পাথরের রূপকথা

হাসান মাহবুব



জমিরুদ্দীন একটি পাথর নিয়ে এসেছে। আংটিতে পরার দামী পাথর না। একটি গম্ভীর চেহারার বড়সড় পাথর। বাসায় বয়ে আনতে তাকে বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। সে খুব একটু শৌখিন মানুষ এমনটা তার নিন্দুকেরাও বলবে না। তবে তাতে তার কী এসে যায়! পাথরটা কেনার মূল উদ্দেশ্য ঘর পাহারা দেয়া। তাদের এলাকায় চোর-ছ্যাচ্চোর বড় বেড়ে গেছে। একজন দারোয়ান আছে অবশ্য। সে তার জীর্ণ শরীরে একটি ধোপদুরস্ত উর্দি চাপিয়ে রাত-বিরেতে হুইসেল বাজিয়ে চলে। সেই হুইসেলের সাথে রাতজাগা কুকুরের দল সংগত করে বটে, তবে তাতে চোর-ছ্যাচ্চোরদের খুব একটু অসুবিধে হয় বলে মনে হয় না। আর কিছুদিন পরে হয়তো বা তারা ছিচকে চুরি না করে ডাকাতি শুরু করবে। সেক্ষেত্রে কুকুরের দল আর বয়োবৃদ্ধ দারোয়ানের ওপর ভরসা করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তার দরকার শক্তিশালী কিছু। এজন্যেই পাথরটি সে ন্যে এলো। তবে সে পরিবারের সদস্যদের তার উদ্দেশ্য জানায় না। সবাই এটাকে তার নিছক একটা খেয়াল হিসেবে ধরে নেয়। মা বলেন,
- কী আজাইরা শোপিস আনায়া থুইছস? খামাখা ঘরের স্পেস নষ্ট!
জমিরুদ্দিনের ভাই বোনেরা অবশ্য এই কলহে যোগ না দিয়ে তার খেয়ালকে প্রশ্রয় দেবার ঔদার্য দেখায়। বড় ভাই হিসেবে জমিরুদ্দিন প্রাপ্য মর্যাদা কখনই আদায় করে নিতে পারে নি। সে কাজের চেয়ে অকাজই বেশি করে। এসব নিয়ে ভাবার মানে নেই।
তবে ভাবতে হলো, যখন সে সদর দরজার সামনে ব্যানার টাঙিয়ে দিলো "পাথর হইতে সাবধান"। তার পরিবারের সদস্যরা তার সাথে এই অদ্ভুত ব্যানারের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। কিছুক্ষণের ভেতর “যা করছে করুক, পাগল ছাগল মানুষ” এই বোধ দ্রুতই তাদের প্রভাবিত করলে তারা যার যার কাজে মনোযোগ দেয়। বাহিরের লোকদের মধ্যেও এমন ভীতিপ্রদর্শনকারী ব্যানার টাঙানোর ফলে তেমন চাঞ্চল্য দেখা যায়না। বরং এটা বেশ ঠাট্টা মশকরার ব্যাপার হিসেবে লুফে নিয়ে তারা বেশ আমোদ করে। তবে জমিরুদ্দিনের পরিবারের লোকজনের মিশুক বলে সুখ্যাতি নেই বলে ভেতরের খবর জানার জন্যে উৎসাহী লোকেরা পাথর নিয়ে আলাপ জমাতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে আসা। এলাকাবাসী তখন সিদ্ধান্ত নেয় যে পাথরের গূঢ় রহস্য জানতে হলে জমিরুদ্দিনের বাসায় তাদের কোনো আত্মীয়স্বজনকে পাঠাতে হবে। অনেক খুঁজে পেতে পাওয়া গেলো জমিরুদ্দিনের দূঃসম্পর্কের এক ফুপাকে। তিনি বেশ জাঁদরেল লোক। যেখানেই যান, জাঁকিয়ে বসেন।
নানা কথার ঘোরপ্যাঁচে ফেলে অসীম ধৈর্য্যের পরিচয় দিয়ে জমিরুদ্দিনের কাছ থেকে তিনি কথা বের করে নিতে সক্ষম হন। আজকাল মানুষের ওপর ভরসা করা যায় না। পাথরের ওপর ভরসা করে দেখা যেতে পারে অন্তত! তার ফুপা ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে পাথরের দিকে তাকিয়ে কটাক্ষ মেশানো প্রশ্ন ছুরে দেন "পাথরকে বডিগার্ড রাখসো, দেইখো আবার ঘুষটুষ না খায়া বাসে। তাইলে সর্বনাশ"
-কী যে বলেন ফুপা! এটা এক্কেবারে এক নম্বর পাথর। মনসাপতি গড় থিকা চামে সিস্টেম কইরা আনছি। আগে রাজরাজরাদের টহল দিতো, এখন আমাদের দিবে।
-তাইলে তো বেশ ভালোই! রাজাগজা থিকা একদম তোমার বাড়িতে। এখন বেশ নিশ্চিন্তে থাকতে পারবা, কী কও?
-জ্বী ফুপা, এটা মন্ত্র দেয়া পাথর।
-তা হলে তো ভালোই।
জমিরুদ্দিনের ফুপা তার কার্য সমাধা হবার পর আর বেশিক্ষণ থাকার প্রয়োজন মনে করেন না সেখানে।


