ল্যাবিরিন্থ

বৃতি হক



আকাশ এক মুক্ত, স্বচ্ছ তেপান্তর। মেঘের চাঁদোয়া পেরোলে ওপরে একটানা গাঢ় নীল উদ্দামতা। এখানে ইচ্ছেমত ছুটে চলা যায়, পাখা মেলে ভেসে থাকা যায়। স্বচ্ছশীল ঝর্ণার জলের মত গড়িয়ে পড়া যায়। ইকারাস ভাসছে। নিচে পেঁজা তুলোর মতন মেঘ। ঢেউ এর পর ঢেউ। আবার ঢেউ। নিঃসীমতায় আনন্দে ডানা মেলেছে ইকারাস। সে জেনেছে, মানুষ বৃক্ষ নয়। মানুষ মূলতঃ পাখি। রক্তের প্রতিটি কণিকায় তার মুক্তির গান লেখা। উড়ালের ছন্দ যাকে ছুঁয়েছে, মাটির পৃথিবীর সাধ্য কী, তাকে আটকে রাখে?
দিগন্তের ওইপাশে কী ভীষণ আগুণ লেগেছে! মেঘের ওপর কমলা আর সোনালীর হোলি। দূরপ্রান্তে বিরাট কমলা গোলক, দ্যুতি ছড়িয়ে স্ফীত থেকে স্ফীতকায় হয়ে উঠছে ক্রমশঃ। মন্ত্রমুগ্ধ ইকারাস সপ্তাকাশে যাচ্ছে স্বপ্নকে ছুঁতে। মহানের সাথে আজ মোলাকাত হোক। টুকরো টুকরো বাতাস-- খন্ড পাথর যেন, শরীরে তীব্রভাবে এসে আঘাত করছে। বাতাসের পাহাড় ঠেলে তবু এগুচ্ছে সে। ডানায় চির চির শব্দ! পালকের ভেতরের মোম কী গলে যাচ্ছে? শুষ্ক বিদীর্ণ মাটির মতন? বাবা অবশ্য বারবার বলেছিলেন সূর্যের কাছাকাছি না যেতে। মাটির মানুষকে মাটির কাছাকাছি নাকি থাকতে হয়। নিষেধ শোনেনি সে। জন্মাবধি মাটির তুচ্ছতা দেখে সে অভ্যস্ত। এ দৈন্যতা অস্বীকার করে বরং মরে যাওয়াও ভাল। গলে যাক! পুড়ে যাক পাখা! তবু সূর্যের আরও কাছে যাওয়া যাক। মরিয়া ইকারাস ডানা ঝাপটাচ্ছে। রুদ্রতায় তার মুক্তি আসুক। বন্ধনহীনতার স্পন্দন তার শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ুক! “আমার মুক্তি আলোয় আলোয় ...”
কক্ষপথ-চ্যুত তারার মতন হঠাৎ পতন হল তার, ছিটকে মেঘের নিচে ডিগবাজি খেয়ে পৃথিবীর সীমানায় নেমে এল সে। নিচে নীল গ্রহটা যেন ধেয়ে আসছে তার দিকে। আগুনের হলকা পুরো শরীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে, ডানা পুড়ে যাচ্ছে। নিচে, আরও নিচে পড়ছে! বাতাসের প্রবল দাপটের ভেতর এক ঝলক দেখে, সাগরের পারে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা, ঐ তো, লাল কুর্তা পরা মেয়েটি! তার দিকে মুখ তুলে হাত নাড়ছে। ইকারাসের প্রতিটি তন্ত্রী জানে, এই মেয়েটার চোখ নীল এবং ঠোঁটে লেপ্টে আছে গোলাপের অবোধ্য হাসি। তার মস্তিষ্কের গহন জানে, একদা এই মেয়েটির কাছে তার যাওয়ার নিয়তি। কোন একদিন এই নীল চোখে তার ব্রহ্মাণ্ড পরিভ্রমণের কথা।
পতনে কী সময় স্তব্ধ হয়? ইকারাস পড়ছে-- নীল শূন্যতা থেকে জলমগ্ন আরেক নীলের শূন্যতায়। অতল সমুদ্রে নয়, হয়ত সেই মেয়েটির চোখের অবারিত নীলিমাতেই হারিয়ে যাচ্ছে সে! কর্ণকুহরে সমুদ্রশঙ্খ একটানা বেজে যাচ্ছে-- শোঁ শোঁ...
