মেলাঙ্কোলিয়া

রাজিব মাহমুদ




প্রাক-কথন
তরুণ গল্পকার রঞ্জু; পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের শেষ সেমিস্টারে। শহর-জীবনের বোরডম আর ক্লান্তি থেকে রেহাই পেতেই গল্প লেখে। প্রাত্যাহিকতার রিপিটেড স্ন্যাপশটগুলো দেখতে দেখতে ওর গায়ের চামড়ার আরেকটা চামড়া পড়েছে-একধরণের অবশ নির্জীবতারঃ টেবিলে এখনো জমা না দেয়া এ্যাসাইনমেন্টের ড্রাফ্‌ট, বাসার ডাইনিং টেবিলে সদ্য-আসা বিদ্যুৎ বিলটা’র গ্লাসগুলোর একপাশে হামাগুড়ি-দিতে-দিতে-উপু ড়-হয়ে-ঘুমিয়ে-পড়া শিশুর মত পড়ে থাকা, পাশের ফ্ল্যাটে নতুন আসা ভাড়াটেদের মেঘ-রঙা কামিজের মেয়েটার ঘোলা-কাঁচ কাঁচা বিদ্রূপের হাসি, লোড শেডিং হওয়া’র পরে নিচের জেনারেটরটা’র একই রকম খ্যাঁক খ্যাঁক শব্দে চালু হওয়া, নিচের বুড়ো দারোয়ানটার গেট দিয়ে বের হওয়া যে কোন আপু বা আন্টির বুকের দিকে (আঁচল যথাস্থানে থাকা সত্ত্বেও) স্থির তাকিয়ে থাকা... এরকম আরও অসংখ্য হোপলেস সব ইমেজ। মনে হয় হাওয়ার আলোতে আঁকা একেকটা পোট্রেট। স্থির আবার একই সাথে অ-স্থির- দৃষ্টি’র চলিষ্ণুতায় ভিডিওগ্রাফি আরা আবার মগজে কেটে কেটে দেখলে একেকটা আলাদা স্টিল ফটোগ্রাফিও নয়ই বা কীভাবে- এরা সবাই প্রাণ থাকার সূত্রে প্রাণী অথচ আবার কি ভীষণ নিষ্প্রাণ একেকজন। এ যেন একটা অন্ধকার সিনেমা হলে বসে দেয়ালে প্রতিফলিত প্রোজেক্টরে একটার পর একটা সাফাকালো ছবি দেখে যাওয়ার মত ব্যাপার। মৃদু ‘খঘট’ ‘খঘট’ শব্দ হচ্ছে একটা ছবি সরে গিয়ে পরের ছবিটা আসার মাঝখানে। রঞ্জু সেখানে নির্বিকার দর্শক। তবে ও অবশ্য একা নয়-হল একদম হাউস-ফুল; চেনা-অর্ধ-চেনা-অচেনা বিভিন্ন দর্শকের ছায়া কাঁপতে থাকে ওর আশেপাশে’র সিটে, প্রোজেক্টরের পর্দার এধারে-ওধারে। এরা উঠে এসেছে অতীত থেকে-বিষাদগ্রস্ত, গম্ভীর, অতৃপ্ত, ও নির্বিকার একেকটা চরিত্র; চোখে-মুখে সমুদ্র-তলের সবুজ শ্যাওলা’র অস্পষ্ট ছায়া অথবা ধরা পড়ে বরফে উপুড় হয়ে থাকা মৃত মাছের চোখেদের ভাবলেশহীনতা এদের একেক জনের চোখে।
