একটি নোনতা গল্প

প্রবুদ্ধ ঘোষ



মাছেরা রক্তের নোনতা গন্ধ পাচ্ছিল। মসৃণ স্বাদ। গোলাপ রঙের রোদ ছুঁয়ে রয়েছে মরচেপড়া গ্রিল। উত্তর কলকাতার রোদজ্বলা বিষণ্ণ গলি অপেক্ষা করছে স্ট্রিটলাইটের ঈষৎ ঘোলাটে আলোয় সন্ধ্যের শব্দ শুনবে বলে। খোঁচাদাড়ি বেলুনওলা অন্য গলিতে চলে যাচ্ছে এই গলিপথ ধরে। না-বিক্রি হওয়া বেলুনগুলো একে অন্যকে স্পর্শ করছে, সরে যাচ্ছে। এইভাবেই একটা মুহূর্ত তৈরি হচ্ছে। আর, অ্যাকোরিয়ামের মাছেরা নোনতা রঙের দিকে আসছে।

#
আঃ! দেরি হয়ে যাচ্ছে। এক ঘণ্টা আগে ঢুকে আজ ঝালিয়ে নিতে হবে স্লাইডগুলো। বিগ্‌ ফিন্যান্সিয়াল হাউজের সঙ্গে মিটিং, আজ ফাইন্যালাইজ করতেই হবে উচ্ছেদ-বিরোধী প্রোজেক্টটা। উন্নতির জরুরি ধাপ। ডিস্‌প্লেসমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট। প্রোজেক্টটা ঠিকঠাক নামাতে পারলে বাকি কম্পিটিটরদের বলে বলে পাঁচ গোল। অন্য প্রোজেক্ট থেকে ইনিশিয়াল ক্যাপিটাল টেনে কিছুদিন ব্যালান্স করতে পারলেই গুডউইল প্লাস মার্কেটিং। ল্যাপটপ খুলে জরুরি তথ্য নামিয়ে রাখছিল তাই। উচ্ছেদ আর জবরদস্তি উদ্বাস্তু করার বিরুদ্ধে বেশ কিছু অকাট্য যুক্তি তৈরি করেছে রাত জেগে। এই যুক্তিগুলো স্লাইড শো দিয়ে প্রেজেন্ট করলেই... আঃ, এত জ্যাম কেন? ৮ মিনিট হতে চলল একই জায়গায় দাঁড়িয়ে। বাইরে তাকিয়ে বিরক্তি বাড়ল আরও। উফফ্‌, আর কতদিন এইসব মিছিল-মিটিং ক’রে পিছিয়ে যাবে শহরটা? জানলার কালো কাঁচ নামাতেই স্লোগানের উচ্চস্বর কানে এলো। কোথাকার এক নোনাডাঙ্গা বস্তিতে উচ্ছেদ হয়েছে কাল রাতে, বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এলোমেলো শ’খানেক ঘর। লোকাল থানার বিরুদ্ধেও স্লোগানিং করছে, কারণ ওরা নাকি ওই রিয়াল এস্টেট গ্রুপকেই মদত দিয়েছে। উচ্ছেদ-বিরোধী প্ল্যাকার্ড হাতে লোকগুলো চারমাথার মোড়ে অবস্থানে বসেছে; একজন সবাইকে অনুরোধ করছে দশ মিনিট সময় নিয়ে ওদের বক্তব্য শুনতে- জবরদস্তি উচ্ছেদ আর পুনর্বাসনের ভাঁওতা নিয়ে কী সব বকে যাচ্ছে একটা বুড়ো। ধুর্‌, সেই এক গল্প... কাচ তুলে দিয়ে এসিটা ফের অন করতে বলল। ড্রাইভারকে বলল বাঁদিকের পুরনো লেন দিয়ে যদি শর্টকাট মারা যায়।

##
চেয়ারে বসে নোট নিচ্ছিলেন মহম্মদ। আগামিকাল সকালে কোর্টে আর্গ্যুমেন্ট- নাগরিক অধিকার আর মানবাধিকার রক্ষার দাবিতে। সংবিধানের পাতা খুলে জরুরি পয়েন্ট নোট। তখনই কেউ বা কারা এসে তাঁকে ছুরি ও চপার মেরে খুন করে বলে খবরে প্রকাশ।
##