শরীরের প্রবল ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে যায় ইকারাসের। নীল শূন্যতা চকিতে মিলিয়ে যায়, চারপাশে রাত্রির নিকষ কালো আঁধার। পায়ের কাছে ঘুমিয়ে থাকা কুটু আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে। চারদিন হলো ইকারাসের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে এই কুকুরটি। চারদিন? নাকি গতকাল থেকে? সময়ের হিসেব গোলমেলে লাগছে। সে তখন তেরাস্তার মোড়ে বাসের অপেক্ষায়। “কুত্তার বাচ্চা!” কানের কাছে হঠাৎ ঘৃণার তীব্রতায় আক্ষরিকভাবেই চমকে উঠেছিল ইকারাস। পরমুহুর্তে চোখের সামনে লাথি খেয়ে দূরে ছিটকে পড়তে দেখেছিল ছোট বাদামি কুকুরটাকে। কেঁউউউ! ব্যথার প্রাবল্যে ঠিকভাবে কান্নাও করতে পারছিল না কুটু। ওকে বুকে তুলে নিয়েছিল সে, ক্ষুদ্রকায় কম্পমান অবয়বে হাত বোলাতে বোলাতে আড়চোখে তাকিয়ে দেখছিল নিরীহ শিশুটির ওপর নির্বিকারচিত্তে প্রতাপ খাটানো খাবার দোকানের গাঁট্টাগোঁট্টা সহকারী লোকটাকে। কাঠের ডেস্কে ফিরে গিয়ে খরিদ্দারের কাছ থেকে হিসেব বুঝে নিচ্ছে। ইকারাস দেখছিল তার তেল চকচকে নিঃস্পৃহ মুখ, তাম্বুলসিক্ত ফোলা ঠোঁট, বাঁ হাতের নিপুণ কারুকাজে পকেটে পুরে ফেলা টাকার গুচ্ছ।
বাসায় এনে এ ক’দিন যত্ন আত্তির পর ব্যথা কমেছে বোধ হয় কুটুর, তার প্রতি কদমের সাথে আজ সে কদম ফেলেছে। ইকারাস থেমে গেলে সেও থেমে যায়, মায়াময় দু’চোখ মেলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সঙ্গীর প্রতি চরম বিশ্বস্ততা এবং তীব্র ভালবাসা নিয়ে কুকুরের জীবন কী অভিশপ্ত? দিন হোক বা রাত, শ্রুতিযোগ্য বা শ্রুতির বাইরের যে কোন শব্দেও সচকিত হয়ে ওঠে কুটু। ইকারাসের সম্ভাব্য সকল শত্রুকে তার ছোট অষ্পুষ্ট শরীরের তাবৎ শক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে চায়। মাথা এলিয়ে আবার শুয়ে পড়া ছানাটার ক্লান্ত ভীষণ আদুরে মুখের দিকে তাকিয়ে “কুত্তার বাচ্চা” শব্দজুটি কেন, কোন হিসেবে মানুষ প্রজাতির কাছে গালিতে পরিণত হল, ইকারাস ভেবে পায় না।
জানালায় ধীরে ধীরে দিনের আলো ফুটে ওঠে, কিন্তু তা নতুন কোন সম্ভাবনা বয়ে আনে না। আকাশেও খাঁ খাঁ মরুভূমির তীব্রতা। পথে চলতে গিয়ে ইকারাস চারপাশের অনুভূতিহীন মুখগুলোর দিকে তাকায়। এই শহর এক অদৃশ্য দেয়ালে মোড়ানো। কেউ কী তা বুঝতে পারছে? অনেকদিন যাবৎ এ শহর থেকে পালাতে চাইছে সে, কিন্তু সে দুর্ভেদ্যতায় বেরিয়ে যাবার মতন কোন ফোঁকর খুঁজে পাচ্ছে না। সারাদিন অনেকটুকু পথ পেরিয়ে এসে মনে হয়, আবার শুরুর বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে। কোন কোন পথ আবার অন্ধগলিতে সমাপ্ত। চীৎকার করলে প্রতিধ্বনি ফিরে ফিরে আসে। নিশ্চিতভাবেই এ শহর এক অদ্ভূত গোলকধাঁধাঁ!
