ব্লান্ডার – ব্লান্ডার !

সঞ্চারী গোস্বামী

কথায় বলে ভুল মানুষমাত্রেই হয় । হক কথা , হতেই পারে । কিন্তু তা বলে আইনস্টাইন ! এ তো প্রায় ভগবানের ভুলের সামিল ! হয়েছিল , এমনটাই হয়েছিল । এবং তাও ঘটেছিল তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘ General Theory of Relativity ’ - র ক্ষেত্রে । ভুল একটিমাত্র ধ্রুবক রাশিকে কেন্দ্র করে । তার পোষাকি নাম ‘ Cosmological constant ’ , ডাকনাম Λ ( ল্যাম্‌ডা ) ।

১৯১৬ সাল । সদ্য প্রকাশিত হয়েছে আইনস্টাইনের ‘ General Theory of Relativity ’ । এর আগে
১৯০৫ - এ প্রকাশিত ও সমাদৃত হয়েছে তাঁর ‘ Special Theory of Relativity ’ । ‘ General Theory of Relativity ’ তারই এক সাধারণীকৃত রূপ ।

ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে । একটু বুঝিয়ে বলা যাক । ধরুন , একটা চাদরের চারকোণ ধরে চারজনে টানটান করে মেলে ধরল । এবার যদি একটা ভারি লোহার বল ওই চাদরের উপর ফেলি - কি হবে ? আপনি বলবেন , এ আর এমন কি শক্ত কথা ! ভারি বলটা যেখানে পড়বে , সেখানে চাদরটা ঝুলে যাবে । ঠিক তাই । এবার ওই চাদরটাকে যদি ‘ Space – Time ’ হিসাবে ধরা যায় , তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে , ভর ও শক্তির প্রভাবে কিভাবে বেঁকেচুরে , দুমড়েমুচড়ে যায় ‘ Space – Time ’ । আরো ভাবুন , এবারে যদি চাদরের প্রান্তের দিক থেকে ছাড়া হয় একটা অপেক্ষাকৃত হালকা বল , তাহলে দেখবেন সেটা ভারি বলটার চারপাশে কেমন ঘুরছে , ঠিক যেমন পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘোরে আর কি ! ঠিক এভাবেই বেঁকেচুরে যাওয়া ‘ Space – Time ’ - ই ঠিক করে দেয় ভর ও শক্তি কেমন করে যাতায়াত করবে সেই ‘ Space – Time ’ – এ । এভাবেই স্থির হয় পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরবে কিনা আর আলো ( যা কিনা শক্তির একটি রূপ ) ভারি মহাজাগতিক বস্তুর কাছ দিয়ে যাবার সময় কিভাবে বেঁকে যাবে । এভাবে ‘ General Theory of Relativity ’ - র মাধ্যমে আইনস্টাইন দেখতে চাইলেন কেমন করে বিবর্তিত হয়েছে এই মহাজগৎ । সেটা ১৯১৭ সাল ।

