জয়

রুখসানা কাজল




নক নক নক। জানি জয় নক করছে দরোজায়।
আমি মাথার উপর চাদরটা ভালো করে টেনে গভীর ঘুমের ভান করে পড়ে থাকি বিছানায়।
গেলো ক ঘন্টায় আমার মন টকে গেছে। মাথা গুলিয়ে গেছে ভয়ঙ্করভাবে। ভীষণ বিপন্ন আর বিষণ্ণ লাগছে।
সুদূর শৈশবে চোখের সামনে সূর্য ডুবে যেতে দেখলে কেমন একটা মন খারাপি জড়িয়ে মুড়িয়ে পেয়ে বসত আমাকে। অসহ্য কান্না পেড়ে ফেলত আমার মনটাকে। তখন খেলা ভুলে নদীর ঘাটে পাতা গাছের উপর বসে থাকতাম বিবশ মনে। আর জয় শেষ বারের মত চাড়া ছুঁড়ে নদীর জলে ব্যাং হাঁটিয়ে এসে বলত, তুই কি বোকা রে! চল, ঘরে চল। সকালেই দেখবি সূর্য আবার এসে গেছে।
সেই মন উদাস করা বিবশ আতুর অনুভূতিটা এই প্রৌঢ় বয়সে আবার ফিরে পাচ্ছি। অণু অণু হয়ে যাচ্ছি দুঃখ কাতরতায়।
আমার শরীর মন অবিশ্রান্ত কেঁদে গেছে এই ক ঘণ্টা। বিছানায় পাওয়া একটা এক্সট্রা বালিশ দিয়ে মাথা মুখ ঢেকে কান্নাটাকে নিঃশব্দে বয়ে যেতে দিয়েছি। কিছুটা হালকা লাগছে এখন।
যতটা সম্ভব নর্মাল হতে চেষ্টা করছি। এই মূহুর্তে আমি জয়কে বুঝতে দিতে চাইছি না আমার মনের অস্বস্তিকর বিবশ অবস্থাকে। সবকিছু এমন অপ্রীতিকর অনাত্মীয়ের মত, অচেনা আর ভীতিকর হয়ে ওঠবে এতটা সত্যিই আমি ভাবিনি কখনও।
তবে হ্যা, এরই মধ্যে ডিসিশন ফাইন্যাল করে ফেলেছি, চলে যাবো এ বাড়ি ছেড়ে। কেবল সকাল হতেই যা অপেক্ষা। জোরালো কোনো কারণ দেখিয়ে আর্লি মর্নিঙেই চলে যাবো হোটেলে। আর দুদন্ড এবাড়িতে থাকতে ইচ্ছে করছে না আমার ।
হয়ত আর কখনো কোনো দিন, আর আসা হবে না এ বাড়িতে। দেখা হবে না এদের সাথে। রক্তের সুত্রটা হয়ত এভাবেই কেটে যায় আপন রক্তের আত্মীয়দের সাথে।
ঝগড়া, ফ্যাসাদ, ধন, সম্পদ, নির্ধনের অসহায়তা আর অপমানের চাইতেও বেশি ধর্মের কারণে পর হয়ে যায় স্বজনরা। যুক্তি পালটা যুক্তির তো অভাব নেই এই ভূভারতে। তুই হিন্দু , তাই তোর মাটির মূর্তিতে পূজাপাঠ, যা তুই এদেশ ছেড়ে! তুই মুসলিম, অচ্ছুত গরুখোর, ভাগ তুই এদেশ ছেড়ে ! আর কি আশ্চর্য এই বিভেদের লক্ষণরেখায় পড়ে রক্তের সম্পর্কগুলো কেমন অবলীলায় ভাগ ভাগ হয়ে যায়!
জয় একবার বলেছিল, চল রবীন্দ্রনাথের যে পূর্বপুরুষরা মুসলিম হয়ে গেছিল তাদের খুঁজে বের করি ! আরে বাংলাদেশেই ত থাকবে তারা। হয়ত খুলনা নাহয় যশোর! তাছাড়া যাবে কোথায় !