চারপাশের অদৃশ্য দেয়ালের স্থানে স্থানে কিছু ছাপচিত্র অবশ্য দৃশ্যমান। এই যেমন, পাশে একজন মোটাসোটা মহিলা তর্জনী তুলে শাসাচ্ছে ঘর্মাক্ত ক্লান্ত বুয়াকে। ইভটিজারের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে বালিকা পকেট থেকে বের করেছে নেইলকাটারের ছুরি। নিঃসঙ্গ এক বৃদ্ধ হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে ছোট শক্ত বিছানায়। মাছবাজারে মৃতমাছ ঠিক যেভাবে ডালার ওপর বেকায়দা ভঙ্গিতে পড়ে থাকে, সেভাবে। জেলখানার কয়েদ ধরে দাঁড়িয়ে কয়েকটি রাগান্বিত অসহায় মুখ। অসূয়ামত্ত বাগানে সুতোয় বাঁধা আহত প্রজাপতি। মা চুল টেনে ধরেছে ছোট মেয়েটার, গুম গুম করে পিঠে কিল পড়ছে তার। তারস্বরে চীৎকার করছে শিশুটি। কামান্ধ যুবকের বিছানার পাশে নগ্ন নারীর পোস্টার। ঘৃণার মন্বন্তরে মৃতপ্রায় জনপদ এক। পবিত্র গ্রন্থের ভেতর বয়ে আনা রাশি রাশি গোলাপি ইয়াবা। ন্যায্য পারিশ্রমিকের দাবিতে প্রতিবাদে ফেটে পড়া ক’জন দিনমজুর। সুচতুর রাজনীতিবিদের সাজানো কথার ফুলঝুরি। আর আশ্বাস। ঝগড়া করছে প্রেমিক প্রেমিকা। সবুজ ঘাসের পাটাতনে লাল পোশাকে ধর্ষিতা তরুণীর মৃতদেহ। তৃতীয়বার ধর্ষণের প্রতীক্ষায় হাত-পা ছড়িয়ে আছে। ইকারাসের গলা শুকিয়ে আসে। এই লাল কুর্তা পড়া মেয়েটির চোখ কী নীল? এর কাছেই কী তার যাওয়ার কথা ছিল? বন্ধ সেই দু’চোখের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে ইকারাস।
নরম মাটিতে আমাকেই বরং মুড়িয়ে ফেল, পৃথিবী! এইসব অস্থিরচিত্র আর ভাল্লাগে না!

শহরের শেষপ্রান্তে পুরনো ছোট দোতলা অফিস। রাস্তা ঘেঁষে কাঠের দরজার ওপরে একটি ছোট সাইনবোর্ড টাঙানো।
“অপার শান্তির সন্ধান করছেন? আমরা আপনাকে সাহায্য করতে পারি। ডঃ ডেথ।”
পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় ইকারাস, দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে চেয়ার টেনে বসে। তার এক বন্ধু এই অফিসের সন্ধান দিয়েছে। চেম্বারে বসা মধ্যবয়সী লোকটির চেহারা আমুদে, হাসিখুশি।
: শান্তি পেতে কীভাবে সাহায্য করা হয় এখানে?