প্রতিদিনকার এই রুটিন ছবি দেখা থেকে অন্তত: কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি চাই। আর এজন্যই গল্প লেখার আড়ালটা। লিখতে গিয়ে অতীত-ভ্রমণ একটা প্রয়োজনীয় বিরতি’র সুযোগ করে দেয় ওকে; ব্যাপারটা অনেকটা একটা লম্বা সুড়ঙ্গের এই মুখে দাঁড়িয়ে ঐ মুখের জীবনটাকে দেখবার মত- যে জীবনের সবাই বা সবকিছু তলিয়ে গেছে সময়ের হাঁ- এর ভেতর। ছোট ছোট কিছু ছবি ও বর্ণনা উঠে আসতে থাকে ওর মগজে; কিছুক্ষণের বিরতি, তারপর আবার- এভাবে কিছুক্ষণ পর আস্তে আস্তে লেখাটা শুরু হয়ে যায়। তবে কিছুটা এগুনোর পর গল্পটা কেমন শ্লথ হয়ে পড়ে; বাইরের কোন প্রতিবন্ধকতায় নয় বরং বাক্যগুলোর ভেতরেরই কিছু শ্লেষ্মায় তাই। আলাদা আলাদা ভাবে পাশাপাশি থেকেও ওরা ভেতরের ভাবগুলোকে পর্যাপ্ত স্বছতায় বহন করে নিয়ে যেতে পারছে না।
ব্যাপারটা অনেকটা জগ থেকে ছলকে পড়া ছিরিছাঁদহীন পানির একটা স্ফীত ধারার মত যেন-যেটা ছড়িয়ে পড়তে থাকে টেবিলের একপাশ থেকে-...ছড়াতে ছড়াতে আনমনেই যেন এঁকে তুলছে একেকটা জলের কন্ট্যুর...সেটা দেখে কখনো মনে হয় সদ্য মানচিত্র আঁকতে শেখা কিশোরের আঁকা আফ্রিকা...আবার কিছুক্ষণের মধ্যে সেটা পাল্টে হয়ে যায় পেগাসাসের মাথায়...খানিক পরে আবার মনে হয় মেরু ভাল্লুক... এই করতে করতে কখন যে থ্যাবড়া ধারাটা সব রেখা-মানচিত্র এলোমেলো করে দিয়ে সদ্য হামা দিতে শেখা শিশুর মত চলে যায় টেবিলের বিপজ্জনক কোণায় সেটা যেন রঞ্জু লক্ষ্যই করে না। বরঞ্চ এই জায়গাটায় এসে হঠাৎ-ই ওর মনে ভেসে উঠল শেষবার দ্যাখা রিক্তা আপার মুখটা। তবে শুধুই কয়েকটা মুহূর্তের জন্য।
রঞ্জু আস্তে আস্তে লিখে উঠতে থাকে মনের ভেতরের কিছু সংক্ষিপ্ত, কিছুবা দীর্ঘ-বোধের ছবি... ফেড-ইন, ফেড আউট...ওর ভাবনা বাতাসের মত পেছনে ছুটে যায়...পথে পথে স্মৃতির তলানিতে আটকে পড়া কিছু টুকরো টুকরো দৃশ্য...যেসব পার হয়ে গেছে সেই কবে...লং লস্ট এ্যান্ড ফরগটেন।
এইসব ছবিগুলোর সাথে সাথে উঠে আসে ভীষণ ডেলিকেট কিছু আবেগ... আজকের বিচারে যেগুলোকে স্রেফ ন্যাকা ন্যাকা সেন্টু ছাড়া আর কিছু মনে হবে না। এটা হয়ত ওর দীর্ঘ শহর বাসের ফল। অতীতের আবেগগুলো ছিলো ভানহীন খোলা বাতাসের স্বতঃস্ফূর্ততার মত... ছিলো একটা ঘন অনুভূতির জন্য হাজারো কষ্ট সহ্য করার অনায়াস প্রস্তুতি! সেইসব অনুভূতির একেকটা দোলায় শূন্যে উঠে গিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাবার জন্য ভেতরটা উন্মুখ হয়ে থাকত। ‘দুঃখ’ ‘কষ্ট’ ‘আনন্দ’ -এসব মোটাদাগের অনুভূতি ছাড়িয়ে শরীরের অতল থেকে হঠাৎ হঠাৎ ধাক্কা দিত অচেনা কিছু তীব্র আবেগ। আজকের এই কড়াত কড়াত বাস্তবতায় নির্ঘাত পালিয়ে বাঁচতে চাইত ওগুলো।