এত দুঃখেও আমার হাসি পেয়ে গেলো। মনে মনে মন শক্ত করে ফেলি। জয়ের কোনো অনুরোধ, উপরোধ, রাগ বা অভিমানেও এখানে আর থাকবো না।
আমার জন্যে জয়ের এই হেনস্থা আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছি না। বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে। জয় আমার জয়। দুঃসহ এক অপারগ রাগে ফুলে ফুলে ওঠছে আমার রক্তনালী। ইচ্ছে করছে এ বাড়ির চার দেয়াল ভেঙ্গেচুরে জয়কে নিয়ে চলে যাই আমাদের শৈশবের শহরে। আমাদের নাড়ি পোঁতা সেই শহর। সেই আজান ভাসা, শঙ্খ বাজা ছোট্ট শহরে ফিরে যাই আবার।

বুঝতে পারছি, হেরে গেছে জয়। পরাজয়ে ন্যুব্জ হয়ে ভেঙ্গে পড়েছে সবকিছু নিয়ে। তাই পর্যুদস্ত মানুষের মত অবুঝ রাগে গরগর করছে সারা রাত ধরে। ওর এই রাগ আমার চেনা।
রেগে গেলে জয়ের শরীর দ্রুত শুকিয়ে লম্বা হয়ে যেত। কেমন হিলহিলে এক চাপা আলো ওর শরীর জুড়ে লেপ্টে বসত । আর হাতদুটি ঝলকে ওঠত সাতদিন ধরে শান দেওয়া রামদার মত। প্রতিপক্ষ যেই হোক জয়ের মারের কাছে কাটা কলাগাছের মত ঢলে পড়া ছিল তার নিয়তিতে বাঁধা!
গেলো সন্ধ্যায় জয়ের চোখ দেখতে পাইনি। তবে মনে হয়েছে জয় কিছুটা মন্থর হয়ে গেছে। ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাচ্ছে হয়ত। ওকে দেখলেই বোঝা যায়, জানা অজানা অসংখ্য যন্ত্রণা পুঁইয়ে চলেছে দিনরাত। একা। ওর শরীর মন আর বুঝি নিতে পারছে না এই যন্ত্রণার কামড় !
গেলো বিকেলে এয়ারপোর্টে নেমে ওকে জড়িয়ে ধরেই বুঝেছিলাম, অসম্ভব তাপদগ্ধ ওর শরীর। ভাপ ওঠছে শরীরের ভেতর থেকে, কিরে তোর কি জ্বর নাকি রে ?
হ্যাত্তোত্তুরি, কু কথা মুখে আনিস না তো। ওয়েস্ট বেঙ্গলে এখন আনআইডেন্টিফায়েড ডি ফিভার চলছে । তুই কেমন আছিস ? কি হয়েছে তোর যে একবারে ডাক্তার দেখাতে হবে!
কিচ্ছু না বলে জয়কে আবার জড়িয়ে ধরেছিলাম। দ্বিতীয় আলিঙ্গনে জয়ের বুকটা কেঁপে ওঠেছিল। কি এক আবেগে ওর বুক আমার বুকের উপর এক ঝলক জোর চমক মেরে ছুঁয়ে গেছিল। বেশ কিছুটা বেশি সময় ধরে আমাকে জড়িয়ে রেখেছিল জয়।
তখনই বুঝেছিলাম ওর হৃদয় পুড়ে যাচ্ছে। আপনজনদের কাছ থেকে পাওয়া যন্ত্রণা ওকে পেড়ে ফেলেছে মাথামুড়ো লেজ জুড়ে।
স্বজন পীড়নের যন্ত্রণা যে কি ভয়ংকর হতে পারে তা আমরা দুজনেই ভালো করে জানি। আমাদের হাড় মাংস মনে জমে আছে প্রিয় স্বজনদের দেওয়া নিদারুণ কষ্ট জ্বালা দাহ অপমান । চেনা ঘর, চেনা মানুষ, চেনা চেনা আঘাত বেদনা কতটা কুরে খেতে পারে একেকটা জীবনকে আমাদের থেকে তা আর কে বেশি জানে!
এ যন্ত্রণার কোনো নির্বাণ হয় না। কেবলই জ্বলে যাওয়া। হৃদয়ের ঘাটে ঘাটে অনির্বাণ ঝরে যায় রক্ত। তবু থামে না। বয়ে যায় আমৃত্যু, আজীবন!
গাড়িতে ওঠে তাই বলেছিলাম, হোটেলেই চলে যাই জয়। শুধু শুধু বাড়িতে ঝামেলা করে কি লাভ!