#
চেনা রুটে ফিরছিল ছেলেটি। হাতে বই। যতক্ষণের বাসজার্নি, কোনও না কোনও বই পড়তে থাকে। সারাদিন চাপের মধ্যে থেকে, গাদা গাদা মেডিক্যালের বই আর দিন নেই ক্ষণ নেই রক্ত-রুগী সামলে এই সময়টুকু বের করতেই হয়। পুরনো বইয়ের ধূলো ঘেঁটে থেকে সস্তায় পেয়েছে এটা- লে মিসানথ্রপ। পুরনো ট্রান্সলেশন। সূর্য সেন স্ট্রিট, রাজাবাজার আর মানিকতলার জ্যাম পেরোতেই আধঘণ্টা লাগবে, তারপর খান্নার জ্যাম, অনেকটাই শেষ করা যাবে। শ্রদ্ধানন্দ পার্কটা পেরিয়েই হঠাৎ ‘গেল, গেল’ চিৎকার আর মারাত্মক ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল ১২সি/২। মুহূর্তেই ভিড় আর বেড়ে যাওয়া ক্যালোরম্যালোর। উফফ্‌, শালারা দেখে রাস্তা পার হতে পারে না? আর, লোকেদের ধারাবিবরণী শুরু হয়ে গেল। ছেলেটির পাশে যে অফিসফেরত বসেছিল, “চ্চুক্‌ চ্চুক্‌, মাথাটা থেঁৎলে গেল বোধহয়”, প্রতিবন্ধী সিটের খ্যাঁচামতো লোকটা, “না, না, ডানকাঁধের ওপর দিয়ে চাকা...আমি দেখলুম”। কয়েকজন ঘাতক ম্যাটাডোরের ড্রাইভারকে টানাহেঁচড়া করছে। ভিড়ের মধ্যে দৌড়োদৌড়ি, “অ্যাম্বুলেন্স”, “একটা ডাক্তার ডাক”, “এই তো সামনেই মেডিকেল কলেজ”... ছেলেটির মুখ কুঁচকে গেল বিরক্তিতে। আরও আধঘণ্টা লেট হবে পৌঁছতে। সেমেস্টারের এতগুলো জিনিস বাকি, রাত পোহালেই পরীক্ষা। এই সেমেস্টারটা উতরে দিলেই ইন্টার্নশিপ, সরকারি ডাক্তারির দোরগোড়া... অতীনকাকুর চেম্বারটাও আছে অবশ্য। ছেলেটি একবার গলা তুলে ড্রাইভারকে, ‘দাদা, যাবেন নাকি নেমে যাব?’ বলে লে মিসানথ্রপে মন দিল আবার। ফিলিন্তের সাথে বেশি মিল খুঁজে পাচ্ছে নিজের, আর, ইলিয়াতেঁ তো পুরো মিলে যাচ্ছে... উফফ্‌ এতক্ষণ বাস দাঁড়িয়ে গরম ঘাম হচ্ছে ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্সের জন্যে লোকগুলোর ছুটোছুটি আওয়াজ বাড়ছে।

##
পাঞ্চালীকে খুব কাছ থেকে চারটে গুলি করেছিল আততায়ীরা। ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে আর ট্রাম-শ্রমিক ইসমাইলের ওপর একটা কভার-স্টোরি লিখছিলেন, ডকুমেন্ট্‌রি শুরু করতে যাচ্ছিলেন মুজফ্‌ফরনগর, নোয়াখালি আর আসানসোলের দাঙ্গাগুলোর ফিল্ডওয়ার্ক নিয়ে। বাড়ির সিঁড়িতেই লুটিয়ে পড়ে ছিলেন পাঞ্চালী, আততায়ীরা অধরা।
##

