হলুদ দহন

রুণা বন্দ্যোপাধ্যায়



তুমি একটা হলুদ দহনের গল্প বলেছিলে। সময়টা মনে পড়ছে না। শুধু মনে আছে তোমার চোখে তখন মায়া বসতো। আমার ঠোঁটেও প্রলাপের মতো কিছু। ভাষাহীন। নৈঃশব্দ্যের রূপটান। তোমার মনে আছে সেই ফরগেট মি নট? পুরোনো ডায়রির মধ্যে হঠাৎ খুঁজে পেলাম। তারিখটা ধুয়ে গেছে নোনতা জলে। পাতাটা তেমনই আছে যেমনটা রেখেছিলাম। শুধু ঝরে গেছে সবুজ শরীর। হয়তো পিছুডাকে লেগেছিল জল দাও জল দাও বোধ। ফিরে দেখা হয়নি। শিরাগুলো আজও চেনা যায়। প্রাচীন শেকড় খুঁড়ে বেড়ে ওঠা স্বপ্নপাগল। পাগল বললে তুমি পায়ের দিকে তাকাতে। অথচ গোল কোনো স্বপ্ন নয়। লক্ষ্য। নির্দিষ্ট। আড়ালে থাকা হুকুমনামায় নিয়তির বাঁকাঠোঁট। আমি কিন্তু পথের কথাই ভেবেছিলাম। মাছের চোখের দিকে তির ছোঁড়া প্রয়াসে যাইনি কোনোদিন।


তিতিরের বন্ধ ঘরটা হঠাৎই খুলেছিলাম সেদিন। সৌর পরিক্রমার যাবতীয় নকশা আর গসিয়ানের গল্পগুলো ছড়ানো ছেটানো। ফিজিক্স বইটার ভাঁজে সূর্যপত্র আজও তেমনি আছে। ঘরটায় এখনও লেগে আছে ওর বুকের সেই রেণু রেণু কোয়ার্কের সুগন্ধ। দেয়ালে ঝোলানো মাইকেল জ্যাকসনের ছবিটার নীচে তিনটে পেনসিল স্কেচ। খুব ছোট্ট। ভালো করে নজর না করলে চোখেই পড়ে না। একটা ট্র্যাফিক সিগন্যাল, ঘোড়দৌড়ের মাঠ আর শপিংমল। ছেলেবেলায় আমি একটা হাঁটুজল ছোটনদীর কথা জানতাম। সন্ধেবেলার সহজপাঠ আর সকালবেলার রোদ্দুর। তিতিরের স্কেচে দেখি ভুল ট্র্যাফিক সিগন্যালে বাঁক হারিয়েছে ছোটনদী। সহজপাঠের অ থেকে তেড়ে আসছে ঘোড়দৌড়ের অজগরটা। ঝলমলানো শপিংমলে পিছু হাঁটছে রোদ্দুর। পুরোনো সেই চোদ্দকিস্তি মনখারাপের পাতা ওল্টাতেই হাতে ঠেকল বর্ণপরিচয়ের ছেঁড়া পাতাটা। হিজিবিজি সেনসেক্স লেখা। টানটান সাদা চাদরে ঢাকা খাটের নীচে পুরোনো হারমোনিয়ামটা। কখন যেন হারিয়ে ফেলেছে তার রুমমেটের ডো-রে-মি। পাশওয়ার্ড সভ্যতার আড়ালে আকাশকুসুম চয়ন করে চাঁদের এত গল্প! অথচ গল্পটা কোথাও শেষ হয় না। পড়ুয়ার পতনশীল লাশের সংঘাতে ছিটকে যায় চাঁদ। সূত্রহীন হয়ে পড়ে প্রতিফলনের সমস্ত সংজ্ঞারা। সূর্যপত্র খুলে দেখি তার ফোটনকণারা অন্ধকার খুঁড়ে খুঁড়ে নেমে গেছে নৈরাশ্যে। যন্ত্রণার নুন জড়ো করে গড়ে তুলেছে ক্রেডিটকার্ডের এককে গড়া খয়াটে বিশ্বায়ন। নাভিমূলে তার স্প্যাসটিক গর্ভচিহ্ন। ভ্রূণ ফুটছে স্কিট্‌জোফ্রিনিকের তালকানা শব্দকোষে। ধস্ত পৃথিবীর ক্লান্ত জঙ্ঘায় লিখে রাখছে লজ্জা অনুচ্ছেদ।

