আদম ঘরামীর ঘর

গাজী তানজিয়া



মৃত্যু আর মাছরাঙা ঝিলমিল পৃথিবীর বুকের ভিতরে
চারিদিকে রক্ত ঋণ গ্লানি ধ্বংসকীট নড়েচড়ে।...
আলো আছে তবুও- আলোয় ভরে রয়েছে অন্ধকার।

- জীবনানন্দ দাশ।

এইখানে গোর দিয়া দিলি!
এইখানে দিমু না তো নিমু কই? ওর আত্মার শান্তির একটা ব্যাপার আছে না! বলে খ্যাক খ্যাক করে হেসে ওঠে তিন নম্বর আততায়ী।
বারবার নিষেধ করা সত্বেও কেবল বাঁশ-খুটি লইয়া ঘর বানতে আহে। অর বাপের জায়গা পাইছে; শালা! নে- এইবার জন্মের মতো ঘর বানাইয়া থাক এইহানে।
পুড়ে খরখরে হয়ে যাওয়া মাটিতে কোদালের কোপ বসাতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল বাকী আততায়ীদের।
মাটি তো না, যেন তামা হইয়া গেছে! কতক্ষণ ধইরা পুড়ছে এই মাটি, কত ঘন্টা? ফায়ার ব্রিগেড আসছিল না?
না আইসা যাবে কই! সবই আহে, কিন্তু কিচ্ছু থাকে না।
‘ব্যাডা আদম!’
দ্বিতীয় আততায়ীর বলার ভঙ্গিতে একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়তে পড়তে উবে যায়। এইমাত্র যাকে গলা টিপে হত্যা করেছে, তার প্রতি কোনো বিদ্বেষ, ক্রোধ, হিংস্রতা না থাকতে পারে তবে অনুকম্পা থাকা একেবারেই চলে না। তারপরও কোথায় যেন বুকের ভেতরটা টন টন করে ওঠে। কোথায় যেন মিল এই লোকটার সাথে তার! এই যে একটা প্রতিকূল পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য লোকটার নিরন্তর একটা প্রচেষ্টা ছিল। মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সে এই ইচ্ছেটাকে লড়াইয়ের কেন্দ্রে নিয়ে গিয়েছিল। গোয়ার লোকটার সেই টিকে থাকার নিরর্থক বোকামীর প্রতি এটা নিছক একটা তাচ্ছিল্য বাক্য ছিল না। এই বাক্য উচ্চারণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় আততায়ী তার নিজের জীবনে টিকে থাকার জন্য করা কদর্য ক্লেদ মিশিয়ে দিয়েছিল।
এবার আমরা সদ্য হত আদম ঘরামীর পরিচয়টা জেনে নিই! আদম ঘরামীর বয়স ত্রিশ, স্বাস্থ্য ভাল, পেশা ঘর বানানো, নির্বাচন এলে ভোট দেয়। গত সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে যায় নাই। যদিও ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য এক ধরণের চাপ ছিল, তারপরও যায় নাই।
নির্বাচন নিয়ে তার মোহ কেটে গেছে সোলেমান ঘরামীর মেম্বার হওয়ার পর থেকে। সোলেমান ঘরামী জ্ঞাতি সূত্রে তার চাচা হইলেও যাওয়া-আসার রেসালা তেমন ছিল না। আদমের বাবা-মা নাই। মানুষ হইছে মামার বাড়ি, তার এইসব যোগাযোগ থাকার কথাও না। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে সোলেমান ঘরামী দাঁড়য়ে যাওয়ার পর জ্ঞাতি আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ পড়ে।
