চতুষ্কোণ

স্মৃতি ভদ্র



খাঁ খাঁ করা দুপুরটা মাঝেমাঝে মনের মধ্যে চেপে বসে। যখন ক্লাশ শেষ করে ঠিক পদ্মার পাড় ঘেঁষা রাস্তা দিয়ে অতসী ঘরে ফেরে, সে সময়টার তপ্তক্লান্ত নিস্তব্ধতা ওকে আরোও আঁকড়ে ধরে। চৈত্রের দুপুর, এমনিতেই খরতাপের সময় তার উপর পদ্মার বুক চিড়ে ধ্যানস্থ চরগুলোর রূপালী বালুর সাথে যখন সূর্যের সন্ধি হয় তখন পদ্মা ঘেঁষা এই শহর টাকে তাতিয়ে দেয় খুব মনযোগ দিয়ে। এমন সময় খুব কাজ বা প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে থাকতে চায় না। এই রাস্তাটা শহুরে কোলাহল ছেড়ে একটু দূরে উপকন্ঠের দিকে ধাবমান। রিক্সাওয়ালা ক্লান্তভঙ্গিতে প্যাডেল ঘুরিয়ে যাচ্ছে। অতসী কিছু ভাবছে না তবুও আনমনা। একটি কাক কর্কশ কন্ঠে কা কা করছে হয়তো কোন বাড়ির ছাদের উপর বসে। একটা বাচ্চার ঘুমভাঙা কান্না ভেসে এলো।

রিক্সা থামলো অতসীর বাড়ির গেটে। ভাড়া মিটিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকলো ও। একটু ছোট্ট বাগান যার পুরোটা জুড়েই কিছু পছন্দের ফুল গাছ লাগিয়েছে অতসী। বাম দিকের বাগান চেয়ারগুলো ফাঁকা, এর অর্থ কবির দুপুরে ফেরে নি। কবির গরমেও ভর দুপুরে এখানে বসে কি পায় কে জানে! লতা'র মা ভিতরে আছে জেনেও চাবি দিয়েই কলাপ্সেবল গেটের তালা খুলে ভিতরে ঢোকে অতসী। অকারণে কাউকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়াতে ওর খুব আপত্তি আছে। বসার ঘরে খুব লো ভলিউমে লতা'র মা বাংলা সিরিয়াল দেখছে। অতসী কে দেখেই পান খাওয়া দাঁত বের করে একটা হাসি দিয়ে বলে,"আপা আইলেন?"

" হু " বলেই অতসী বাবার ঘরের ভেজানো দরজার দিকে তাকিয়ে বলে, " বাবা খেয়েছে?"

" না, চাচা তো আপনারে ছাড়া দুপুরে খায় না আপা। বাইরে থেকে আওনের পর একটু লেবুর শরবত খাইছে।"

" ঠিক আছে, তুমি টেবিলে খাবার দাও।"

অতসী নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে একটা নরম তাঁতের শাড়ি পড়ে। আজ যেন গরম টা একটু বেশীই। বসার ঘরে গিয়ে এয়ারকন্ডিশন টা চালিয়ে দেয়, এ বাড়িতে শুধু এ ঘরেই আছে ঠান্ডা হবার এই যন্ত্র টা। বাবার খুব একটা পছন্দ নয় এয়ারকন্ডিশন। তাঁর ভাষায় এটা যেমন শরীরের জন্য ক্ষতিকর তেমন বেহিসাবি খরচের উপকরণ। তাই নিজের ঘরে এই যন্ত্র লাগাবার একটু আধটু ইচ্ছে থাকলেও অতসী কে তা ত্যাগ করতে হয়েছে।

" অতু, কখন এসেছিস?" বাবা যেন কোন ফাঁকে এসে পিছনে দাঁড়িয়েছে।

" এই তো, অল্প কিছুক্ষণ। শরীর খারাপ তোমার? ঘুমোচ্ছিলে যে এখন!"

" না, গরমে ক্লান্ত ছিলাম। তাই একটু চোখ লেগে এসেছিলো। অরণী এসেছে?"

" চলে আসবে। ওর ক্লাশ শেষ হয়ে গেছে। চলো টেবিলে ভাত দিয়েছে।"

অতসী আর বাবা খাবার টেবিলে বসতেই অরণী দুপদাপ করে ভিতরে ঢোকে। আড়চোখে মা আর দাদান কে টেবিলে একসাথে খেতে দেখেই উঁচু গলায় লতা'র মা কে ডেকে বলে,

" আমার খাবার টা ঘরে দিয়ে আসো খালা।"

অতসী আর বাবা দু'জন দু'জনের দিকে একবার তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নেয়। সজনে ডাটা দিয়ে ডালের বাটি টা বাবার দিকে এগিয়ে দিয়ে অতসী বলে," এটা খাও।" এরপর প্রায় নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করে দু'জন।

অরণীর ঘরে একটা দখিনমূখী জানালা আছে। জানালার ওপাশে একটি মাঝারি আকারের ডুমুর গাছ। চড়ুই পাখিদের অভয়ারণ্য যেন গাছটা। একটি আহত চড়ুই কাল থেকে খুব কষ্ট পাচ্ছে। কিভাবে যেন একটা পা ভেঙ্গেছে! আজ খুব কিচিরমিচির করছে। আর ওর সাথী আরেকটি চড়ুই ওর পাশে পাশেই আছে কাল থেকে। অরণী খুব মন দিয়ে ওদেরকে দেখছে। অরণীকে একদম ছোটবেলার মতো লাগছে। অতসী পিছন থেকে দেখছে আর ভাবছে মেয়েটা পাখিদের মধ্যে যে কি খুঁজে পায়!

" আজ কি আর বের হবে?" কথাটা শুনে অরণী মা'র দিকে ফেরে।

" জানি না" ছোট্ট উত্তর ওর। এরমধ্যেই ভেবে নেয় মাকে কি ওর বসতে বলা উচিত। বললেও হয়ত বসবে না কারণ অরণী'র কাছে বসার থেকেও মা'র অনেক জরুরী কাজ থাকে। তাই সেই ভাবনাটা গুটিয়ে রেখে বলে,

" আর কিছু জানতে চাও?"

মেয়েটা দিন দিন চারপাশে একটা দেয়াল তুলে দিচ্ছে বা একটা লক্ষ্মণ রেখা। চাইলেও কেউ সে রেখা পাড় হতে পারে না। না, পারে তো! একজন পারে সব লক্ষ্মণরেখা পাড় হয়ে অনায়াসে অরণী'র খুব কাছে যেতে। আর এই ভাবনাটা আসতেই অতসী'র মুখটা যেন তিতায় ভরে গেলো। আর কথা না বাড়িয়ে শুধু মেয়ের কথার উত্তরে মাথা নাড়িয়ে সেই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

বাবার অনেক পুরাতন প্রকাশিত একটি জার্নালে চোখ বুলাতে বুলাতে কখন যেন অতসী ঘুমিয়ে পড়েছিলো। " হে নুতন, দেখা দিক আরবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ" হঠাৎ কবিরের দরাজ কন্ঠ টা কানে আসতেই ঘুমটা ভেঙে গেলো ওর। কবিরের গানের কন্ঠে সব সময় মুগ্ধ অতসী, তবুও কথাটা কখনো বলা হয় নি কবির কে। ক্ষণিক পরেই অরণীর কণ্ঠও কানে এল কবিরের সাথে। সামনেই পঁচিশে বৈশাখ, তার প্রস্তুতি চলছে দরজাবন্ধ ও ঘরে। সে ঘর,এই সময় সব শুধুমাত্র ওই দু'জন মানুষের অধিকারে। আর কারোও অধিকার নেই সেখানে।