আইনস্টাইন বিশ্বাস করতেন যে মহাবিশ্বের আয়তন ধ্রুব , তার কোনো পরিবর্তন নেই । আপনি অবশ্য এখন জানেন , এটা ভুল । কিন্তু এটা আইনস্টাইনের মত বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী জানতেন না , তাই আবার হয় নাকি ! আজ্ঞে হ্যাঁ , সেটাই হয়েছিল । খেয়াল রাখবেন , সেই সময়েও জানা ছিল , আমরা যে ছায়াপথের বাসিন্দা , অর্থাৎ আকাশগঙ্গা , তার বাইরে আর কোথাও কিছু নেই । এটা ভুল প্রমাণিত হতে লাগবে আরো ৭ বছর ।
এ মহাবিশ্বের কোথায় কি আছে না জানা থাকলে তো মহাবিশ্বকে চেনাই হবে না ! তাই আইনস্টাইনও তখনো পুরোপুরি চিনে উঠতে পারেননি বিশ্বকে । সেই বিশ্বে মহাকর্ষ সর্বত্র বিরাজমান ; মহাকর্ষের জন্য প্রতিটি ভরযুক্ত বস্তুকণাই পরস্পর পরস্পরকে আকর্ষণ করছে সবসময় । এ কথা তো নিউটন বলেছেন বহু আগেই । তাই যদি হয় তাহলে তো নিজেদের মধ্যে আকর্ষণে বস্তুকণাগুলো পরস্পরের ঘাড়ে পড়ে মহাবিশ্বই লণ্ডভণ্ড হয়ে
যেত । তা তো হতে পারে না ! তাহলে ? ভাবতে শুরু করলেন আইনস্টাইন এবং বলা বাহুল্য সমস্যার সমাধানের পথও বের করে ফেললেন – তাঁর ‘ General Theory of Relativity ’ - তে একটি নতুন রাশি যোগ করে কিংবা বলা ভালো গুঁজে দিয়ে । আইনস্টাইনের ব্যবহার করা এই নতুন রাশিটি বেশ মজার , খানিকটা ‘ ঋণাত্মক মহাকর্ষ ’ বলা যায় একে , অর্থাৎ এর উপস্থিতির কারণে মহাজাগতিক বস্তুরা পরস্পর পরস্পরকে বিকর্ষণ করে । এতে সুবিধা হল এটাই যে , এই বল মহাকর্ষ বলের ঠিক উল্টো ; ফলত , বস্তুকণাদের পরস্পরের ঘাড়ে পড়ে যাওয়া থেকে আটকায় । এই ঋণাত্মক মহাকর্ষ বা ‘ Cosmological term ’ - এর শক্তির পরিমাপক ওই ‘ Cosmological constant ’ ।

কিন্তু এক্ষেত্রে কতগুলো সমস্যা ছিল । এর আগে Cosmological term – এর উপস্থিতি ছাড়াই General Relativity দিয়ে ব্যাখ্যা করা গেছে বেশ কিছু মহাজাগতিক ঘটনা । এর মধ্যে উল্লেখ্য প্রতিবার সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে আসার পর বুধ গ্রহের কক্ষপথের সামান্য পরিবর্তন । এখন একটা নতুন রাশি সেই থিওরিতে ঢুকে পড়লে সে ব্যাখ্যা আর ধোপে টিকবে কি? আইনস্টাইন নিজেও সেটা জানতেন । তাই তিনি তাঁর তত্ত্বটাকেই এমনভাবে পরিমার্জন করলেন যাতে ওই ‘ Cosmological term ’ -টি থাকলেও বাকি সব ব্যাখ্যা আগের মতই করা যায় । একটু তলিয়ে বলতে গেলে বলতে হয় , এই বিকর্ষণ তথা ঋণাত্মক মহাকর্ষ এমনই যে সৌরপরিবারের ক্ষুদ্র গণ্ডীতে একে ঠিক বোঝা যাবে না , বোঝা যাবে আরো অনেক অনেক বেশি দূরত্বে। ব্যাস! তবে আর কি ! আর কোনো সমস্যা রইল না ।

তবে ওই যে প্রথমেই বললাম , ভগবানের, থুড়ি আইনস্টাইনেরও ভুল হয় ! কিরকম ভুল ? সেটা অবশ্য খুব সহজেই বোঝানো যেতে পারে । ‘ ঋণাত্মক মহাকর্ষ ’ দূরত্বের সাথে বাড়ে আর মহাকর্ষ কমে । তাহলে আইনস্টাইনের অজর – অমর - অক্ষয় আয়তনের বিশ্বে এই দু ’ রকম মহাকর্ষীয় বলের পরস্পরকে ঠেকিয়ে রাখার কথা । যেন ‘ টাগ – অফ – ওয়ার ’ খেলায় দুপ্রান্তে প্রতিপক্ষ হচ্ছে সমান পালোয়ান। কিন্তু কোনো কারণে যদি দুটি বস্তুর পারস্পরিক দূরত্ব কিছুটা বাড়ে তাহলে কি ঘটবে ? মহাকর্ষ বল যাবে কমে । আর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত উপরি লাভ হবে - ‘ ঋণাত্মক মহাকর্ষ ’ অর্থাৎ বিকর্ষণ বলটি যাবে বেড়ে । এর ফলে বস্তু দুটি পরস্পরের থেকে আরো দূরে সরে যাবে। তাতে আরো কমবে আকর্ষণ, বাড়বে বিকর্ষণ। তাই বস্তুদুটি ক্রমশ পরস্পরের থেকে দূরে যেতে থাকবে । তাহলে যে আইনস্টাইনের স্থির আয়তনের বিশ্বের ভাবনা নিয়ে ভারি সমস্যা হয়ে যাবে ! কিন্তু দুঃখের বিষয় এ দিকটায় সে সময় অন্য কেউ আলোকপাত করেননি ।