এয়ারপোর্ট এরিয়া পেরিয়ে যেতে যেতে জয় শক্ত মুখে বলেছিল, হোক ঝামেলা। আমি ত তাই চাইছি। আচ্ছে দিনে আচ্ছে কিছু হয়ে যাক।
তখনো বুঝিনি পরিস্থিতি এতটা খারাপ হয়ে গেছে। এতটা একা কোণ ঠেসে পড়ে আছে জয় ! ভাঙ্গা মাটির শূন্য ব্যাংকের মত!
একবার সিগ্রেট কিনতে হাইওয়ের একটা ছোট্ট দোকানে নেমেছিল। গাড়ি থেকে মাত্র কয়েক পা দূরে। হেঁটে যাওয়া জয়কে দেখে, আমার বুকের ভেতর পাখি ওড়ার শব্দ বাজছিল ! মনে হচ্ছিল সাঁঝ সন্ধ্যার রক্তিম দিগন্তে একা এক পাখির মত ডানা ঝাপটে ক্রমশ নাই হয়ে যাচ্ছে জয় !
জয়ের সংসারে জয়ের স্থান অচ্ছুত প্রায়। এই সদ্য পঞ্চাশ পেরুনো বয়সে বউদি শর্ত আরোপ করেছে জয় যেনো পুরোপুরি হিন্দু হয়ে তবে তাকে ‘টাচ’ করে। এমনিতে আজকাল জয়কে দেখলেই বউদির ঘেন্না লাগে। গা শিরশির করে ওঠে। ঘর বাড়ি, বিছানাপত্তর অপবিত্র অপবিত্র মনে হয়। জয়ের শরীরে মুস্লিম রক্ত আছে এটা ভেবে পাপবোধে আকুল হয়ে ছুটে যায়। জয়ের সামনেই পেতলের ঠাকুরের পায়ে মাথা কুটে যায় অনবরত।
প্রথম প্রথম জয় ভয়ে তুলে আনত বউদিকে। এরপরই বউদি বায়না ধরল, চলো অমুক ঠাকুরের কাছে । জয় গেলো। গিয়েই চমকে ওঠল, ঠাকুর সেও বিশেষ একটি রাজনীতির গন্ধযুক্ত প্রস্তাব দিলো জয়কে।
এবার ক্ষেপে গেলো জয়। বউদিকে বুঝালো, তোমার তো অজানা ছিলো না কিছু । আমার মা মুসলিম, বাবা হিন্দু ছিল। তবে ?
এর পরের ধাপেই সিনে চলে এলো রুমা বউদির দাদা। সে আসুক। কিন্তু চরম বিস্ময়ে ক্ষেপে ওঠল জয়, যখন দেখল ওদের একমাত্র সন্তান মা আর মামার সুরে একই কথা বলছে ওকে।
মোবাইল গরম করে জয় মুখ খারাপ করেছিল, বুঝলি তো, বিয়ের পঁচিশ বছর পর তোর বউদির মনে হয়েছে আমি হাফ হিন্দু। ছেলেটাও চেঁচায়। যখন তখন প্রায় মারমুখো হয়ে জানতে চায় কেনো ওর সারকা্মসেশন করানো হলো। বন্ধুরা নাকি ওকে কাটা মোহাম্মাদ নামে প্যাক দেয়। নামকরা ভার্সিটির ছাত্র ছেলের চেঁচানিটা আজকাল যেনো থ্রেট হয়ে যাচ্ছে।
বুকের ভেতর চলকে ওঠেছিল রক্ত। তবে কি এটাই ধ্রুব, হিন্দু মুসলিম দুই জাতি, দুই সাগর! এদের মিলন কেবল অধরা নয়, অসম্ভবও বটে!

এই নিয়ে দুবার এসে ঘুরে গেছে জয়। জানি সারারাত জেগে আছে। দু চোখের পাতা একবারের জন্যেও এক করেনি। দু একবার ভাংচুরের শব্দ পেয়েছি আমি। চেনা শব্দ।
ভাঙ্গনের এই শব্দ আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, হ্যা এই ত আমার জয়। আমার ভাই। হৃদয় সহায়। আমার অখিল বন্ধু। আমার মন কাঁদলে জয়ের বুকে রক্ত ঝরে। জয়ের বুক কাঁপলে আমার চোখে শঙ্কা বাজে।
এটি সত্য যে আমরা দু পিতার ঔরসে, দু মায়ের গর্ভজাত পর পর দুই দিনে জন্মানো দুভাই। কিন্তু আমাদের সত্ত্বা এক। হরির হর, হরের হরি। ও জয় এক, আমি জয় নাম্বার টু মানে বিজয়।
ইশকুলে আমি অংক ভুল করলে পন্ডিত স্যার বেত উঁচিয়ে বলতেন, তা তুই আর একা বেত খাবি কেনো রে হতভাগা ! এই যে জয় নাম্বার এক, হাত পাত, হাত পাত। ওরে দামড়া রামছাগল, সারাদিন মারামারি না করে ভাইকে লাভক্ষতি অঙ্কের সূত্রটা ত একটু বোঝাতে পারিস!