চা হাতে বাগানের দিকের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় অতসী। বাবা বাগানের গাছগুলোতে পানি দিচ্ছে। ও কে দেখে বাবা বাগান থেকেই বলে,

" মালি কবে আসবে অতু? কিছু গাছের পাতা ছাটতে হবে।"

" আমি কাল আসতে বলেছি মালি কে। তুমি চা খাবে এসো" কথাটা শেষ করতেই ফটক পেরিয়ে কবির কে চলে যেতে দেখে। নিজের মতো আসে-যায় কবীর। বাড়ির কোন কিছুতে ওর খেয়াল নেই শুধুমাত্র অরণী বাদে।

" অতু একটা কথা ভাবছিলাম।" চা নিয়ে অতসীর পাশে বসে বাবা।

" কি ব্যাপারে?"

" অরণী নিশ্চয় পি এইচ ডি'র জন্য দেশের বাইরে যাবে। এই জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে ও কে। ভাবছি এ ব্যাপারে কথা বলবো ওর সাথে।"

" থাক বাবা, এ ব্যাপারে ও কে তুমি কিছু বলো না। তুমি তো সব সব জানো। "

অতসীর কন্ঠে অনুনয়। মেয়েটা ইদানিং যখন তখন অতসীকে অপ্রস্তুত করে দেয়। পরিবেশ পরিস্থিতি পর্যন্ত বুঝতে চায় না অরণী এখন। সেদিন ডিপার্টমেন্টে এক জুনিয়র শিক্ষকের সামনে স্পষ্ট অবজ্ঞা করে বসলো অতসীকে। তাই বাবা কেও যে কিছু একটা বলে কষ্ট দিতে পারে তা বিলক্ষণ বুঝে গেছে অতসী। আর এসব কিছু হচ্ছে কবিরের জন্য। রাগটা যেন ওই একটা জায়গাতে জমে দিন কে দিন বরফ হয়ে যাচ্ছে।

" না, অতু আমি কথা বলবো ওর সাথে। তুমি অরণীকে জানিয়ে রেখো।"

বাবার যে কোন কথা অতসীর কাছে আদেশের মতো। কিন্তু নিজের মেয়ের ভব্যতা নিয়ে চিন্তিত অতসীর বুক টা হিম হয়ে আসে সম্ভাব্য কি হতে পারে ভেবে। আর এ ভাবনার পথ ধরেই আরেকটি ভাবনা চলে আসে," আজ কবিরের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে হবে।"

কবির আজ একটু রাত করেই বাড়ি ফিরলো। যদিও রাত কম বা বেশী নিয়ে যেমন ওর কোন বিকার নেই তেমনি পরিবারেরও যে কারো মাথাব্যথা নেই তা নিয়েও নিশ্চিত কবির। ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকেই হাত ধুয়ে টেবিলে ঢেকে রাখা খাবার খেতে শুরু করে।

" বাইরের কাপড় টা পালটে যে খেতে হয় এই সহবত টুকুও বিসর্জন দিলে?"

আজ বাবা কেন এত রাত পর্যন্ত জেগে আছে ভেবেই বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে গেল কবিরের। আয়েশ করে মাছের মাথা চিবানো শুরু করে বাবা কে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে। খালেক সাহেব মানে বাবা এসব গায়ে মাখেন না। এসব তো আজ নতুন নয়, ছেলেটা আজীবন এমন থেকে গেল। দায়িত্বহীন অপদার্থ ছেলেটা একদা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক খালেক সাহেবের খুব লজ্জার একটি জায়গা।

নিজের এই অগ্রাহ্যের সামনে বাবার কিছু করতে না পারার অসহায়ত্ব খুব উপভোগ করতে করতেই কবির খাওয়া শেষ করলো। এরপর গুণগুণ করতে করতে নিজের ঘরে এলো।

" আজ কিন্তু খুব বেশী রাত করে ফিরলে।"

" এ তে তো কারো কোন সমস্যা হবার কথা নয়। এ বাড়িতে সবার জন্য নিয়ম এক না, এটা কি তোমাকে আজ আবার মনে করিয়ে দিতে হবে?"

