লিঙ্গরাজত্ব

অনিন্দ্য বর্মন



মানুষ এক চতুষ্পদ জীব। পরমসৃষ্ট। মেধাবী। নীতিজ্ঞ। জ্ঞানী।
প্রয়োজনে ক্রুর এবং হিংশ্র।

দৈনন্দিন আয়নায় ছবি ফুটে ওঠে। সার্ফ করে, নেড়ে-ঘেঁটে কাঙ্ক্ষিত তত্ত্ব তল্লাশি। প্রেম, মাদকতার মিশেলে গা ডুবিয়ে ঈশ্বর সান্নিধ্য অথবা যৌন বর্বরতার আধুনিক উল্লাস। ক্লাস চলছে। আমরা পাঠনরত। ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষক-শি ক্ষিকা নির্বিশেষে যে নাম ভেসে ওঠে ─ সমাজ, লিঙ্গ, জাতি, বর্ণ, ধর্ম, দেশ ইত্যাদি। কুটিল বিভাজন মহাপ্রভুর নির্মাণে কলম চালিয়েছে। বিধাতাপুরুষের ভূমিকা এক্ষেত্রে গৌণ। কারণ ১৩০কোটির দেশ ৪০কোটি বেকার হিংশ্র চতুষ্পদের চারণভূমি।
আপাতত যুদ্ধপরিস্থিতি। আমরা যুদ্ধক্ষেত্র অথবা দাবার পেয়াদা, বোড়ে। ঘটনাকে আড়াল করতে এগিয়ে দেওয়া হয় ৪৫লক্ষ প্রাইমারী আবেদনকারি অথবা ৮কোটি রেলের গ্রুপ-ডি। এই যুদ্ধের স্থান নীতিজ্ঞ মননে, মানসিকতায়। নীতিপুলিশের লাঠির আঘাতে। ধর্ষণের স্বীকৃতি আছে, আইনি লড়াই আছে। কিন্তু প্রকাশ্যে চুম্বনের কোনও আইন নেই। তোমার জন্য অপেক্ষা করছে নরক, ইবলিশ, স্যেটান। তাই মুখবন্ধ। খাম নয়, মানুষের। চিঠির মতোই ক্রমশ অচল আর্তনাদ।
যুদ্ধ শেষে শান্তিতে শুয়ে আছে সারিবদ্ধ লাশ। ভাই-ভাইএর রক্তপাতে আপাতত সব চুপ। উরুদেশ জুড়ে রক্তের ছোপ। আমরা বিচার করি সীমারেখা কারণ বর্বরতার টেনে দেওয়া গণ্ডির নাম সারহ্‌দ। আর আমরা শিখেছিলাম এক্কাদোক্কা অথবা ছু-কিৎকিৎ। ক্ষতের প্রলেপে ঔষধির বদলে ‘পতিত পাবন সীতা-রাম’, ‘May God bless you’ অথবা ‘বরকত ও রহমতের’ প্রতিশ্রুতি। যে শরীরটা হয়ে উঠেছিল কয়েকটি নরপশুর লীলাক্ষেত্র, উল্লাসের পীঠস্থান; সেই মন্দিরেই তুমি নীরব বসে আছ। পাথরের মূর্তি সম্মুখে দুগ্ধপাত্র, রাজভোগ। অনতিদূরে, প্রসাদ প্রত্যাশী ভক্তেরা নামগানে মত্ত। অতএব, মাদ্রাসার বিদ্রোহ-রাত্রি আঘাত হানে। যুদ্ধপরিস্থিতি। ‘জাগতে রহো!!’ আমার বৃষ্টিভেজা রাত্রি জ্বর ও মৃত্যুর সুসংবাদ পাঠায়, যা কোনও চিকিৎসাপত্রে উল্লেখযোগ্য নয়। মশার কামড়ের মতোই ধর্ষণও ছোট্ট ঘটনা হয়ে হিমঘরে ভোরের অপেক্ষায় একটার পর একটা insomniac রাত্রি যাপন করে। কারণ বীর্যপাত এবং মুত্রন মানেও তো সামাজিক আখ্যায় ‘Holy Shit!!!’
