ভেসে যাচ্ছে ডুবে যাচ্ছে দাহকাল

অপরাহ্ণ সুসমিতো




আপেল কেটে গোল মরিচের গুঁড়ো মেশাতে মেশাতে, ছুরির ফলায় নয়, আচমকা বেদনার ঝড়ে লন্ডভন্ড,ওলট পালট হয়ে যাওয়া,কেটে যাওয়া জীবন। কেউ দেখে না সে জীবনের গল্প। দেখাতে চায় না বলেই লিখে চলে হাজারো জীবনের টুকরোটুকরো ভাসান আর মিলনের গল্প। মৃন্ময় কাব্য।

যে জীবন তার হতে পারতো, সে জীবন তার হয়নি। কল্পনায় অন্যের যাপিত জীবন আঙ্গুলের ডগায় তুলে আনে সে। নিজের আশা-স্বপ্ন প্যান্ডোরার বাক্সে বন্দী করে, স্বপ্ন দেখায় অন্যকে। আশার ফেরি করে। যেন দুলে ওঠে ডাকের ফেরিঅলা : আ শা আ আ আ আ আ ..

চেনা আলো থেকে আড়াল রেখে অচিন বৃক্ষের নীচে এক অনিশ্চিত সন্ন্যাস।
পেঁপে’র টুকরো মুখে তুলে দিতে দিতে দেখে বুকের ভেতর কী ভয়ংকর ভালোবাসা,ডালিমের দানার মতো রক্তক্ষরণ যা সে নিজেও উপেক্ষা করে।

হাহা শব্দ করে হাসে। এতো জুড়িয়ে যায় ভেতরটা। একদম ঠান্ডা। বলতে ইচ্ছে করে: নট নো আইস, এড মোর আইস প্লিজ!
মানুষ এমন করে হাসতে পারে! কী করে পারে!

ছকে বেঁধে রেখেছিল জীবন। কখনো আলস্যে নয়। সে সুযোগ নেই। মনুষ্য জীবনের সমস্ত পাওয়া তার হয়নি। না পাওয়াই বেশি...
কোন অভিযোগ নেই এতে। এতো স্থির স্থানু কী করে হয় সে! যে জীবন বুঝতে পারে না মানুষ এক যাপনে,
অপূর্ণ সে জীবন নিয়ে কীভাবে এতো পূর্ণ থাকে?
সুন্দর সব মিশে থাকে,অসুন্দর প্রকাশ নেই বোধে চিন্তায় মননে মগজে...

লেখকের সৃষ্টিকে ভালোবাসতে হয়। নিয়ত নূতন প্রেম তাদের সৃষ্টির প্রেরণা। নয়তো স্থবির। সেই অনুল্লেখ্য চেহারার লোকটিও.... '' তারপর পায় নাকো আর''... কত আকুতি এক প্রেমের জন্যে! ঋতুস্রাব এর কারণে মিলিত হতে পারেনি কিন্তু সারাজীবন মনে রেখেছে তাকে.... যেমন সুজাতাকে,সুচেতনা,বনলত ...
কাদম্বরী থেকে মৈত্রেয়ী কী ওকাম্পো, কোথাও কি স্থির কবিমন! নানা রঙ নানা ছন্দে মন খুঁড়ে শেষে ভাইঝিকে পত্র লেখা চলে.....
লেখার আঙুল শব্দ আঁকে
চোখে জল নিয়ে।
এ মানুষ, মানুষ পড়ে।
এ মানুষ, মানুষ বোঝে।
এ মানুষ, মানুষ লিখে।