সব সমান সমান। জয় ভুল করলে আমি জয় নাম্বার টু বেত খেতাম মহা আনন্দে। একের জন্যে অন্যের মার খাওয়া, একের জন্যে অন্যের প্রশংসা পাওয়া আমাদের দু ভায়ের অভ্যাস হয়ে গেছিল।
তাই জানি কাল সন্ধ্যা থেকে কি যন্ত্রণায় পুড়ে যাচ্ছে জয়। পুড়ছে অসহ্য রাগে। দুরন্ত ক্ষোভে। ক্ষপা অপমানে।

আদৌ কি কাল সন্ধ্যা থেকে এই যন্ত্রণার শুরু ?
জয় যেন কি বলে চলেছিল গেল এক বছর ধরে!
কি এক ঐতিহাসিক ভুলের পুণরাবৃত্তি ঘটে গেছে ইদানীংকার ভারতে।
উনিশ সাতচল্লিশে দেশ ভাগ হয়েছিল মনুষ্যত্বের বলিদান দিয়ে। এবার চলছে মনুষ্যত্বের ভাগাভাগি।
মুসলিম লোগ বাহিরি হ্যায়। তরবারির জোরে হিন্দুদের মুসলিম করা ছাড়া তাদের কোনো অবদান নেই ভারতবর্ষের ইতিহাসে। শোর ওঠেছে, শালার তাজমহলও নাকি মন্দির ছিল! শুয়োরের বাচ্চা। কাটার দল। ভারতবর্ষের মন্দির ভেঙ্গে ভেঙ্গে মসজিদ করতে পারলে তাজমহলও হয়ত কোনো মন্দির ভেঙ্গেই বানানো! কাটার বাচ্চাদের বিশ্বাস কি!
আমি হেসে হেসেই বলতাম, হ্যারে জয় কথাটা তো সত্যি। সোমনাথের মন্দির কি লুঠ করেনি মুসলিমরা ?
হ্যা করেছে। সেভাবে হিন্দু রাজা জমিদাররাও কম অত্যাচার নির্যাতন করেনি মুসলিমদের। আর এভাবে বিদ্বেষ পুষে রেখে কি রাষ্ট্র চালানো যায়? প্রতি মুহুর্তে ধর্মের জন্যে মানুষ মানুষকে ঘৃণা করে চলবে তাই কি হয় ? রাজা বাদশাদের কম্মকান্ডের জন্যে আমরা কেন সাফার করবো? শালার গুয়ের মাছিতে ভরে গেছে দেশটা। রাজনীতিবিদরা হচ্ছে শুয়োরেরবাচ্চা। শালার পাবলিক হচ্ছে তাদের গুচাটা!
আমি বলি, বুঝিনা আবার ! হাড়ে হাড়ে বুঝছি রে। বাংলাদেশ ত জ্বলন্ত চুলোয় টগবগ ফুটছে। বিস্ফোরণটা হতে বাকি। গলা কাটছে, বোমা ফাটাচ্ছে, হিন্দুদের ঘর জ্বালাচ্ছে, তাড়িয়ে দিচ্ছে, নতুন নতুন ফতোয়া দিচ্ছে। কারাই বা কম কিসে বল তো জয়!
