বহ্নিশিখার দিন

মঈনুল হাসান



একটা ঘোর আচ্ছন্নের মধ্যে ডুবে আছে নিবারণ। অবসন্ন বিবশ শরীরটায় এখন আর আগের মতো বল নেই। কোষ্ঠী গণনা করে বয়সের কোনো হিসাব তার কাছে না থাকলেও উনপাঁজুরি শরীরটা দেখে বয়সটা বেশিই মনে হয়। অন্তত কোটরে দেবে যাওয়া চোখ ও চোখের নিচে জমে থাকা ছোপ ছোপ কালির দিকে তাকালে। দিকভ্রান্ত মানুষটির শূন্য দৃষ্টির অতল গভীরতা আর কপালের কুঞ্চিত বলিরেখা বিলক্ষণ সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। এ যেন এক যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষের নিদারুণ প্রতিচ্ছবি।
উৎকণ্ঠিত আর অসহায় নিবারণ তার শরীরটা কোনোরকম টেনে নিয়ে টলবল পায়ে বুড়ো শিমুল গাছটার লাল শামিয়ানার নিচে এসে দাঁড়ায়। মলিন পোশাকে চোখের ঘোলাটে দৃষ্টি নিয়ে একবার উপরের দিকে চায়। কিন্তু, সে চোখ যে গভীরতা মাপার চেষ্টা করে তা অন্যদের নজর এড়িয়ে যায় নিমিষেই।
শিমুলের রুক্ষ গাছটার ডালে ডালে একরোখা তেজী ভাবের নাচন। পাতাহীন ধূসর শাখায় শুধুই লাল ফুলের বিদ্রোহ- যেন জ্বলজ্বলে কোনো মশালের অগ্নিবিম্ব আহ্বান। কিন্তু, নিবারণের চোখে মুখে সে বিদ্রোহের লেশমাত্র দেখা যায় না তেমন। বড় অস্পষ্ট অস্ফুট সে ছাপ। হতবল হয়ে এদিক ওদিক কী যেন খুঁজতে থাকে সে। অনতিদূরের মুন্সিপাড়ার গোরস্থান ঘিরে সৃষ্টি হওয়া জটলাটি তাকে সম্মোহিতের মতো টেনে নিয়ে এসেছে এখানে। প্রচন্ড ভিড় ঠেলে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করে নিবারণ। তেষ্টায় গলা শুকিয়ে আসে তার। আকণ্ঠ তৃষ্ণাটা তাকে মুহূর্তেই শশব্যস্ত করে দেয়।

বিলাসপুরের প্রধান সড়ক পেছনে ফেলে গাঁয়ের মাটির রাস্তার দুইধারে যেখানে আকন্দ, বাবলা আর রাঙচিতার বুনো ঝোপ তার ঠিক শেষ প্রান্তে পুব দিগন্তঘেঁষা মুন্সিপাড়ার গোরস্থান। দীর্ঘদেহী শিমুল গাছটা সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে সবকিছুর সাক্ষী হয়ে। বুড়ো গাছটার মাথায় লাল লাল ফুলের সেই কী মনোরম উজ্জ্বল আভা। দূর থেকে হঠাৎ তাকিয়ে আগুনের রোশনাই ভেবে দৃষ্টিভ্রম হয় যাত্রাপথের মানুষের। আবার অমাবস্যার ঘুটঘুটে রাত্তিরে গাঁয়ে ফেরা মানুষের কাছে সাক্ষাৎ যমদূতও এটি। মাঝে মাঝে অশরীরী কোনো ছায়া ভেবে ভ্রম হয় তাদের। আল্লাহ ও ভগবানের নাম জপ করতে করতে দুরু দুরু বুকে শ্মশান আর গোরস্থানের মাঝখান দিয়ে একছুটে পালিয়ে যায় তারা। শিমুল গাছটার মধ্যে কী যেন সম্মোহনী একটা ব্যাপার আছে, যা গাঁয়ের লোকের মুখে মুখে ফেরে।
ফাল্গুনের নেশালাগা হাওয়ার দাপাদাপি চারদিকে। রোদের তেজ ততটা জ্বালা ধরায়নি গায়ে। কাছের কোনো বুনো ঝাড় থেকে লাল আষাঢ়ি লতার হালকা সুগন্ধ মেশানো বাতাসটা বার বার নাকে এসে লাগছে নিবারণের। লাঠিতে ভর করে ঠায় দাঁড়িয়ে ঝাপসা চোখে ইতিউতি তাকায় নিবারণ। সেখানে গিয়াস মাস্টার, আলম মেম্বারসহ তার স্বজাতি কয়েকজনকেও দেখতে পায়। ছেলে ছোকরাদের কারো কারো চোখে কৌতূহলভরা জিজ্ঞাসার শাণিত দৃষ্টি। ফিসফিস করে জানতে চায় কী হবে এখানে। জটলার গুঞ্জনে ওঠা কথাগুলো নিবারণকে আরও চিন্তাগ্রস্ত ও ভারাক্রান্ত করে দেয় ক্রমশ।
