মাইক্রোওয়েভ ও একটি রান্না

শুভ আঢ্য



আপনি তো খেতে ভালবাসেন! তাহলে রান্না ব্যাপারটা নিশ্চয়ই খুব একটা অপছন্দের না, আর সামান্য হাত পুড়িয়ে নিতেও... মানে ওই মাইক্রোওভেনে রান্না আর কি... খুব খারাপ লাগবে না। আর বাই-চান্স ভালো হয়ে গেলে নিজেকে বেশ একজন শিল্পী শিল্পী, মানে ঈশ্বর ঈশ্বর মনে হবে। তো, শুরু করা যাক...
হ্যাঁ, তো ব্যাপার হল শক্তি, ব্যাপার হল নিত্যতা সূত্র। আর ব্যাপার হল ফিজিক্স, আর ব্যাপার হল আমাদের সমাজ। তো ব্যাপার হল এই সব। ও হ্যাঁ, রান্নার কথা বলছিলাম। তো, পাহাড়ে গেলে মাংস যেমন সহজে সেদ্ধ হয় না... হাই অল্টিটিউড... নাহ্‌, অনর্থক বকছি না, কারণ হ্যাজ। কারণ পারিপার্শ্বিকতা। তা ছেড়ে আপনিই বা কে, আমিই বা কে, আর এই মুরগী তা সে জ্যান্তই বা কি, মরাই বা কি।
এখন আপনি নিজের চারপাশ দেখুন। মানে আপনি যে সাড়েদশ-বাই-পৌনেবারোর শীতাতপনিয়ন্ত্রিত খোপে থাকেন, তার কথা ভাবুন। একটি পোলট্রি বই তা’ই বা কি আর... কি? আপনি একা থাকেন? হতেই পারে না। আপনার সঙ্গে সুমন আছেন ঘণ্টাখানেক, বব ডিলান আছেন, ফেসবুকের তিনহাজারপাঁচশোসাতষট্ টি জন ফ্র্যাণ্ড আছেন, যারা আপনার হাসিতে হাসেন, সিরিয়াস কিছু বললে চুপ করে যান অবশ্য, সে আলাদা ব্যাপার। তাহলে, কিছুটা পরিষ্কার হল তো ব্যাপারটা? আপনি হলেন গিয়ে সেই মাংস ভাজার আগের হাইব্রিড মুরগীটি, তেলা মাংসসমৃদ্ধ ঠ্যাং, চওড়া সিনা, গায়ে সাদা পালক নিয়ে বাজার গরম করছেন। আপনি কেন, আপনার মতো অনেকেই তো গরম করছেন বাজার। এই তো দহনকাল প্রসঙ্গে বেশ আস্তে আস্তে ঢুকে পড়া গেল।
আপনার বক্তব্য নেই, সামান্য শব্দ আছে। নিজে জবাই হবার আগে অন্যকে কসাইয়ের আগে এগিয়ে দেবার স্বাধীনতাটুকু নিয়ে আপনি নিজের গায়ের পালকে পোকা ধরিয়েছেন। সুতরাং সামান্য অসহিষ্ণুতা থাকাটা খুব একটা দোষের নয়। আপনি দেখছেন, প্রত্যেকদিন আপনারই ফিমেল ভার্সানেরা ডিম দিয়ে যাচ্ছে, আর কেউ একজন সে ডিম তুলে নিয়ে যাচ্ছে; কেউ ডালনা খেয়ে ঢেঁকুর তুলছে বাঙালীমতে, কেউ পোচ, হাফবয়েল ইত্যাদি প্রভৃতি। এটাকে ভ্রুণহত্যা বলি? এই যে আপনার ছোট্ট মাথায় লাল ঝুঁটির মতো এক ছটাক বুদ্ধিও আছে, তা কোনো কম্মের নয়। আছে, এই পর্যন্তই। কাজে লাগাতে যাবেন না, আর চাইলেও পারবেন না। পোলট্রির বাইরে তো তাক করা আছে চপার আর থাক করা আছে বাসি মাংস রাখার মিটশেল্ফ। এবার, বল্‌ মা তারা দাঁড়াই কোথা?
