‘হেমন্ত’

মাহরীন ফেরদৌস



রাসেল চিৎকার করতে করতে বলল, ‘মা, ওকে এই মুহূর্তে বের করে দিতে হবে’।

বাইরে আকাশ কালো করে মেঘ জমছে। মোমেনা আখতার ডাইনিং টেবিলের কোণার চেয়ারে নির্বিকারভাবে বসে আছেন। পাশের বাসা থেকে কবির সাহেব আর তার স্ত্রী উৎসুক ভঙ্গিতে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এ বাড়ি থেকে সচরাচর পিনপতনের শব্দও পাওয়া যায় না। সকাল বেলা রাবেয়া নামের মহিলা ছুটা কাজ করতে না আসলে আর মাঝে মাঝে বিকেল বেলা মোমেনা আখতারকে একগাদা পরীক্ষার খাতা নিয়ে ঢুকতে না দেখলে অনেকেই ধরে নিতো ১২/বি নামের এই ফ্ল্যাটটায় আসলে আর কেউই থাকে না। কবির সাহেবরা বাড়িতে ঢুকবেন কিনা বুঝতে পারছেন না। দরজার সামনেই কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। যেন উনাদের কারণেই রাসেল এর মেজাজ সপ্তমে চড়েছে। মোমেনা আখতার এবার ডাইনিং এর পাশের জানালা দিয়ে আবছা দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আকাশের পরিবর্তন দেখতে থাকলেন। রাসেল গটগট করে হেঁটে নিজের ঘরে চলে গেলো।

মোবাইলে কিছুক্ষণ স্ত্রীর সাথে রাগারাগি করে কথা বলে, তারপর আবার ঝড়ের গতিতে ডাইনিং রুমের সামনে এসে আগের চেয়েও জোরে চেঁচিয়ে বলল, ‘আগামী এক ঘন্টার মধ্যে এই কুত্তার বাচ্চাটাকে বাসা থেকে বের করার ব্যবস্থা করছি আমি’।


রাসেল মোমেনা আখতারের একমাত্র ছেলে। পেশায় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। আমেরিকা থেকে পড়ে এসে সে সিঙ্গাপুরে একটা বড় ফার্মে কাজ করে। বছর তিনেক আগে বিয়ে করেছে নিজের পছন্দে। এক বছরের একটি সন্তান আছে। যদিও সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশের দূরত্ব প্লেনে মাত্র কয়েক ঘন্টার কিন্তু পেশাগত এবং পারিবারিক ব্যস্ততার জন্য সে শুধুমাত্র একবার দেশে আসে। তা হল মোমেনা আখতারের জন্মদিনে। সিঙ্গাপুরে তার স্ত্রী, সন্তান এবং স্ত্রীর প্রায় পুরো পরিবার থাকে বলে সে ঈদ করতেও ঢাকায় আসে না। আর মায়ের জন্মদিন উপলক্ষে ঢাকা আসলেও কেক আর নতুন শাড়ি কিনে দেওয়া বাদে বাকি সময়টা তার পুরানো বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে কাটায়। রাসেলের বাবা নেই। ‘নেই’ মানে পৃথিবী থেকে নেই এমন কিছু নয়। তিনি এক স্কটিশ মেয়েকে বিয়ে করে ইউরোপে আছেন বেশ অনেক বছর আগে থেকেই।

মোমেনা আখতার তার শিক্ষকতার এবং পারিবারিক জমি বিক্রয়ের টাকা থেকে এই ছোট ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। মা-ছেলের তাতে দিব্যি চলে যেত। আপাদমস্তক যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে তিনি সকলের কাছে পরিচিত। ছেলেকে স্বাবলম্বী করতে এবং পৃথিবীর সাথে লড়াই করতে শেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। সেই চেষ্টা রাসেল কে একটু বেশিই হিসেবি করে তুলেছে। যা নিয়ে হয়ত তার আফসোস থাকার কথা কিন্তু তিনি তা স্বীকার করেন না। শিক্ষকতা করেন আর চুপচাপ থাকেন বলে কেউ যদি তাকে বোরিং এবং সেকেলে মনে করে তাহলে সে ভুল করবে। মোমেনা আখতার একদম বন্ধুহীন না। কিছুদিন আগেই তিনি ফেসবুকে নিজের স্কুলের সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী নাসরিনকে পঁয়ত্রিশ বছর পর খুঁজে পেয়েছেন। নাসরিন স্বপরিবারে কানাডায় থাকে। ফেসবুকে খুঁজে পাওয়ার পর থেকে দুজনে প্রতিদিন আধ ঘণ্টা করে স্কাইপে গল্প করেন। মোমেনা আখতারকে ফেসবুকে তার পোশাকি নামে খুঁজে পাওয়া গেলেও কেউ জানে না তার ছদ্মনামে আরেকটি একাউন্ট আছে। সেখান থেকে তিনি কেবলই কবিতা আর গান শেয়ার করেন। অচেনা মানুষজন এড পাঠালে গ্রহণ করেন। খুব বেশি উলটা পালটা কিছু মনে না হলে মাঝে মাঝে মাঝে গল্পগুজব করেন। যেমন কিছুদিন আগে, ওবায়েদ নামে এক ছেলের সাথে কথ বলেছেন।


