ওঁ শান্তি

জয়া চৌধুরী



জানি তো সহজ কাজ হতাশ হওয়া। ভোরবেলা ঘুম থেকে ওঠার সময় থেকে চোখ মেলে দেখুন রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত আশপাশে কেবল নঞর্থক ঘটনার ছড়াছড়ি। কতদিকে চাইবেন আপনি? পত্রিকা খুলুন চায়ের কাপের সাথে নজরে যা পড়বে তাহল সমাজের খারাপ দিকগুলি। কোথাও আত্মহত্যা কোথাও খুন কোথাও ধর্ষণ কিংবা অন্য কোন মন্দ ঘটনার ফিরিস্তি। তবে কি পত্রিকা পড়বেন না? যাঃ তা কি বাস্তবসম্মত কথা হল? না কি পত্রিকার সাংবাদিকেরা সমাজের বিচ্যুতি তুলে ধরবেন না? সে ও কখনও সৎ সাংবাদিকতা হতে পারে না। তাহলে? আমার মনে হয় ইদানীং সমাজের বুক থেকে ভারসাম্য শব্দটি হারিয়ে যাচ্ছে। সব কিছুতেই সকলে একপেশে। আপনি কোন রাজনীতিকে সমর্থন করুন দেখবেন ক্রমশ সমর্থন মতবাদ ছাড়িয়ে ব্যক্তি মানুষের দিকে ঢলে পড়ছে। সর্বত্র এই অস্থিরতার মূল আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। দেখুন একশ বছর আগে কী কী ভাল ভাল কাজ হয়েছিল বা ব্যক্তিরা ছিলেন সেইসব কথা বারবার আউড়ে গেলেই আমাদের বর্তমান বাস্তবতা থেকে তো রেহাই মিলবে না। আমাদের সেইসব অতীতের উদাহরণ সামনে রেখে নব্য ভাষার দুনিয়াতে নব লিপি রচনা করতে জানতে হবে। মেয়েদের উপরে ঘটা এত ধর্ষণ এত মলেস্টেশন কিংবা আরো অনেক বিকৃতি এখন রোজকার ঘটে যাওয়া ঘটনা মাত্র। সদ্য একটি পুরুষকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ। চলন্ত বাসে দুই তরুণীর দিকে তাকিয়ে প্রকাশ্য দিনের আলোয় হস্তমৈথুন করছিল সে। এ পর্যন্ত পড়েই যারা চোখে হাত দিয়ে তৌবা তৌবা করছেন তারা বুকে হাত দিয়ে বলুন তো পত্রিকায় না পড়েন বাস্তবে যে এমন আগেও ঘটত এমন কথা কী শোনেন নি কখনও? তবুও একদল লোক গ্রাম্ভারী চালে মাথা নাড়িয়ে বলবে মেয়েরা বাড়ির বাইরে বের হয় বলেই এইসব কান্ড ঘটে বেশি। কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যে। ধর্ষণ আগেও হত ঘরেই হত, বাস যবে থেকে চলছে ইতিহাসে প্রকাশ্যে হস্ত মৈথুনও চলেই যাচ্ছে। স্রেফ আগে এসব বলা হত না ছাপা হত না। বিষয়টা ছিল নোংরামি করা যায় কিন্তু তা নিয়ে উচ্চারণ করলেই সতীত্ব চলে যায় সমাজের। মেয়ে মানুষকে বন্দী করে রাখলেই যদি সমাধান হত সে কাজটি কি হাজার হাজার বছর ধরে করে আসে নি সমাজ? তারপরেও বিধবাদের ধর্ষণ বহু বাড়ির গোপন কথা ছিল। অন্য দেশের কথা থাক আমাদের দেশেই দরকার প্রকৃত শিক্ষা। মিড ডে মিল খাবার লোভ দেখিয়ে প্রশ্ন উত্তর মুখস্থ করিয়ে ছোটদের শিক্ষিত করার চেয়ে এ জিনিষ ঢের দরকারী। পরীক্ষার খাতায় নম্বর তোলার চেয়েও জরুরী সেই বোধ আমার ঘরে মেয়েটি আমার মতই সমান মানুষ। আমার যা অধিকার এই দুনিয়ার ওপর তারও তাই।