কাল মাঝরাতে হঠাৎ মুঠোফোন গেয়ে উঠল ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি। আমি ভাবলাম হয়তোবা তুমি। ভুল করে মনে পড়ে গেছে। চোখ খুলে দেখি তিমিরসন্ধ্যার হাসিভরা যুগল মুখ। ওদের তখন পশ্চিমি সকাল। খোঁজ নিচ্ছিল আমি কেমন আছি। ওরা ভালো আছে। ওদের এখন বটিকাবিজ্ঞাপনে পা ছড়ানো যৌবন। এমন অনন্ত অনন্ত ডেকে ডিঙি সাজিয়েছে যেন বসন্তবাগানের সবকটা ফর্মূলা কষে ফেলবে একটা ফাল্গুনেই। মনে আছে তুমি হাওয়া বেলুন বলতে? আমাদের সেই আকাশ অ্যাভিন্যুউ ঠিকানাটা? প্রতিটা ফাল্গুনে কত ভালোবাসা রঙের বিদ্যুৎলতা লেপটে থাকত ঘুড়িতে। অথচ লাটাই জানে তার ক্ষণিক মৌসুমকথা। তিমিরসন্ধ্যা তাদের বটিকাবিলাসী জীবন সাজিয়ে নিচ্ছে স্কাইস্ক্র্যাপারের সাজানো ড্রয়িংরুমে। ওদের হরিয়ালী যৌবন আমাদের পুরোনো সেই শিশিরজন্ম মুছে ছুটছে ম্যারাথনে। লাজুক হেসে সন্ধ্যা জানায় তারা মোরাম বিছিয়েছে ডটেডবেলুন হাইরোডে। মনে পড়ছে আমাদের সেই ফেলুদাকে। তার স্বল্পায়ু ভবানন্দের খেল এখন শতায়ু ভব, একটা জীবন নিয়েই সহস্রায়ু সারং গাইছে। বেচারি চিত্রগুপ্ত! তুরীয়তলায় নাইতে গিয়ে ক্ষুইয়ে আসে তার দীর্ঘ সূচিপত্রের দৈর্ঘ্য প্রস্থ। প্রকৃতির উপসর্গ হারিয়ে সবাই এখন বিন্দাসবাসী। আমি ভাবছি হাড়ের ভেতর ঘাসলতানো সম্পর্কের কথা। একা একা বসে এমন করুণ সুরে বেহালা বাজায় যেন ড্রইংরুমেই দ্বীপান্তর বসছে।


তুমি তো জানো তিমিরসন্ধ্যারা দেশে ফিরছে। শ্যাওলাপিছল কর্পোরেট মার্কেটে এখন মন্দার হিড়িক। অন্ধকারের সমস্ত সর্বনাম ফুটে উঠছে ক্ষুধার্ত গ্লোবের এপারে ওপারে। আত্মহত্যার লিরিক লেখা তুলোক্ষেতে শুয়ে আছে স্বপ্নভাঙা পৃথিবীর উড়ন্ত শিমুল। সবুজগ্রাসী সেপিয়ান্সের দোরগোড়ায় দুলছে ক্লোরোফিল হারানো স্যুইসাইড নোট। তিমিরটা ছেলেবেলা থেকেই খুব হিসেবি। তাই ‘I Quit’-এ পা ফস্কাবার আগেই ওদের সিদ্ধান্ত।