২.
পাশের বাসার পরিবার দীর্ঘদিনের জন্য কোথাও যাবে। ফুলের টবগুলো দিয়ে যায় বা বাসার চাবি। যেন সপ্তাহে অন্তত একদিন কেউ একজন তালা খুলে টবে পানি দেয় অথবা অচেনা প্রতিবেশী,অনেকদিন দেখা যাচ্ছে না,তাদের বাগান আলো করে গোলাপ ফুটে আছে। নিজের অজান্তে ওর গোড়ায় হাতে থাকা পানির বোতল ঢেলে দেয়া।
সুন্দরের মৃত্যু কেউ চায় না। নষ্ট হতে দিতেও চায় না কেউ। থেমে থাকে না সত্যি দৈনন্দিতা। মৌলিক চাহিদা ক্ষুধা বস্ত্র বা কর্ম। জীবনের জন্য।
মন?
সে থেমে যায়।
আবার জীবনও থেমে যায় কখনো। যেমন হেলেনের। শেকল পরা তার কোন বোধ নেই। হয়তো বোধ জীবন কি! বোধে আছে শুধু একটাই..প্রেম হেলাল হাফিজের তা আছে কি?নাকি হেলালের প্রেম ক্যাশ করা কবিতা আছে?
কোন কোন শিশু জন্মের মুহূর্তে মা হারায়।তবুও বেঁচে থাকে। ডাস্টবিনে ফেলে দিলেও সুতীব্র চিৎকারে জানান দেয় বেঁচে আছি।

ঘুমু ভেঙ্গে এক কাপ চা তারপর প্রাতরাশ সেরে কাগজে নেটে চোখ বুলানো,মুভিতে ডুবে যাওয়া অথবা মাফিন কফি খেতে বাইরে…দহন এমন নয়। শাক দিয়ে রুই রান্নার আগে অভ্যস্ত হাতে ছুরিতে এক সেকেন্ডে ফালি ফালি করে পেঁয়াজ কাটা... আবার এমনও নয়। একদিন অসাবধানে প্রচন্ড গরম পানিতে হাত পুড়িয়ে দহনকে লেখার মাঝে আসতে হয়। তুষার বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বর্ষার কোলা ব্যাঙের ‘মেঘ হ’ ডাক শোনা..ন্যাড়া গাছের দিকে তাকিয়ে শিউলিতলা..প্লাস্টিক ঘাস মাড়িয়ে সর্ষের ক্ষেতে পা ফেলার মতোই এ অমিলে সমিল কল্পনা।
আশা থাকে দাগাও থাকে। একটা কল্পনার মায়াঘর থাকে। সেখানে পায়ে ব্যথা নিয়েও সঙ্গমের চূড়ান্ত শীর্ষে ওঠা যায়। দহন সেই প্রেমের মতোই। চোখ বুজলেই ধরা যায় আবার হাতের মুঠি থেকে উড়ে যাওয়া প্রজাপতি।

যা কিছু আমার আপন যে আমার নিজের তার কাছে ফিরে যেতে চাই না। কোন স্মৃতি রাখতে চাই না। একটা অনিমেষ অভিমানে নিজেকে গড়ে নিয়েছি এভাবে..

ভয় হয় দহনকালের কাছে কোনদিনই আসব না। এলে হয়তোবা ও আমার কেউই হয়ে উঠতে পারেনি। তুষারপাতের মাঝে হাঁটার একটা সুবিধা আছে। চোখের জলকে এক করে নেয়। পাশের মানুষটিও বুঝতে পারে না,জল ধোয়া হাসির আড়ালের পথটুকু শুভ্রতায় ঢাকা হলেও বড় পিচ্ছিল।
সবাই কিছুটা হয়তো ব্যতিক্রম আর নিজস্ব দহনে ব্যস্ত। সবার দহন এক নয়। জীবন যাপন আর জীবন দর্শন এক নয়। এক হতে হবে এমনও নয়। গল্পে আরম্ভ থাকে,চরিত্র থাকে বিভিন্ন। ক্লাইমেক্স থাকে। থাকে উপসংহার। জীবনের গল্পে আরম্ভ জানা থাকলেও কোন চরিত্রের কি ভূমিকা,আনন্দ ভৈরবী গাইবে নাকি বিষাদ তানপুরা তা শেষ অংকে পৌঁছানো না অব্দি বোঝা দুষ্কর। তাই উপসংহারও টানা যায় না চট করে।

সত্যি বেঁচে থাকায় সেনাবাহিনীর মত সরল রেখায় বাঁচতে হয়। লেফট রাইট লেফট...