#
মেয়েটি হাত খুলে কমেন্ট আর রিপ্লাই করছে স্টেটাসে। পয়লা বোশেখের ছুটি আজ। স্কুলের গ্রুপ, প্রায়ই আউটিং করে ওদের গ্রুপটা। এখন তর্ক হচ্ছে এস্থেটিক্‌স নিয়ে। আসলে, ঘণ্টাখানেক আগে নামদেও ধাসালের একটা কবিতা পোস্ট করেছে মেয়েটি। গান্ডু বাগিচা। গ্রুপের কয়েকজনের সেটা নিয়েই আপত্তি। কেন এত খিস্তি থাকবে কবিতায়, এস্থেটিক্‌স কোথায়? আরে বাবা, নামদেও ধাসাল যে আপার ক্লাসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, সেটা বুঝতে হবে তো। এলিট ক্লাসের আইডিওলজি থেকে এটা বোঝা যাবে না, অ্যান্টি-পোয়েট্রি দিয়ে শিল্পের নান্দনিকতাকে ভাঙা- সেটাই বোঝাচ্ছিল মেয়েটি। একজন আবার বোকার মতো প্রশ্ন করল, দলিত সাহিত্য বলে আলাদা কিছুর দরকার আছে? ওঃ, কে বোঝাবে এদের? বামার ‘সঙ্গতি’ পড়ে নি এরা, নামদেও পড়েনি; মেয়েটি পড়েছে ওদের ইউনিভার্সিটিতে ‘কালচারাল স্টাডিজ’ পেপারে পড়তে হয়েছে। কী যুক্তি দেবে এদের? ওঃ, এদিকে আবার চ্যাট-বক্স পপ-আপ করল। ওই ছেলেটা আবার মেসেজ করে জ্বালাচ্ছে... কতবার এড়িয়ে যাচ্ছে, তবু শুনছে না... আরেঃ, ইউনিভার্সিটিতে ঢুকেছিস তো কোটায়, এম-ফিলে চান্স পেয়েছে বলেই প্রেম নিবেদন করতে হবে?... কমেন্টে ফিরল মেয়েটি। অন্তরীপ কমেন্ট করেছে মডার্ন স্যোসাইটিতে কাস্টের রেলেভ্যান্স নিয়ে। ‘অ্যানাইহিলেশন অব্‌ কাস্ট’ থেকে আম্বেদকর কোট করছে। বালটা জানেনা যে, ওরও পড়া আছে টেক্সটটা। মেয়েটির একটা দারুণ পাল্টা যুক্তি মনে পড়ল আম্বেদকরের বইটা থেকে... লিখছে কমেন্টবক্সে। উফ্‌, আবার ওই ছেলেটা লাভ সাইন পাঠাচ্ছে। মুখ চেনে, কয়েকদিন কথা বলেছে মেয়েটি ঠিক আছে; কিন্তু, এটাও তো বলে দিয়েছে মেয়েটি, “আমাদের বাগবাজারের মিত্র ফ্যামিলি। তিনঘরের কায়স্থ আমরা। ঠাকুর্দা এখনও বেঁচে, তাই তিনঘরের কায়স্থ ছাড়া বিয়ে দেবেনা”... ছেলেটি তবু নাছোড়, উত্তর চায়। শালা, কোটায় চান্স পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে, ডিরেক্ট প্রেম নিবেদন! হাঃ! চ্যাট বক্স টার্ন অফ্‌ করে কমেন্ট লেখায় মন দিল মেয়েটি।

##
বুদ্ধকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানাচ্ছে পুলিশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশকর্মী বলছেন, দু’দিন আগে যে গ্রামে সূর্যসেনা আর রণবীর সেনা গণহত্যা করল, সেখানে ঘুরে ঘুরে খবর সংগ্রহ করছিলেন বুদ্ধ। তখনই লালন আর সুরদাস ওকে পোড়ো স্কুলবাড়িটায় তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ। সেখান থেকেই বিকেলে রক্তাক্ত বুদ্ধকে উদ্ধার করে পুলিশ।
##

#
নিউজফ্ল্যাশ আসছে। একের পর এক। বৃষ্টি না-হওয়া অসহ্য নোনাধরা বিকেলে আকোরিয়ামের পাশে বসে আছে। নিউজফ্ল্যাশ চোখ ছুঁয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, কানে ঢুকেও মাথায় পৌঁছচ্ছে না সংবাদপাঠকের নাটকীয় স্বর। মাছেরা চকচকে পাথরের দিকে যাচ্ছে, সরে আসছে কৃত্রিম গাছের দিকে, উঠে আসছে জলতলে; আর, নোনতা রক্তের দিকে ঝাঁক মারছে। বুদ্বুদ উঠছে। অ্যাকোরিয়ামের পাশে রাখা সদ্যব্যবহৃত ব্লেড। জলে রক্ত মিশিয়ে দিচ্ছে দেখছে মাছেদের উৎসব। খবরের শব্দগুলো কানে ঢুকছে না আর, বরং মাছেদের ঠোঁট নাড়া ডিকোড করতে শিখছে... কানকোর পাশ ফুলে উঠলে কি আনন্দের প্রকাশ? জল বেশ লাল হচ্ছে এবার, শিরাকাটা হাত আরেকটু জলের গভীরে এলিয়ে দিল।