মোবাইলের ওপাশে আন্তরিক হাহাকারে আর্ত হয়ে ওঠত জয়, এ পাশে আমিও।

খুব আস্তে কিন্তু অসহিষ্ণু শব্দে জয় দুবার নক করে গেছে আমার রুমের দরোজায়। আমি তখুনি দরোজা খুলিনা। সাড়াও দিনা।
জয় ভাবুক ঘুমিয়ে গেছিলাম বলে কাল রাতে ওদের ভেতরে আমাকে নিয়ে যত তর্কবিতর্ক ঝগড়া হয়েছে তার কিছুই শুনিনি আমি। যেনো কিছুই জানতে পারিনি।
ছোট বেলায় খেলার মাঠ থেকে ঘরে ফিরতে বিশাল এক তেঁতুল গাছ পেরিয়ে আসতে হত আমাদের। একহাতে গলাগলি করে থাকতাম আমরা দুভাই। অন্য হাতে বুকের কাছের জামা খিমচে ধরে বলতাম , আমার আল্লা, জয়ের ভগবান, আমার ভগবান বিজয়ের আল্লা, ও গড সেভ আস্‌।
আমার চোখ উপচে জল আসে। আমার আল্লা, জয়ের ভগবান, আমার ভাইটাকে তুমি রক্ষা কর গড। সেভ হিম, প্লিজ।
শুয়ে শুয়ে নিজের মুখটাকে সহজ করে তোলার চেষ্টা করি আমি। জানি জয় আবার আসবে। এবার দরোজা না খুললে ভেঙ্গেও ফেলতে পারে। যে পাগল! ভেবে বসবে আমার কিছু হয়ে যায় নি ত আবার ! হয়ত এই ভয় আর শঙ্কায় উৎকণ্ঠিত জয় মাথা ঠিক রাখতে পারবে না কিছুতে!
শরীরটাও কেমন যেন লাগছে আমার !
বুকের বাঁ দিকে আজকাল একটা ব্যাথা হয়। গত এক বছর ধরেই হচ্ছে। জয় যখন এসব কথা বলত আমার বুকের ভেতর রক্ত ছলকে ওঠত। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যেত কষ্টে। রক্তের অণু পরমাণু চীৎকার করে ছুটে ছুটে ডাকত, ভাই আমার ভাই ভালো নেই আল্লা। সব কিছু আগের মত করে দাও হে পরওয়ারদেগার। তোমার অসীম শক্তির ঝাপ্পি দিয়ে আবার আগের মত করে দাও সব।
ডাঃ দেবি শেঠি বাংলাদেশীদের বড় প্রিয় ডাক্তার। ওর কাছে চিকিৎসা নেবো বলে এবার এসেছিলাম কলকাতা। হোটেল বুক করে রেখেছি ঢাকা থেকেই। কিন্তু জয় কিছুতেই শুনলো না। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা ওর বাসায় এনে তুলেছে।
আর এই নিয়েই জয়ের যে ঝামেলা ছিল তা আরো বেড়ে গেলো।
কিছু কিছু মানুষ আছে তারা বোঝে না কিম্বা বুঝেও মানতে চায় না, তাদের ঘর আর তাদের নেই। কখন যেনো তারা নিজের ঘরে আশ্রিত হয়ে যায় মাকড়সার জালে ঝুলে থাকা মরা মাকড়সার মত।
গেলো কালকের আলোচনা শুনে যা বোঝার বুঝে ফেলেছি। এই সংসারে জয় একটি মরা মাকড়সা হয়ে ঝুলে গেছে। এখন কেবল সংসারের মানুষদের দ্বারা ঝেড়ে ফেলাটুকুই বাকি !

নক নক নক! বিজয় এই বিজয় দরোজাটা খোল্‌। খোল দরোজা! শুনছিস ভাই--
জয়ের আঙ্গুলে স্পষ্ট অসহিষ্ণুতা। গলার ব্যাকুলতা কোমল খাদে।
এবার আমিও ওঠে বসি। জয়কে শুনিয়ে হাচড় পাচড় শব্দ করে চপ্পল খুঁজি। তারপর ঘরের আলো জ্বেলে দরোজা খুলে অবাক হওয়ার ভাব দেখিয়ে গলা বাড়িয়ে আকাশ দেখার ভান করি, কিরে জয় কি হয়েছে ? আরিব্বাস সকাল হয়ে গেলো নাকি রে এত তাড়াতাড়ি ?
জয় ঘরে ঢুকে চারপাশ দেখে বলে, পাঁচ মিনিট। রেডি হয়ে নে। এখুনি বেরুবো। সবকিছু নিয়ে নে। কুইক।
গোছানোই ছিল সবকিছু।
কেবল রাত পোশাক পাল্টাতে যতক্ষণ। জয় গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছে। হেডলাইটের আলোয় ওদের বনেদী আবাসনের বাগান জুড়ে ফুলগাছগুলো মুখ উঁচু করে দেখে নিচ্ছে, কারা চলে যাচ্ছে এই পরাজিত ভোরে!