আসলে আমাদের এখন দহন হয় না এখন হয় দাহ। মৃত মানুষকে দাহ করি যেমন আমরা ঠিক তেমনই নিত্য দিন কামনার কাছে, লোভের কাছে, অনিঃশেষ চাওয়ার কাছে পুড়তে থাকি। আর সেই পুড়তে থাকা বড় নগ্ন। তার পেছনে কোন অনিশ্চয়তার ভাবনা নেই। যেন যা চাইছি তা আমি পাবই। না পেলে কামড়ে ছিঁড়ে কেড়ে নেবই। শুধু যে মেয়েদের অপরেই নিত্য নতুন খারাপ কাজ হচ্ছে তা নয়, যে কোন সৎ সুন্দর সভ্য জিনিষের ওপর নেমে আসছে খাঁড়া। তাকে বলা হচ্ছে নিচুতলার জিত বলে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন সকলকে উচ্চে তুলিতে হইবে। সাম্যের এইই পথ। আর এখন যা হয় তা হলে সকলকে অবনমন করা হচ্ছে। শালীনতার নাম ভীতুমি, সভ্যতার নাম নাক উঁচুভাব, আগ্রাসনের নাম বীরত্ব।
দেখুন মন্দকে মন্দ দিয়ে তো পালটানো যায় না। হ্যাঁ একথা প্রবাদ আছে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে হয়। কিন্তু এই সর্বব্যাপী অশ্লীলতার নীচতার অভ্যাস কাঁটা নয় ক্ষত। ক্ষত সারাতে ওষুধ দরকার। আর সে ওষুধ হল যেটা ঠিক সেই আচরণ করে যাওয়া। অবিরাম। নিরন্তর যা বলি সেই মত কাজ করে যাওয়া ছাড়া আমাদের কাছে আর কোন উপায় আছে বলতে পারেন? মানুষের কাজ তার কথার চেয়ে ঢের দামী। মনে নেই শ্রীরামকৃষ্ণের সেই বিখ্যাত উদাহরণটি? উত্তম গুরু, মধ্যম গুরু ও অধম গুরু? যিনি রোগ হলে ওষুধ খাবার উপদেশ দিয়েই কাজ সারেন তিনি অধম গুরু। যিনি ওষুধ কিনে দেন তিনি মধ্যম গুরু আর যিনি ওষুধ কিনে এনে অনিচ্ছুক রুগীকে চেপে ধরে গিলিয়ে সারিয়ে তোলেন তিনিই উত্তম গুরু।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে সে কাজটি করবে কে? পৃথিবীর ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে সব দেশেই সভ্যতা এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে জাগ্রত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। যারা মধ্যপন্থায় বিশ্বাসী সমাজ সংসারের টালমাটাল অবস্থায় তাদের কাজই ভারসাম্য আনে, টিকিয়ে রাখে মানব সমাজ। সেই মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণী এখন কোনও বিষয়ে উদ্যম নেন না। স্রেফ বইয়ে শেখা বুলি আউড়ে নিজেকে সমাজ সচেতন প্রমান করেন। তাদের সর্বক্ষণ কী যেন হারাই হারাই ভাব। পদক্ষেপে সব সময়ই দ্বিধা। কাজেই নির্দ্বিধায় ব্লা যায় তারা তাদের দায়িত্ব পালন করছেন না। তাহলে সমাজের যারা যেখানে আছেন সেখান থেকেই কাজটা শুরু হোক। বইয়ে পড়া নীতি ধর্ম তাহলে বাস্তব জীবনে রূপায়ন করা হোক। প্রত্যেকে মানব ধর্মের যে নীতি সেই যে আদর্শ লিপির কথাগুলি- অসৎ সঙ্গ ত্যাগ করো/ আলস্য দোষের আকর / ... উগ্রভাব ভাল নয় / ঔদার্য অতি মহৎ গুণ/ একতা সুখের মূল... ইত্যাদিকে আচরণে পরিণত করি আমরা। এই দহনকালে শান্তির জল তাহলেই ছেটানো যাবে বলে বিশ্বাস রাখি।
________ ______________________________________________________