আদম তো এমনিতেই হুজুগে পাগল, তার উপরে তার জাত-গোষ্ঠির একজন ইলেকশানে দাঁড়ায়ে গেছে। এমন ঘটনা সে এর আগে কখনো ঘটতে দেখে নাই। খুশিতে, উত্তেজনায় তার লাফালাফি দেখে কে! সমাজের নেতা-খ্যাতা উচু উচু মানুষ যারা এসব পদে থাকে তাদের তো চাইলেই ছোঁয়া যায় না, সেদিক দিয়া সোলেমান চাচা তো ঘরের মানুষ। না হয় তার ছেলে মিডলইস্টে পাড়ি জমাইয়া কিছু টাকা বানাইছে। না হয় সোলেমান চাচা পাওয়ার পার্টিতে নাম লেখাইছে; তারপরও তো সে তাদের একজন! আদম তার জান-প্রাণ লড়ায়ে দিছিল সোলেমান চাচারে নির্বাচনে জিতাবার জন্য। সোলেমান চাচা নির্বাচনে জিতাও গেছে কিন্তু আদমের মতো লোকেরা- যাদের রাজনৈতিক পরিচয় নাই, সামাজিক অবস্থান নাই, তারা ওই একদিনের পিঠ চাপড়ানির পর দূর থেকে দূরে সরে যেতে লাগল। আর সোলেমানের কাছে টাকা ঢালার কৃতিত্ব, ক্ষমতার ব্যবহারের কৃতিত্ব, প্রতিপক্ষ ভোটারদের ভয়-ভীতি দেখানোর কৃতিত্বগুলোই বড় হয়ে দেখা দিল। জনগণও দূরকে দূর।
আদমের হিসাব-নিকাশের মধ্যে এসব ছিল না। সে যত সরল হিসাবের মধ্যে যেতে চাইল ফলাফল ততই গোলমাল পাকিয়ে যেতে লাগল। গুণ-ভাগের বিভাজন প্রকট হয়ে দেখা দিল। তাই সে যখন তার এই দূর সম্পর্কের সোলেমান চাচার দুর্ব্যবহারে প্রায় মুষড়ে পড়েছিল, তখন তার সবচেয়ে কাছে চলে আসে সোলেমানের মেঝ মেয়ে মনিরা।
ওই নির্বাচনের প্রচার প্রচারণা চালাতে গিয়েই আদম আর মনিরার সম্পর্ক গাঢ় হয়। না হওয়ার কোনো কারণও ছিল না। আদম দেখতে সুন্দর, অনেকটা ফিল্মের হিরোর মতো, আপন ভোলা, স্বভাবে গোয়ার, ভালো মানুষ। এতোটা কাল কাঠ-খুটি-টিন-পেরেকের মধ্যে কাটয়ে দিলেও, মানুষটার ভালোবাসার ক্ষমতা আছে। মনিরার যে বয়স, সেই বয়সে মানুষের চোখে এই গুলাই গুণ।
কিন্তু সদ্য মেম্বার হওয়া সোলেমানের কাছে তা গুণ হতে যাবে কোন দুঃখে! তার কাছে আদম চাল-চুলোহীন ভাদাইম্যা। এরে পাত্তা না দেয়াই দস্তুর।
তাই মনিরাকে পাওয়ার সাধ স্বপ্নে আদমের মনে আসা-যাওয়া করলেও সে মুখে কখনো সেভাবে প্রকাশ করে নাই। কিন্তু বাস্তবে মনিরা ক্ষেপে উঠেছিল আদমকে পাওয়ার জন্য। মনিরার সাধাসিধা মা এর মধ্যে কোনো দোষ খুঁজে না পেলেও বাপ তা মানবে কেন?
শোনামাত্র আদম গ্রামছাড়া। কিন্তু আদমের ভালোবাসা তো গ্রামছাড়া হয় নাই। ওই ভালোবাসার টান তাকে আর মনিরাকে এক করলেও, আদম আর গ্রামে ফিরতে পারে নাই। ক্ষমতার সাথে পেরে উঠে তার সাধ্য কি!


অগত্যা সে পাড়ি জমায় রাজধানী শহরের দিকে। সে শুনেছে সব ঘর হারার ঘর নাকি সেখানে গেলে জোটে। ঘরামী তো জানে না, এখানে ফুটপাতে কত মানুষের দিন কাটে!