: মৃত্যুতে আছে অপার প্রশান্তি। এখানে ইচ্ছামৃত্যুতে সাহায্য করা হয়।
: তারমানে এখানে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করা হয়?
: না। নিরলস শান্তি পাওয়ার পন্থা জানানো হয় আগ্রহীদেরকে। মৃত্যুপথযাত্রীদেরকে আগে শুধু এই সুবিধা দেয়া হত। পরে আমরা বিবেচনা করলাম, মৃত্যুও একপ্রকার মানবাধিকার। হিউম্যান রাইট। সুস্থ অসুস্থ নির্বিশেষে সবার তাতে অধিকার আছে।
: মৃত্যুর মত বিষয়টি নিয়ে এতো আগ্রহী কেন আপনারা?
: আমি পেশায় ডাক্তার, ইকারাস। সাইকিয়াট্রিস্ট। চিকিৎসা প্রদানের নিমিত্তে নিত্যনতুন রুগীর সাথে পরিচয় হয়। একদিন এক ফরাসি নারী এলেন আমার সাথে কথা বলতে। উচ্চশিক্ষিত, সুন্দরী। তিনি আমার পরামর্শ চাইলেন, তার পঁচাত্তরতম জন্মদিনে নিজের জীবনকে কীভাবে সুন্দরভাবে শেষ করে দেয়া যায়। কারণ হিসেবে বললেন, ৭৫ একটি চমৎকার সংখ্যা, আর বেঁচে থাকার জন্য একটি যথেষ্ট পরিমাণ বয়স। তাকে অজ্ঞ বা পাগল ভাবার মত কোন অবকাশ ছিল না আমার। সুস্থজ্ঞানসম্পন্ন তিনি, বেঁচে থাকার জন্য তাকে প্রেরণা দেয়ার পেছনে যৌক্তিক কোন কারণও খুঁজে পেলাম না। তাকে দেখেই মূলতঃ আমার মাথায় এই চিন্তাটা আসে। যে কোন সুস্থ বুদ্ধির মানুষ তার নিজের মৃত্যুর কাল ধার্য করার অধিকার রাখেন।
: জীবন একটা চমৎকার উপহার। একে সুন্দরভাবে গ্রহণ করাই কী উচিৎ নয়?
: জীবনকে যদি উপহার হিসেবেই দেখো, ইকারাস, সেই উপহারকে ফিরিয়ে দেয়াও তোমার একটা অপশন ভাবতে পার। সব উপহার কি তুমি জমিয়ে রাখো?
ইকারাস ভাবে। তার জীবনে উল্লেখযোগ্য কোন ঘটনা নেই। নিউরণের ধূসরতায় মা’র কোন চিত্রপট আঁকা নেই। নীলনয়না প্রেমিকার অষ্পষ্ট প্রতিচ্ছবি লুকিয়ে আছে হৃদয়ের অতলে, বাস্তবে তার দেখা পায়নি এখনও। হাতে গোণা দু’জন বন্ধু। আর বাবা ডিডেইলাস, এক অভিশপ্ত জীবন বহন করে চলেছেন। এখন আর কথাও বলেন না, চুপচাপ বসে থাকেন। সামনে থোকা থোকা শাদা কাগজের পাতা। অনবধানে বাবার দু’হাত বানিয়ে চলে একের পর এক খেলনা এরোপ্লেন। উত্তরাধিকারসূত্রে অভিশাপের বোঝা টেনে চলেছে পুত্র, বাবার সাথে নির্বাসিত সেও। একে একে ষোলোটি বছর পেরিয়ে গেছে। মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তার প্রবলতর হয়েছে। বাবা কী হাল ছেড়ে দিলেন? তার বৃষস্কন্ধ কখনো নুয়ে থাকে উপাসনালয়ের পাথুরে মূর্তির সামনে। শূন্যচোখের সেই মূর্তি অবশ্য কখনো কথা বলে না। জরা খরা দুর্দশায় বা দুর্ভোগে পাশে এসে দাঁড়াতে তাঁকে কেউ দেখেনি। এই দেবতা জীবনভর ভোগ-পূজা-অর্চনা নিয়েও নির্বাক নিঃস্পন্দ থাকে।
: একবার ভেতরে এসেই দেখো, ইকারাস!