নাগরিক পাকামো সর্বগ্রাসী ব্যাপার। চাইলেই জামার মত খুলে ফেলে মুক্তি পাওয়া যায় না- প্রতিদিনকার যাপিত জীবনে আস্তে আস্তে চারার মত বেড়ে ওঠে ওরা। রঞ্জু বোঝে ওর মনের ভেতরটায় পাতার সোঁদা সবুজ মুছে গিয়ে ঘনিয়ে উঠেছে জবড়জং এ্যাক্রিলিক। তবে এই রং ওয়েদার-প্রুফ কারণ এর সহ্য ক্ষমতা অনেক বেশি। আর তাই অল্পতে অনুভূতির ছ্যাঁদো স্ক্র্যাচ পড়ে না। আজ বহু বছর পর নিজেকে খুলে ফেলতে ইচ্ছে করছে রঞ্জু’র। আর সেটা করবে লিখে লিখে। কিন্তু নাভির অতল থেকে এক ধরণের চিনচিনে আশঙ্কা অদৃশ্য ধোঁয়ার মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠে আসে। মনে হয় থাক না অনুভূতিগুলো মগজের তরল ওমে!... কী দরকার ওগুলোকে টেনে-হিঁচড়ে বের করার?
জানালার বাইরে কৃষ্ণপক্ষের থমথমে রাত। বাতাসও যেন বন্ধ হয়ে গেছে। এসময়ে বড় রাস্তা থেকে শুনতে পাওয়া কুকুরটার অস্পষ্ট ঘেউ ঘেউও নেই। লেখার জন্য ওর হাতের তেলোর নিচের চামড়ায় যেন শব্দগুলো পোকার মত কিলবিল করতে থাকে; আর স্মৃতি’র ভেতরে পুরনো ছবিগুলো উস্কাতে থাকে ওকে-এদের নিষ্কাশন জরুরী হয়ে পড়েছে...তবে কাজটা করতে হবে তৃতীয় কারো ঘাড়ে চেপে। অর্থাৎ ও লিখবে তৃতীয় পুরুষে- একটা চরিত্রের আড়াল নিয়ে। ধরা যাক চরিত্রটার নাম মঞ্জু...


কৃষ্ণকলি
একটা পুরো রাত জেগে থাকার ভারী অবসাদ আর সকালে তেল চুপচুপ পরোটা আর গরুর ভুনা মাংসের ভুরি-ভোজনের ভাত-ঘুম ক্লান্তি—এই দু’য়ের সাথে লেপটে রইল ভোজন-পরবর্তী ঝাঁঝালো ঢেকুর আর তলপেটের অন্ধকারে জন্মানো মৃদু টানের কামেচ্ছা। মঞ্জুর সংক্ষিপ্ত বাস যাত্রাটা এই ত্রিকোণ ঘোরেই কেটে যেতে পারত।
আধ-খোলা চোখে সামনে তাকিয়ে ও দ্যাখে চলমান জেগে উঠতে থাকা শহরটাকে আগলে কে যেন বসে আছে। একটু ভালো করে তাকাতেই বোঝে ওটা একটা মেয়ে। কাঁধের উপর ছড়িয়ে থাকা চুল থেকে উঠে আসছে অভিজাত কর্পোরেট সুবাস; সদ্য স্নানের ইতস্তত: বিক্ষিপ্ত পানির বিন্দু চারপাশে একটা হার্দিক সতেজতা ছড়াচ্ছে।
ঘুম-ঘুম আমেজটা পাতলা হয়ে আসলেও এই লাউড শহরটার নানা স্কেলের শব্দের মন্থন ওর মগজে তখনো ঝাঁকি দেয়নি। এরপর-ই হঠাৎ...