৩.
মনুষ্য ভ্রুণ দেখতে ব্যাঙাচির মতো। জীবনের শুরুটা তেমন সুন্দর কী! ঠিক যেন প্রজাপতির...
শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি। গাছের পাতায় আঠার মতো লেগে থাকা শুঁয়োপোকা আকর্ষণ করবার চাইতে ভয় লাগায় বেশি। অথচ জীবন চক্রের বেশ কয়েকটা পর্যায় পেরিয়ে পাখনা মেলে বের হয়ে আসে অনিন্দ্যসুন্দর প্রজাপতি। ব্যাঙের মতো সাঁতরাতে সাঁতরাতে যেমন মায়ের গর্ভ থেকে বের হয়ে আসে পবিত্র এক শিশু।
শিশুর হাসি আর প্রজাপতির পাখনার নানা বর্ণের খেলায় কোথাও মিল আছে।
মুগ্ধ হবার। প্রজাপতির নানা রঙ দেখে আমরা মুগ্ধ হই। এ মুগ্ধতা বদলায় না।
শিশু থেকে ধাপেধাপে মানুষ হবার প্রক্রিয়ায় অনেক রঙ বদলায়।
এ রঙ বদলানো প্রায়শই মুগ্ধ করবার বদলে বেদনার্ত করে বেশি। প্রজাপতি নিয়ে বহু মিথ। সৌভাগ্যের প্রতীক কোন অবিবাহিতার গায়ে... বিয়ের ফুল ফুটলো বলে..

একরকম আনন্দ আবার বিষাদের শেকল। মেয়েটি হ য় তো আর প্রজাপতি জীবন এর রঙ বৈচিত্র্য নিয়ে যখন তখন উড়ে যাবার অধিকার বঞ্চিতা। আবার হয়তো উল্টোটাও। প্রাচীন গ্রীক শব্দে psyche হলো প্রজাপতি যার অর্থ soul বা আত্মা, mind বা মন।
মানুষের মন বা আত্মা প্রজাপতির পাখনার মতোই আজীবন রঙিন। বৈচিত্র্যময়।
মন আর প্রজাপতি ব্যাঙাচি আর শুঁয়োপোকা ছাপিয়ে সুন্দরতায় কোথায় যেন মুক্তভাবে যুক্ত..

একদিন এক গল্পে পেয়ারা গাছ আর পুষি বেড়ালের কথা মনে পড়ল। কতো কতো দুপুর পুষি পেয়ারা গাছটিতে উঠে বসে থাকত। টিয়া পাখি ছিল চারটা। দুটো খাঁচা। জোড়া স্বামী স্ত্রী। গলায় মালা ছিলো লাল নাকি গোলাপি মনে নেই। কেউ কেউ তো খাঁচায় বন্দী পাখি। সেই পেয়ারা গাছেই থাকে খাঁচা। ছোট্ট পুষি মাঝে মাঝে চড়ুই মেরে ফেলতো। নো পুষি নো। অথচ টিয়াদের পুষি কিচ্ছু করতো না।
মন বলে ছেড়ে দাও পাখিগুলো।
মন খারাপ করে ছেড়ে দেয়া হলো ওদের।
ওরা কোথায় যে চলে গেলো...
মনের খাঁচায় কতো কী পুরে থাকে। পোষ মানে না। তবুও ছেড়ে দিতে পারা যায় কই... নক্ষত্রের রাত, মৃদুমন্দ হাওয়া।সময়ও গড়ায়...
ডুবে যাওয়া চাঁদের আলোয় যে দাঁড়িয়ে আবছায়া আঁধারে।
অসাধারণভাবে সাধারণ জীবন যাপন কিন্তু মুখ খুললেই বাকী অসাধারণ ভাব ধরারা ধরা খেয়ে যায়। কী মোহগ্রস্ত থাকে দহনকালে। দর্শনে।
খুব সরল সহজ পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া শব্দগুলো সে ধরে ফেলে যা চোখেও পড়ে না অন্যের। শশার মতো চাকচাক করে কেটে কী যত্নে লবণ টমেটো পেয়াজ কাঁচামরিচ আর হাল্কা অলিভ অয়েল মেখে বানায় মৃত্যু সালাদ। স্বাস্থ্যকর স্বপ্নের খাদ্য খাইয়ে আর সবাইকে করে মেদহীন বুদ্ধির, ভাবনার।
জীবন কী সুন্দর করে ডিপ ফ্রিজে ঢুকে থাকে।
কেউ জানে না ডি ফ্রস্ট হলে কী ভয়ংকর সব না পাওয়া রান্না হতে পারে।