এই যে আপনাকে ইচ্ছের বিরুদ্ধে কম সময়ে বড়ো করে তোলা হচ্ছে, পাকিয়ে তোলা হচ্ছে, আপনার সরু ঠ্যাংকে খালি বেসনে ভাজার জন্য বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, এর জন্য অসহিষ্ণুতা থাকা স্বাভাবিক। আর এ কাজ করছে কে? তাকে আপনি বণিক বলে জানতে শিখেছেন, অথচ দেখেননি কোনোদিন, কারণ তারা আমার আপনার টাকা ঋণ হিসেবে নিয়ে ভাগলবা। খালি তাদের শাগরেদরা এসে আপনার ডিম তুলে নিয়ে যায় (এখানে আপনাকেও ইন জেনারেল ফিমেল বলে ধরা হল)। এই দহনকালে আপনি এসিতে বসে, ফেসবুকে চাড্ডি স্ট্যাটাস দিয়ে সমাজ সম্পর্কে আপনি যে কারওর চেয়ে কম জানেন না এবং আপনার অক্ষিপটলেও যে কিছু পরিমাণ এইচ-টু-ও আছে তা’ও জানান দিয়ে দিতে চান। কি করেন আপনি? না, এই যে আপনাকে ধর্ষণ করা হচ্ছে, ইচ্ছের বিরুদ্ধে ডিম, উফফ্‌, একই কথা বারবার আপনাকে বলতে হয়! এসব বুঝে নিন। তা আপনার বয়স যাই হোক না কেন, আপনি ডিম দিতে এয়েচেন। তা অন্য কেউ দিল কি দিল না, তা জানার দরকার কি! আর ধর্ষণই বা কি, আমার ইচ্ছা হচ্ছে আপনার সাথে এট্টু শুই, ওই আর কি... তো আপনার দিল তো মচ্‌ল যাবার কথা, সিনেমায় দেখেননি? কি করতে তাহলে বলিউড মুভি দেখেন? ওপিনিয়ন ফর্মেশন? হ্যাঁ, গেল বছরেও পেঁয়াজের দাম বেশ বেশীই ছিল! আপনি কি ওপিনিয়ন পড়লেন? আমি ওনিয়ন লিখতে গিয়ে... এহ্‌ হে, প্রিন্টিং মিসটেক। আপনার আবার মতামত কি মশাই। আপনি বাজার, আপনি গণ, আপনি পোলট্রির ভেতর থেকে বুখ বের করা সামান্য এক পাখী যা উড়তে অবধি পারে না। এই গরম বাজারে গা-গতর আপনার ঝলসে যাচ্ছে, তবু, এ এক বিস্তৃত মাইক্রোওয়েভ বলে আপনি চুপ থাকছেন।
এবার আপনার অধিকার নিয়ে কথা হোক। অধিকার তো আপনাকে দেওয়া হচ্ছেই। ওই যে চানা আপনার সামনে দেওয়া হচ্ছে, অসুখ করলে সাতাশ দিন বাদে ডাক্তার দেখানো হচ্ছে, তিনি ভেট না হয়েও চিকিৎসা করছেন, এ’ও কি আপনার অধিকারের পর্যায়ে পড়ে না? বাকি থাকল, মনোনয়ন। আহা, মন হরণ করা ওই নয়ন, তা বোজার মধ্যেই তো প্রশান্তি। কেন আপনি রেখেছেন খুলে! সুতরাং আপনার পালকের ওপর কেউ তো আর হাত বুলিয়ে দেবে না, বরং উপড়ে নেবে ক’টি। আপনার আর থার্ড পার্সন প্লুরাল নাম্বারের সাথে সামান্য ঝটাপটি হলে কিছু পালক তো উড়বেই। তো সেই হল ব্যাপার, এখানে আবার ডারউইন চলে আসেন, এই এক মুশকিল। যোগ্যতমের উদ্বর্তন। শালা, ডারউইনই ঠিক ছিলেন, এইসব অধিকার ফধিকার সব ফালতু। আপনার গায়ে জোর নেই - তো, আপনার বেঁচে থেকে হবেটা কি? হ্যাঁ, সামান্য তোষণের কথা বলছেন! সেটা হল আপনাকে জবাই করার আগে ম্যারিনেট করা হয়েছে তো। আহা, দই, লঙ্কা, কেওড়ার জল দিয়ে আপনাকে সামান্য প্যাম্পার করা হবে ভোটের আগে, এটাই দস্তুর। এটাই তো এই সারাবছর গমরকাল থাকা দেশে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা! আপনি সংজ্ঞা মেনে চলুন, আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আপনারই জিনের ভেতর সালামত থাকবে।