“শালা বাঞ্চোত টেরাফিকেরে আমি………………”
ড্রাইভারের এই খিস্তি কানের পাশ ঘেঁষে বেরিয়েই যাচ্ছিল যদি না এর সাথের কড়া ব্রেকটা মঞ্জুকে কঁকিয়ে তুলত তার আচম্বিত ধাক্কায়। পুরোপুরি সজাগ হয়ে কানের মধ্যে হুড়মুড় করে ঢুকতে থাকা শব্দগুলোকে সামলাতে না সামলাতেই চোখ-কচলে পিঁচুটির অস্বচ্ছতার ভেতর দিয়ে ও দ্যাখে তিলোত্তমার একরাশ ভালগার ছবি: পাকা রাস্তার পাশেই প্যাঁচপ্যাঁচে কাদার বাদামি-কালো পেস্ট পিষে উত্তর- দক্ষিণে ছুটতে থাকা বুড়ো-যুবা-ছোঁড়া-ছুঁড়ির ধাক্কাধাক্কি, রিকশা সি এন জি বাসের নিজস্ব ঢঙের কর্ণ-অন্দর কাঁপানো হর্ন, ফুটপাতের উপর দিয়ে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে এগিয়ে যাওয়া মোটরসাইকেল, হকারদের হাতে ড্যান ব্রাউনের বই, সাত-আট বছরের বাচ্চাদের হাতে ঠাণ্ডা মিনারেল ওয়াটার অথবা গরম খবরের কাগজ, কিছু কিশোর বয়সী ছোঁকরার হাতে সুজি রঙের ফিনফিনে রুমাল ...। এসবের ফাঁক দিয়েই মঞ্জু পড়ে ফেলে ইলেকট্রিকে থাম্বার উপর আলগোছে ঝুলতে থাকা ‘শেষ চিকিৎসা’ দাওয়াখানার ছোট্ট টিনের সাইনবোর্ড: ‘ধাতু দৌর্বল্য’,’স্বপ্নদোষ , ‘আগা মোটা গোড়া চিকন’ ইত্যাকার যাবতীয় সমস্যার গ্যারান্টি সহ সমাধান ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। এর ঠিক পাশেই সামনের বিলবোর্ডটায় জ্বলজ্বল করছে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী সুন্দরী’র ঝাঁ চকচকে দীপ্র গোলাপি মুখ- ঘাড়টা হাল্কা বাঁকিয়ে বুকের বিজ্ঞাপন-অনুমোদিত উপরি অঞ্চল অবধি নগ্নতাটুকু মেনে নিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। বাস থেকেও যেন মেয়েটার গায়ের ম ম গন্ধ পাচ্ছে মঞ্জু।
সামনের মেয়েটা আগের জায়গাতেই স্টিল ফটোগ্রাফি হয়ে আছে। ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশে দেখারও যেন তার কিছু নেই। যেন এই নোংরা শহরকে দু’পাশে ফেলে তার গন্তব্যের সুরম্য অট্টালিকায় না পৌঁছানো পর্যন্ত যেন স্বস্তি নেই তার। সবকিছুই সুররিয়েল তার—চুলের ইতস্তত: ঢেউ, পোশাকের নকশায় আঁকা রূপকথার মাঠ, ডান পাশে মুখ ঘুরিয়ে থাকা প্রোফাইলে অভিজাত গাম্ভীর্য, হাতের ব্রেসলেটে রিনরিনিয়ে ওঠা মিষ্টি ক্যাকোফোনি—সব মিলিয়ে এই ঈশ্বর-পরিত্যক্ত শহরে যেন এক ঝলক স্বপ্ন-কাঁপা হিমেল হার্দিক বাতাস।