- ‘আপনার কবিতাগুলো খুব সুন্দর’।

- ‘আমার না। এগুলো হেলাল হাফিজ আর জীবনানন্দ দাশের কবিতা।‘

-‘তাও আপু, মনে হয় যেন আপনিই লিখেছেন।‘

-‘ আপু না, আমি তোমার খালাম্মার বয়সী হবো’।

-‘কী যে বলেন। আপনার প্রোফাইলে শুধুই আকাশের ছবি। কীভাবে বুঝবো আপনি আপু না খালাম্মা? আজকে তো প্রথম কথা হচ্ছে। তিন, চার দিন পর একটা সেলফি দিয়েন। আপনি ভুলে গেলে আমি মনে করায়ে দেব।‘

- ‘দেখো, বাবা। তুমি আমার চেয়ে অনেক ছোটই হবে। ফেসবুকে বন্ধু হয়েছ কথাবার্তা বলো ঠিক আছে। সেফলি, কুলফি দিতে পারবো না।‘

- ‘আপু, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে না আপনি আসলে মুরুব্বি কেউ না। আপনি মনে হয় সুন্দরী কেউ। সুন্দরীদের কাছে ছবি চাইলে তারা এমন করে। হে হে হে।‘

- ‘আবার আপু বলছ? পাগল নাকি?’ মোমেনা আখতার বিরক্ত হয়ে ওবায়েদকে আনফ্রেন্ড করে দেন। পৃথিবীটা কোথায় চলে যাচ্ছে, মানুষজন ফেসবুকে বন্ধু হয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে না নাকি? সত্য কথা বললেও বিশ্বাস করে না। ওবায়েদ অবশ্য আনফ্রেন্ড হবার পরেও দমে যাওয়ার পাত্র না। সে প্রতিদিন সকালে ঝর্ণা আর গোলাপ ফুলের ‘জিআইএফ’ দিয়ে শুভ সকাল ম্যাসেজ পাঠায়। মোমেনা আখতার কবিতা শেয়ার দিলে তাতে সে ‘লভ’ ইমো দিতে ভুলে না। তার দৃঢ় বিশ্বাস এটি একটি কমবয়সী সুন্দরী ও কবিতাপ্রেমী মেয়ের প্রোফাইল।

আরেকজন ব্যক্তি আছেন, নাম মাসুদ হাসান। তিনি বন্ধু তালিকায় থাকার পরেও কখনও ম্যাসেজ দেন নি। কিন্তু কিছুদিন আগে ‘প্রাক্তন’ কবিতা শেয়ার করার পর ভদ্রলোক একটা দীর্ঘ ম্যাসেজ দিলেন। খুব সুন্দর করে জানালেন এই কবিতাটা তার অতীতের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ক্লাস পালিয়ে তিনি মেয়েটির সাথে প্রেম করতে যেতেন। বাসায় ধরা পড়ে যাওয়ার কারণে যাকে জোর করে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই ভদ্রলোকটি ভালোই। মাঝে মাঝেই দু এক লাইন লিখেন। মন্দ লাগে না। আবার এক কিশোরী মেয়ে আছে লিস্টে, নাম প্রিন্সেস আমিরা। প্রতি ঘণ্টায় নিত্য নতুন সেলফি আর চেক ইন দেয় সে। প্রচুর বন্ধুবান্ধব তার। মেয়েটা বার্গার খেতে খুব ভালোবাসে। দু দিন পরপরই বার্গার হাতে তার সেলফি দেখা যায়। কৈশোর, রঙিন জীবন, দেখতে ভালোই লাগে। পূজা পারমিতা নামের এক মহিলাও আছেন বন্ধুতালিকায়। যিনি শুধুমাত্র স্বামীর সাথে ঝগড়া হলেই ফেসবুকে এনে পুরুষজাতি কে গালাগালি করে স্ট্যাটাস দেন। সব কথাই যে রাগের মাথায় বলেন তা না, কিছু কিছু বেশ যুক্তি সঙ্গত কথা বলেন। এবং প্রতি স্ট্যাটাসের শেষে স্বামীর করা কাণ্ড কারখানা লিখে দেন। মোমেনা আখতার এমনি করে কতশত মানুষের খবর যে ফেসবুকে পড়েন তার কোন ইয়াত্তা নেই। সময় কেটে যায় হু হু করে। আর হ্যাঁ, ফেসবুকে তার দ্বিতীয় একাউন্টের নাম অবশ্য মোমেনা আখতার না। সেখানে তার নাম ‘সুচিত্রা আখতার’। বলা বাহুল্য, এককালে সুচিত্রা সেনের সিনেমার ভক্ত ছিলেন বলেই এই নাম।