পুলিশের নীল রঙের একটা জীপ গড়গড়ে আওয়াজ তুলে হঠাৎ এসে থামে সেখানে। যান্ত্রিক আওয়াজে সচকিত হয়ে ওঠে সবাই। সাদা পোশাক পরিহিত একজন লোক জীপের সামনে থেকে নেমে শিমুল গাছের নিচে রাখা বেঞ্চিটায় গিয়ে বসে। জীপের পেছন থেকে লাফ দিয়ে নামে কয়েকজন সেপাই। উপস্থিত সকলে নিশ্চিত হয় পুলিশের কেউ হবে।
এদিকে চলছে কবর থেকে লাশ উঠানোর নির্বিঘ্ন বিরামহীন আয়োজন। শ’খানেক লোক জটলা পাকিয়ে সেই যজ্ঞই দেখছে উৎসুক হয়ে। নদীর ধার ঘেঁষে গোরস্থান। মাটির রাস্তার অন্য পাশে অনতিদূরেই হিন্দুদের শব দাহের শ্মশান ঘাটও আছে। তবে সব কৌতূহল ঘুরপাক খায় মুন্সিপাড়ার গোরস্থানের ওই নতুন কবরটিকে ঘিরে। সকল রাগ, ক্ষোভ, ঘৃণা আর রহস্যের জন্ম হয়েছে যেখানে।
উৎসুক জনতার অজানিত আগ্রহ ও অগণ্য জিজ্ঞাসা গফুর মুন্সির ছোট ছেলে সুলতানকে ঘিরেও। মাসখানেক আগে গাঁয়ে চাউর হয়েছিল সুলতান নিবারণের মেয়ে ফুলকিকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল পাশের গাঁয়ে। ভাব ভালোবাসায় ডুবে জাত ধর্মের জটিল হিসাব মেলাতে না পেরে হঠাৎ এই নিরুদ্দেশ। খেয়ালের বশে সুলতান সকলের অগোচরে জোর করে ফুলকিকে নাকি বিয়েও করেছিল। কিন্তু, দুর্জনের ছলের অভাব হয় না একথা সকলেই জানে।
গফুর মুন্সি কাটগোঁয়াড় লোক। জাতের মান-সম্ভ্রম যাতে খোয়া না যায় সেদিকটা ষোল আনা ঠিক রেখে নানান কূটকৌশলে সুলতানকে ফিরিয়ে আনে নিজের কাছে। বিত্তহীন স্বজাতি কাউকেই যেখানে সে মানতে নারাজ নিম্নবর্ণের কোনো হিন্দুর মেয়েকে ঘরে ঠাঁই দেবে কোন ভরসায়? তাই বিয়ে নামক এ সত্য ধর্ম পালনকে অগ্রাহ্য করে জাত-ধর্ম, বিত্ত বৈভবের ছক কষে শুরু করে নানান অশান্তি। সুলতানও ফেঁসে যায় সেই খেয়ালি ফাঁদে।
অনাদর অবহেলায় শিমুলের লালচে রঙ যেমন ফিকে হয়ে আসে তেমনি সুলতান ও ফুলকির মনে হঠাৎ যে চিত্তভ্রম তৈরি হয়েছিল একদিন সে ঘোর কেটে যায়। এক নিমিষেই মিলিয়ে যায় সে এক দন্ডের মোহ। আসলে নিদারুণ গঞ্জনা আর অবহেলায় জীবনের শেষ দিনগুলো কাটতে থাকে ফুলকির। যাপিত জীবনের অস্থির তাড়নায় এক সময় তার রঙিন মনে ধূসর বাদামী রঙ ধরে। আর সেই ধূলিমলিন বিবর্ণ মনটায় বিষণ্নতার পাথর চেপে বসলে সে ছুটে যায় নিঃসঙ্গ শিমুল গাছটার তলে। আগুনের ফুলকি হয়ে জ্বলে ওঠার আগে গভীর অভিমান নিয়ে শেষ ফাগুনের নিবেদন জানায় গাছের শাখে শাখে।
