হুসুলডাঙ্গার আব ও রক্ত

অভিষেক ঝা



...অনেক বা কয়টা জোনাকি নদীর মত ভেলে ভেলে যাইতে শুরু করিলেক...
হুসুলডাঙ্গার পাশ দিয়া পাকা রাস্তা হইতে পারেক; ইয়া ভাবা গেলেও উয়া যে হ্যাদ্দে বড়ো হাইরোড হইবেক তা বোধা’য় বয়সের গাছ পাথর না থাকা শিরিষ গাছগুলানও ভাবতে পারে নাই। ইনারা রানীকেও এই রাস্তায় পায়ে হাঁটতে দেখেছেন পালকিতে নদী পার করে এসে, পেঁজা পেঁজা হয়ে মোষের গাড়িতে পাট যেতে দেখেছেন হুই দূরে। এখানকার পাটভাপা গরমে হুই দূর শহরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা রেলের গাড়িতে লইট লইট পাট তুলতে মইষ আর মুনিষগুলা যাইত এই হুসুলডাঙ্গার ঢিবির চারিপাশ থেকেই, তাও জানেন ইনারা। নদীর দুপাশ জুড়া এই হদ্দ সমতলে এই ঢিবটা উটের কূঁজের মত স্বাভাবিক দেখতে ঠেকে না। মানুষের শরীরে বেঢপ আবগুলো যেমন অস্বস্তি দেয়, তেমনই ওই ঢিবটাকে নিয়ে খচখচানি থেকে যায় এখানের। মিটার কুড়ি উঁচু ঢিবটা চওড়ায় না করেও পৌনে দু’বিঘা। পুরোটা জুড়েই বাঁশঝাড়--- হলদেটে মাকনা আর সবুজালো বয়রা।বাতাসে রোদ চিকালে দূর থেকে দেখে মনে হয় কালনেমি সাপের গায়ে শরীর জেগেছে।হলুদসবুজ আর সবুজহলুদ মাতোয়ারা হয়ে আলো ঢাকতে চাইছে রক্তস্রোত। দিনের ভিতর কত্তবার দিন ঢেকে যায় কালনেমির শরীরে, রাতও আসে না ঠিকমতো। সেইসব সময় প্রতিটা জলের ফোঁটাকে ভরা নদীর খরস্রোত লাগে। সাঁতার ভুলে গিয়ে তখন ডুবতে চাওয়ার আলেয়া লোভ দেখায় জল।
“অক্তে যদি মিশি যায় ,তবে বাহির হইব কেমন করি?” খুব হতাশ গলায় এখানে জিগাতে আসে মেয়ের দল। বাঁশের শিকড় এখানে গা জড়াজড়ি করে এক না চলতে পারা পথ তৈরি করেছে। এটাই হুসুলের মাজার। এর তলে আদৌ কেউ শুয়ে থাকা দূরে থাক, মরেছিল কিনা কে জানে। এখানে মেয়েরা ছাড়া কেউ আসতে নারেক। ঋতুমতী হয় নি এমন মেয়েরাও আসতে নারেক। “সংসার ভালো করি চালাতে লাগিক হুসুলের অখানে যাওয়া আছি” --- কতদিন ধরে এ কথা মেনে চলে হুসুলডাঙ্গা নিজেও সে কথা ভুলে গেছে। রক্তে মিশে থাকাদের নিয়ে এই কালনেমি শরীরে বারবার আসে হুসুলডাঙ্গার মেয়ের দল, সংসারী হতে।
