কাকার সামনে মুখ তুলে তাকায়নি, তাদের সামনেই বরের হাত ধরে টেনে ছাদে চলে গিয়েছিল। উড়ো চিঠিটা পাওয়ার পরে ওর ছাদে ওঠাও বারণ ছিল। রীতা কখনো নায়র করতে আসেনি আমাদের বাড়িতে।
সামান্তার চলে যাবার পরে এক বিকেলে ব্রুকলীন ব্রিজ পার হবার সময় হঠাৎ আমার মনে হয়েছিল রীতার অভিশাপ আমাকে কখনও সুখি হতে দেবে না। অবশ্য আমার ধারণা ছিল ব্যাপারটা রীতা কেন বাড়ির কেউই জানে না।
বাড়ির সাথে আমার যোগাযোগটা বাবা মা চলে যাবার পরে ঢিলে হয়ে গিয়েছিল। দেশে যাই্নি প্রায় পনের ষোল বছর হয়ে গেছে। শেষবার গিয়েছিলাম মা চলে যাবার পরে। বাবার মৃত্যুর এক সপ্তাহ পরেই আমার পি এইচ ডি’র ডিফেন্স ছিল। তা ছাড়া তার মাস ছয়েক আগে আমার জীবনটা সামান্তা দুমড়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল যা থেকে আজও আমি উঠতে পারিনি। বাবার মৃত্যু সংবাদটা যখন পাই তখন আমি ল্যাবে। আমার সুপারভাইজার আমাকে নিজে ড্রাইভ করে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিলেন। ফ্রিজ থেকে বিয়ারের ক্যান নিয়ে আমার মুখোমুখি বসেছিলেন। বাবার কথা বলতে গিয়ে আমি ঝরঝর করে কাঁদছিলাম বাচ্চাদের মত। আমার সুপারভাইজার কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। আসলে আমি সেদিন বাবা নয় সামান্তার জন্যে কাঁদছিলাম। একটা নেই নেই হাহাকার আমাকে সাঁড়াশির মত চেপে ধরেছিল চারপাশ থেকে।
বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমরা। সামান্তা তখন চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। মিসক্যারেজে বাচ্চাটা হারায় সামান্তা। এরপর থেকেই আমাদের দুজনের খুঁতগুলো দুজনের কাছে ক্রমশ প্রকট হতে শুরু করেছিল। দু’বছর জোড়া তালি দিয়ে চলেছিল অথবা আমরা চালিয়েছিলাম। মাঝে মাঝেই দূরে কোথাও ব্যাকপ্যাকিং এ যেতাম আমরা। নতুন দেশ, অচেনা মানুষ আমাদের কাছাকাছি আনতো। মিটমাট হয়ে যেত সব। কিন্তু ফিরে আসার মাস খানেকের মধ্যেই আবার ঝামেলা শুরু হত।
ছোট একটা ভুল করেছিলাম আমি। বাচ্চাটা ওর পেটে আসার পরে আমি ভড়কে গিয়েছিলাম। বাঙালি সংস্কার হঠাৎ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। বিয়ের আগে থাকাথাকি এক কথা কিন্তু বাচ্চা? তখনই রাজ্যের সংকীর্ণতা ঘিরে ধরেছিল। সমাজ আত্মীয়স্বজন! এক সকালে বলে ফেলেছিলাম এ্যাবর্শনের কথা। সামান্তার সেই দৃষ্টি ভুলতে পারবোনা কখনো। পরে অবশ্য আমি অনেক করে মাফ চেয়েছি। বিয়ে করার সিদ্ধান্তটাও সেদিনই নিয়েছিলাম। সমাজকে গুল্লি মারি, মনে মনে আওড়েছিলাম। কিন্তু সবকিছু হঠাৎ উল্‌টে দিলেন বিধাতা। বাথরুমের মেঝেতে বসে হতবাক চেয়ে ছিল সামান্তা। ‘দু’পায়ের কোল বেয়ে মৃত্যু চলে যাচ্ছে জন্মের আগে’, এভাবেই বলেছিল ও আমাদের শেষ ব্যাকপ্যাকিংয়ের সময়। আমরা ক্যারিবিয়ান আইল্যান্ডে গিয়েছিলাম সেবার। সেরাতে আকাশও বুক ভেঙে কেঁদেছিল সামান্তার সাথে। আমরা অনেকদিন পরে শরীরে শরীর খুঁজেছিলাম। ফিরে আসার পরের সপ্তায় ও আমাকে রাতের খাবারের পরে জানিয়েছিল আমাদের সম্পর্কটা এখানেই শেষ হওয়া উচিত। আমার পকেটে তখন ওকে চমকে দেবার জন্যে সামর্থ্যের বাইরে কেনা বিয়ের আঙটি। দু’দিন পরে ও ক্যালিফোর্নিয়া চলে গিয়েছিল। আমি তখন লাইব্রেরিতে থিসিস লেখায় ব্যস্ত।
যাবার সময় ও কিছুই নেয়নি। ওর জামাকাপড়, টুথব্রাশ, ট্যাম্পন, কানের দুল, পেপারব্যাক, বিকিনি নেইলপলিশ সব যেমন রেখেছে তেমনই পড়ে ছিল।
ডিফেন্সের দিন আমি ভেবেছিলাম ও ফোন দেবে। এমনকি হয়তো চমকেও দিতে পারে এসে। ও যোগাযোগ করেছিল আরও এক সপ্তাহ পরে। আমি তখন নতুন এ্যাপার্টমেন্টে চলে যাবার জন্যে জিনিস কমাচ্ছি। এখনো কানে ভাসে ওর সেই শেষ ফোন কল। ‘হ্যালো ডঃ ডাট্ট’। আমি চুপ করে ছিলাম। ও অভিনন্দন জানালো আর জানালো শ্যন ক্যাম্পবেল নামে একজনের সাথে ডেইট করছে এখন। খুব সাধারণ একজন। যার ক্যারিয়ার নিয়ে কোন উচ্চাশা নেই, সামান্তাই তার জীবনের ধ্রুবতারা।
সামান্তা এখন ট্যাক্সাসে থাকে। শ্যন কেম্পবেলকেই বিয়ে করেছে। নিয়মিত চার্চে যায়। দুই মেয়ে নিয়ে ওর সুখি সংসার।
এ্যাপার্টমেন্ট পালটাবার সময় সামান্তার সব জিনিস আমিও ফেলে দিয়েছিলাম। পাঁচ বছর একসঙ্গে থাকার সমস্ত চিহ্ন মুছে দিয়েছিলাম। কেবল মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে আজও অজান্তে কারো চেনা স্পর্শ খোঁজে আমার হাত। সেদিন ব্রুকলিন ব্রিজের ওপর দিয়ে যাবার সময় হঠাৎ রীতার কথা মনে পড়েছিল। অদ্ভুত এক গ্লানি গ্রাস করেছিল আমাকে। সামান্তা চলে যাবার পরে আমি আর কোন সম্পর্কে জড়াতে পারিনি। কোন মেয়েই আমাকে আর মুগ্ধ করেনি। সেদিন ফিরে আমি বড়দা’র কাছ থেকে রীতার ফোন নম্বর নিয়েছিলাম। ও অবাক হয়েছিল। ‘এমা কী রে ঘন্টু! কী হলো? এত্তগুলো বছর পরে তুই আমার খোঁজ করছিস!’ রীতা আমাকে ঘন্টু বলে খেপাতো, আমার ডাক নাম রিন্টু বলতো না। রীতাকে সেই আগের মতই হাসিখুশি উচ্ছল মনে হয়েছিল। আমি কিছুতেই বলতে পারিনি আমার পাপের কথা।
ওদের দেখেছিলাম আমি। ফালুদা খাচ্ছে লিবার্টি তে। ক’দিন আগেই বাবড়ি মসজিদ নিয়ে কালিবাড়িতে হামলা করেছিল মিছিল করে মুসলমানেরা। মূর্তিগুলোর ধড়মাথা আলাদা করে ছড়িয়ে রেখেছিল রাস্তায়। আমি তখন ঢাকাতে। বাবা কাকারা জরুরী তলব দিয়ে ফিরিয়ে এনেছিলেন বাড়িতে। রীতারা তখন কোন এক সাংস্কৃতিক দলের হয়ে সম্প্রীতির বাণী ছড়াচ্ছে। মিছিল করছে। একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান। ‘বৌদ্ধ খৃস্টান আপাতত বৃন্তের বাইরে? যত্তসব!’ আপাতত এ দুটি ফুলতো পোকা মুক্ত করি!