একদিন হঠাৎ প্রচণ্ড জেদ আর মানসিক উন্মাদনায় রাতের অন্ধকারে নিজেই নিজের অগ্নি সৎকারের আয়োজন করে। গায়ে কেরোসিন ঢেলে দাহ করতে চায় নিজেকে। সে আয়োজনের মধ্যে রাগ-ক্ষোভ যেমন ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি ছিল চাপা এক কষ্টের দগদগে ক্ষত। তবে জেদের বশে সুলতানই এ কাণ্ড করেছিল কিনা এ নিয়ে রয়েছে দেদার গুঞ্জন ও বিস্তর তর্ক। কেউ মুখ না খুললেও গাঁয়ের লোকের মনে এ নিয়ে নানান প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে।
গফুর মুন্সি ও তার লোকেরা সহজে দমার পাত্র নয়। এই ভয়ে তাই কেউ মুখ খুলতে চায় না। খামাখা ঝঞ্ঝাট বাড়িয়ে লাভ কী? লোক জানাজানি হবার আগে রাতের মধ্যেই নতুন গোর খুঁড়ে মাটি চাপা দেয়া হয় ফুলকির পোড়া দেহ। শিমুল গাছের পাশে মুন্সিপাড়ার ছায়া দীঘল গোরস্থানে নতুন আশ্রয় হয় ফুলকির। শিমুলের ফুল যেমন বৃন্তচ্যুত হয়ে মাটিতে পড়ে থাকে অবহেলায়- ফুলকিও তেমনি ধর্মচ্যুত, বাস্তুচ্যুত হয়ে অজান্তে অনাদরে হারিয়ে যায় চকচকে এক নতুন বসতে। মুন্সিবাড়ির নতুন এক গরঠিকানায়।

২.
বামনপাড়ায় ফুলকির নতুন ঠিকানার খবর নিবারণের কানে কানাকানি হয় না প্রথমে। জানাজানি হয় না কয়েক ঘর বসতির দৈনন্দিন গালগল্পেও। শুধু কয়েকদিনের ব্যবধানে বাপ বেটার বাক যুদ্ধেই ধীরে ধীরে খোলাসা হয় সব। গাঁয়ের লোকেরা সন্দিগ্ধ হয়ে কেউবা বলছে খুন, কেউবা বলছে আত্মহনন। কে বা কারা নাকি অপমৃত্যুর মামলাও করেছে। তাই পাঁচ কান হয়ে নিবারণের কানে আসতে আর বেশি দেরি হয় না।
বিলাসপুরের ঝকঝকে আকাশে সেদিন রোদের আনাগোনা শুরু হয় সকাল থেকেই। এমন সময়ে নগেন মাঝি এসে নিবারণকে সবিস্তারে জানায় ফুলকির কথা। সেই বৃত্তান্ত শুনে তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে সে ভাবে, কী শুনছে এসব? ফুলকি নতুন জীবন শুরু না করতেই আবার হারিয়ে গেল কীভাবে? তারপর থেকেই একেবারে ঝিম মেরে যায় সে। বোবা দৃষ্টি। কিছু জিজ্ঞেস করলেই কেবল ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় একেবারে নির্বাক হয়ে নিবারণই উত্তর খুঁজে বেড়ায় অন্যদের কাছে। আইনের আশ্রয়ে শেষে সমর্পণ করে নিজেকে।
আসলে সুলতানের সাথে ফুলকির চলে যাওয়া আগেই মেনে নিয়েছিল নিবারণ। একটা প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় ও নীরব সায়ও ছিল এতে। এই নিরুদ্দেশ তাকে তেমন অবাক বা বিচলিত করেনি। ব্যাকুল মনে বুকের এক গভীর কোণে একটু শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল মাত্র। সুলতানের সাথে ফুলকি যখন আবার গাঁয়ে ফিরে আসে এ খবর শুনেও সে ভীষণ আশ্বস্ত হয়। তবে ভেতরে ভেতরে মোটেই স্বস্তি পায় না। তার রাত-দিন গ্রাস করে নেয় অজানা এক শঙ্কা। ভেতর থেকে দমে গিয়ে চিন্তায় কপালের ভাঁজ আরও গাঢ় হয়। অজানা এক ভীতির গ্রহণ লাগে তার মনের জমিনে। কিন্তু, তারপরও নিবারণ নিরুত্তর থাকে।
দিন দশেক না যেতেই আজ আবার নিবারণের জ্ঞাতি ভাই দেবেশ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে তার কাছে। জোর কণ্ঠেই বলে, দাদা মুন্সিপাড়ার গোরস্থানে চল।
ক্যান, হইছে কী?