পেশায় ঘরামীর রাজধানী শহরে কি-ইবা কাজ থাকতে পারে! তারপরও তার কপাল ভালো। এক সময় একসাথে কাজ করত আবুলের ভাইর সাথে, সেই আবুল ভাই শহরে ফার্নিচারের কারখানায় কাজ করে। আবুল ভাই-ই তাকে কাজ জুটিয়ে দেয় সেখানে। আর আস্তানা বাতলে দেয়, ঝিঙ্গাবাড়ি বস্তি।
সেখানে আকাশ নাই, বাতাস নাই, হত-পা ছড়ানোর জায়গাটুকু পর্যন্ত নাই। সদ্য গ্রাম ছাড়া মানুষের হাসফাঁস অবস্থা হয় এমন জায়গায় এসে পড়লে। কিন্তু মনিরা তার সখের ঘর বাঁধার স্বপ্নে এইসব অস্বস্তি আমলেই ন্য়ে না। ঘর এক আশ্চর্য মোহ মানুষের কাছে। সেই মোহ আর সুখের ঘোর কাটতে যে সময় লাগে, সেই সময় পার হওয়ার আগেই আসে মনিরার মাতৃত্বের সংবাদ। পিতা-মাতাহীন আদম আর ঘরছাড়া মনিরা যেন সুখের সাগরে ভাসতে থাকে। স্বপ্ন দেখে সব হারানো সম্পর্ক ফিরে পাওয়ার। এই অনাগত প্রাণটাই যেন ঘুচিয়ে দেবে তাদের বাকি সব অপূর্ণতা!
আদম মনিরার চুলে আঙ্গুল চালাতে চালাতে বলে, ‘এইবার আমরা দ্যাশে ফিরমু। তোমার জন্য ঘর বানামু মনিরা বেগম, ঘর। সারা জীবন মাইনষের জন্য ঘর বানাইলাম, আর আমার নিজের ঘর বানামু না! আমারে আর কেউ দমাইয়া রাখতে পারবে না। শুধু আমাদের সোনা দুনিয়ায় আসুক, দেইখো’! আদম যেন পায়ের নিচে মাটির দিশা পায়। যে ঘর বানানো ছিল তার ধ্যন-জ্ঞান, সেই ঘর যেন টিন-কাঠ সমেত তার সামনে এসে দাঁড়ায়! তার মেরুদ- বেয়ে এক গরম রক্তস্রােত উথলে ওঠে। আর মাত্র কয়েকটা দিন।
মনিরার মাতৃত্বের সংবাদে ঘর লাগোয়া প্রতিবেশি আবুলের বৌ রাবেয়া হয়ে ওঠে সবচেয়ে কাছের মানুষ। সেই কাছের মানুষ, পাশের মানুষটাই একদিন সতর্ক করে মনিরাকে, ‘খেয়াল রাইখো ভাই, সময়টা ভালা না, চৈত্র মাস আসতাছে, পোয়াতি মানুষ, বস্তিঘর, খুব খেয়াল- খুব খেয়াল’!
চৈত্র যেন বস্তিগুলোর জন্য এক কঠিন সময়। ঘিঞ্জি ঘর, খরো হাওয়া, সামান্য অসাবধানতায়, আগুনের এক ফুল্কিতে সব নিঃশে^স!
মনিরাকে নিয়ে আদমেরও দুঃশ্চিন্তা বাড়ে। কিন্তু এখান থেকে সরিয়ে কোথায় রাখবে সে মনিরাকে! তার যে তিনকূলে কেউ নাই! চৈত্রের ষড়যন্ত্র তো আদমের অজানা না। এর সাথে মিশানো রাজনীতির হালচাল সে অনেকটাই বুঝে গেছে। উন্নয়ন, পাতাল রেল, মাল্টিস্টোরেড বিল্ডিং- বাতাসে ফিসফিসানি শোনে সে প্রায়ই।
মনিরা সাবধান ছিল, সাবধান ছিল আদমও কিন্তু চৈত্রের রহস্যময় হাওয়া সাবধান ছিল না। আগুণ তার সর্বগ্রাসী রূপ ধরে চৈত্রের আগেই হানা দিল।
খবর পেয়ে কারখানা থেকে ছুটে আসে আদম। অনেক কষ্টে সংজ্ঞাহীন মনিরাকে খুঁজে পেেেলও ঘর খুঁজে পায় না। একটা বিশাল ধ্বংসস্তুপের সামনে আহাজারি করতে থাকা মানুষগুলোকে তার মানুষ মনে হয় না তখন। আদমের মনে সন্দেহ হয়, আসলেই কি এরা মানুষ ছিল কখনো! নাকি আগাগোড়াই সুতোয় টানা নাচের পুতুল!