সেদিন ওদের দূর থেকে দেখছিলাম। মাথা ফেরালেই ও আমাকে দেখতে পেত কিন্তু ও তখন হাহাহিহি করেই যাচ্ছে। মাথায় আমার জীবনানন্দ ঘাই দিচ্ছিলো, ‘কী কথা তাহার সাথে?’ ওর চোখ ভরে কাজল দেয়া । হুটহাট ছাদে যাওয়া। রিহার্সালের নামে বাড়ির বাইরে থাকা সবকিছু কেমন পরিস্কার হয়ে যাচ্ছিলো আমার কাছে।
হাটহাজারি বাস স্ট্যান্ডের কাছে এক কম্পিউটারের দোকানে দু’জনের ছবি দুটো জুড়েছিলাম। তারপরে বাঁহাতে দুই পৃষ্ঠা ওদের ব্যাভিচারের কাহিনী। চটি বইয়ের মতই চটুল। সম্প্রীতির মানে হিন্দু মেয়েকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বেহেস্তের খোয়াব! দেখাচ্ছি মজা। চিঠিটা পোস্ট করে সেদিন বেশ রাত করে বাড়ি ফিরেছিলাম। রীতা আমাকে ধরেছিল। ‘এই তোকে নিউমার্কেটে ঘোরাঘোরি করতে দেখেছে বাবু ভাই। ঘটনা কী? এখন সময় ভালো না একা একা না ঘুরে আমাদের সাথে কাজ করলে তো পারিস!’
আমি ওকে চোখ দিয়ে ভস্ম করে দিচ্ছিলাম।
রীতার অসুখটার পরে সেই অপরাধবোধটা ফের কুড়ে খাচ্ছিলো আমাকে। রীতার জীবনটা আমার কারণেই তছনছ হলো।
পনের বছর পরে কেবল রীতার জন্যে দেশে আসা আমার। গেটের সামনে রিকশা থেকে নামতেই দোতলার ব্যালকনিতে চোখ চলে গিয়েছিল। ওখানেই নারকেলপাতার আড়াল নিয়ে মা দাঁড়িয়ে থাকতো আমার অপেক্ষায়।
সদর দরজাটা খোলাই ছিল। আশেপাশের পরিকল্পনাহীন নতুন সব মাল্টি স্টোরিড বিল্ডিঙ আকাশ ছেটে দিয়েছে। এর মধ্যে আমাদের বাড়িটা দুখি চেহারা নিয়ে কালের সাক্ষি যেন। ভেতরে পা দিতেই চোখ চলে গিয়েছিল তুলসি তলায়। ওখানে এত ধুপকাঠি! বুক ধক্‌ করে উঠেছিল। বাবুল দা’ আর বড়দা উলটো দিকে দাঁড়ানো। আমাকে মেজ জ্যাঠিমাই দেখলেন। মুখে আঁচল চেপে সাথে সাথে বসে পড়েছিলেন মাটিতে। বড়দা’ অবাক হয়ে বললেন, তোকে কে খবর দিল? বাবুল দা’ রাজ্যের বিরক্তি চোখে আমাকে দেখছিলেন চুপচাপ। সাথে সাথেই মনের গহীনে জানা হয়ে গেল রীতা নেই আর। অদ্ভুত ব্যাপার রীতা আত্মহত্যা করেছে। কেন? সবাই বললো ব্যথাটা সহ্য করতে পারছিল না। আমাকে কেউ জোর করে যেন মাটিতে ঠুকে আঁটকে দিচ্ছিলো।
ডায়েরীর ছেঁড়া পাতাটা দিয়েছিল রীতার ছেলে। জেট-ল্যাগের কারণে খুব ভোরে ঘুম ভেঙেছিল। আমার বাবা মায়ের ঘরেই ঘুমাবার ব্যবস্থা হয়েছিল আমার। সারারাত এপাশওপাশ করে কেটেছে। দীর্ঘদিন পরে ভোরের আজান শুনলাম। ছাদে চলে এসেছিলাম। বাড়ির সবাই তখনো ঘুমে। কড়া লিকার চায়ে হাল্কা দুধ মেশালে যেমন হয়, রাতটা মেলাচ্ছে ঠিক সেই ভাবে। ছাদের হাওয়ায় শিশিরের আঁচ ছুঁয়ে আছে। আকাশে তারাগুলো তখনো আবছা আলো নিয়ে ঝুলে আছে। কোথায় আছে রীতা? হঠাৎ বুকটা হুহু করে উঠলো। এই ছাদেই ও কারণে ওকারণে উঠতো বলে আমার সন্দেহ পাকা হয়েছিল। উলটো দিকেই ছিল বাবু ভাইদের বাড়ি। কত কী মনে পড়ছে! দেয়াল ঘেঁষে বেল গাছটা এখনো আছে কেবল আগের মত ঝাকড়া নয় আর। ভোরের আলো ফোটার আগেই পুজোর ফুল তুলতে আসতো ছেলে বুড়ো, মাঝে মাঝে বুড়িটাইপ মাসিমারাও। আমার এখন সেই একই বয়েস। ফুল পাড়ার জন্যে একধরণের সরঞ্জাম থাকতো। স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় কোঁটা; লম্বা বাঁশের কঞ্চির আগায় লোহার আঙটা লাগানো। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে পাতলা আঁধারের মধ্যেই আমাদের ঘরের জানালা দিয়ে দেখা যেত দেয়াল ঘেঁষে কোঁটা উঠে যাচ্ছে গাছের ডালে, একটু পরেই বেলের ডাল আঙটার গায়ে মুড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে দেয়ালের ওপারে। নিঃশব্দেই চলতো এই পারাপার। তবে মাধবী লতার ঝাড়টা সদর দরোজার কাছে মাথা নুইয়েই পুজারীদের জন্যে অপেক্ষা করতো যেন। হাতের নাগালেই যা পাওয়া যেত তাতেই ডালা ভরে যেত, কোঁটার দরকার হতো না। ঠানদিও আলো ফোটার আগেই উঠতো ফুল তুলতে। অলিখিত প্রতিযোগিতা যেন! সাধারণত এইসব ফুল চুরি নিয়ে ঠানদি কিছুই বলতো না তবে বেলপাতার ব্যাপারে ঠানদি ভীষণরকম সংবেদনশীল ছিলেন। বিষ্যুতবার ছাড়া অন্য দিনগুলোতে ভোরবেলার এই সব অভিযাত্রীদের কোঁটা বেলগাছের আশেপাশে দেখলেই ঠানদি’ চিলচেঁচাতেন! ‘অনাস্তিক তোরা আঁর বেল গাছরে মারি ফেলাবিনা?’ (অনাস্তিকের দল আমার বেল গাছ কি মেরে ফেলবি?)। মাঝে মাঝে দেয়ালের ওপাশে চ্যাংড়া কেউ থাকলে ঠানদিকে আওয়াজ দিত, ‘গাছে বেল পাকিলে তাতে কাকের কী?’। সেসবের উত্তর দিত না ঠানদি। শ্যামাকে পাঠাতেন দেখতে। শ্যামা হাই তুলতে তুলতে পাড়া কাঁপিয়ে গেইট খোলার আনজাম করার আগেই অন্যপক্ষ পগারপার।
ছেলেবেলায় আমিও উঠতাম মাঝে মাঝে ঠানদির সাথে। তবে রীতা উঠতো সবসময়। কবে যেন ঠানদি পিঠ বেঁকে থুত্থুড়ে বুড়ি হয়ে গেল কিন্তু পুজোর ফুল তোলার সেই ভোরের পর্বটা রীতাই চালু রেখেছিল। ওর বিয়ের দিন ভোরেও দধিমঙ্গলের ভাত খাওয়ার আগে পুজোর ফুল তুলতে উঠেছিল। জানালা দিয়ে দেখেছিলাম আমি ওকে। কী মগ্নতায় ফুল গোছাচ্ছে সাঁজি ভরে! ওর মুখে একধরণের নির্লিপ্ততা ছুঁয়েছিল। আড়াল থেকে ওকে দেখে আমার সেদিনই মনে হয়েছিল কোথাও একটা বিরাট ভুল করে ফেলেছি আমি।
এখন কেন জানি মনে হচ্ছে রীতা এ বাড়িতে থাকবে না পণ করেছিল হয়তোবা। অসুখের প্রাবল্যে ওর পণ ভঙ্গ হচ্ছে মানতে পারেনি কি?
ছাদটা একটু অন্যরকম লাগছে। কোথায় কী যেন নেই। একটু সময় লাগলো পরিবর্তনটা ধরতে। ছাদে জলের ট্যাঙ্কটা নেই। আমি থাকার সময় এখান থেকেই মটর দিয়ে জল ওঠানো হতো। এখন ছাদের সিঁড়ি বেঁকে আরেকধাপ উঠে গেছে। সেখানে ছাদ বাগান আর গাজি ট্যাংক দাঁড়িয়ে আছে কালো দৈত্যের মত। হঠাৎ করে বিল্ডিংটা কেমন যেন একদিকে কাত হয়ে আছে মনে হচ্ছে।
সিগারেট হবে?