অনাঘ্রাতা এক বিলোল সুবাসের ভেতর নিজেকে জাগিয়ে রাখে মঞ্জু। চারপাশের সবকিছু ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে গেল মুহূর্তের মাঝেই। শুধু ওর দিকে পিঠ দিয়ে ওর সামনে বসে থেকে ওর সাথে স্মৃতি- বিস্মৃতির ফ্রিযবি খেলতে থাকে কৃষ্ণকলি। বাসের ভেতরের অসহ্য গুমোট গরমেও ওর কেমন ফুরফুরে আর সজীব লাগে। মেয়েটার চুলের ভেতরটা হঠাৎ-ই যেন মেঘলা দিনের দূরের এক স্কুল মাঠে পাল্টে গেলো... কৃষ্ণকলি ঘুরে ওর দিকে মুখ ফিরিয়ে বসল এবার, দৃষ্টি জানালার বাইরে। ওর বুকের ভেতর গুম গুম মেঘের ডাক শুরু হয়ে যায়। জানালায় একটা হাত রেখে থেকে ওর দিকে তাকিয়ে কেমন খোলতাই হেসে ওঠে কৃষ্ণকলি -যেন হাওয়ায় উড়ে যাওয়া মঞ্জু’র মনের গহীনের পৃষ্ঠাগুলোকে সে পড়ে নিচ্ছে কিশোরীর কৌতূহলে। মঞ্জু কি করবে বুঝে উঠতে পারে না; ওর মুখ সদ্য গোঁফ-ওঠা খরগোশের ছানার মত দেখাচ্ছে। সেই সাথে সাথে উদ্বোধিত হয় ভেতরের একটা খুশির গভীর নলকূপ। জগত কি মায়াময়! কি ঐশ্বরিক দ্যুতি চারিদিকে!! এসময় কানের কাছে কে একজন বেয়াদবের মত বলে উঠল, ‘ভাড়াটা দিয়েন বরো ভাই।’ ভাড়া গুনতে পকেটে হাত দিতে দিতে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে কৃষ্ণকলিও উধাও; অনেক দূরে কোথাও যেন ক্রাত ক্রাত বাজ পড়ল।


সিন্ডারেলা
একটা পুরনো স্যাঁতস্যাঁতে ঘর। চল্লিশ পাওয়ারের বাল্বে জ্বলছে রোগা আলো। মাঝারি আকারের ঘরটার দু’পাশে দেখা যাচ্ছে দু’টো খাট। ঘরের এক কোণায় উঁই খাওয়া ঝুরঝুরে কাঠের গুঁড়া ছড়ানো একটা টেবিল। তার উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দুইটা চুল জড়িয়ে থাকা চিরুনি,একটা পাউডারের বাক্স,একটা লিপস্টিক মোছার কাপড়ের টুকরা, আর একটা অডিও ক্যাসেট।
ঘরের খাটের মাঝখানে হেঁটে ঢুকতে গিয়ে মেয়েটাকে দেখে আড়ষ্ট হয়ে যায় মঞ্জু। ও বসে আছে বাঁ দিকের খাটের মশারির স্ট্যান্ডের চৌকোনা ঘেরাটোপে। ওপরে সেই আদ্দিকালের একটা হলদেটে ফ্যান ঘটাং ঘটাং করে ঘুরছে। ওর হাতে অলস ভঙ্গীতে পড়ে আছে একটা বাক্স মার্কা রেডিও- ক্রমাগত নব ঘোরাতে থাকায় এক ষ্টেশনে বাজতে থাকা ‘রূপ দেখে তোর হইয়াছি পাগল’ শিষ কেটে ভেঙ্গে পড়ে পরের স্টেশনের আবহাওয়া সংবাদে: “আজ রাতে হাল্কা থেকে মাঝারি ধরণের বর্ষণ হতে পারে।”