ক্যামেরার পাউচটা কাঁধে ঝুলিয়ে সুটকেস তুলে পা দিয়ে রুমের দরোজা টেনে দিই। কেমন দুলতে দুলতে সংকুচিত অনিচ্ছায় বন্ধ হয়ে যায় দরোজাটা।
টেবিলের উপর রুমা বউদির জন্যে একটা চিঠি ছেড়ে এসেছি। রাতেই লিখেছিলাম।
নিশ্চিত পেয়ে যাবে। হয়তবা এই শেষ দেখা।
চিঠিটা পেয়ে হয়ত বউদির কিছু স্মৃতি ভেসে ওঠলেও উঠতে পারে। কিন্তু জানি তাও বেশীক্ষণ স্থায়ী হবে না। বরং ঝামেলা গেছে বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে রুমটা পরিষ্কার করতে পরিচারিকার সাথে নিজেও হাত লাগাবে।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রুমা বউদি এই ক বছরের ভেতর প্রচন্ড ধর্ম আশ্রয়ী হয়ে গেছে। জাতপাতের মানামানিতে নিজেকে অভ্যস্ত করে ফেলেছে যুক্তি গ্রাহ্যের বাইরে। পূজাপার্বণে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে খাঁটি হিন্দু হিসেবে বদলে ফেলেছে সংসারের আগাপাশতলা।
আজকাল নাকি জয়কে বিয়ে করা নিয়ে খোলাখুলি আফসোস করে। কেনো যে সে মুসলিম রক্তবাহী একজন হাফ হিন্দুকে বিয়ে করল সে !
এই গ্লানি ঢেকে ফেলতে জয়ের উপর চাপ বাড়ায়। একজন সনাতন বিশুদ্ধ হিন্দু হতে জয়কে নানা পূজা পার্বণসহ বিভিন্ন ধর্মগুরুর কাছে নিয়ে যেতে চায়। জয়ও নাছোড় । কোনোভাবেই বউদির এসব কথা একদম শোনে না। তাতে অশান্তি বেড়ে আগুণ হয়ে ওঠে বাসার পরিবেশ।
কি জানি হয়ত আমি চলে যাওয়ার পরই, গোবর কিম্বা গোমুত্রে রুমটি শুদ্ধ করেও নিতে পারে রুমা বউদি। স্বামীর রক্তজাত মুসলিমভাইয়ের ব্যবহার করা সবকিছু ত এখন বেজাত, অশুদ্ধ, অচ্ছুত পাপে পরিপূর্ণ।
রুমা বউদির দাদা এখন প্রবল হিন্দুত্ববাদী। সাধারণ সমর্থকদের থেকে উঁচুতে তার অবস্থান। নেতারা কলেজ শিক্ষক দাদার কথা শুনে চলে। তারা জানে শিক্ষক টানলে গুটিকতক ছাত্র আসবেই। আর এই গুটি গুটি শত শত ফুলের পাপড়ির মত ফুটি ফুটি করে একদিন হাসবেই। এ তো রাজনীতির ঐতিহাসিক সরল সূত্র।
গেলো রাতে এরাই এসেছিলো।
বউদির বড়দা জয়কে মুসলিম আত্মীয়তা মুছে ফেলে শুদ্ধ হিন্দু হওয়ার শিক্ষা দিয়ে উত্তরপ্রদেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আফরাজুলের পরিণতি মনে করিয়ে দিয়ে গেছে। রুমা বউদির দাদার ভেসে আসা কথাগুলো কাঁপিয়ে দিয়েছিলো আমাকে।

এরকম গলার স্বর, এই হুমকি এ তো আমার আর জয়ের আশৈশব চেনা।
উনিশ শ একাত্তর সাল। যুদ্ধ চলছে দেশ স্বাধীন করতে। আর একদল বাঙালি রাজাকার ঘরে ঘরে মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করে জানিয়ে দিচ্ছে পাক আর্মিকে।
আমাদের উঠোনে পড়ে রয়েছে আমার দাদার লাশ। হিন্দু মেয়েজামাই রজতউৎপল শর্মাকে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি নিয়ে এসেছিল শামসু রাজাকার। বয়সে ছোট শামসু ক্ষমতার বলে রাইফেল উঁচিয়ে বলেছিল, হিন্দুর সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে লজ্জা করে নাই মিয়াসাব? এবার মিলিটারির হাতে আপনার মেয়ে তুলে দেবো। বলেন আপনার ছেলে সাইফুল আর জামাই রজত কই ?