আচমকা পাশ থেকে কেউ বলে উঠলো। চমকে উঠেছিলাম।
চোয়াড়ে মার্কা চেহারা। রীতার বা বাবুল দা’র কোন চিহ্নই নেই ওর আদলে। কত হবে বয়েস? বাইশ? চব্বিশ?
সিগারেট খাওয়া পোড়া ঠোঁট। আমি পকেট থেকে ডানহিলের প্যাকেটটা বের করে ওর দিকে ছুঁড়ে দিলাম। ও হাত বাড়িয়ে লুফে নিল। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্যাকেটটা জরিপ করতে লাগলো। আর আমি ওকে।
গতকাল মনা মাসি বলছিল ছেলেটার জন্যে রীতা খুব মন খারাপ করতো। মাথা পরিস্কার কিন্তু কুসঙ্গে পড়ে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে নেশা ভাঙে ডুবে আছে। মনা মাসি মেজজ্যাঠিমার বোন।
আমি সহজ হওয়ার চেষ্টা করি,
কী কর তুমি?
নামটা মনে আসছে না। অর্ক না অভ্র? এই বয়েসী ছেলেদের আমি সমঝে চলি। নয় থেকে তেরোর বয়ঃসন্ধির মত বিশ থেকে চব্বিশেরও কোথাও একটা গোলমেলে চক্কর আছে। অতিরিক্ত সাহস আর আত্মবিশ্বাস এই দুইই এই বয়েসে অন্যকে তাচ্ছিল্যের ধৃষ্টতা দেয়। গতকাল থেকে একগাদা নাম শুনেছি। কারো ছোট কাকু, কারো ছোট মামু এমনকি ছোট দাদুও। আমার এতগুলো বছরের অনুপস্থিতির নিকেশ ওরা একএকজন। এর বেলায় নাম যদি ভুল করি তবে সহজভাবে নেবে না। রীতার মৃত্যুর গুমোটটা আমি আসায় কেমন যেন উৎসবে পাল্‌টে গেছে! এমন কী মেজো জ্যাঠিমাও কাল অনেক রাত অব্দি আমার কাছে আমেরিকার গল্প শুনছিল। ওর কি রাগ হচ্ছে আমার ওপর? এই সিগারেট চাওয়ার মধ্যেই কেমন একটা অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য জড়িয়ে আছে।
ও আমার কথার উত্তর দেয়না। সিগারেটটা ঠোঁটের কোণে চেপে ডান হাত প্যান্টের পকেট হাতড়াতে থাকে। লাইটার খুঁজছে নিশ্চিত। লাইটার আমার কাছে আছে কিন্তু আগ বাড়িয়ে ওকে বলতে ইচ্ছে হয়না। আমার দিকে কাত করে লাল চোখে তাকায় কিছুক্ষণ। তারপর দুম করে বলে
আপনি মা’কে ভালোবাসতেন?
মানে?
মানে মা’র সাথে আপনার কোন চক্কর ছিল?
কী!!!
ধাঁ করে মেজাজ চড়ে যায় আমার।
তোমার মা আমার আপন জেঠতুতো দিদি। ভালো তো বাসবই নাকি?
ও পকেট থেকে ধীরেসুস্থে দেশলাইয়ের বাক্স বের করে। বাক্সের ধারে এক আঙুলে অদ্ভুতভাবে কাঠি ঠুকে সিগারেটে আগুন জ্বালায়। নিতান্ত অবহেলায় ছাদ থেকে নিচে ছুঁড়ে দেয় দেশলাই বাক্সটা। বাক্সে কি কেবল একটা কাঠি ছিল? সিগারেটের প্যাকেটটা আমার দিকে তাকিয়েই পকেটে চালান করে দেয়। এক্কেবারে নতুন প্যাকেট। মাত্র দুটো শলা টেনেছি আমি।
‘ভালো জিনিস। এখানে সব দু’নম্বর’। আয়েস করে লম্বা টান দেয়। আমি খেয়াল করি ও বেশ লম্বা। আমার চেয়ে ইঞ্ছি খানিক তো হবেই। মুখখানা গা আন্দাজে ছোট বলে কিনা জানিনা ওকে গত কাল বিকেলে অতটা লম্বা মনে হয়নি আমার।
কিন্তু এটা কী বললো ও? পিঠ দিয়ে সরসর করে ঠান্ডা সাপ নামে আমার।
চোয়াল শক্ত করে তাকাই আমি।
কী বলছিলে যেন তোমার মাকে নিয়ে?