মেয়েটা উঠে এসে আমার মঞ্জুর হাত ধরে বিছানায় ওর পাশে বসায়। কোন আড়ষ্টতা নেই ওর ব্যবহারে। পরনে কমলা-রঙা একটা কামিজ; বুকের মসৃণ ঢেউয়ের আবেদন অচঞ্চল, নিভৃত। সোঁদা একটা পুরানো গন্ধ নাকে এসে লাগে। মেয়েটা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে রেডিওটা বিছানার একপাশে রেখে হাসে। সামনে ঝুলে থাকা চুলের গোছা মুঠির মধ্যে নিয়ে ছুড়ে দিয়ে একটানে প্রস্তুত করে নেয় নিজেকে; ঠোঁটের কোণায় ঝুলিয়ে রাখা হাসিটা ঘরের রোগা আলোয় ঘষা কাঁচের মতই ম্লান দেখায়। দেখেই মন কেমন করে ওঠে মঞ্জুর; হঠাৎ-ই খুব একা লাগে ওর নিজেকে। একটা আত্মা ঘিরে ধরা নিঃসঙ্গতা যেন ঘড়ির ভেতরে ঢুকে সময়ের প্রত্যেকটা কাঁটাকে ধীরে ধীরে ঢেকে ফেলছে- এক অদ্ভুত সময়হীন আলোছায়ার ভেতরে যেন আটকে গেছে সবকিছু। মঞ্জুর পিপাসা পেয়ে যায়।
১১ টাকার লাক্স মিনি-প্যাক সাবানের গন্ধে কেমন একটা চেনা-অচেনা আবেশ—মগজের কোণা থেকে হারিয়ে যাওয়া বহুদিনের একটা গন্ধ সাবানের গন্ধটার সাথে মিশে যায়। করোটির ভেতরের অন্ধকার ঘরের হলুদ আলোকে কেমন কালচে করে তুলেছে। মনে পড়ে মঞ্জুদের পাশের বাসায় থাকতেন রিক্তা আপারা। মঞ্জু তখন স্কুলে পড়ে। মঞ্জুকে ডাকতেন “সুজয় চপ্পর” বলে যার অর্থ মঞ্জু কোনদিন জানার চেষ্টা করেনি। ওটা ছিলো একগুচ্ছ রিনরিনে ধ্বনি-অর্থ জেনে গেলেই যেন কাঁচের মত ঝন ঝন করে ভেঙে পড়বে। শীতের সকালে উনাকে দেখা যেত এই মেয়েটার জামার মত একটা কমলা-রঙা সুতির জামায়। কারণে অকারণে শুধু হাসতেন রিক্তা আপা।
এক প্রচণ্ড শীতের সকালে মঞ্জুকে গেট দিয়ে ঢুকতে দেখে উনি ছাদ থেকে হাসতে হাসতে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন, “এ্যাই সুজয় চপ্পর। ছাদে আয়।”। মঞ্জু ছাদে গেলে উনি চুল বাতাসে ফর ফর করে ওড়াতে ওড়াতে বললেন,“জানিস আমার না একটুও শীত করেনা। কেন করে না বলতে পারলে তোর জন্য একটা পুরস্কার আছে”। এর পর পরই কিছু একটা মনে পড়ায় খুব গম্ভীর আর আত্ম-নিমগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন।
একদিন শোনা গেলো রিক্তা আপা’র বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। সেদিন বিকেলেই ছাদে জগিং করতে উঠে মঞ্জু দেখল আপা কেমন মূর্তির মত বসে আছেন। মঞ্জুকে দেখেও মনে হয় চিনতে পারলেন না। তখন উনার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছিল। এর তিন দিন পর আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। সফল হয়েছিলেন বিয়ের ৩ দিনের মাথায়। উনার শ্বশুরবাড়ি থেকে যেদিন খবরটা আসে সেদিন ওদের বেড়াল মিনি সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরলো। কেউ খাবার দিলনা তাকে। আমাদের বাড়ির বারান্দায় নিঃসাড় পড়ে ছিল মিনি সারাটা দিন। এই ঘটনার তিন দিন পরে রিক্তা আপার বাবা মা আর ছোটবোন খুব ভোরে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