জয় আমার ফুপি মানে পিসির ছেলে। আপন ফুপি। আব্বুর আদরের বোন। আমার ফুপি সেই তেষট্টিতে আব্বুর বন্ধু রজতফুপাকে বিয়ে করেছিল বিশেষ ম্যারেজ আইনে। ষাটের দশকের প্রচন্ড আইউব বিরোধী আন্দোলনে আব্বু, আম্মু, বড় ফুপি, রজত ফুপারা ছিল সোচ্চার। জেল জুলুম থোড়াই ছিল এদের কাছে। এর মধ্যে দুজনে বিয়ে করে আমার আব্বু আম্মুর কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল।
রজতফুপার দুচোখ যেনো জ্বলজ্বলে পোষ্টার। হাজার বছরের ধর্মীয় সংস্কার ভেঙ্গে রজতফুপা তখন কেবল মানুষ। মানুষের অহংকারে মনুষ্যত্বকে ধর্ম বলে গ্রহন করে নিয়েছিল ওরা।
আমার আম্মু আব্বু বিহ্বল বোবা হয়ে গেছিল কিছু সময়ের জন্যে। পরক্ষণে ভাবতে বসেছিল, এই বিয়ের পরবর্তি প্রতিক্রিয়া নিয়ে। হিন্দু মুসলিম বিয়ে যে হয় না তা নয়। তবে যারা এরকম বিয়ে করে তাদের থেকে দূরে থাকা মানুষরা যথেষ্ট উৎসাহ উদারতা দেখালেও নিজের ঘরের বেলায় ভয়ঙ্কর ঘাবড়ে যায়। আব্বু আম্মু দুজনকে অনুরোধ করেছিল কিছুদিন অন্তত বিয়েটা গোপন রাখতে। দেখি কিছু করা যায় কিনা।
আব্বু নিজে রজতফুপার বাবামার কাছে গিয়েছিল। সহস্র বছরের নিগূঢ় ধর্মের শিকল ভাঙ্গা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আত্মীয়দের ভয়ে সামাজিক অনুষ্ঠান করে বিয়ে দেওয়াতে সাহস না পেলেও মেনে নিয়েছিলেন। বড়ফুপি ত রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক কাজে অনেকবার রজতফুপাদের বাড়িতে গিয়েছে। খেয়েছে। গান তুলে নিয়ে এসেছে। সুর ঠিক করে নিয়েছে।
দু পরিবার অখুশি হলেও তেমন অসুবিধা হয়নি। কেবল দু পরিবারের কিছু আত্মীয় স্বজন সরে গেছিল। দশমুখ করে তারা কুকথা বলেছিল। সামাজিক সম্পর্ক সাময়িকভাবে ছিন্ন করে নিয়েছিল। খুব অস্বাভাবিক ছিলনা তাদের এই প্রতিক্রিয়া। রজতফুপাদের খুব কাছের কিছু আত্মীয় রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করে সেই সময়েই গোপনে চলে গেছিল ইন্ডিয়া।

রজত ফুপা বড় ফুপিকে নিয়ে শহরে বাড়িভাড়া করে থাকত। সেখানে গোপনে চলত রাজনৈতিক সভা। পোষ্টার লেখা। পোষ্টার লাগানোর আঠা জ্বাল দেওয়া। এর মধ্যে কয়েকবার আইয়ুব খানের পোষা পুলিশরা এসে ঘুরে গেছে। কিছুই পায়নি বলে খালি হাতে ফিরে যেতে যেতে দাঁত কিড়মিড় করেছে। তাদের মগজে রাগ জমা হচ্ছিল আব্বু আর রজতফুপাসহ আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে।
পঁয়ষট্টির ভাদ্র মাসে একদিনের এদিক সেদিক আমাদের জন্ম। ইশকুলের হেডস্যার নবারুণ চৌধুরি আমাদের দুজনকে দেখে নাম রেখেছিলেন, জয় বিজয়। আমি বিজয় আহমেদ ইসলাম। আর ও জয়উৎপল শর্মা। আমরা ভাই ভাই। বন্ধু তারচেও বেশি।