খ্রিস্টমাসের ছুটির সময়ই ওরা স্যান্ডিয়্যাগোর পাততাড়ি গুটিয়ে লেকটাউনের এই বাড়িতে ফিরে এল। রিনিকে তো তুমি দেখনি। তিমিরসন্ধ্যার মেয়ে। এমন মিষ্টি হয়েছে মেয়েটা! খিলখিল হাসলেই ঝাড়লণ্ঠন জ্বলে ওঠে অন্ধকার বাড়িটার কোণে কোণে। এমন মেয়ের কোনো মেয়েবেলা নেই, শুধুই ডিজিটালবেলা। সিন্থেসাইজড বিটে ও যখন পা মেলায় আমায় ডেকে নেয় পিয়ানোসন্ধ্যা। ডাকের ভেতর পুরোনো সেই দিনের কথা। কথার গায়ে আলতো আঙুল, পুরোনো বাহুডোর, ধুলোপড়া পিয়ানোরিড। রিনি নতুনের গল্প বলে। নাসামণ্ডলের সারভিস প্যাক থেকে নামিয়ে আনে তুমনানাতুমনানা রোমান্সিকতা। কেপলার বাইশের সম্ভাব্য সবুজিনে রোজনামচা লেখে একভাগ আশা আর তিনভাগ শূন্যতা দিয়ে। ছশো আলোকবর্ষের দূরত্ব মাপে ষাট বছরের ছেলেভুলোনো স্কেলে। তবু বিষাদমুখী পৃথিবীর এইটুকুই তো আশালতা। কেমন লতিয়ে উঠছে ডায়াস্পোরিক প্রজন্মের বহুতল আয়নায়। যদিও আমি খুব অনায়াস নই খোলা বাজার নীতির এই চওড়া অ্যাভিনিউতে। ওই টানটান ড্র্যয়িংরুমে ডুকরে ওঠা বন্ধুহীনতা, আঙুলের ছাপহারানো বুকশেল্‌ফ এমন বিপজ্জনক করে তুলছে শীতল ঠোঁট যেন জিভের নীচে লুকিয়ে রাখা তীক্ষ্ণতা এখনি ফাটিয়ে দেবে ফোঁটা ফোঁটা ঘৃণার বুদবুদ। একটা জানলা লাগাবার কথা তিমিরসন্ধ্যাকে জানাইনি কোনোদিন। যদিও হিসেবে রেখেছি তার মাপজোক। ভেবেছি যথেষ্ট হবে কি হাওয়া এই ইশকুলফেরত পাখিটার জন্য? যথেষ্ট হবে কি তার পালকের স্পৃহা? সেদিন রিনি আমাকে জোর করে ওদের সঙ্গে ধরে নিয়ে গেল সিনেমায়, ২০১২। মায়ানামায় মুখ রাখা নিরীহ ক্যালেন্ডার শেষপাতায় রেখেছিল জিরো ডেটের চাকায় রাখা পরবর্তী সময়সাইকেল। কিন্তু সবুজখোয়ানো পশ্চিমাকাশ মানবে কেন? তাই হলিউডাল চালচিত্রে সুপারম্যানগ্রস্ত মস্তিষ্ক। গজিয়ে উঠল ধ্বংসপ্রস্তাব। ডিজিটাল ম্যাজিকের প্রসবসদনে উছলে গেল আগামী বারো। প্রথম ভুবনের সন্ধ্যা লেখা পাতায় অনুবাদ হয়ে এল দুপেগ এক্সানল। অনলাক্রান্ত গণসঙ্গীতের বেনোজল হু হু ঢুকে পড়ল কাশাকাশে। স্লো-মোশানে মজা-হি-মজা ফিল্মোলজিতায় হেসে বাঁচিনে। ফেরার ভাবনাসুতোয় কষ্ট বুনতে বুনতে রাত হয়ে এল। অন্ধকার বারান্দায় রিনির তোলপাড় বুকের কাছে মুখ নামিয়ে জলরোলের গল্প বলি। আকাশের গায়ে লেপ্টে থাকা নীহারিকা কারুকাজ দেখাই। তাদের বিজনরহস্যে ঘেরা অশ্বিনী অর্কেষ্টা শোনাই। লেবুপাতায় নামা জ্যোৎস্নার সুগন্ধ লাগাই দুচোখে। উতল হৃদয় শান্ত হলে মেয়েটার চোখে ঘুম নামে।
ইদানীং বারান্দার এই হাতলভাঙা চেয়ারটাতেই সময় কাটে বেশি। ওদের আশ্চর্য নেভানো ড্রইংরুমে বসলেই দেখতে পাই হাফপ্যান্টের স্বপ্নডাঙা কেমন ফেড হয়ে আসছে। তিতিরের কথা মনে পড়ে যায়। জট পাকানো অ্যাবসার্ডিটির ভেতর মেধাবীলতার ঘুমযায়ী পাগলপণ। নিউরোপাথের মোড় ঘুরে তাই ফিরে আসি বারান্দায়। আমার প্রিয় চেয়ারটায়। ভাঙা হাতলে গজিয়ে ওঠা একলাকিত্বে আঙুল রাখি। ঘুম ঘুম ঘর। ঘরের ভেতর দ্বীপান্তর। অস্পষ্ট বিরাম ডাকছে পিছু ফেরা নৈঃশব্দ্য। আমাদের সেই অন্ধবিন্দু, তার নয়ানজুলি দাহ। তুমি তো জানলে না ধিকি ধিকি দ্রোহে আজও হেঁটে যায় আমার বৈদিক বসন্ত। বাসন্তী মর্মরে মগ্নমোহ তুলে রাখি বিরহী আঙুলের আলতো অভিমানে।