ভেতরের কামরায় বেশ কিছু কিউবিকল। প্রতি কিউবিতে সামনে ক্লায়েন্ট নিয়ে ভাবলেশহীন মুখে পরামর্শক বসে, মৃদুমন্দ স্বরে তারা কথা বলছে। প্রতিটি ক্লায়েন্টের ইচ্ছা আর রুচিকে প্রাধান্য দিয়ে স্বেচ্ছামৃত্যু বিষয়ক পার্সোনালাইজড পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। ইঞ্জেকশন, পিল, বাথটাবে ইলেক্ট্রিক শক থেকে শুরু করে নতুন আবিষ্কার সার্কো।
: সার্কো?
: এটা কফিনের মতন একটা মেশিন। ভেতরে তরল নাইট্রোজেন দিয়ে কাজ পরিচালিত হয়। ক্লায়েন্ট মেশিনে আসন গ্রহণ করার পর পর তা প্রবাহিত হবে। দেড় মিনিটের ভেতর ক্লায়েন্ট শূন্য শূন্য বোধ করবেন- অনেকগুলো হার্ডড্রিঙ্কের পর মাথা যেমন ফাঁকা লাগে- ঠিক সেই অনুভূতি। অল্পক্ষণের ভেতর তিনি জ্ঞান হারাবেন। মিনিট পাঁচেকের ব্যাপার। সব কাজ মেশিনের ভেতর থেকেই পরিচালিত হয়। জীবনের শেষ সময়ে চারপাশে কি ধরণের দৃশ্য দেখতে চান, সেটাও ক্লায়েন্ট পছন্দ করবেন। অনেকে অন্ধকার পছন্দ করেন। অনেক খোলা সবুজ প্রান্তর দেখতে চান। কেউ দেখতে চান নিজের ঘরের পছন্দের কোণটি। আত্মীয় স্বজনের চেহারা দেখতে চাইলে সেটার ব্যবস্থাও করা হয়।
: কেউ যদি শেষ মুহুর্তে মন বদলায়, ডক্টর?
: সে ব্যবস্থাও আছে। ভেতরে জরুরী বাটন আছে, যা চেপে ধরলে ইমার্জেন্সি দরজা খুলে যাবে, সেইসাথে মেশিনের ভেতরে অক্সিজেন প্রবাহিত হবে। স্টপ বাটনও আছে।
হলওয়েতে একটু দূরে লাল কুর্তা পরা মেয়েটি দাঁড়িয়ে কী? ভীত বড় বড় নীল গভীর চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে? সজোরে দু’পাশে মাথা নাড়ছে?
ডঃ ডেথের সাথে হাত মেলায় ইকারাস, আপনার সাথে কথা বলে ভাল লাগলো। তিনিও বন্ধুত্বপূর্ণ হাসেন,
: Au Revoir.
পিঁপড়ার সারি অদৃশ্য দেয়াল বেয়ে বেয়ে ওঠে। ফুটপাতের এককোণে ঝিম ধরে বসে থাকা জন্মান্ধ ভিখারীটি বাঁশি ঠোঁটে তুলে নেয়। এক মনকাড়া আকুল সুরে থমকে দাঁড়ায় পথিক, রাজপথ আনমনা হয়। চারপাশে অনাঘ্রাতা ফুল সুবাস নিয়ে ফোটে। পায়ের নিচে ঘাস জন্মায়, সবুজ প্রসারিত হতে থাকে বহুদূর। নদীরা দৌড়ে বয়ে যায়, তার পাশের ছায়াঘেরা গাছে পাখিরা গান শুরু করে। ইকারাসের বুকের ভেতর কোথাও কাঁপন ধরে। বাঁশির সুরে বসন্ত এসেছে! সেই মেয়েটিকে খোঁজে-- যার ছায়া সে অনেকবার দেখেছে, কিন্তু তাকে জানা হয়নি কখনো। তার সমুদ্রগভীর নীল চোখে তাকিয়ে মন্দ্রস্বরে কিছু কথা বলার ছিল তাকে।
: রু... রু...