প্রেম একটু কম নাকি প্রণয় বেশি একটু? প্রেম শুরুর ধাপ তো প্রণয়ের,নাকি? প্রেম তো আর বাঁশির ফুঁয়ে আরামে দাঁ ড়া সোজা হ বামে তাকার মতো নয়। দাঁড়িপাল্লায় একটু আর বেশির তারতম্যে কী প্রেম ভারসাম্য পায়? প্রেম বাধুক নয়। বললেই একটানে নাম লেখা হয়ে যায় বা লম্বা চুল এর কবিতা? নাতো। চাইতে জানতে হয়। চাইবার যোগ্যতাও থাকতে হয়।
৬০% কটন আর ৪০% পলিয়েস্টার বিছানার চাদরে শুয়ে আরাম হয়না। গা কুটকুট করে।
১০০% হতে হয় যে কোন টা। বাটখারাটা তাই সমানে সমান। দাঁড়িপাল্লা স্থির। একটুও ওদিক এদিক নয়। ধারণ। কতো কিছু। মুনতাসির ফ্যান্টাসির মতো শুধু পেট বড় করা। ধারণ করছে সময়। চৈত্রের মাঝামাঝিতে শুরু যে দহনকাল, তাকেও।

ড্রেনের পাশে বসত গড়া নেড়ি কুকুরের মাঝেও দহন থাকে। ওর ডগফ্রেন্ড পাশের মহল্লার অন্য এক নেড়ির সাথে লেগে ছিলো। কিছুতেই ছোটানো যাচ্ছিলো না। উঠতি বয়সীরা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মারছিল লেজের জায়গায় আর আদিম উল্লাসে দাঁত বের করে মজা নিচ্ছিল। রাস্তার পাশের ঝুপড়ি এক ঘরে ১৮+ নীল ছবি দেখে দেখে ১২ না পেরুনোগুলো বুঝে ফেলেছে সব ক্রিয়াকলা। কুই কুই কান্নার শব্দ শুনে নেড়িটি এগিয়ে গিয়ে দেখে সে দৃশ্য। ওর ভেতরে শূন্য হয়ে যায়। বোশেখের তীব্র দহন ওর চোখে। ডগফ্রেন্ড চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। কুকুরের কী মানুষের মতো অপরাধ বা পাপবোধ থাকে? মানুষের মতো প্রতারণা করতে তো পারে!
একটু এগিয়ে গিয়ে তাকায় নেড়ি সরাসরি চোখে। অথচ তার গলা আশ্চর্য চুপ। কোন ঘেউ ঘেউ শব্দ বের হচ্ছে না।
একবারও পেছন ফিরে না তাকিয়ে সে দৌড়াতে শুরু করে।


সেইবার হলে একসাথে চারজন ছাত্রনেতা নিহত হলেন। সব নাম মনে পড়ছে না।

একসাথে চারজন খুন । বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথে ৪ জন নেই.. খুব কান্নার রোল চারদিকে। কান্না পাওয়াটাই যেন কাজ। যথারীতি মিটিং। উত্তেজনা সারা ক্যাম্পাস জুড়ে। হল ছাড়ার নোটিশ। রাজনীতি বোঝা খুব কঠিন। সেদিন পোস্টার পড়েছিল সারা শহর ক্যাম্পাস জুড়ে...

