ইমামসাহেব, বার্মিংহ্যাম থেকে বলছি

সোহম দাস




মাননীয় ইমামসাহেব,
আমি বার্মিংহ্যাম থেকে বলছি! কেমন আছেন?
আমাদের একটা অদ্ভুত মিল আছে জানেন, সবকিছুতেই আমরা যাইহোক দিয়ে শেষ করি। পৃথিবীর ম্যাপে আসানসোল কোথায় আমার জানা নেই! তবে একটা উপলব্ধিতে আমি পৌঁছেছি। সেটা জানাতেই আজকে লিখতে বসলাম চিঠিটা। এ কথাগুলো বরং শুধু আমাদেরই থাক। জানেন, আমার কিরকম মনে হচ্ছে আসানসোল আর বার্মিংহ্যাম খুব দূরে নয়। হ্যাঁ, ঠিকই শুনলেন। বার্মিংহ্যাম। উইন্সন গ্রিন। যেখানে আমাদের বাড়ি, ব্যবসা, আমাদের জীবন। যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় এশিয়ান কমিউনিটি আমাদের এই শহরে, আরও ভালোভাবে বলতে গেলে, এই উপনগরীটায়।
সবই ঠিকঠাক চলছিল। ভারতীয় ক্রিকেট দল তখন এখানে সফর করছে। প্রথম দুটো টেস্ট ম্যাচে হেরে সিরিজ হারের আতঙ্কের সামনে দাঁড়িয়ে। সঙ্গে টেস্টে এক নম্বর স্থানটাও নড়বড় নড়বড় করছে। এসব শুনতে আপনার ভালো লাগছে না জানি। লাগার কথাও না! আপনি নির্ঝঞ্ঝাট, শান্তিপ্রিয় মানুষ। এত জটিল বিশ্লেষণের মধ্যে অহেতুক ঢুকবেনই বা কেন! তবু আপনাকে বলছি, কারণ আছে আমার বলার। হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম। আপনার দেশ তখন বিশ্বক্রিকেটে প্রায় নতুন সম্রাট; একাধিপত্য জাঁকিয়ে বসার অপেক্ষায়। শুধু কয়েকটা হার্ডল টপকানো। সেই অবস্থায় ইংল্যাণ্ডের সাথে সিরিজ। কোন একটা কাগজ কেবল বলেছিল, ইংল্যান্ডেরও এক নম্বর জায়গাটা পাওয়ার সম্ভাবনা, তবে তা বড়ই ক্ষীণ। ভাবলেও কি আশ্চর্য লাগে, আমাদের শহরে যখন এল, তখন সেই ক্ষীণ সম্ভাবনাটাই উজ্জ্বল হওয়ার অপেক্ষায়। অস্তিত্বের সংকট। আর কী অদ্ভুতভাবে ওই একই সংকটের মুখোমুখি হলার আমরাও, একইদিনে। আপনাকে বলছিলাম না, যুক্তরাজ্যের সর্ববৃহৎ এশিয়ান কমিউনিটি আমাদের শহরে। ম্যাচের দিন ছিল মনে আছে, ১০ই আগস্ট। আর সেইদিনই রাত তখন একটা-
আপনাকে সংক্ষেপেই বলি। রাত তখন একটা। আমি আর বড় ছেলে তখন বাড়ির বাইরেই ছিলাম। একটা গাড়ি ক্র্যাশ করলে যেমন শব্দ হয়, সেরকম শুনে ছুটে গেলাম দুজনে। ততক্ষণে বার্মিংহ্যামে পেট্রোল স্টেশনে ডাকাতি হয়ে গেছে, সোশ্যাল ক্লাবকে কারা তছনছ করে দিয়েছে। তিনখানা দেহ দেখলাম কাতরাচ্ছে রাস্তায় পড়ে। প্রথম দেহটার কাছে গেলাম যখন, চিনতে পারিনি। মৃত্যুর কাছে এলে মানুষ বোধহয় অচেনা হয়ে যায়। পরে চিনলাম, শাহাজাদ আলি। গাড়ি ধুত। পাশেই ওর ভাই আব্দুল মুসাফির। রক্তে ভেসে যাচ্ছে, আমার সারা শরীর রক্তে মাখামাখি হয়ে গেল। তারপর তৃতীয় দেহটা। কালো লেদার জ্যাকেট, সাদা স্লিভ...