প্রথম বিরোধিতাটা আইনস্টাইন পেয়েছিলেন তাঁরই এক বন্ধু ও সহকর্মীর কাছ থেকে । সেটা ১৯১৭ – তেই । সে ভদ্রলোকের নাম উইলিয়াম ডে সিটার । ইনি আবার বেশ অঙ্ক-কষিয়ে লোক । প্রথম থেকেই Cosmological term – এর বিষয়ে এনার বেশ আপত্তি ছিল। কারণ General Relativity–র সমীকরণ থেকে কিছুতেই বের করা যাচ্ছিল না এর মান। পরে সমীকরণগুলির সমাধান করে ডে সিটার দেখিয়ে দিলেন যে আইনস্টাইনের কল্পনার বিশ্ব আসলে ভরশূন্য । কিন্তু তা তো হতেই পারে না । ওই তত্ত্বের মূল কথাই তো ভর ও শক্তি । ভর ও শক্তি না থাকলে ‘ Space – Time ’ - কে দুমড়েমুচড়ে দেবে কে ? এর কয়েক বছর পর ১৯২২ সালে আলেকজান্ডার ফ্রায়েডম্যান দেখালেন আইনস্টাইনের General Relativity সমীকরণগুলি থেকে যে সমাধান পাওয়া যায় তার থেকে স্পষ্ট দেখা যায় যে মহাবিশ্বের আয়তন সঙ্কুচিত হচ্ছে বা প্রসারিত হচ্ছে । অর্থাৎ আইনস্টাইন যা ভেবেছিলেন তা একেবারেই নয় – স্থির নেই । এসব প্রমাণ অবশ্য তাত্ত্বিক । ১৯২৯ - এ লেমেয়টার ও হাবল্‌ পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ করলেন যে মহাবিশ্ব প্রসারিতই হচ্ছে ।

আবার নতুন করে ভাবতে শুরু করলেন আইনস্টাইন । না , পরীক্ষা প্রমাণের পরে নয় , তার অনেক আগে থেকেই এই ভাবনা শুরু হয়ে গেছিল তাঁর । আসলে যদিও কার্য-কারণের প্রেক্ষিতে ওনার মনে হয়েছিল ‘ Cosmological term ’–কে সমীকরণে রাখার কথা , কিন্তু প্রথম থেকেই কেমন একটা খচখচানি কাজ করছিল তাঁর মধ্যে । দেখবেন এমনটা হয়। যখনি অফিস বেরোবার পথে আপনি কিছু একটা জরুরী ফাইল বা
লাঞ্চ - বক্সটা বাড়িতে ভুল করে ফেলে আসবেন , আপনার কেবলি মনে হবে কি যেন একটা ভুলে গেছি । টের পাবেন অফিসে গিয়ে । আইনস্টাইনেরও এমনিই হয়েছিল । তাঁর মনটাও ছিল উন্মুক্ত – যে কোনো নতুন যুক্তিসিদ্ধ ধারণাকে গ্রহণ করতে আপত্তি ছিল না তাঁর । ফ্রায়েডম্যানের ব্যাখ্যার পর ১৯২৩-এ বন্ধু ওয়েলকে লিখছেন আইনস্টাইন – “ If there is no quasi-static world , then away with the cosmological term ” । আসলে আইনস্টাইন ছিলেন সত্যিই বড় মাপের মানুষ । তাই ভুল স্বীকার করার ঔদার্য তাঁর ছিল। তাঁর তত্ত্বের বিরুদ্ধে যাওয়া কোনো প্রমাণকেই তিনি ছোটো করে দেখেননি । এর মধ্যে ঘটেছিল আরেকটি ঘটনা ।
হাবল্‌ - দের পরীক্ষা থেকে পাওয়া পৃথিবীর আয়তনের হার থেকে ‘ Cosmological constant ’ বাদ দেওয়া আইনস্টাইনের সমীকরণের সাহায্যে পৃথিবীর যে বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল , দেখা গেছিল তা আসলের থেকে অনেকটা কম । আইনস্টাইনের বন্ধুমহল খুব খুশি – আরে ! তাহলে তো ‘ Cosmological term ’কে বাদ দেওয়ার দরকার নেই । কিন্তু এখানেই আইনস্টাইনের মহত্ব । সে ফলাফল দেখেও তিনি বলেছিলেন , হয়ত হাবল্‌ - দের মাপজোকে কোথাও যন্ত্রপাতির ত্রুটির জন্যই এই ভুলটা হয়েছে । ‘ Cosmological term ’ - টা ভুলই ছিল । ১৯৩০ এ এডিংটনও দেখালেন আইনস্টাইনের ভুল । এ প্রসঙ্গে বলে রাখি এই এডিংটনই কিন্তু ১৯১৯ সালে সুর্যগ্রহণের সময় পরীক্ষা করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে আলো সত্যিই ভারি বস্তুকণার পাশ দিয়ে যাবার সময় বেঁকে যায় । আসলে General Relativity-র ভাবনা ওই পর্যন্ত তো ঠিকঠাকই ছিল, যা গোলমাল তা তো ওই ‘ Cosmological term ’ - এর জন্য ।