শিক্ষকতা, ঘরের কাজ, নাসরিনের সাথে গল্প আর ফেসবুক নিয়ে সময় মন্দ কাটছিল না। ঘটনা শুরু হল যখন এ বছর তার জন্মদিনে রাসেল জানালো সে অফিসের কাজে আটকা পড়ায় ঢাকা আসতে পারবে না। আর শুধু তাই নয়, এই প্রথম সে কেক আর শাড়ি বাদে ভিন্ন একটি উপহার পাঠালো। সেদিন সকাল সকাল একটা বিশাল মাইক্রোবাসে করে একটি লম্বা বাক্স আসল। মোমেনা আখতার এত বড় বাক্স দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন। রাসেল স্কাইপে কল দিয়ে হাসতে হাসতে জানালো, মানুষের নানা কাজে সাহায্য করার জন্য তার কোম্পানি সিঙ্গাপুর ও ঢাকা মিলিয়ে বেশ কিছু ‘ইউজার ফ্রেন্ডলি’ হিউমেনয়েড রোবট তৈরি করছে । প্রাথমিকভাবে অল্প কিছুই করা হয়েছে। সেগুলোর আচরণ ও কাযকর্ম দেখে বাকিগুলো বানানো হবে। ওকে সেখান থেকে মাস তিনেকের জন্য একটা রোবট ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল কিন্তু যেহেতু ওর বাচ্চা এখন বেশ ছোট তাই আপাতত সে পরীক্ষামূলক কিছুই আনতে চাইছে না। আর মোমেনা আখতার তো একাই থাকেন, তাই তার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া। এতে করে তার ঘরের কাজে সাহায্য হল আর ফ্রি সার্ভিসটা নেওয়াও হল। প্রথম প্রথম তিনি রাসেলের এই প্রস্তাব একদমই পছন্দ করেন নি। কী বলে না করবেন তাও বুঝতে পারছিলেন না।

সেদিন বিকেলে কোম্পানির লোক এসে রবোটটিকে বাক্স থেকে বের করে সচল করে দেওয়ার পর তিনি আবিষ্কার করলেন তার সামনে দশ, এগার বছর বয়সী ছেলের উচ্চতার একটি যন্ত্রমানব দাঁড়িয়ে চোখ পিট পিট করার মত আলো জ্বালাচ্ছে। এবং তার তার চতুষ্কোণ ধাতব মুখটি এমন করে বানানো যে দেখে মনে হবে মৃদু হাসছে। ব্যাটারিচালিত খেলনা দেখে প্রথমবারের মতো যেভাবে কোন শিশু মুগ্ধ হয়ে যায় মোমেনা আখতারের অবস্থা তাই হল। কোম্পানি থেকে গোটা তিনেক লোক এসেছিল সবকিছু ঠিক করে দেওয়ার জন্য। এদের মাঝে একজন কমবয়সী ছেলে আঁতেলের মত মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল,