" না, এ বাড়ি বা জীবনের নিয়মের গল্পগুলো আমাদের আলোচনাতে কখনো আসে নি কবির, এখন কেন আসবে? আমার অরণীকে নিয়ে কথা ছিল।"

" অরণী আবার কোন নিয়ম ভাঙলো?" কিছুটা বিদ্রুপের সুরে বলে কবির।

" মেয়েটাকে তো কুক্ষিগত করেছো, অন্য কেউ ওর পাশে যেতে পারে না। কাউকে পরোয়া করে না মেয়েটা। তাই একমাত্র তুমিই পারো ওকে সভ্য করতে। ও কে তুরুপের তাস করে খেলা বন্ধ করো দয়া করে , আদতে এতে ওর ক্ষতি করছো।"

অতসীর এই কথার পরেই কবিরের অট্টহাসি তে রাতের আঁধার যেন চমকে ওঠে। এরপর যথারীতি সব সময়ের মতো আলোচনার মাঝপথে কোন কারণ ছাড়াই আলোচনা থেকে বেরিয়ে এলো কবির। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই সারাদিনের ক্লান্তি কবিরকে শ্রান্ত করে দিলো, ঘুমের অতলে হারিয়ে গেল কবির।

এই অবজ্ঞা যদিও সেই প্রথমদিন থেকেই অতসীর জন্য বরাদ্দ তবু এতদিনেও যেন মেনে নিতে শিখলো না ও। কিছুটা কষ্ট আর কিছুটা রাগে গলার কাছে ভারি হয়ে থাকলো।

আজকের দিনের প্রস্তুতি অতসী কাল রাত থেকেই নিয়ে রেখেছিল। ছুটির দিন, তাই সকালের খাবার টা লতা'র মাকে সাথে নিয়ে তৈরী করে মেয়ে আর কবির কে ডেকে তুললো। বাবা খুব নিয়মমাফিক চলেন। সকালের হাঁটা শেষ করে চিরতা ভেজানো পানি খেয়ে খাবার টেবিলে চলে এসেছেন। একটু পরেই কবির আর অরণীও চলে আসে টেবিলে।

টেবিলে ওরা বসতেই অতসী কোন ভনিতা না করে সরাসরি মেয়েকে জানিয়ে দিল আজ তার সাথে দাদান কিছু জরুরী কথা বলতে চায়।

" আমার হাতে খুব বেশী সময় নেই, আমার গানের রিহার্সাল আছে। " খাবার খেতে খেতে বলে অরণী।

" পি এইচ ডি করতে হবে তোমাকে, এ ব্যাপারে ভেবেছ নিশ্চয়। তোমার মায়ের মতো হতে হবে তো তোমাকে। " খালেক সাহেব বলেন।

" না, আমি মায়ের মতো হবো না। পৃথিবীতে কি আমার মা একমাত্র অনুকরণীয়? "

অরণী'র কাছ থেকে এমন কথা একদম অপ্রত্যাশিত নয়। খালেক সাহেব বিরক্ত হন। অরণী একটু থেমে আবার বলে,

" আচ্ছা দাদান, আমি কেন বাবার মতো হতে পারি না? বাবা কত ভাল গান গায়। তোমাদের উৎসাহ পেলে বাবা কত ভাল করতো জানো? "

এবার যেন ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙে খালেক সাহেবের। খুব বিরক্তি নিয়ে বলে,

" শুধু গান দিয়ে জীবন চলে? তোমার বাবাই তোমাকে নষ্ট করছে।"

" আর বাবাকে জীবনে পিছিয়ে দিয়েছ তুমি।"

এবার আর অতসী চুপ করে থাকতে পারে না। মেয়েকে চুপ করতে বলে কবিরকে উদ্দেশ্য করে কটাক্ষ হানে,"এমন সময়েও কেউ চুপ করে থাকতে পারে?"