ফুলকিরে খুন কইরা তারা কবর দিছে। আইজ তার লাশ তোলা হইব, জানো নাকি দাদা? নিবারণের ভাবলেশহীন কথার উত্তরে দেবেশ আরও উত্তেজিত হয়। তার উচ্চকিত কণ্ঠে ক্ষোভ উপচে পড়ে।
এ উসকানিতে নিবারণ নির্বিকার থাকে। ফুলকির চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার মাঝে অগ্নি সৎকার কিংবা দাফন এ সবই তার কাছে অর্থহীন। দেবেশের কথায় কর্ণপাত না করে ধুতির খোঁট কোমরে গুঁজে হাত বাড়িয়ে ঝুলানো কোর্তাটা গায়ে চাপিয়ে নেয় সে। হাতে রাখা লাঠিতে ভর দিয়ে সতর্কভাবে উঠে দাঁড়ায় নিবারণ।
মুন্সিবাড়ির লোকে মুসলমান হইয়া আমাগো মাইয়ারে কবর দেয় কেমনে? তুমি ভালা কইরা খোঁজ লও। এইডার একটা বিহিত কর।
এই বিহিতের মানেও সে বোঝে। কিন্তু, কোনো রকম বিবাদ-বিসম্বাদে যেতে চায় না নিবারণ। ভগবানের কৃপায় আস্থা রেখে তার করণীয় সে করেছে। তাই দেবেশের উদ্বেগকম্পিত সব কথা আমলেও নেয় না সে। কথার পিঠে কথা বাড়ে। তাই আর না বাড়িয়ে ধীর পায়ে শুধু দেবেশের পিছু নেয় সে। ফুলকির লাশ তোলা হবে এই উত্তেজনায় তার হাত-পা থরথর করে কাঁপতে থাকে।

গাঁয়ের মুন্সিবাড়ির কথা সকলেই জানে। প্রভাব, প্রতিপত্তি কিংবা দাপট কোনো অংশেই কম নয় তারা অন্যদের চেয়ে। দোর্দণ্ড প্রতাপের সাথে তাই অপকর্মের ফিরিস্তিও অনেক বেশি। নিবারণ আনমনে ভাবে, সকলের অগোচরে ফুলকিকে গোর দেয়া হলেও হিন্দুর মেয়ে সে। তাই জাত ধর্ম নিয়ে নানান কথা উঠছে চারদিকে। আশপড়শির মুখে যেসব কথা রটেছে তাতে সে অনেকটা দিশাহীন হয়ে পড়ে।
ফুলকির অগ্নিদাহ না হওয়া নিয়ে গাঁয়ে বিস্তর কথা হয়, মাটি চাপা নিয়ে চলে তর্ক। কিন্তু, মৃত্যুর কারণ নিয়ে কোনো কথা হয় না। বাতাসে কানাকানি হয়ে সব কথা অবশেষে নিবারণের কানেও ঠেকে। সে সবই বোঝে। স্বজাতির মনরক্ষা আর বারংবার উসকানিতে সেও মনস্থ করে বলে, ‘আমার মাইয়ারে ফুসলাইয়া নিয়া গেছে সুলতান, আমি তারে ফেরত চাই’।
কোল সম্প্রদায়ের নিঃস্ব প্রান্তজন নিবারণ। দীর্ঘকাল ধরে বাঁশের তৈরি ঘর গিরস্থালির ডালা-কুলা, ঝুড়ি-চাটাই বানিয়ে রোজকার হাটে সওদা করে তারা। এভাবে কোনোরকমে কেটে যায় তাদের দিন। তাই মুন্সিপাড়ার বনেদী গৃহস্থ পরিবারের সাথে তাদের জীবনযুদ্ধের ঠিক মিল খায় না। তাদের যুদ্ধ রোজকার বেঁচে থাকার যুদ্ধ। এ যুদ্ধ কোনোভাবেই কোনো শক্তির বিরুদ্ধে নয়। প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসাবের খুব একটা মিলন ঘটে না তাদের। মিটমাট হয় না দৈনন্দিন চাহিদা ও সমাজের নিত্য ওঠাবসার অনেক হিসাব নিকাশের।
অবশেষে নিবারণ একদিন সাতপাঁচ না ভেবে এক সহজ স্বাভাবিক নির্লিপ্তিতে নির্মোহ আস্ফালনের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় উপজেলা সদর আদালতে মামলা ঠুকে দিয়ে। গ্রামের চৌহদ্দি আর আদালত করে করে হাঁপ ধরে যায় তার। জাতপাতের অনেক ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে সবকিছু বিচার করতে চেয়েছিল সে। কিন্তু, চারপাশের দানবীয় কুশীলবদের চাপের কাছে সেও তালুবন্দি হয় সংকীর্ণ চিন্তার গণ্ডিতে।
নিবারণের এই উদ্যোগ শুধুমাত্র তার মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আশায়। জীবিত না হোক; হয়তো বিকৃত পোড়া শরীরটাও একবার দেখলে তার অস্থিরতা কমে যেত অনেক। ফুলকির পচা, গলা, পুতি দুর্গন্ধময় নিথর দেহটাই আজ সে চায় দ্বিধাহীনভাবে। যে মায়াবী মুখখানা জলছবির মতো তার মনের আয়নায় ভেসে উঠছে জ্বলজ্বল করে বারবার।

৩.