বারান্দা থেকেই রোজ দেখতে পাই ছোট্ট রিনির ইস্কুলযাত্রা। স্কুলবাসটা যত এগিয়ে আসে ততই তার আতঙ্কমুখের ইলেকট্রনেরা গতি হারায়। বুকের নিউক্লিয়াস গলে আর্তকান্নায় গড়িয়ে পড়ে প্রাণের প্রোটনেরা। অসহায় বারান্দা দেখে নিউট্রনের নিরপেক্ষতা। জীবনফোটা প্রচ্ছদ থেকে প্রথমপাতায় নামতেই দেখি অ্যালমামাটার থেকে কখন যেন খোয়া গেছে ম্যাটারের রোমান্সিকতা। ডুয়েলইঞ্জিন পেরেন্টাল পায়ে ঊর্ধশ্বাস, হাঁপ ছাড়ছে বোকাবক্সের কেলগ হাসিতে। ফলত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে রিনি রুটি ঝোলাগুড়ের সমস্ত রসায়ন। একমুঠো জিজ্ঞাসা চিহ্ন উঠে আসছে প্রতীকী সংসারে। রোদ পড়ে এলে ঘরে ফেরে বিষণ্ণ অ্যাণ্ড্রোমিডা। পিঠে তার দিস্তে দিস্তে হোমওয়ার্ক। এলাডিং বেলাডিং সইফস্কানো বিকেলে রিনি একটা গল্প লেখে মাইক্রোসফ্‌টের গোপন খাতায়। পাসওয়ার্ডে রাখে পটারের ব্রুমস্টিক, ওড়নকলার ম্যাজিককলমে।

ও হ্যাঁ, তোমাকে বলা হয়নি। ডাক্তার বলছে আমায় চালশে ধরেছে। চশমা হারালে এখন কুহেলিকা ডাকে সব মুখ। ভাঙা চিবুকের পালতোলা রোদে গেরুয়া স্মৃতি। সন্ধেফুরোনো চোখে কেদারের ধুন গোপন রাখে গান্ধারে নামা দীর্ঘশ্বাস। তাই সিদ্ধান্তটা এবার নিয়েই ফেললাম। তুমি হয়তো ভাবছ আমি তিক্তবিরক্ত। আসলে তা নয়। এখনও আমার অন্ধবিন্দুর হারানো প্রতিবিম্বে ফোঁটা ফোঁটা অপত্যস্নেহ। তিমিরসন্ধ্যা ঘরে ফেরার আগে আমি জবাকুসুমের গল্প শোনাই ব্লন্ডির ঋতুমাফিক রঙমহলকে। রিনির খিলখিল হাসিতে খুলে যায় আমার মনক্রোম আলব্যাম, যেখানে মেঘমর্মর চুল, টুপ টুপ ধ্বনি। কার্টিলেজ খয়ে যাওয়া হাঁটুতে যখন লতিয়ে ওঠে বিষণ্ণ বিকেল, সময়ের কোষে জমানো জিনোম রহস্য প্রেসবায়োপিক শীতগন্ধের গল্প বলে। রিনি আদুরে আঙুলে কোমল মধ্যমের প্রলেপ লাগায় বলিরেখার গায়ে। তবু সিদ্ধান্তটা নিতেই হল। দুটো মানুষের মাঝে একটু স্পেস। দুটো ঘরের মাঝে একটু স্পেস। দুটো পঙ্‌ক্তির মাঝে একটু স্পেস। আমরা সকলেই বোধহয় নিজেদের করিডোরে কিছুটা স্পেস কামনা করি। তাই সিদ্ধান্তটা এবার নিয়েই ফেললাম। বিজনবাস। চারিদিকে এখন হিমপ্রহর। স্পেসহীন করিডোরে বরফের সাদা চিৎকার। উষ্ণতার ডেকোরেশান এখন ব্যক্তিগত। শীত ও শান্তি শরীর বিনিময় করছে নিঃশব্দে। বড় ক্লান্ত লাগে আজকাল। তাই এই বিজনবাস। দ্বিতীয় জীবনের অসম্পূর্ণ পরিসীমায় গড়িয়ে দিই দহনের গল্পটা।