- ‘ম্যাডাম, সবকিছু চেক করা আছে। বারো ঘণ্টা পর পর চার্জ দিতে হবে। অসুবিধা হবার কথা না। আর কোন সমস্যা হলে আমাদের কে কল করবেন, কেমন? আর হ্যাঁ ওকে আসলে এখনও কোন ভয়েস ইনপুট দেওয়া হয় নি। আপনি কথা বললে সেটা সে তার সিস্টেম ফাংশন এর মাধ্যমে বুঝতে পারবে কিন্তু কথা বলে উত্তর দিতে পারবে না। আর প্রথম দুই সপ্তাহ খুব সহজ কিছু কমান্ড দিবেন। ও যখন যখন আপনার কমান্ড বুঝতে পারবে মাথায় হালকা নীল আলো জ্বলবে। আর ওর ওজন কিন্তু অনেক। প্রায় পঞ্চাশ কিলোর মত। তাই ধাক্কা যেন না খান সে ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন। চোখে পড়ার মত কিছু দেখলে নোট রাখবেন। রাসেল স্যার অবশ্য বলেই দিয়েছেন, আপনি বেশ ভালো করে আপডেট দিতে পারবেন আমাদের।‘

একনাগাড়ে এতগুলো কথা শুনে মোমেনা আখতারের সত্যি মস্তিষ্কে ধাঁধা লেগে গেলো। ঢোক গিলে তিনি বললেন, ‘অবশ্যই পারবো। আশা করছি। কিন্তু ওর নাম কী?’

- ‘ম্যাডাম, এই মডেলগুলোর আসলে আলাদা কোন নাম দেওয়া হয়নি শুধু কিছু সংখ্যা ধরে এদের আপডেট রাখা হয়। তবে আমাদের ডক্টর নেলসন বলে একজন আছেন তিনি ডাকেন ‘হ্যান্ডমেইড’। মানুষের হাতেই তো এরা তৈরি সে জন্য আর কি।‘

- ‘সেকি! এমন খটমটে ইংরেজি নামে নিয়মিত ডাকা যায় নাকি? না না, এসব আমি পারব না। এরচেয়ে বরং আমি নাম দিলাম ‘হেমন্ত’। সহজ, সুন্দর নাম। কেমন হল?’

কমবয়সী আঁতেল ছেলেটির মনে হয় নামটি বেশি পছন্দ হল না। সে দ্বিধান্বিতভাবে মাথা নেড়ে বেশ কিছু কাগজে সই নিয়ে আর একটি ক্যাটালগের মত পত্রিকা রেখে চলে গেল। মোমেনা আখতার আড়চোখে রোবটটিকে দেখে চুলায় চায়ের পানি বসাতে গেলেন। প্রাথমিকভাবে রোবটটিতে চার্জ দেওয়াই ছিল। সে ড্রয়িং রুম এর এক কোনায় নিজের সবুজ আলোর চোখ জ্বালিয়ে রেখে আসবাবপত্রের মত ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। মোমেনা আখতার ফিরে এসে গলা খাকরে বললেন, ‘ফলো মি’। কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল মনে হয় রোবটটির বুঝতে এরপর মাথায় হালকা নীলাভ আলো জ্বালিয়ে সে নীরবে তাকে অনুসরণ করতে থাকল। মোমেনা আখতার চা বানালেন, রান্নাঘরের কাপবোর্ড থেকে বিস্কুট নিলেন, বেডরুম থেকে ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার খাতা আনলেন এবং এরপর চা পান করতে করতে খাতা দেখতে শুরু করলেন। রোবটটি সারা ঘরময় ঘুরঘুর করতে থাকলো। দীর্ঘক্ষণ খাতা দেখে তিনি ক্যাটালগ পড়তে শুরু করলেন। এবং জানতে পারলেন রোবটটি বাংলা কমান্ড নিতে সক্ষম। তিনি তাই আগ্রহভরে রোবটটির দিকে তাকিয়ে কণ্ঠ তুলে বললেন, আজকে থেকে তোমার নাম আর ‘হ্যান্ডমেইড’ না বরং ‘হেমন্ত’ ঠিক আছে? হালকা নীলাভ আলোর রেশ এসে মিলিয়ে গেলো। মোমেনা আখতার কৌতূহল নিয়ে হেমন্তের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