সদর আদালতের অপ্রশস্ত কক্ষ লোকে লোকারণ্য। তিলঠাঁই হয় না সেখানে। বিজ্ঞ হাকিম সব শুনে আদেশ দেন কবর থেকে ফুলকির লাশ ওঠানোর। কারণ, নিবারণের দাবী এ মৃত্যু আত্মহনন নয়, এ যে হত্যা। মুন্সিবাড়ির লোকে সত্যি সত্যি ফুলকিকে খুন করে রাতের অন্ধকারে মাটি চাপা দিয়ে রেখেছে। তা না হলে পিতা হয়ে সে শেষবারের মতো কেন ফুলকিকে চোখের দেখা থেকে বঞ্চিত হলো? নিবারণের আকুতি মিথ্যা হয় না। নিষ্ফল হয় না আবেদন। অবশেষে আদালতের নির্দেশে আশ্বস্ত হয় সে। নতুন করে ময়না তদন্ত হবে। ফুলকির লাশ উঠিয়ে আদালতও সবকিছু নিশ্চিতভাবে জানতে চায়।
আদালত থেকে ফিরে এসে একেবারে বোবা হয়ে যায় নিবারণ। তার অপেক্ষার প্রহর যেন আর কাটে না। নাওয়া খাওয়া ভুলে গিয়ে নানান ছলে মনে রাখার চেষ্টা করে সে দিনটার জন্য।

চৌঠা ফাল্গুনের বহু প্রতীক্ষিত সেই দিন আজ, যার জন্য নিবারণ অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিল গত সাত দিন ধরে। নগেন মাঝি যেদিন প্রথম এসে তাকে জানিয়েছিল ফুলকির কথা সেদিনই আসলে বুকে সাহস বেঁধে মনস্থির করেছিল সে। আদালতের দ্বারস্থ হয়ে বুকে খানিকটা বল পাওয়ার চেষ্টা করেছিল অসহায়ের মতো। প্রতীক্ষার সেই সাতদিন অবশেষে সাত যুগে শেষ হয়েছে নিবারণের। দেবেশ এসে না জানালে সে হয়তো ভুলেই গিয়েছিল। আজকাল সবকিছুই বিস্মরণ লাগে তার।
নিবারণ ভালোভাবেই জানে মাটিতে মিশে যাওয়া ফুলকির গলিত লাশটি থেকে আলাদা করে আর কিছুই চিনতে পারবে না সে। তারপরও পিতা বলে কথা। নিথর শরীরের আদল থেকে মুখটুকু চিনে নিয়ে তাতেই আদরের স্পর্শ বুলিয়ে দিতে চায়। আনমনে এসব ভাবতে ভাবতেই জোয়ান ওই অফিসারের কথায় চৈতন্য ফিরে পায়।
আপনার নাম নিবারণ?
জি। মাথা নেড়ে জবাব দেয় সে।
আপনি স্থির হয়ে এখানে বসেন। আপনার কাজ আছে অনেক। মেয়ে কি আপনার?
এসব প্রশ্নের কোনোটারই মুখ ফুটে উত্তর দেয় না নিবারণ। কোনোরকম মাথা ঝাঁকিয়ে অপলক চেয়ে থাকে শুধু।
আপনি উপস্থিত আছেন। তাই এইখানে একটা টিপসই দেন।
কী সব লেখাজোখা একটা কাগজ বাড়িয়ে দিলে সেখানে নিবারণের কম্পিত হাতের বুড়ো আঙ্গুলের টিপসই পড়ে।
এইখানে কী লেখা আছে?