মঞ্জু’র শরীর যেন জমে শক্ত হয়ে গ্যাছে। মেয়েটা ওর ঘাড়ে হাত রাখে, মৃদু আকর্ষণ করে নিজের দিকে, কণ্ঠে স্বাভাবিক আমন্ত্রণ, বলে ‘আসেন ভাইয়া’। মঞ্জু সহজ হতে পারে না কিছুতেই। মেয়েটা ওর গালের কাছে মুখ নিয়ে আসলে মঞ্জুর নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। পরপর কয়েকটা আলতো চুমু খায় মেয়েটা ওকে। কিন্তু এতে যেন আরও আড়ষ্ট হয়ে যায় মঞ্জু। এই অস্বস্তির ভেতরে হয়ত অন্য কিছু ছিল। মেয়েটার সপ্রতিভ কিন্তু ক্লান্ত ভঙ্গিটার ভেতর কি যেন একটা খোঁজে ও। সিনেমা-টিক কিছু? ভালবাসা টাসা নাকি? নাকি স্নেহ? অনেক আগে একটা উপন্যাসে পড়েছিল কোলকাতা শহরের লালবাতি এলাকার এক পেশাদার গণিকা একটা চৌদ্দ-পনেরো বছরের ছেলেকে তার দরজায় দেখে অবাক হয়ে ভেতরে ডেকে বসিয়েছিল। ভেবেছিল ছেলেটি ভুল পথে তার কাছে চলে এসেছিল।
কিন্তু এই মেয়েটির তো এমন ভুল হওয়ার কথা নয়, ভাবে মঞ্জু। আর তাছাড়া মঞ্জু কল্পনার কোন প্রলম্বনেই বাচ্চা নয়। আর মেয়েটাও বয়স্ক গণিকা নয়।তবে সে রঞ্জুকে অমন স্নিগ্ধ স্বরে ‘ভাইয়া’ ডাকছে কেন? ‘ভাইয়া’ সম্বোধনটাকেও কেমন একটা সুদূর-পরাহত হাহাকারের মত শোনাচ্ছে। এটাও হতে পারে যে মেয়েটাই হয়ত এ পথে নতুন। খদ্দেরকে কিভাবে এ্যাপ্রোচ করবে ঠিক বুঝে পারছে না। তার চুমু খাওয়ার ভঙ্গিটাও বেশ কাঁচা। পটাপট বাঁধা কিছু জায়গায় চুমু খেয়ে দ্রুত উত্তেজনা সৃষ্টি করে খদ্দেরকে এক ফুঁয়ে দপ করে নিভিয়ে দেবার ব্যাপারটা ছিলনা ওর মধ্যে। নাকি ছিল? থাকলেও হয়ত সেটা শুধু মাথার মধ্যেই ছিল ‘জানা’ আকারে।
মঞ্জুর ভেতরে একটা ছবি ভেসে উঠতে উঠতে স্পষ্ট হতে থাকে: শৈশবের একটা খোলা খেলার মাঠ। খুব দ্রুত সন্ধ্যা নামছে। বাড়িতে ফিরতে দেরী হয়ে যাবে ভেবে ও একসময় দৌড়াতে থাকে। মঞ্জুদের বাড়ীটা দৃষ্টিসীমার মধ্যে আসলে ও দ্যাখে বারান্দায় মা দাঁড়িয়ে আছেন।
অনেক দূরে একটা কালচে পেঁয়াজ-রঙা ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে চলে যায়।


শেষের গদ্য