হেমন্ত বাড়ির একটি সচল আসবাবে কিংবা সদস্যে পরিণত হল খুব দ্রুত। যদিও রাবেয়া তাকে একদম সহ্য করতে পারে না। প্রথমদিন সকালে এসে আতংকে সে পাড়ার সবাইকে ঘুম থেকে জাগিয়ে ফেলেছিল। পরে আস্তে আস্তে ধাতস্থ হয়েছে। তবে হেমন্তের সাথে একটা প্রতিযোগিতামূলক আচরণ করে সে। পাশের বাসার কবির সাহেবরা প্রথম কিছুদিন খুব আগ্রহ দেখিয়ে ঘুরঘুর করেছিলেন। তবে মোমেনা আখতার পাত্তা দেন নি বেশি তাই নানা কানাঘুষা চললেও কেউ বাসায় আসার সাহস পায় নি। এতসব কিছু বাদে হেমন্তর উপস্থিতি বাসায় খুব স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। সপ্তাহ দুয়েকের মাঝেই হেমন্ত নাসরিনকে স্কাইপে হাত তুলে ‘হ্যালো’ বলতে শিখে গেলো। ব্যাগ এগিয়ে দেওয়া, খাতা এনে দেওয়া, পানি দেওয়া, ফ্রিজে কিছু রাখাসহ টুকটাক সহজ কাজও শিখে গেলো। মোমেনা আখতার রোজ কাজ শেষে বাড়ি ফিরে আসার তাড়া অনুভব করা শুরু করলেন। বাইরে থেকে এসে দরজা খুললেই দেখতেন হেমন্ত দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। যেন তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। প্রতি রাতে ঘুমানোরর আগে তিনি হেমন্তের সাথে নিজের জীবনের নানা গল্প করা শুরু করলেন। এবং এক বিকেলে হেমন্তসহ একটা সেলফি তুলে ওবায়েদকে পর্যন্ত পাঠিয়ে ফেললেন। সেলফিটা অবশ্য খুব একটা ভালো হল না, ঝাপসা হল। তাও ভালোই এসেছিল দেখতে। ওবাদেয় কী বুঝলো কে জানে! তবে সে পরদিন থেকে গোলাপ ফুল আর ঝর্ণার জিএইএফ দেওয়া বন্ধ করে দিল। মোমেনা বেগম এক বিকেলে ফুরফুরে মেজাজে চা পান করতে করতে হেমন্তকে দুই লাইন গান গেয়েও শুনিয়ে ফেললেন। সুচিত্রা সেনের সিনেমার গান, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’। হেমন্তর তাতে কী হল তিনি বুঝতে পারলেন না! নীলাভ আলো জ্বালিয়ে সে ঘরের ভেতর থেকে আয়রন মেশিন আর টেবিল ল্যাম্প এনে ভেতরের নাটবল্টু খুলতে শুরু করল। এবং ক্যাবলে হাত, আঙুল পেঁচিয়ে একদম ভজঘট পাকিয়ে দিলো। মোমেনা আখতার সেই দৃশ্য দেখে মাথা গরম করতে চেয়েও পারলেন না। উলটা শব্দ করে হাসতে থাকলেন।

মাস দুয়েক হয়ে যাওয়ার পর তিনি বুঝতে পারলেন হেমন্তের উপর তার কেমন যেন মায়া পড়ে গিয়েছে। আর অল্প ক’টা দিন বাকি আছে বলে তিনি স্মৃতি হিসেবে নিয়মিত হেমন্তের সাথে ছবি তুলে রাখার শুরু করলেন। সকালের নাস্তায়, বিকেলের সময়ে, টিভি দেখার সময়, কিংবা পেপার পড়ার সময়। বিভিন্ন ক্যাপশনে ছবিগুলো আপ করতে থাকলেন উনার দ্বিতীয় প্রোফাইলে। তারপর একদিন কী মনে করে দুখানা বার্গার কিনলেন। একটি নিজের, আরেকটি হেমন্তের। তারপর প্রিন্সেস আমিরার মত ছবি তুললেন। ফেসবুকে দিলেন। নিজেকে তার তরুণী তরুণী মনে হল। হেমন্ত খেতে পারে না তো কী হয়েছে? সঙ্গ তো দিতে পারে। উনাকে তো আর একা একা আগের মত খাবার খেতে হয় না।