আপনি যে লাশ ওঠানোর সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন এইটা তার কাগজ। একটু পর নির্বাহী হাকিম আসবেন। উনার উপস্থিতিতেই লাশ তোলা হবে। ডোম বীরেন হেলাকে খবর দেয়া হয়েছে। সেও চলে এসেছে। আপনি এখানে অপেক্ষা করেন।
নিবারণের কান পর্যন্ত এসব কথা পৌঁছায় না। সে শুধু সংযত হয়ে ঘোলাটে চোখে তাদের জোগাড় যন্ত্র চেয়ে চেয়ে দেখে। আর বড় হাকিম আসার অপেক্ষা করে।
কিছুক্ষণ পর একটা সাদা ছোট জীপ এসে থামলে পাতলা ছিমছাম একজন লোক নেমে আসে। পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। সেপাই দুইজন দৌড়ে এসে জটলাটিকে সরিয়ে গোরস্থানে যাবার পথ পরিষ্কার করে। উপস্থিত গ্রামবাসী আঁচ করে নেয় উনিই হাকিম। তাঁর অপেক্ষাই সবাই করছেন। উনিই সবার কৌতূহলের অবসান ঘটাবেন। এক সময় বিজ্ঞ হাকিম ইশারায় ডেকে নেন পুলিশ কর্মকর্তাকে। নিচু আওয়াজে কী সব কথা বলে নির্দেশ দেন তাকে।
মুন্সিপাড়ার মোকছেদ আর গোফরান কোদাল দিয়ে মাটি আলগা করতে থাকে কবরের। নতুন কবরের নতুন মাটি। তাই ঠিকমতো বসেনি। মাত্র দিন দশেক গেছে। তাই আগাছাও গজায়নি ভালোমতো। শুধু শিমুলের বড় বড় ঝরা ফুলে পুরো জায়গাটা কেমন লাল গালিচার মতো হয়ে আছে- হয়তো নীরব অভ্যর্থনা জানাচ্ছে সবাইকে। কত কিছুর যে সাক্ষী হয়ে আছে এই বোবা গাছটা! এদিকে ঝরা ফুলের গোটা গোটা বৃন্ত অবহেলায় পায়ে ঠেকছে সকলের।
বিজ্ঞ হাকিমের নির্দেশে মোকছেদ আর গোফরানও জোর হাত চালায়। নিবারণ সেদিকে চেয়ে থাকে আর কোদালের প্রতিটি কোপ তার পাঁজরের হাড়গোড় আলগা করে দিতে থাকে। নিশ্চলভাবে বসে শুধু পেছনের কথাই ভাবে নিবারণ।

৪.
ফুলকির কোনো দোষ ছিল না। মুন্সিপাড়া ঘেঁষে গোটা দশেক বাড়িতে তাদের দীর্ঘদিনের বসবাস। পাশাপাশি দুই পাড়ায় নিত্যদিনের ওঠাবসায় কখনও বিরোধ হয়নি। মিলে মিশেই উৎসবে পার্বণে একসাথে জীবন গাঁথা তাদের।
ফুলকি আর সুলতানের সখ্যকে নিবারণ ততটা আমল দেয়নি প্রথমে। বুঝতেও পারেনি এর জটিল অঙ্ক। হিসাবে কখনই পাকা ছিল না সে। তাই ফুলকিকে অবাধেই যেতে দিয়েছে মুন্সিপাড়ায় গফুর মুন্সির বাড়িতে। ধামা-কুলা, ঝুড়ি-চাটাই বাঁশের তৈরি এসব নানান জিনিস বানিয়ে দিয়ে আসতো। সেই থেকে তার উপর নজর পড়ে ছেলে সুলতানের। নজর না বলে ভাব বলা যায়। নিবারণ একদিন অনুমান করে গভীর আশনাই হয়তো।
ভালোবাসা তো অন্যায় নয়। তবে কেন এসব আবোল-তাবোল ভাবছে নিবারণ? ভেবে ভেবে বুকের জমাট বাঁধা পাথরটাকে কেন আরও ভারী করে দিচ্ছে? হঠাৎ ঘামতে থাকে সে। গলা শুকিয়ে প্রচণ্ড তেষ্টা পেতে থাকে জলের। ঘাটের এত কাছে নদী। তারপরও মনে হয় জলে ডুব দিলেও এই তেষ্টা মেটানো যাবে না। আজন্ম তেষ্টায় ছটফট করতে থাকে সে।