কিপ দেয়ার নেইমস ইন ইওর মেমোরি। প্রে ফর দেয়ার ডিপার্টেড সোলস। মেমোরি কাজ করে না সবার। বয়সে। স্মৃতি ঝাপসা। কিছু সবুজ। ঐ প্রোফাইলের রঙের মতো।

রাতে হল থেকে কয়েকজন বাসায় আশ্রয় নিলেন। নিরীহ ছাত্র নাকি নেতা বোঝার বয়স নেই। এত রাতে কোথায় যাবে? তাই লুকিয়ে নীচ তলায় ওর রুমে জায়গা করে নিলেন। অবশ্যই সবাই ঘুমানোর অনেক পরে। ওরা কী সুন্দর কবিতায় গানে নাটকে দেশের কথা বলতেন। স্বৈরাচার হটানোর শপথ নিতেন।
শেষ প র্যন্ত শপথে কজন টিকে থাকে! পা পিছলায় তো! কারো কারো! আপোষ। শুকতলি না ছিঁড়ে সহজ নেতা। সহজ অর্থ। সহজ ক্ষমতা। সহজে নাম। পত্রিকায় টিভিতে ওদের অনেককে দেখা যায়। মাখন এর মতো মসৃন ছুরিতে লাগানো চেতনা। প্রলেতারিয়েত বুর্জোয়া। সময়ের কাঁধে চড়ে অনেকে কতো বড় ব্যবসায়ী। আহা সময়টা... সময়ের কী দহন হয়?

ঘড়ির কাটা ধরে জীবন চালানো সময় কখনো বিছানায় শুয়ে টিকটিকি সংগী করে।
ক্যুড বি ওয়ার্স..
কানে বাজে। এক বৃন্তে দুটি ফুল সহসা ফোটে না। রেয়ার। ফুল একাই ফোটে। একা বৃন্তে। ঝরেও যায়। আত্মঘাতী হয় যে কোমরে বোমা বেধে, সে একা। আত্মহত্যা করে যে, সেও। পরিকল্পনা চলে দীর্ঘদিন। একা চলে যায়, তবে ধ্বংস করে যায় অনেক। অনেক জীবন।
পরিকল্পনা করেও এক হওয়া যায় না। কফির পর কফি জুড়িয়ে যায়। দেখা দেয় না। শেষ হুইসেল বাজিয়ে শেষ ট্রেনটিও ছেড়ে যায় স্টেশন। মিলিয়ে যেতে যেতে হাওয়ার ভাসতে থাকে পালানো..
সুচের মতো তীব্র এক দহন এফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়ে যায়। অব্যক্ত কান্না হাটু মুড়ে বসে পড়ে প্লাটফর্মে। কোন কোন মেয়ে লাউয়ের ডগার মতোই বেড়ে ওঠে। পেঁচিয়ে ধরে কেউ। গ্রামে রব উঠে যায়। ফিস ফাস।
'পেড অইছে ছেমড়ির'।
খুব নিকষ কালরাত। ভোরের আলো ফোটার আগেই জেগে উঠেছিলো গ্রাম। শিশুর কান্না র শব্দে।
পুকুরের পাশে।
পুকুরের জল কী রঙিন।
ভেসে থাকা যেন ঠিক এক শাপলা ফুল.. বিশ্বাস কী শাপলা? জলে ভাসা পদ্ম? বিশ্বাস আয়না?
শরীর না মন? কোথায় বসত গড়ে? মন বিছিয়ে শরীর দেয়া বিশ্বাসে।
তারপর?
বিশ্বাস কী ইনবক্সের মতো? অপর প্রান্ত দেখা যায় না এমন ধোঁয়াশা?
বিশ্বাস কী ঘুম ভেংগে অপেক্ষারত পোস্ট? মৃত মা আর বোনের কাপড়ের পুটলি হাতে সীমান্ত পাড়ি দেয়া চার বছরের সিরিয়ান শিশুটি জীবন চেনে না। চেনে দাহকাল। ক্ষমতা আর ধর্ম নামক বিষধর সাপ এর ছোবলেও সে বুঝতে পারে ক্ষুধার চেয়ে বড় শত্রু কেউ নয়। তার খাবারের বড় প্রয়োজন।
দেহের ক্ষুধা। দেহের ক্ষুধা মরে না। মৃত বাড়িতেও চারদিন পর হাড়িতে ভাত ওঠে। বুকের বোতাম খুলে টসটসে যৌবন, একদিন কলতলায়। তারপর বাসর। বিছানা। লখিন্দর প্রেম মরে যায়। কিন্তু ক্ষুধা?
নিরামিষ আর সাদা থান পেঁয়াজহীন জীবন... তবুও বুকের বোতাম খোলা। দহন হয়।
বাম মিলে যায় ডানে। শাহবাগ মন্ত্রীকন্যার সাথে হাত মিলায়। দাউদাউ করে তবুও জ্বলে। অক্ষম আপোষ।
বিশ্বাসে তাকায় উপরে। বিশ্বাসে কতল করে। ভাসমান কী বিশ্বাস? আকাশে থাকে?
বুকের ভেতরে খুব গহীনে কেউ দেখে না?
ওখানে যা কড়া নাড়ে, তাই তো বিশ্বাস। মনের ক্ষুধা ভয়ানক। দেহ ব্যায়ামে শীতল হয়। কিন্তু মন! জ্বলে, পোড়ে, পোড়ায়।
পাশাপাশি সমান্তরাল জীবন চলে শুধু মনেই। না ছুঁয়েও ছুঁয়ে থাকা যায়। এতো গোপন যে সাথেসাথে থাকা ছায়াও টের পায় না। মন দিয়েই মন... মন দিয়ে সব। মন বলে ওঠে ডাক আসছে..