চাপা আর্তনাদ তীব্র হতে হতেই আমরা শুনে ফেলি, ট্রেন আসছে। ফাঁকা বগিগুলি লাশ বয়ে আনে। দেশ, কাল, ধর্ম এবং সমাজের লাশ। যারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কখনওই গর্জে উঠবে না। অথচ এই সুখস্মৃতি বুকে আগলেই বিভূকাকা বলে ফেলেছিলেন, ─ “অপু, সেরে উঠলে আমায় একদিন রেলগাড়ি দেখাবি?” আর এই স্মৃতিই ছোট্টবেলায় মনে গেঁথে গেছিল। ৩ ভাইবোন বিকেল হলেই ক্রসিংএ রেলগাড়ি দেখতে যেতাম দাদুর হাত ধরে। তখনও কী জানতাম, ৭০ বছর পরও লাহোর-অমৃতসর এক্সপ্রেস লাশ ফেরি করে!!!
আপাতত ‘দ্বাদশ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা। পূর্বে, দ্বাদশ শ্রেণী পাশ করলেই চাকরি। আমরা জেনেছিলাম দ্বাদশ পাশে কলেজের ছাড়পত্র। বর্তমান জানিয়ে দিল, শাস্তির সীমাও ঠিক করবে ‘দ্বাদশ’। ১২বছরের নিচে কোনও শিশুকে ধর্ষণ করলেই ধর্ষকের জন্য বিপুল পরিমাণে শাস্তি অপেক্ষা করছে। তারও আগে অপেক্ষা করছেন চোখে পট্টিবাঁধা আইন, আইনের রক্ষাকর্তা বিচারক, উকিল, পুলিশ, ঝাণ্ডা হাতে মোর্চা বাহিনী এবং হতঃকিম POCSO Act। অতএব, ধর্ষণ করতে হলে শিশু নয়, যুবতীই প্রয়োজন। অথবা র‍্যেস্ট্যুরেন্টের A-la-carteএর মতো বেছে নাও পছন্দসই নারীশরীর।
বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পড়ে জানলাম, বহু আগে তিন বন্ধু ছিলেন। ভগবান, আল্লাহ এবং যিশু। ধর্মের নামে হানাহানি এবং রক্তপাতে ক্লান্ত তিন বন্ধু আপাতত সমাজকল্যানে মৌনব্রতী হয়েছেন। কারণ ধর্ষণের উদ্দেশ্যে রাম-রহীমের সমান অবস্থান।
পশুদের মধ্যে একটি নিয়ম চালু আছে। সকল পশুগোষ্ঠীর একজনই সর্দার। অন্য কেউ সর্দার হতে চাইলে সে বর্তমান সর্দারকে দ্বন্দযুদ্ধে আহ্ববান জানাবে। যুদ্ধে যে জিতবে, সেই হবে পরবর্তী সর্দার। মানুষের বর্তমানে কেউ সর্দার হতে চাইলে রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে উন্নয়ন, অথবা ধর্ম। অধার্মিক আমিকে প্রশ্ন করেছিলাম, ─ ‘ঘটা করে সরস্বতী পুজো করিস কেন?’ উত্তর এসেছিল, - ‘অধার্মিক বলেই এই দুঃসাহস।’
খাদক এবং শিকারের মধ্যে সমঝোতা হয় না। ধর্ষণের সময় জাতি, ধর্ম বিচারেরও চল নেই। অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কাছে পাঠ অব্যাহত। অতঃপর, ক্লাস চলছে। প্রিয় দেশ; জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে বাকি সব কিছুর মতোই ধর্ষণও শেখানো হয়???