মোকছেদ আর গোফরান মাটি খুবলে গাদি করে রাখে একদিকে। বাঁশের চাটাই আর পাটাতনের বাঁশের খণ্ডগুলো সরাতে থাকে এক এক করে। বীরেন হেলা ওদিকে বাংলা মদ খেয়ে বুঁদ হয়ে আছে। পুলিশের সাথে ঘ্যান ঘ্যান করছে তার নাকি আরও দুই বোতল চাই। নাহলে সে কিছুতেই ওই গলিত পচা লাশ তুলবে না। বীরেনের ঊনকোটি অজুহাতে বিরক্ত হয়ে সেপাইটা হাতের লাঠির বাড়ি মেরে তাড়িয়ে দেয় একদিকে। তারপরও সে বলে চলে,
দশ দিনের বাসি লাশ। আমি অত সহজে তুলতে পারুম না। আমার আরও দুই বোতল মাল লাগব। ঘ্যান ঘ্যান করেই চলে বীরেন।
আর পাবি না। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ কর; আর এক বোতল পাবি। জবাব দেয় সেপাই।
সূর্যের তেজ বাড়ছে। রাগে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করতে করতে কবরের দিকে এগিয়ে যায় বীরেন। এক হাতে নাক চেপে ডুবে যায় মাটির গহ্বরে। তারপর দু’হাতে ধরে এক তাল মাটির ঢেলার মতো ময়লা সাদা কাফনের কাপড়সহ নিথর দেহটা তুলে আনে উপরে। নিয়ে আসে শিমুল গাছের তলায়- ফুলকির স্পর্শ লেগে থাকা মাটির শক্ত চাতালে।
দূরে কাঠের চেয়ারে বসা হাকিমের মাথায় ছাতা ধরে ছিল আরদালি একজন। সে কানে কানে কী যেন বলে। তখনই হাকিম উঠে এসে রুমালে নাক চেপে লাশের কাছে এসে দাঁড়ায়। এদিকে লাশ ওঠানোর পর তা দেখার আগেই মাথায় হাত দিয়ে সটান মাটিতে লুটিয়ে পড়ে নিবারণ। মোকছেদ আর গোফরান দৌড়ে ছুটে আসে।
আরে, নিবারণ কাকারে তোল; সে তো অজ্ঞান হয়ে পড়িছে।
নিমীলিত চোখ মেলে নিবারণ তাকায় মোকছেদের চোখে। অস্ফুটস্বরে বলে,
আমারে একটু জল দে বাবা। বড্ড তেষ্টা পেয়েছে।
তাড়াতাড়ি মাথায় জল ঢালে কে একজন যেন। চোখে মুখে জলের ছিটায় কিছুটা সংজ্ঞা ফিরে আসে তার। তারপর একটু জল খেয়ে লাশের কাছে না গিয়েই ফুঁপিয়ে বলে ওঠে, “ওইটাই আমার ফুলকি, আমার আদরের ফুলকি”। জটলাটা ততক্ষণে নিবারণকে ছেড়ে ফুলকির লাশকে ঘিরে উৎসুক হয়। পরক্ষণেই হাকিম, পুলিশ আর ডাক্তারসহ কয়েকজন লাশ নিয়ে যাবার তোড়জোড় শুরু করে।
ফুলকির লাশের ময়না তদন্ত হবে। কত সব পরীক্ষা হবে। আরও কত কী যে হবে! লাশ নিয়ে যাবে সদর উপজেলায়। সুরতহাল ঘেঁটে বিস্তারিত প্রতিবেদন শেষে আবার তা নিয়ে আসা হবে গাঁয়ে। নিরুত্তর নিবারণ এসবের কিছুই জানতে বুঝতে চায় না। সে শুধু ফুলকির গলিত দেহটার অপেক্ষায় বসে থাকে ।

৫.