বিকেলের দিকে কিছু উঠতি মাস্তান আসে জমিরুদ্দিনের বাসায়।
-কী খবর ভাই, একটা স্পেশাল পাথর নিয়াইলেন, আমাদের দাওয়াত দিলেন না যে!
এসব মাস্তানদের তার চেনা আছে, বাসায় বসিয়ে হালকা নাস্তা পরিবেশন করে সিগারেটের জন্যে কিছু ধরায় দিলেই তারা সন্তুষ্ট। অনেকদিন চাঁটা-টাদা নিতে আসে না। একটা উপলক্ষ্য পেয়ে চলে এসেছে। তাদের কি বিমুখ করা ঠিক হবে? সুতরাং জমিরুদ্দিনের বাবা আকারে-ইঙ্গিতে তার স্ত্রীকে বুঝিয়ে দেন এদেরকে চা-নাস্তা এবং কিছু খরচা দিয়ে বিদায় করে দিতে। নিত্তনৈমিত্তিক একটি ব্যাপার। এতে কোনো চাঞ্চল্যের অবকাশ নেই। কিন্তু জমিরুদ্দিন আজকে বেঁকে বসলো। সে তার বাবাকে আড়ালে নিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করলো যে এই মন্ত্রপূত, শক্তিশালী পাথর তাদের ঘরে আসার ফলে যাবতীয় অপরাধীদের তারা এখন থেকে সহজেই দূরে রাখতে পারবে। তাই তাদের বাড়তি তোয়াজ করার দরকার নেই। জমিরুদ্দিনের বাবা মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনলেন। এরপর আর কথা খরচ না করে তার ছোটছেলেকে বললেন দোকান থেকে চানাচুর আর কোমল পানীয় আনতে। অতিথিদের আপ্যায়ন করতে হবে।
যাওয়ার সময় উঠতি মাস্তানটা বলে "কোন অসুবিধা হইলে আমারে কয়েন। এলাকায় একটা মন্ত্রপূত পাথর আইছে, তার কোন অসম্মান করতে দেয়া যায় না।
রাত গভীর হলে এশার নামাজ পড়ে জমিরুদ্দিন পাথরটার কাছে গিয়ে কোরআন শরীফ পড়ে। তার ধারণা, পবিত্র গ্রন্থের বাক্যাবলী পাথরটার মধ্যে গভীর বোধের সৃষ্টি করবে। তার সুপ্ত শক্তি জেগে উঠবে। দিনকাল ভালো না। বাড়তি প্রতিরক্ষার প্রয়োজনীয়তা সবাই একদিন ঠিকই বুঝবে। গভীর আবেগে পাথরের শরীরে হাত বুলিয়ে দিলো সে।
পরদিন রাত গভীর হলে আগের দিন চা-নাস্তা খেয়ে যাওয়া মাস্তানের দল মাতাল হয়ে জমিরুদ্দিনের বাড়িতে চলে এলো। তাদের পদোন্নতি ঘটেছে। তারা আর ছিঁচকে মাস্তানটি নেই। তারা এখন ডাকাবুকো ডাকাত হতে চায়। আর শুরুটা করবে জমিরুদ্দিনের বাসা থেকেই। যে বাসার মানুষ পাথরকে পাহারাদার হিসেবে নিয়োগ করে, তাদের চেয়ে সহজ প্রতিপক্ষ আর কে হতে পারে? তাদের হাতে ধারালো অস্ত্র, মুখে খিস্তি, কলজে ভরা ঘৃণা। তারা সাচ্ছন্দ্যে বাসা লুটপাট করতে শুরু করলো। প্রতিরোধ করার মত শক্তি বা সাহস ছিলো না কারো।