এদিকে ফেসবুকে মধ্যবয়স্কা এক নারীর সাথে রোবটের দৈনন্দিন জীবনের ছবি দেখে ফেসবুকে তোলপাড় হয়ে গেলো। বেশ কিছু সাংবাদিক মেসেজ দিলো। প্রচুর মানুষ সুচিত্রা আখতারকে ফলো করতে থাকলো। রোবটটির সাথে দেখা করতে চাইলো, সেলফি তুলতে চাইলো। অনেকে কিনতেও চাইলো। কেউ কেউ আবার জানতে চাইলো দেখার জন্য কত টাকার টিকেট কাটতে হবে? মোমেনা আখতার এমন অবস্থা এবং এত ম্যাসেজ দেখে হতভম্ব হয়ে গেলেন। একাউন্ট কীভাবে অচল করতে হয় তা তিনি জানেন না। তাই এতসব বিষয় এড়াতে ফেসবুকে যাওয়াই বন্ধ করে দিলেন। এছাড়াও কলেজে টার্ম পরীক্ষা শুরু হবে সামনে মিটিং, প্রশ্নপত্র তৈরি আর অন্যান্য কাজ নিয়ে ব্যস্ততা যাবে খুব। আপাতত তাই ফেসবুকে বাদ দেওয়াই উত্তম।

মোমেনা আখতার ঘুমানোর আগে হেমন্ত আজকাল মাথায় হাত রাখতে জানে। শীতল আর ধাতব একটা স্পর্শ তার কপালে এসে স্পর্শ করলে খুব শান্তি পান তিনি। মনে হয় পাশে কেউ আছে। সে বাবা-মা, স্বামী, সন্তান নয়। হয়ত শুধুই একটা যন্ত্র। তবুও তো কেউ। নাকি?

আর এক সপ্তাহ বাকি!

এক সকালে হুট করে চলে আসে রাসেল। অস্থিরভাবে কলিং বেল বাজাতে থাকে। দরজা খুলে ছেলেকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেন তিনি। কিন্তু তাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে রাসেল রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে, ‘এসব কী শুরু করেছ ফেসবুকে? লজ্জা করে না?’

বিমূঢ় হয়ে যান মোমেনা আখতার। রান্নাঘর থেকে ঘুরে ঘুরে রাসেলের সামনে এসে হাজির হয় হেমন্ত। রাসেল হাতের ব্যাগটা ধপ করে মাটিতে রাখে। তারপর দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে স্টিলের চেয়ার ছুঁড়ে মারে হেমন্তের দিকে। চিৎকার করতে করতে বলে, ‘আমার মা, ফেইক একাউন্ট চালায়। রোবটের সাথে সেলফি দেয়, সেলিব্রিটি হয়। কী করে কী না করে। কোন সেন্স নেই। বয়সের সাথে সাথে বুদ্ধি কমে যাচ্ছে। ‘প্রেসটিজ পাংচার’ করছে আমার আর পরিবারের সবার। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। নানা মানুষ স্ক্রীনশট দিচ্ছে আমাকে। ছিঃ আমারই ভুল। এই কুত্তার বাচ্চাটাকে আসলে আনাই উচিৎ হয় নি। আমি আর কথা বাড়াতে চাই নাই, মা, ওকে এই মুহূর্তে বের করে দিতে হবে। এই মুহূর্তে।‘

এটুকু বলেই রাসেল ছুটে গিয়ে হেমন্তের মাথার পেছন থেকে ‘মেমরি চিপ’ টা একটানে খুলে নেয়। একটা মৃদু যান্ত্রিক শব্দ করে দাঁড়িয়ে যায় হেমন্ত।


ঘণ্টা দুয়েকের মাঝে দুজন লোক এসে যখন হেমন্ত কে নিয়ে যাচ্ছিলো মোমেনা আখতার তার কিছুক্ষণ আগে দ্বিতীয় একাউন্টে গিয়ে দেখলেন ফেসবুক জানাচ্ছে উনার ফলোয়ার প্রায় বিশ হাজার হয়ে গিয়েছে। যদিও উনি জানেন না ফলোয়ার বিষয়টার লাভ আসলে কী! চলে যাওয়ার আগে উনি বারদুয়েক হেমন্তকে ডেকেছিলেন। হেমন্ত সাড়া দেয় নি। স্মৃতি হারিয়ে সে এখন শুধুই একটি যন্ত্রমাত্র।

এদিকে রাসেল ষাঁড়ের মতো চেঁচিয়ে কার কার সাথে যেন ফোনে কথা বলে যাচ্ছে। সন্তানের শাসন কিংবা দুর্ব্যবহার কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারলো না, বরং স্মৃতি হারানো এক যন্ত্রমানবের জন্য তিনি আড়ালে চোখ মুছলেন। যেন এটি খুব বিশাল কোন ব্যাপার!