" অরণী ভুল বললে আমি ওকে থামিয়ে দিতাম।" রুটির কোণা ছিড়ে মুখে দিয়ে বলে কবির।

খালেক সাহেব বিরক্ত মুখে খাবার ছেড়ে উঠে নিজের রুমে চলে যায়। পিছনে পিছনে অতসীও যায়।

" আমি জানতাম বাবা এমন কিছু হবে.." অতসীর কথা শেষ হবার আগেই অরণী এসে দাঁড়ায়।

" বাবা যদিও সরি বলতে পাঠিয়েছে এখানে আমাকে তবে আমি দাদানের সাথে কিছু কথা বলবো।"

" এখন থাক।" হাত নেড়ে বলেন খালেক সাহেব। কিন্তু তা না মেনে অরণী বলে যায়,

" দাদান সরি, আমার এভাবে কথা বলা ঠিক হয় নি। কিন্তু তোমরা কেউ বাবাকে বুঝতে চাও না। বাবা খুব কষ্ট পায়। দাদান তুমি কি জানো বাবা আর মায়ের মধ্যে দূরত্বের কারণ তুমি?"

" কি বলছো এসব?" খালেক সাহেব এই কথার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না।

" নিজের ছেলে পড়াশুনোয় মাঝারি ধরণের ছিল বলে ছোটবেলার বন্ধুর ব্রিলিয়ান্ট মেয়েকে ছেলের বউ করে নিয়ে এলে। যাতে করে ভার্সিটির অনান্য শিক্ষকের সন্তানদের সাথে প্রতিযোগিতায় মা কে এগিয়ে দিতে পারো, নিজের দূর্বলতা ঢাকতে পারো। আর ছেলের সাথে ইগোর লড়াইয়ে জিততে পারো।"

" যার যা প্রাপ্য আমি শুধু তাই দিতে চেয়েছি।" খালেক সাহেব চোয়াল শক্ত করে বলেন।

" না, তুমি তা দাও নি দাদান। তাহলে বাবার গান নিয়ে এত অবহেলা কেন করেছো? মা কে কেন বাবার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছো? "

" অতু, কি বলছে ও এসব?" বাবাকে এমন রুদ্ররূপে দেখেনি কখনো অতসী। মেয়েকে থামানোর একটা ব্যর্থ প্রয়াস চালায়। মায়ের বারণ শুনে যেন অরণী আরোও বলার উৎসাহ পায়।

" বাবার দূর্বলতা আর মায়ের যোগ্যতা নিয়ে তুমি কাটাকুটি খেলেছো। মাকে অস্ত্র করেছো বাবার বিরুদ্ধে অথচ আমার বোকা মা তা বুঝতেই পারে নি। তোমার রণনীতিকে ভালবাসা ভেবে পুতুল নাচের সুতোয় বাঁধা পুতুল হয়ে গিয়েছে।"

" অরণী, দাদানের সাথে এভাবে কথা বলিস না। উনি কিন্তু আমার বাবা মনে রাখিস।" খালেক সাহেবের ফ্যাকাসে মুখটা দেখে কবির আর চুপ করে থাকতে পারলো না।

" বাবা, এই কথাগুলো যদি তুমি শুরুতেই মা আর দাদানকে বলে দিতে তাহলে আজ সবকিছু এমন হত না।" অরণীর চোখে জল।

" অতসী কখনো আমাকে বুঝতে চায় নি। বাবার ছায়ায় আমাকে দেখতে চেয়েছে সব সময়।" কবিরের কথাতে মাথা নেড়ে অসম্মতি জানায় অতসী।

" তুমি সবসময় একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে রেখেছ কবির।" অতসী বলে।