দিন যায়, লুটপাট আর হেনস্থার কাহিনীটাও ফিকে হয়ে আসতে থাকে। মানুষের মনে আর উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারে না। ডাকাতির ঘটনা বাড়তে থাকে। জমিরুদ্দিনের বাসার সামনে “পাথর হইতে সাবধান” লিখনটি নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করার মত সময়ও আর থাকে না কারও। তবে জমিরুদ্দিন আশা হারায় নি। মনসাগড়ের মাটি থেকে উত্তোলিত মন্ত্রপূত পাথর, যাকে সে প্রতিদিন পবিত্র আসমানী বাণী শোনায়, সে একদিন না একদিন নিশ্চয়ই তার আশা পূরণ করবে! তাকে দেবে কাঙ্খিত নিরাপত্তা এবং আশ্রয়!
হঠাৎ করে একদিন রাতে সে গোঙানি শুনলো। সে নিশ্চিত হয়ে গেলো এটা পাথরেরই গোঙানি। কারণ তাদের বাসার সবাই গোপনে গোঙায়। অথবা গোঙালেও তা জমিরুদ্দিনকে শুনতে দেয়ার মত নৈকট্য পরস্পরের এই। জমিরুদ্দিন চমকে উঠে পাথরটির কাছে গেল সে। আদর করে জিজ্ঞেস করলো,
-কী হৈছে? কান্দো কেন?
-কিছুই হয় নাই। আমার বড় একাকী লাগে।
-আরে বোকা পাথর! তোমার জন্মই তো একাকী। তুমি একাকী জন্মাইছো, তোমার কোন বাবা-মা নাই, বন্ধুবান্ধব নেই, শুধু তোমার বিশাল আকৃতির জন্যে সবাই তোমার দিকে তাকায়। সেডাই বা আর কদ্দিন করবে! তুমি যে স্রেফ একটা পাথর, গুণহীন, সেটা সবাই জাইনা গেছে, যেন কত্ত জ্ঞানী একেকজন! কব্বরের দিকে এক পা দেওয়া মুরুব্বীরা যা মাঝেমধ্যে একটু তোমার দিকে তাকায়। একা তো লাগবেই। কিছু করার নাই।
-আমার কোনো ক্ষমতা নাই। আমি তোমার আস্থার প্রতিদান দিতে পারি না। আমার খারাপ লাগে। আমারে পাইলা পুইষা এত বড় করলা, জীবন দান করলা। কিন্তু আমি কী করতে পারলাম!
-আরে পারবা, পারবা। তুমি এত শক্ত, তুমি এত প্রকাণ্ড, তুমি না পারলে কে পারবে? আগেকার দিনে কত অলৌকিক ঘটনা ঘটছে, চাইলে এখনও ঘটতে পারে। তোমার বয়স তো কম না। কয়েক হাজার বছর হবে। কম তো দেখো নাই। জানো না এইগুলা?
-খালি দেখছি, খালি জানছি, খালি শিখছি। কিন্তু কাজে লাগাইতে পারি নাই কিছু। তুমি আমাকে কাছে নিয়া আইসা ভুল করছো জমিরুদ্দিন। তোমরা মানুষরা পাথর হয়া যাইতাছো ভালো কথা, তাই বইলা পাথরদেরও মানুষ বানাইতে হবে? আমার তো আগে কখনও একা লাগে নাই জমিরুদ্দিন, আগে কখনও যন্ত্রণা বুঝি নাই। কেন দেখাইতেছো এসব আমারে? এর চেয়ে ভালো, তুমি আমার কাছে আসো। এক হয়ে যাও।

জমিরুদ্দিন হঠাৎ প্রচন্ড টান অনুভব করে। পাথরটা টাকে টানছে ভীষণ। এ টান অগ্রাহ্য করা অসম্ভব। সে চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। কোনোভাবেই পারছে না এ টান এড়াতে। শেষতক সে পাথরটার ভেতর ঢুকেই গেল। কিন্তু এ কী! পাথরের ভেতর ওরা কারা! তার স্ত্রী,বাবা, মা ভাই, বোন। সবাই বেশ আতঙ্কিত হয়ে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ...
একটা ভূমিকম্প হলো ভীষণ। ঘরবাড়ি টলছে। সব ভেঙেচুড়ে পড়ছে। তবে জমিরিদ্দুন এবং তার পরিবার আছে নিরেট পাথরের নিরাপদ আশ্রয়ে। গ্রানাইট পাথর। চিড় ধরার সম্ভাবনা কম। বাইরে প্রলয়কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে। অনেক মানুষের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে ভাঙনের শব্দ। ধ্বংসের হুংকারে কেঁপে উঠছে মাটি, মানুষ, মাস্তান, আসবাব, চায়ের দোকান, ঘর!

বেশ কদিন পার হয়ে গেছে। পাথরের বুকে ভালোই আছে জমিরুদ্দিন এবং তার পরিবার। চারিপাশের ধ্বংসলীলার কোনো চিহ্ন এখানে নেই। পাথরের গায়ের শ্যাওলা থেকে তারা আমিষের অভাব পূরণ করে। আর তার অশ্রূ থেকে লবণ ছেঁকে নিয়ে নেয় পানীয়।
ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীর উদ্ধারকর্মীরা অবশ্য ভেঙে পড়া বাড়িঘর আর আসবাবের মধ্য মানুষজন উদ্ধার করতে গিয়ে এই পাথরটিকে আবিষ্কার করে ফেলবে এই আশঙ্কা কম।
কারণ পাথরটি ততদিনে ডেবে গেছে মাটির অনেক গভীরে...