ওই যে ফিজিক্স, ওই যে নিত্যতা তা মান্য করুন। এবার এমন এক জিনিসের কথা বলি, শুনে আপনার নেশা হয়ে যাবে। আপনাকে নিয়েই তো নেশা, যাকে আমরা ধ-এর পরে ম-য়ে রেফ দিয়ে বলি। এর আবার নানা ভাগ আছে। যেমন ওই চাইনিজ, মোগলাই, নর্থ-ইণ্ডিয়ান, ফিউশন, থাই... আলাদা আলাদা। তো আপনাকে রামের সাথে নাকি রহিমের সাথে (পড়ুন হুইস্কি), তা নিয়ে ভেবে আপনার মাংস সামান্যতম নরম করেও লাভ নেই, বরং যেনে রাখুন বেশ ভালো রকম হাই টেম্পারেচারে আপনাকে গরম করা হবে। তন্দুরি হতে চলেছেন, মশলাগুলো গায়ে লেগে পুড়তে পুড়তে থাকবেন আর চ্যান্ট করবেন হরি ওম... হ্যাঁ, পতাকা ধরার দণ্ড আপনার ওইখানে ঢুকিয়ে যে দেওয়া হয়েছে তা নিয়ে কিছু বলাই এক্সট্রা। ওটা এতক্ষণে অনুভব করার পর নিশ্চয়ই সে বেদনাও সহ্য করে ফেলেছেন। আপনি সর্বংসহা। আপনিই ঈশ্বরের প্রতিভূ। ওই নিত্যতা সূত্র মেনে আপনাকে ট্রান্সফার করা হচ্ছে মানুষ থেকে মুরগী থেকে ভক্তে।
এতক্ষণে আপনার গা বেশ দগদগে হয়ে উঠেছে। আপনার ত্বক বেশ পুড়ে পুড়ে উঠেছে। তা এই দামি মাইক্রোওয়েভের ভেতর প্রিহিটেড বলে একটা ব্যাপার তো থাকে, না কি! দামি জিনিস। আপনার পারিপার্শ্বিক ব্যাপারটার সাথে রান্নার কি সম্পর্ক নিশ্চয়ই বোঝাতে পারলাম? না পারলে, তার দায়ও আমার না, আপনার মাথায় ছোট্ট লাল ঝুঁটিটা ছাড়া আর আছেই বা কি, সে তো আগেই লিখে রেখেছি। এই দহনকালে আপনি করবেনটা কি? পোতিবাদ-টোতিবাদ বাংলা সিনেমার ব্যাপার, ওসব নব্বই সালের পর আর পাবলিক খায় না। আর করার মধ্যে যেটা থাকল তা হল হজম করা। এই যে এত্ত ঘটনা ঘটছে, এই যে আসিফা, এই যে অন্য এক জায়গায় অন্য ধর্মাবলম্বী কাউকে... তো এসব নেহাতই একটা ঘটনা। ঘণ্টাখানেক সুমনের সাথে বসলে আপনি জানতে পারবেন, আপনি খুব সৎ এবং এথিকসধর্মী হলে খুন খওল উঠেগা, কিন্তু আপনার রক্ত তো সাপের মতই ঠাণ্ডা হতে সামান্য সময় লাগা ছাড়া আর কি’ই বা হবে।
আপনি দেখবেন, সামনে একদল মানুষ মার্চ করতে করতে এপ্রিলের দিকে চলে গেল। পায়ের দগদগে ঘায়ের ছবিতে ভরে উঠল মোবাইল স্ক্রিন, কিন্তু আপনার পাশের কেউ তা’তে হাঁটল না, আর যদি বা হাঁটল তা’ও রবিঠাকুর জুতো তো আবিষ্কার করেই দিয়ে গেছেন। দেখবেন, আপনার মেয়ে আর সেফ নয় অথচ আপনাকে সইফ আলি খানের সিনেমা দেখতে বাধ্য করা হচ্ছে। আপনি কামের বিরুদ্ধে বলবেন আর আপনার ডিও-পাউডার মায় শেভিং ক্রিমটি অব্দি কোনো না কোনো মহিলা এসে আপনার গালে ঘষে দিয়ে যাচ্ছে। আপনি সংযত হবেন, দেখবেন আপনার ফ্রিজের খবর হাইজ্যাক হয়ে ক’জন জীবাণু আপনার বাড়িতে ঢুকে পড়ল আর কসায়ের মতো কাটাকাটি, রক্তারক্তি... নিঘিন্নে ব্যাপারস্যাপার।
অনেক হয়েছে, এবার মাইক্রোওভেন থেকে বেরিয়ে একটু রুম টেম্পারেচারে থেকে মচমচে হয়ে নিন, নামতে হবে অনেকটা পথ। সেই গলা থেকে ভেতরের নাড়িভুঁড়ি হয়ে সেইইইইইইইইই পাকস্থলী, সেখানেও এনজাইম! নাহ্‌, আর ভয় দেখাবো না। ছাড়ান দিলাম। এখন একটু সিনেমা দেখতে বসবো। ঋত্বিক ঘটকের ওই সিনেমাটা, যাতে আছে - সব পুড়ছে, ব্রহ্মাণ্ড পুড়ছে। সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা মানুষ, উনিও মনে হয় মাইক্রোওভেনের ভেতর বসেই সিনেমাটা বানিয়েছিলেন।