১৯৩২ - এ ডে সিটারের সঙ্গে যৌথভাবে আইনস্টাইনের পেপার প্রকাশিত হল ওই ‘ Cosmological term ’ - কে প্রত্যাহার করে নিয়ে । বলা বাহুল্য , পরে ১৯৬০ সালে যখন যান্ত্রিক ত্রুটি যথাসম্ভব মুক্ত করে আবার পরীক্ষা করা হল মহাবিশ্বের আয়তন প্রসারণের হার এবং গণনা করা হল পৃথিবীর বয়স , দেখা গেল , আইনস্টাইন ঠিকই করেছিলেন পিছু হঠে ।

আসলে বিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য সঠিক উত্তর খোঁজা নয় , সঠিক কারণের জন্য সঠিক উত্তর খোঁজা । সেখানেই একটু ভুল হয়েছিল আইনস্টাইনের । তবে মজার ব্যাপারটা কি জানেন ? “ আবার সে এসেছে ফিরিয়া ” । ‘ Cosmological constant ’ আবার হাজির হয়েছে। হালের গবেষণায় দেখা গেছে যে মহাবিশ্বে বেশ কিছু শক্তি আছে , গেছোদাদার মত যাদের দেখা পাওয়া যায় না । এদের বলে ডার্ক এনার্জি । এই ডার্ক এনার্জির অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করতে আবার ‘ সে ’ হাজির । কি ভাবছেন ! তাহলে বাকি সবার তত্ত্ব, হাতে - নাতে প্রমাণ সবই মিথ্যে হল তো ! আরে মশাই , ধৈর্য ধরুন । যদিও ‘ সে’ ফেরৎ এসেছে , তবে পুরোনো মহিমায় নয় । অর্থাৎ , আইনস্টাইন ভুলই করেছিলেন । তবে কি জানেন , বিজ্ঞানে এরকম ‘ constant ’ আরো অনেক আছে । কোনো একজন প্রথিতযশা অধ্যাপকের কাছে শুনেছিলাম , এই constant গুলো আসলে গোঁজামিল , যা কিছু আমরা এখনো ব্যাখ্যা করতে পারিনি সেখানে সেখানে গুঁজে দিয়েছি constant । যেদিন সবকিছু ব্যাখ্যা করা হয়ে যাবে এই constant গুলোর আর কোনো প্রয়োজনই থাকবে না । তাই ভুল এখনো রয়ে গেছে অনেক । এসবের সমাধানের জন্যই একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে বিজ্ঞান ।