এ দহন শুধু মন বোঝে। প্রবহমান জলের কোন দহন নেই। দুর্ঘটনায় বা স্বেচ্ছায় ডুবে যাওয়া মৃতদেহ, এক সমগ্র জীবন গায়েব করে দিতে পারে অতলে। শুধু নিজে যখন জল শুকিয়ে মরা, তখন কী এক ফোটা তৃষা জাগে? বৃক্ষের মতো? বৃক্ষ যখন পত্র পল্লবহীন, ন্যাড়া-- পাখি কী নীড় বাঁধে! ছেঁড়া তার সেতার। ঘরের এক কোণে জায়গা করে নেয় শোভাবর্ধক। টুং টাং বাজে না আর ধুলোর আস্তরণে।
সম্পর্কের মতো। দিনের পর দিন ধুলো জমে। কেউ যত্ন করে ন্যাকড়া দিয়ে মুছে চকচকে করে তোলে না। ভেতরে মরচে ধরে, বাইরে মিলেমিশে থাকবার শোভা। পাশে থাকা সম্পর্ক ঘুম পাড়িয়ে আলগোছে, পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ঝুল বারান্দায় বসে থাকতেই বেশি ভালো লাগে। প্রতিদিনকার ব্যবহার্য পোশাক এর চেয়ে উৎসবে কেনা কাপড় লুকিয়ে রাখতেই আনন্দ বেশি। চোরের মতো বাকসো খুলে সন্তর্পনে দেখা। কেউ যেন না দেখে! পাশের সম্পর্ক অভ্যাস। নির্ভরতা। নিরাপত্তা। তবে একঘেয়ে। কাজল কালো চোখে অশ্রু দেখতে পায় না। কাজল নয়না হরিণীও দেখে না শার্টের একটা বোতাম খুলে পড়ে গেছে কখন!
তাকায় সম্পর্ক, দেখে না। অদেখা সম্পর্ক হয়ে যায়। এই সময়ে যেমন, সেই সময়েও তেমন হতো। এ সময়ের দোষ হয়। সহজ যোগাযোগ। আসলে এ সময়ের দাবী নয়। দোষও নয়।
এ চূড়ান্ত মন দহন। যুগে যুগে।


৪.
তারপর সাদা কাগজে কালো অক্ষরের মতো রাত। তার জন্য মন যে কেমন করে তা মনই জানে... সেও জানে।
সে যে মানুষ। সেইতো মানুষ। আঘাতে খোঁচানোতে বেদনাতে প্রেমে প্রণয়ে চুমুতে কবিতায় বাউলিয়ানায় সংগীতে ক্রিসপি র‍্যাপে হাহাহাহা করে তুমুল হেসে ওঠা অবিচল মানুষ, সেইই তো।
তার মাঝেই বাঁচা হয়ে যায়
সে মরতে দিতে জানেই না...তবে জানে দাহকাল।

লেখার মতোই।