ফুলকির লাশ নিয়ে গেছে দলটি। কয়েকজন এখানে ওখানে ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে থাকে কী হবে আবার দেখার জন্য। মরার কি দাহ হবে নাকি আবার কবরেই শোয়ানো হবে? চারদিকে এমন এক নতুন ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই নিবারণ খুঁজতে থাকে সুলতানকে। কোথাও খুঁজে পায় না তাকে। তবে মুন্সিবাড়ির লোকে গিয়াস মাস্টারের সাথে কী নিয়ে যেন ভীষণ শোরগোল বাঁধায় সেখানে। হক কথার দাম নেই কোথাও, নিবারণ তা বোঝে।
চারপাশে আজ সব লাল লাল ফুল ফুটে আছে। রঙের বন্যা বইছে চারদিকে। ফাল্গুনের এই মধ্যাহ্নে লাল আষাঢ়ি লতার সুগন্ধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। অশোক আর পলাশের রেণুগুলো ছড়াতে থাকে বাতাসে। সব যেন আগুনের ফুলকি হয়ে বাতাসময় ছড়িয়ে পড়ছে। ফুলকির মনের রঙ মিশে গিয়ে আকাশটাও আরও লাল হয়ে উঠছে।
মধ্যাহ্ন গড়িয়ে সূর্য ঢলে পড়ছে পশ্চিমে। ফুলকির লাশ ফিরে আসলে নিবারণ গোঁ ধরে থাকে তা নিয়ে যাবার জন্যে। সে ধর্মমতে শবদাহ করে লাশের বিহিত করতে চায়। দুইহাত জোড় করা নিবারণের সকলের কাছে এইটুকুই যা মিনতি। কিন্তু, তার কথাগুলো অনতিব্যক্তই থাকে ভিড়ের কোলাহলে। সে সমাজের বাইরে নয়। যে সমাজে তার আজীবনের বিচরণ তার নিয়ম কানুন ও বিধি-সংস্কারে আগাগোড়া বন্দি সে।
নিবারণের আবেদন অনতীত অব্যক্ত কোনো দাবী নয়। কিন্তু, বাধা ওঠে খোদ মুন্সিবাড়ির দিক থেকেই। সুলতান কিছুতেই তা মানতে চায় না। মুন্সিবাড়ির বউকে ধর্মমতে নিয়ম মেনেই দাফন করা হয়েছে। তাদের দাবী এ লাশ যেহেতু কবর থেকে ওঠানো হয়েছে তাই তা কবরেই শোয়ানো হবে। মিথ্যা এ সামাজিক মর্যাদা ও বন্ধনের দাবী নিবারণের কাছে প্রহসন ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। তাই ডুকরে কেঁদে ওঠা এই আকুল প্রার্থনায় তার দু’চোখের প্রান্ত বেয়ে দরদর করে নোনাজল নামে।
গফুর মুন্সি সফদার ইমামের ফতোয়া জানতে চায়। ওদিকে পশ্চিমাকাশ ধীরে ধীরে আরক্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু, পিতৃ আবেগ কিংবা ধর্মীয় সংস্কারের চেয়ে সামাজিক প্রতাপ কিংবা প্রতিপত্তি অনেক বড় হয়ে দেখা দেয়। নিবারণ মনে মনে হাসে জীবিত ফুলকির চেয়ে মৃত ফুলকির এই মূল্য দেখে। তার এ সঙ্গত দাবী একগুঁয়ে সমাজের যূথবদ্ধ সংস্কারের কাছে হার মানে অবলীলায়।
ঝরে পড়া রাঙা শিমুলের বোঁটা পচে বিগলিত হতে থাকে মাটিতে। ফুলকির পুতি দুর্গন্ধময় দেহটি শিমুল গাছের সেই চাতালের নিচেই পড়ে থাকে অবহেলায়। ক্ষয়ে যেতে থাকে ধর্মীয় কোনো আদেশের অপেক্ষায়। এদিকে হাদীস-কোরআন ঘেঁটে ধর্মীয় বিধি নিষেধ মেনে সফদার ইমাম ফতোয়া দেবেন আসর ওয়াক্তের পর। প্রকৃত সত্য চাপা পড়ে যায় নতুন এক মীমাংসার আশায়। বামনপাড়া আর মুন্সিপাড়ায় এই নিয়ে চাপা গুঞ্জন চলতে থাকে। এক পর্যায়ে সৃষ্ট এ গুঞ্জন কলহে রূপ নিয়ে পাশের অন্য পাড়াতেও ছড়িয়ে যায় ধীরে ধীরে।
মসজিদ থেকে একসময় ধ্বনিত হয় আসরের আযান। নামাজ শেষে ফতোয়া দেবেন সফদার ইমাম। সেই অপেক্ষায় দুই পাড়ার উপস্থিত জটলার বিবাদের মধ্যেই মুচকি হেসে ফুলকি সবাইকে ধিক্কার জানাতে থাকে।