দহন-আজ

অনিন্দ্য রায়




সকাল থেকে বৃষ্টি, ছাড়ছেই না ।
সেই যে ঘর থেকে বেরিয়েছে, সরোজ আর ফিরতেই পারছে না । অল্প দূরে মোলগাছের তলায় দাঁড়িয়ে, কতটুকুই বা আড়াল, ভিজছে । আজ রোববার, ইস্কুল ছুটি । ছাগল নিয়ে বেরিয়েছিল সকালে কিচ্ছুটি না খেয়েই। তারা সব জলের ঝাপট দেখে ফিরে গেছে, ওই তো দেখা যাছে তাদের বাড়ি, ছাগলগুলো বাঁচতে উঠে পড়েছে ধাড়িতে।
পেট চোঁ চোঁ করছে সরোজের, দুয়েকবার জিভ বের করে আকাশের জলই খাচ্ছে সে, তাতে ভুখ কাটে না, পেট দুখায় ।
ঘরে তার বুড়িমা আছে, বাপের মা, একা । বাপ-মা-দিদি গেছে পুবে । আসার দিন তো হয়ে গেল, কিন্তু যা বৃষ্টি কদিন, কে জানে আসবে কবে!
ঘরে নাই কিছু, হাঁড়িতে সামান্য চাল ।
তবু খিদে পায়, কটা বাজল কে জানে, সূর্য নাই। ইস্কুল থাকলে তিনি-চার ক্লাস তো হয়েই যেত ।
সে জামাটা খুলে নিয়ে মাথায় বাঁধে, তারপর ছুটতে থাকে ঘরের দিকে।
হাঁপাতে হাঁপাতে বাখুলে ঢোকে। জলে সব থইথই ।
‘খ্যাতে দাও’ চিল্লায় ।
‘চুলাটো ধরাবো কই ? কাঠপালা সব ভিজা” বলে বুড়ি , চোখে দেখে না কিছুই, সাদা সুতার মতো চুল, হাতড়ে হাতড়ে ঠ্যাঙা হাতে ঘোরে আর কাশে খনখন ।
‘সে আমি নাই মানি’ বলে সে মাথা থেকে জামা খোলে, নিঙড়ায়; প্যান্ট খোলে নিঙড়ায় । ক্লাস এইট, উন্মুক্ত কৈশোর, পোষা চন্দনার খাঁচার দিকে এগিয়ে যায় । শিস দেয়, পাখিটিও প্রতিধ্বনি করে। সরোজ খিলখিল হাসে । লাফ দেয়, ছৌয়ের মতো লাফিয়ে ঘুরে যায়, হাঁটু মুড়ে পড়ে মাটিতে।
দেখে বুড়ি উনুন ধরাচ্ছে ।
সে শিউরে ওঠে, ‘ হুইইই’ লাফায়, বুড়ির সামনে গিয়ে পড়ে ।
দেখে জ্বালানি না পেয়ে বুড়ি তার বই থেকে পাতা ছিঁড়ে আগুন জ্বালিয়েছে । বুড়ির হাত থেকে সে ছোঁ মেরে কেড়ে নেয় ‘আমাদের পরিবেশ’, তার ভূগোল বই। দেখে ততক্ষণে বই থেকে ছেঁড়া ভারতের মানচিত্র পুড়ছে ।
আর ইতিহাস, ‘অতীত ও ঐতিহ্য’ এর মধ্যেই ছাই ।
সে ফোঁপায়, তেরো বছরের খিদে কাঁদে, কী কী যে দাহ হয়ে গেল কানা-বুড়িটা বোঝে না।