এত চওড়া রাস্তা নিয়ে তাদের কি লাভ বা ক্ষতি এ হিসাব কষতে না কষতেই রাস্তার দু’ধারের আধপাকা বাড়ি , দোকানগুলো খালি করার কাগজ পেয়ে গেল এই তল্লাটের মানুষ। বিশ্বাস করতে না করতেই ভাঙচুর শুরু হয়ে গেল। উন্নয়নের মৃত্যুডঙ্কা সবার আগে শরীর দিয়ে টের পায় বৃক্ষের দল। শিরিষ গাছগুলোকে নোটিশ পাঠাবার প্রয়োজন অনুভব করেনা কেউই কোনোদিনই। কয়েক শতাব্দীর গল্প নিয়ে শিরিষ গাছগুলি তিনদিনের ভিতর অতীত হয়ে গেলেন। মানুষজন নিজ হাতে দোকানপাট, বাড়ির ভাঙচুর শুরু করে, যে কয়টা ইঁট পাওয়া যায় তাই লাভ, এই ভেবে।রাস্তার ধারে পড়ে থাকল শুধু হুসুলডাঙ্গার ঢিবি, বাঁশঝাড়ে শুয়ে থাকা হুসুলের মাজার নিয়ে। এবং হুদাই আসমান ভাঙি পড়িল যখন জানা গেল এত্ত চওড়া রাস্তা বানাইবেক সরকার যে ঢিবও ভূঁইসাৎ হতি লাগি। ঢিবিটির কোনওরকম ভূপ্রাকৃতিক গুরুত্ব না থাকায়, বাঁশ একটি অবলুপ্ত প্রায় প্রজাতি না হওয়ায়, এবং হুসুল এক নাম না জানা পীর হওয়ায় কেউই দেশের উন্নয়নে বাধা দিতে চাইল না। শুধু হুসুলডাঙ্গার সমস্ত মহিলা বিডিও অফিসে এ নিয়ে বিক্ষোভ দেখাতে গেলে তাদের চা বিস্কুট খাওয়ানো হয় এবং বিডিও নিজেই বলেন রাস্তার পাশেই একটি পাকা মাজার প্রশাসনের তরফ থেকে তৈরি করে দেওয়া হবে। সমস্ত কিছু মিটে গেলে এক বছর চল্লিশের মহিলা বলে বসে, “অক্তে কিছু মিশে গেলে হুসুলের বাঁশঝাড়ের মাটি কোথা থেকে আনিব? তুমি দিদিমণি হইয়াও বুঝলা না বিডিও সাহেব!”
এ কালনেমির শরীরজুড়া কবর। কতজন পুঁতেছে নথ। এ নথ মোহরের সময় ভাতার দেয়নি, দিয়েছিল তার বড় ভাই বুড়া নিম তলে আনাজপানি খেলার সময় । কানের দুল--- বছর চল্লিশেকের কানের লতির স্মৃতিতে এখনও সতেরো বছরের দাঁতের আদরের হুম। আঁকাবাঁকা হাতের লেখায় ভালোবাসা নামক অক্ষর শুয়ে রয়েছে এখানে। মাটি খুঁড়লে পাওয়া যেতেও পারে এক অঝোর পানির বিহানে কি চোখে সে তাকিয়েছিল তার দিদির চোখের দিকে। এখানে হুসুলডাঙ্গার মেয়েরা সেই কবে থেকে গল্প করতে আসে হুসুলের সামনে।এর গল্প শুনে ও। ওর গল্প শুনতে শুনতে এর মন জুড়ে ঝিল জাগি উঠে। গল্প শেষে সংসারে ফিরে যায় তারা।হুসুলের ঢিব শ্বাস নিতে শুরু করে।
ঢিবিকে মাটিতে মেশাবার আগের দিন যখন বাতাসে শেষ রোদ চিকালো, সন্ধ্যার বাঁশঝাড় ভরে উঠে মাটি কোপানোর শব্দে। একমুঠ করে এ মাটি মুখে চালান করে দেয় এরা। কষাটে স্বাদ জ্বলতে জ্বলতে রক্তে মেশে। এই সমস্ত পুড়ে যাওয়ার সময় অনেক বা কিছু জোনাকি কাঁপতে কাঁপতে নদী হয়ে বয়ে গেল।