" মা, দাদান বাবাকে অপছন্দ করে আর তোমাকে পছন্দ- এটা তুমি উপভোগ করো, তাই না ?" অরণী যেন আজ তীর বিঁধোতেই ব্যস্ত।

" শুধু কি বাবার ব্যর্থতাই একমাত্র কারণ না কি অন্য কোন কারণ আছে বাবা-মার এই দূরত্বের। তোমার কি মনে হয়?" অতসীর এই প্রশ্নে খালেক সাহেব একটু কেঁপে ওঠেন।

দাদানের কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে মা'র সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মায়ের হাত দু'টো ধরে,

" আমি একটা স্বাভাবিক পরিবার চাই মা। বাবা আর তুমি একটু করে সামনে আগাও ব্যবধান কমে যাবে, সব দূরত্ব মিলিয়ে যাবে। বাবা তোমাকে নির্লিপ্ততা কমাতে হবে আর মা তুমি বাবাকে নিজের চোখ দিয়ে দেখা শুরু করো, দাদানের চোখে নয়। দেখবে দু'জনকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছো।"

মেয়ের কথাতে যেন অতসী আর কবির যেন একটু আলোর দিশা পায়।

মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে শতভাগ চেষ্টা করার আশ্বাস দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায় কবির।

অতসী বাবার এমন হেরে যাওয়া চেহারা দেখে কিছু বলতে যাবে কিন্তু হাত নেড়ে খালেক সাহেব বুঝিয়ে দেন উনি এখন কথা বলতে চাচ্ছেন না। অতসী বাবার ঘর থেকে বেড়িয়ে আসার সময় অরণী কেও সাথে আসতে বলে। কিন্তু অরণী আরেকটু সময় ওর দাদানের সাথে থাকতে চায়।

" দাদান, পৃথিবীতে সবাই সম্পূর্ণ জীবন পায় না। কিছু অসম্পূর্ণতা থেকেই যায়। কিন্তু নিজের অসম্পূর্ণতা দিয়েই আমরা অন্যের জীবনকে সম্পূর্ণ করতে চাই। কিন্তু তুমি তা করো নি।"

" কি বলতে চাইছো?" উত্তেজনাহীন কন্ঠ খালেক সাহেবের।

" তুমি বুঝতে পারছো, আমি জানি। তোমার একটি ইন্টেলেকচুয়াল সঙ্গীর প্রয়োজন ছিল যা স্বল্পশিক্ষিত দিদান কোনদিন হয়ে উঠতে পারে নি। এজন্য মাকে তুমি সবসময় পাশে চেয়েছ। তোমার আর দিদানের শীতল দাম্পত্য জীবনের সবটুকু শীতলতা ইচ্ছে করেই আমার বাবা-মা'র মধ্যে দিতে চেয়েছ। নিজের অপ্রাপ্তিকে তুমি হেরে যাওয়া ভেবে আমার বাবাকে জিততে দেও নি। অথচ বাবাকে হারিয়ে দিতে গিয়ে তুমি কিন্তু নিজেই হেরে চলেছ। বাবা আর আমি তোমার থেকে অনেক দূরে চলে গেছি।"

অরণী'র এই কঠিন সত্যগুলো খালেক সাহেবের যেন বোধোদয় ঘটায়। হয়ত ততটা সচেতনভাবে তিনি এসব কিছু করেন নি তবে কবিরকে প্রতিপক্ষ ভেবে অনেক ভুল করে ফেলেছেন জীবনে। খালেক সাহেবের চোখ ভিজে যায়।

" দাদান, অনেক হেরে যাবার গল্প হল। তোমাকে এখন চল জীবন জয়ের ছবি দেখায়।" অরণী দাদানের হাত টেনে জানালার পাশে নিয়ে আসে।

বাগান চেয়ারে পাশাপাশি কবির আর অতসী বসে আছে। তীব্র রোদও কিন্তু মাঝেমাঝে রংধনুর সাতরঙ ছড়ায়।