রাত্রিরা অন্ধকার, ভোরেরা অবসন্ন, তবু আসন্ন

সুবন্ত যায়েদ



ঈষাণকোণে ভীষণ মেঘ। গুমোট ফিসফিসানি পুরো নগরে ও গ্রামে। এটা ফাল্গুন, নাকি গ্রীষ্ম, মনের ভেতরে কুয়াশার মতো কানাকানি। আর সেই তরুণ বয়েসের উদ্দাম প্রেমের দিনগুলোতে কী যেনো একটা গান, সাজানো ফুলের বনে ঝড়। হাসিবের বুড়ো দাদা বলে, বোশেখ নাকি এসে গেছে। সন্ধ্যার গোমড়া মেঘের অনুসরণে তার নাকে লাগে বাপের আমলের গেরস্থলি ঘ্রাণ। তখন বুকের ভেতরে ঝড়ের মতো বেগে হু হু হাওয়া আসে। তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় নাকি টালমাটাল করে। সে টের পায় পেছন দিকে বাঁকানো একটা তীর যেটা ধুকপুকানো কলিজার খুব কাছে বিঁধে আছে। একটা পুরনো রক্তের ধারা, শুকনো, সেখানে আবার নতুন রক্ত গড়িয়ে আসে। আর সেও কি ততোটাই ব্যাথা নিয়ে আসে না গড়িয়ে! একটা সমাজ থেকে, একসার লালচোখ মানুষের দৃষ্টি থেকে। পেছনে পাথরের মতো ঠোকাঠুকি করে পূর্বপুরুষ, উত্তরপুরুষ। সে দেখে তাদের দশঘরের সমান্তরাল একটা উঠোন হঠাৎ অসমান্তরালের খেতাব পেয়ে গেছে। রোদের সকাল কিংবা জোসনাভরা রাত ছাড়া যে উঠোন চেনা যায় না, সে উঠোনে ইচ্ছের মতো রঙ নিয়ে রোদ এলো বটে, এলানো চাঁদ সমস্ত জোসনা ঢেলে দিলো, কিন্তু তাদের উঠোনখানা আর সমান্তরাল নয়। তাই জোসনা রোদ মুখ থুবড়ে থাকলো সমুদ্রের মতো, উঁচু-নীচু ঢেউ ঢেউ। তাই ফুলের মতো শিশুরা রোদ ও জোসনার উঠোনে এসে ছোঁয়াছুঁয়ি খেললো না। তারা বের হয়ে এলো আগুনের মতো এক সন্ধ্যায়, ছোটো ছোটো মুখে, কিন্তু তাদের চোখের পাঁপড়ি নামছিলো না উঠছিলো না। তারা বললো আমরা আর শিশু নাই, এখন আমরা আর রোদ জোসনা চাই না। আমরা এখন আগুন নিয়ে খেলতে পারি, বন্দুকে কার্তুজ পুরে নিশানা তাক করতে পারি।

তারপর, হীমের ঘরে ঢুকে গেলো রোদ, রাতের মায়া জোসনা, আর টুকরো কিছু প্রাণ। কিন্তু উঠোনে শিশুরা আর ফিরে এলো না বড়োত্বের দাবি ছেড়ে। কারণ সমান্তরালে আর ফিরলো না তাদের প্রশস্ত উঠোনখানা। সেখানে কফিনের চেরাই কাঠের স্তুপের ভেতরে মৃতের আত্মারা সুখদুঃখ পার্ক বানালো। আর শিশুর মতো দেখতে বড়োদের বন্দুকের নিশানা আরো সুক্ষ হলে দাউদাউ আগুন জ্বলে উঠলো প্রশস্ত উঠোনজুড়ে। তখন দশ ঘরের ত্রিশটি জানালা খুলে গেলো আর্তচিৎকারে। হাসিবের বুড়ো দাদা কয়, নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না।


কিন্তু দুটি গোপন চোখে রাখালিয়া সূর। অনেক দূর থেকে ভেসে আসে। মিলিয়ে যায় কখনো কাশবন আর মেঘের সাদার মতোন। আর দুয়েকটি বাতাস ঠোঁটে করে বয়ে আনে সমান্তরাল ভোর। তখন রাখালিয়া সূর উদাসী এক দুপুরের কথা বলে। কিন্তু দুপুর আসে না ভোরের মতো পথ ধরে। আর আসে না আলোর মতো রাত, যে রাত সমান্তরাল এক উঠোনে সমর্পন করলে জোসনা নামে। কিন্তু নামবে না কি আর? আসবে না কি সমান্তরাল সেই ভোর! এই পৃথিবী নাকি একবার শুধু তারে পায়, কেনো পায় নাকো আর! হৃদয়ে তো আকাঙ্খা ভরপুর, ভাঙ্গনে তাই মৃতের মতো ধূসর অধিকার করে। যদিও বসন্ত আসে, সবুজ কোলাহল দেখার আকাঙ্খায় চোখ মেলতেই ফুরায়ে যায়। আর জীবনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে নিদারুণ এক দহনকাল। তখন সবুজ গাছের বীজ বুনে বৃষ্টির প্রার্থনায় নত হয় প্রাণ, কিন্তু চরাচরজুড়ে শুধু আগুন, পুড়িয়ে দেয়। হাসিবের বুড়ো দাদার মতো তখন বুঝি গান ওঠে আরো কয়েকটি কণ্ঠে- এ জীবন ছাড়িয়ে যাই...। কিন্তু জীবন ছাড়িয়ে কোথায় আর যাওয়া যায়, চরাচরজুড়ে শুধু দহন।


তখন একটি দুটি করে মেঘের মতো পুঞ্জিভূত বাসনা এসে জড়ো হয়। তবে ঝড়ের মেঘ উঠে আসুক, আর পৃথিবীব্যাপিয়া একটি চিৎকার করে পৃথিবীর উপরে ভেঙ্গে পড়–ক। তাতে দহনকাল যদি ফুরায়, আমি বসন্তেই যাবো, এই বলে জেগে উঠবে শীতার্ত এই পৃথিবী। কিন্তু ঝড়ের মেঘ যদি বাউণ্ডুলে বাতাসে উড়ে যায়, কোমল প্রাণ থেকেই উৎপাদিত হোক পৃথিবীব্যাপিয়া শতো কোটি চিৎকার, সেটা জেনেও যে, এই পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।