সেলুলয়েড জনস্রোত

নুরেন দূর্দানী



দুর্বিষহ দহন রাজ্যের ভেতর জেগে আছে আগুনফুল। তোমার ঠোঁটে চুম্বন এঁকে দিচ্ছে গুঞ্জরিয়া পাখি। মনে পড়ে বাড়ি ফেরার পথটাকে তুমি কতো অভিশপ্ত ভাবতে। পায়ের জুতোয় কাদাজল লেপ্টে গেলে বিরক্তির ছাপ সাময়িকভাবে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিতো দাঁতে-দাঁত চেপে থাকা দুঃখ-শোক। সকালের আলসেমি ঘুম, মিঠাইয়ের হাতে ধোঁয়া ওঠা চা, অবন্তীকার গোপন প্রেমের ডাকনাম আর খুচরো হিসেব। কোনোদিন তোমার কিছুই ছিলো না। এমনকি তোমার ব্যাগভর্তি ছিন্নপত্র, হাত-খামের ভেতর হয়ে যায় চালান রসিদ। মেপে মেপে দিনলিপিকার হিসেব দিতে হয় বন্ধুর কাছে, প্রেমের কাছে এমনকি অধীনস্থ ঘরের কাছে। হতাশ সন্ধ্যায় কুড়মুড় শব্দ তুলে, স্বাদের ভাজা-পোড়াকে বেশি আপন মনে হয় আর তখনই চায়ের কাপে শেষ চুমুকে ফুরিয়ে আসে একান্ত অন্তঃসার শূন্যতা। শব্দ আর কথকতা অভিব্যক্তি হয়ে ওঠে সেলুলয়েড জনশ্রোত। গল্প উঠে আসে ক্রমিক বৃত্তে; কারো নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। কালো কাপড়ে মুখ মুড়ে বাক-প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা। জমছে ফাইলের উপর ফাইল। কালোচোখি ভার বয়ে লেপ্টে জমা হচ্ছে বহুপুরোনো ঘুম-অসুখ। পরিপাটি জীবীদের দায়িত্বভারে মানি-ট্রান্সফার হলেই হরেক রঙের পণ্যের ভেতর পকেটবিহীন মানিব্যাগ। নকশী ব্যাগের তলানীতে পুঁটি আর কুমড়োফুল। বিষাদের ঘোরযুদ্ধের নাম হয় অপারগতা। চিঠি সমেত আবাসহীন স্থানজুড়ে বৃদ্ধার চোখে শূন্য স্টেশন। কারো শরীরের জন্মায় ক্যান্সার গাছ, আয়ুরেখার পাতা ঝরায়। হাইওয়ে পিচে চাকারা পারাপারের মৃত্যুর সংকেত নিয়ে ধারালো চাপাতির মতো এগিয়ে আসে এলোপাথাড়ি। কালো বিড়ালের থলের ভেতর কেউটেসাপ। রঙিন মিঠাইয়ের ঠোঁট পালিশ চিড়ে চিড়ে হয় দ্বিখণ্ডিত। বর্বর ব্যর্থকাম। ডাস্টবিনে ভ্রূণ হয় পিত্তিনাশ। লজেন্সকাঠি-চিপসের খোলস ফেলে বিদ্যা কৌশল চুরি হয়ে যায়। চাপা কণ্ঠস্বর পাঁচ-তেরো-বাইশ-বত্রিশ- ল্লিশের চোরাবালিতে কেঁপে কেঁপে ওঠে। দৃশ্যের ফাঁকে-ফাঁকে রস ও রসদ নিস্তেজ হয়ে পড়তেই, বিস্ফারণ ঘটে। বিক্ষিপ্ত প্ল্যাকার্ড লেখা থাকে সর্বজনীন আখ্যান ‘আমি চিৎকার করিয়া কাঁদিতে চাহিয়া করিতে পারিনি চিৎকার!’
ভিড় ঠেলে ভুক্তভোগী নির্মাণ কৌশল আর কতো? জলভর্তি গ্লাস ঝনঝন শব্দের উচ্চারণে ভেংগে পড়ুক। ধেয়ে আসুক রক্তস্রোত। সময়টা শ্বাপদের রঙ চিনে নেওয়ার। চিৎকার করো আগুনফুল, যতো জোরে পারো জানান দাও, স্পষ্ট করো তোমার অস্তিত্ব। সকল অন্ধকূপের জানলা-দরজা উন্মুক্ত করো। বয়ে যাক তীব্রতর ঝড়। আরও একটিবার মৃত্যুর আগে নখের আচড়ে খসে পড়ুক মুখোশ। ধিক্কার সকল নির্লিপ্ত পঙ্‌ক্তির। গুঞ্জরিয়া পাখি মন্ত্রের চুম্বন পৌঁছে দাও; হে ক্ষুদ্র অস্তিত্ব! গোটা বিশ্ব নশ্বরতার আশীর্বাদ। শুদ্ধতার আলো জ্বালিয়ে রাখো আমৃত্যু ফাল্গুন।