লেখাটা শেষ করে ওর ই-মেইলে এ্যাটাচ করে একটা পত্রিকার সাহিত্য পাতার ই-মেইল ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয় রঞ্জু ওরফে মঞ্জু ।‘সেন্ড’ বাটনে ক্লিক করার পরই ওর কেমন অস্বস্তি লাগতে থাকে । গল্পটা আবার ওপেন করে ও- দাঁড়ি-কমা দিয়ে আলাদা হয়ে থাকা বাক্যগুলোকে কেমন অচেনা লাগে। যেন একটা বিস্তীর্ণ জীবন বিছিয়ে আছে সাদা পাতা গুলোয়। ও নিজেকে প্রশ্ন করে: এসব ঘটনা কি সত্যিই আমার জীবনে ঘটে গেছে? ওর হঠাৎ-ই ওর মনে হয় লিখিত অক্ষরগুলোর যেন একটা বুড়ো প্রাণ আছে আর সেই বুড়োটা ওর দিকে ভীষণ গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন নীরব অভিযোগে প্রশ্ন তুলছে যে তাকে তার মত থাকতে দেয়া হলনা কেন; সে তো রঞ্জুর মগজের অন্ধকারেই নিরুপদ্রব ঝঞ্ঝাটহীন একটা ওমের ভেতরে ছিল-এভাবে ভাষা-বন্দী হয়ে পাঠকের চোখে নগ্ন ভাবে বিকোতে চায় নি।
ভাষা বোঝে না বা বুঝেও ঘাঁড় বেঁকিয়ে মানতে চায় না যে তার প্রকাশ-ক্ষমতা ভয়ঙ্কর রকম সীমিত! সেই সীমিত ক্ষমতায় যা কুলোয় না তাকেও ভাষা জোর করে বন্দী করতে চায় তার অথর্ব শুঁড় দিয়ে; ফাঁক গলিয়ে কেউ বেরিয়ে যেতে চাইলে শুঁড় পেঁচিয়ে তাকে মেরে ফেলে সে। নিজের অক্ষমতার ব্যাপারটা প্রকাশ্য হয়ে পড়াটা যেন একেবারেই পছন্দ নয় ভাষার। আর ঘটনাগুলোকে কি-না শেষ পর্যন্ত আটকা পড়তে হল এই ভাষার ভেতরেই। আর কোনদিন তাদের ফেরা হবে না আদি কোমল রূপে। লেখাটা প্রকাশিত হলে পাঠকের দৃষ্টি ওদের ভাষা-বন্দী শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে পিছলে যাবে। এই দৃষ্টির কোন কোনটা হবে প্রখর রৌদ্রের মত বেহায়া-উদ্ধত, আবার কোনটা ফ্রিজে রাখা পায়েসের মতই বিস্বাদ-শীতল, কোনটা বা আবার বিদ্রূপের পশমে মোড়া। পাঠক-সমালোচকেরা তাদের বিশ্লেষণের ছুরির নীচে শুইয়ে ওদের কাঁটা-ছেড়া করবে। ওরা আসলে এরকম পড়ে ফেলা ছিন্নপত্র হয়ে চায়নি। ওরা বেঁচে থাকতে চেয়েছিল রঞ্জুর মগজের শিরা-উপশিরার রক্তের উষ্ণতায় ।
শহরবাসী রঞ্জুর ভেতরে একধরণের ছ্যাঁদো উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়তে থাকে। মনে হয় ও ওদেরকে এভাবে লিখে ফেলে ভীষণ অপরাধের কাজ করে ফেলেছে; প্রকাশের পর আর এই ময়নাতদন্তের ভেতর দিয়েই রঞ্জু হয়ত খ্যাতিমান হয়ে উঠবে-অন্তত: সেটাই হয়ে উঠতে চেয়েছে সে। নিজেকে ওর হঠাৎ-ই মাছির মত খুব লোভী আর পানির মত সস্তা মনে হয়।
বাইরের রাত থমথমে নেই আর-ঝড়ো হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। শোঁ শোঁ বাতাসের শব্দে ভিজে একসা রাতটাকে কেমন ক্লান্ত আর অসহায় লাগে। যেন মুখ নিচু করে ভিজে যাওয়াটাই রাতটার নিয়তি।
এদিকে রঞ্জু’র ভেতরে চলছে দহন। খুবই ছ্যাঁদো। কিন্তু খুব তীব্রও বটে।