জয়ের ঠাকুমা যখন পূজা করত আমরা দুভাই বসে থাকতাম নাড়ু তক্তির লোভে। আমার দাদুমা নামাজ শেষে আমাদের দুভাইয়ের কপালে চুমু খেয়ে সন্দেশ খেতে দিত। আমরা জানতাম , জয় হিন্দু আমি মুসলিম । কিন্তু কখনো কোনোদিন সামান্যতম বিভেদ হয়নি আমাদের মধ্যে। রজতফুপার দুই বোনের বিয়ের ঘটকালী করেছে আমার দাদু দিদা। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিয়েছে। তারাও বিয়ের পরে আমাদের দুবাড়িতেই সমান আদরে ঘুরে গেছে। কখনো কেউ ধর্ম নিয়ে ক্লেদ প্রকাশ করেনি। আমাদের জীবনে ধর্ম এসেছে সাধারন স্বাভাবিকভাবে। অন্তরঙ্গ বন্ধুর মত। দিনের সূর্য রাতের চাঁদের মত।

সুটকেসটা পেছনের সিটে তুলে দেয় জয়। অন্ধকার অন্ধকার ভোর। গাছের পাতাগুলো সবুজের বদলে কালো দেখাচ্ছে। ভালো করে ভোর হতে এখনো একঘন্টা বাকী। ঘড়িতে দেখাচ্ছে পাঁচটা একুশ মিনিট।
যাচ্ছিস কোথায় ? আমার হোটেলে চল। আমি জয়কে স্বাভাবিক গলায় বলি। যেনো সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। স্বাভাবিক একটি রাত। রাতের তিক্ততা। বিষমাখা কিছু তর্ক বিতর্ক। হুমকি আপ্যায়ন। ঘৃণা ভরা উপেক্ষা। কিছুতেই আমার কিছু আসে যায়নি।
লেকের সামনে বড় কড়াই গাছের নীচে গাড়ি থামিয়ে বসে থাকে জয়। হালছাড়া অবস্থা। ভোরের আবছা আলোয় জয়ের মুখে রাতজাগার ক্লান্তি। রজতফুপার মত কপালের শিরা জেগে থাকে জয়ের। সেখানে আঁকিবুঁকি কাটছে অসংখ্য লেজভাঙ্গা প্রতিবাদ।
বলতে পারিস এর শেষ কোথায় জয় ? কান্নারুদ্ধ অসহায় কন্ঠ। --আমার ছেলেটাও কেমন ভিড়ে গেছে ওর মামাদের সাথে দেখেছিস।
আমি হাসি। থুতনিতে সামান্য দাঁড়ি। এলোমেলো চেহারার অসম্ভব ব্রিলিয়ান্ট দিগ্বিজয় শর্মা, জয়ের ছেলে, আমার প্রিয় ভাইপো । সদ্য ইঞ্জিনীয়ার। হাসতে হাসতে কাল রাতে আমাকে বলেছিলো, কাকু একটি একটি মুস্লিম ধরো, সকাল বিকেল নাস্তা করো । আমরা ভারত থেকে সব মুসলিমকে তাড়িয়ে দিয়ে শুদ্ধ ভারত গড়ে তুলব। আগুনটা দেখেছেন ত! সাধারন হিন্দুরা আপনাদের কত ঘৃণা করে
আমি হেসে হালকা করে নিয়ে বলেছিলাম, তা ভাইপো আমাদের কোথায় পাঠাবে তোমরা ? আমরাও যে এ মাটির আদি অধিবাসী।
দিগ্বিজয়ের চোখে ক্রূর তাচ্ছিল্য, আমরা আপনাদের পাকিস্তানে খেদিয়ে দেব। যেখানকার মাল, সেখান মে ঢাল । হিন্দু রাষ্ট্রে কোনো মুস্লিম জেহাদিদের থাকতে দেওয়া চলবে না।
আমার চোখে ভেসে আসে বাংলাদেশের হলি আর্টিজানে খুনি নির্বাস আর ওর বন্ধুদের চেহারা। ওরাও শুদ্ধ মুসলিম ছাড়া কাউকে বাংলাদেশে থাকতে দেবে না বলে নৃশংসভাবে খুন করে ফেলেছিল কতগুলো দেশি বিদেশী প্রাণ। খুন হচ্ছে ঈদের মাঠে, একুশে বইমেলা, বুকশপে, রাস্তায়।
এ কি হলো আমাদের দু দেশের তরুণদের ? রাজনীতির কোন্‌ ব্যর্থতা আমাদের তরুণদের এ পথে টেনে আনছে!
জয়ের মত আমিও নিকষ কালো ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকি।উইন্ডস্ক্রীনে তখন ঝরে পড়ছে শুকনো প্যারাসাইটের দু একটি পাতা।
-----------------------------