মিষ্টি কন্ঠে দূর থেকে কেউ ডাকছে তাকে। নীল চোখের মেয়েটি? নাকি মা? বাবার কাছে শুনেছে, এই নামে মা ডাকতো তাকে। দু’চোখ জলে ভরে যায়, মোড়ানো দু’হাঁটুর মাঝে সে মুখ লুকায়।
: এতো অস্থির ক্যান তুমি, বাবা? শান্ত হও। হারাইসো কিসু? এইখানে?
ভিখারী বাঁশি নামিয়ে মৃদুকন্ঠে জিজ্ঞেস করে। ইকারাস প্রাণপণে কান্না আটকায়।
: প্রিয় কিসু হারাইলে ঘুইর‍্যা ঘুইর‍্যা সেই জায়গায় তুমারে আসতেই হৈব। হারানোর শোক দূরের মানুষরেও টাইন্যা আনে রে, বাপ! আর পিরথিমি সেইখানে চুইষ্যা নেয় চক্ষু থেইক্যা ঝইরা পরা জল। মাটিরে ভেজায়। হেই অমৃত থেইক্যা গজাইয়া ওঠে বেহেশতি ফুলের চারা।
বাঁশির সুরে কী তাহলে পারিজাত ফুটেছিল চারপাশে?
ইকারাস মুখ ফুটে বলতে চায়, সমুদ্রে তার ডানাদু’টো হারিয়ে গেছে। সেইসাথে হারিয়েছে নিজের বাড়িসংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য। ঠিকানা। বাড়ি! “বাড়ি” শব্দটির অর্থ কী? মা? নীল চোখের মেয়েটি? মুক্ত আকাশ? মৃত্যু? কে বলে দেবে তাকে? তার জন্মান্তরের স্মৃতিটুকুর কথা এই ভিখারী বিশ্বাস করবে কী? সে চুপ করে থাকে।
: যে যা-ই বলুক, নিজের মনের ওপর বিশ্বাস রাইখো, বাবা। মনই তুমারে একদিন পথ দেখাইব।

দৌড়াচ্ছে ইকারাস। পা টেনে টেনে পেছনে ছুটছে কুটু। নীল গ্রহ, নীল আকাশ, নীল সমুদ্র, নীল নাইট্রোজেন, নীল চোখ। একটি ধোঁয়া ধোঁয়া মুখ। নীলের কাছে তার কী এক অপরিশোধ্য ঋণ? নীলেই কী তার মুক্তির সনদ লেখা? নীল কী এই শহরের গোলকধাঁধাঁর রহস্যভেদের প্রথম সূত্র? সমুদ্রের কাছাকাছি চলে এসেছে সে। মাথার ওপর গনগনে সূর্য। দৃষ্টির পরিসীমা থেকে একটি পাখি আড়ালে চলে যায়। মাটি থেকেও তার ছায়া মিলিয়ে যায়। হাঁপাচ্ছে ইকারাস। এখনই হেরে যেতে চায় না সে। ইকারাস আজন্মযোদ্ধা। এই সূর্য কী জানে, কেন সে এখানে দাঁড়িয়ে? বারুদসমুদ্রে স্বপ্ন হারিয়েছে বলেই কী তাকে বারবার এখানে আসতে হয়? এই সূর্য কী জানে, কেন সে উড়ে গিয়েছিল তার কাছে? এই সূর্য কী জানে, কেন সে ভূপাতিত হয়, বারবার?