ছাড়ুন । আমার মায়ের সাথে আপনার সম্পর্ক থাকলে কি আর না থাকলেই বা কি? সে তো এখন আকাশে চড়ে বসেছে। ক’বার বললাম তোমার রিন্টু ভাইকে বল আমার ভিসা লাগাবার ব্যবস্থা করতে আর সে কিনা দড়ি দিল? শালার বাপটা এখন দেবদাস দেখাচ্ছে নাকের জলে চোখের জলে কান্না ফোটাচ্ছে। অথচ পান থেকে চুন খসলেই মাকে অতিষ্ঠ করে রাখতো।
আমার কান মাথা বোঁবোঁ করতে থাকে। আমাদের বুড়ি ঠানদি’ সারাক্ষণ সকাল সন্ধ্যা আওড়াতো,
‘চটা কথা কাদা পায়
ছোট লোক চেনা যায়’।
আর সেই বাড়ির নাতি কিনা দিব্যি মুখ সোজা করে বাপকে খিস্তি করছে। আমার সাথে মাকে জড়িয়ে নোংরা কথা বলছে।
বুকের ভেতরে মনে হচ্ছে হাজার পাথর ভরে দিয়েছে কেউ। ও এবার পকেট থেকে একটা ডায়েরির ছেঁড়া পাতা আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে।
আপনার সাথে আমার মায়ের কিছু থাক না থাক আমার মায়ের জীবনটা ছারখার করার পেছনে আপনি ছিলেন।
আমি হাত টেনে কাগজটা নিতে গিয়ে দেখলাম ওর চোখের কোণে জলের আভাস। দ্রুত পেছন ফিরে সিঁড়ি টপকে ও হাওয়া হয়ে যায়। কাগজটা ভাঁজ খুলে পড়ি, ‘রিন্টু তোর ‘র’ আর ঠিক হলো না। চিঠিটা উড়ে আসেনি তুই দিয়েছিস। মা আমাকে দ্বিরাগমনের দিন দেখিয়েছিল। বাঁ হাতে লিখেছিস। আমাদের ফেলুদা’র মত গোয়েন্দা হবার শখের কথা মনে পড়েছিল। তুই উল্টো করে লিখতে পারতিস। অবশ্য তাও আমি ধরে ফেলতাম। কেন রে রিন্টু? এমন কাজ করার আগে একবার জানতে চাইলি না? ছবি দুটো কোথায় জুড়েছিলি? খুবই কাঁচা হাতের কাজ। বাবা জ্যাঠারা এমনকি বড়দা’ও ছবিগুলো দেখে বুঝলো না! অনেক ইচ্ছে ছিল পি এইচ ডি করবো, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবো। তোকে মাফ করে দিয়েছি। শুধু অপমানটা মন থেকে তাড়াতে পারছি না। আমার কাছে কেউ কিছু জানতে চাইলো না! সেদিন আমিই বাবুভাইকে জোর করে ধরে ফালুদা খেয়েছিলাম। রিহার্সাল থেকে বেরিয়ে সঞ্জানার জন্যে অপেক্ষা করছিল বাবুভাই। সঞ্জনা আসতে পারবে না জানিয়েছিল আমাকে। বাবু ভাইয়ের চিঠি পৌঁছে দেব, বিনিময়ে ফালুদা । বাবু ভাই আমাদের সবার দুলাভাই ছিল রে। তোকে বাবু ভাই দেখেছিল সেদিন। আমাদের রিহার্সালে নিয়ে আসতে বলেছিল। আমি যদি জানতাম তোর মাথায় এমন কিছু দানা বাঁধছে নিজেই তোর সন্দেহ দূর করতাম। আমি জানি তুই প্রচন্ড অপরাধবোধে ভুগছিস। কথাগুলো আমার রাগ কমানোর জন্যে লেখা। বাবুলকে ভালোবাসিনি কিন্তু অভ্রকে তো ভালোবাসতে হবে। মন থেকে ক্ষোভ না সরালে হচ্ছিলো না। তবে তুই কখনো জানতেও পারবি না যে আমি জেনেছিলাম সব।
ডায়েরির পাতায় তারিখ দেয়া পঁচিশে মার্চ ১৯৯৩।
জীবনে দ্বিতীয়বারের মত আমার চোখ ভেসে যাচ্ছিলো জলে।