হাতে চারশো টাকা নিয়ে স্থানুর মতো বসে থাকে আদম ঘরামী। এই মাত্র তার হাতে পড়েছে এই টাকাটা। সাথে সিল সাপ্পর সই সাবুদও কম লাগে ন্ইা! পাশের ঘরের আপন মানুষটার উঠতি বয়সের ছটফটানো ছেলেটা বলে ওঠে, ‘হুনছি, প্লেনে উইঠ্যা মরলে ক্ষেতিপূরণ দেয় কোটি ট্যাকা, ঘর পুড়লে- এই! আর লঞ্চে ডুইব্যা মরলে কত’?
আদম জানে না, তার ওইসব জানার দরকারও নাই। তার এখন একমাত্র জানার দরকার পোড়া ঘর আবার কখন উঠবে? পোয়াতি বৌ’র দুই পা যেন এক বিঘত দড়ি দিয়া বান্ধা। ব্যথার কারণে পা বাড়াইতে পারে না। তার ফ্যাকসে মুখ আর সাদাটে ঠোট আদমের ভেতরটা ওলট-পালট করে দেয়। স্বাস্থ্যকর্মী বলেছিল, বৌ নাকি তার রক্তশূন্য! ডেলিভারির আগে রক্ত দেয়া লাগতে পারে। এরকম একটা মানুষরে সে এখন কোথায় রাখে!
এক একটা দিন যেন এক একটা বছরের মতো লম্বা মনে হয় তার কাছে। একদিন যায়, দুদিন যায়, আদম দিশাহারার মতো এরে জিগায় তারে জিগায়, ‘ঘর কবে উঠবে ভাই? কবে উঠবে ঘর’!
বাতাসে রব উঠে, মালিক জানে। কবে উঠবে! সরকারের জমি লিজ নিছে সে, সে ছাড়া আর জানবে কে? উঠবে কি কোনোদিন আর ঘর!
কেমন যেন ঘোর লাগা সব শব্দ। হ্যাঁ আর না এর তফাত বেড়ে বেড়ে দীর্ঘ হয়। ‘কি জানি! ক্যাডা কইতে পারে!’ ঘুরে ফিরে এরাই তার কানের ভেতর ছেড়া টেপ রেকর্ডের মতো বাজতে থাকে। মাথার মধ্যে দ্রিম দ্রিম দ্রিম! আদম কিছু শুনতে পায় না। কে যেন তার ভিতরে ক্রমাগত তাড়া দিতে থাকে-’ যা আদম, পোড়া শশ্মানে ঘর তোল। বৌরে বাঁচা।’
ঘর তোলার নেশা তাকে চুম্বকের মতো টানতে থাকে। একটা উপায়হীন লোহার মতো সে ছোটে, ছুটে চলে সেই প্রচণ্ড তাগিদের দিকে। ছুট, ছুট, ছুট! একদিন, দুদিন... প্রতিবারের বাধা তাকে আরো দুর্দমনীয় করে তোলে। তার শরীরের আঘাতের চি‎হ্নগুলো বেড়ে বেড়ে সে যেন এক অচেনা মানুষ হয়ে ওঠে। এভাবে ছুটতে ছুটতে সে কৃষ্ণ গহ্বর পর্যন্ত পৌছে যায়! এক সময় তার আর দেখা মেলে না। দেখা মেলেই বা কার!