খুব চেনা! বড় ছেলেটা চিৎকার করে উঠল। কার্ডিও পালমোনারি রেসাসাইটেশন। শিখেছিলাম একসময়। শুরু করলাম। নিজের ছেলের ওপর কোনোদিন করতে হবে ভাবিনি। ইমামসাহেব, ভাবতে পারেন, যত পাম্প করি তত ওর নাক দিয়ে ভলকে ভলকে বেরিয়ে আসছে রক্ত। তাজা, গরম-যেন আগ্নেয়গিরি সদ্য জেগেছে, গলিত লাভাস্রোত বেরিয়ে আসছে হু-হু করে, এখুনি গ্রাস করবে সবকিছু! তখন আমার পাগলের মত অবস্থা ইমামসাহেব, আমি কি ভাবছিলাম জানেন? ভাবছিলাম, ওই দুজনকে বোধহয় বেশি সময় দিয়ে ফেললাম, আর নিজের ছেলেটাকে...। আর ভাবতে চাই না ইমামসাহেব, আমায় ক্ষমা করুন।
ওরা দাঙ্গা থামাতে গিয়েছিল। ওই শাহাজাদ, আব্দুল আর আমার ছোট ছেলেটা। ও, ওর নামটা বলিনি, না? হারুন। অনেকটা আমার ধাত পেয়েছিল। ডাকাবুকো, নির্ভীক। সঙ্গে নিয়মিত যোগব্যায়াম করা সুঠাম চেহারা। দাঙ্গাকারীদের আটকাতে যাওয়ার আগে তাই দুবার ভাবেনি।... স্রেফ পিষে দিল ওদেরকে গাড়ি দিয়ে। হিট-অ্যান্ড-রান। কতই বা বয়স তখন ওর, একুশ। ওই বয়সেই বুদ্ধির পরিণতি দেখে অবাক হতাম। কত স্বপ্ন দেখত জানেন, অনেক বড়লোক হওয়ার।... যাক, সে কথা। বেশি ভাবব না ওর কথা! ভাবলেই...
এরপরের ঘটনাটা আপনাকে বলি। হাসপাতাল থেকে ফিরে আসছি। লোকে লোকারণ্য-পাড়ায়, আমাদের বাড়ির চারপাশে। সকলের মুখভঙ্গি দেখে বুঝলাম, প্রতিশোধস্পৃহায় ফুঁসছে। একবার শুধু আমার সম্মতির অপেক্ষায়। কিন্তু আমি আরও কি দেখলাম জানেন? আ সি অফ হারুন’স! ওর শেষমুহূর্তটা ভেবে বড্ড কুঁকড়ে যেতে চাইলাম। তবু বুঝছিলাম, আমাকে শক্ত থাকতে হবে, হঠকারিতা চলবে না। ঠাণ্ডা স্বরে বললাম-আরও কেউ যদি আমার অবস্থায় পড়তে চাও, তবে গিয়ে দাঙ্গা করো, আর যদি শান্তি চাও, তাহলে চুপচাপ বাড়িতে গিয়ে বসে থাকো। অনেকেরই আপত্তি ছিল প্রবল। আমাকে ভীরুও ভেবেছিল হয়ত কেউ কেউ। আমি জানি না, সেসব ভাবার মত অবস্থা আমার ছিল না। বিশ্বাস করুন ইমামসাহেব, আমি কোনওকালেই ধর্মপ্রাণ নই, মসজিদের চেয়ে পার্ক বা রেলস্টেশন বেশি পছন্দ করতাম। শখে বক্সিং করেছি এককালে। মার খেলে পালটা মার দেওয়াই আমার স্বভাব। সেই আমি কিকরে ছেলের এমন নৃশংস হত্যার পরেও শান্তি বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছিলাম, কে জানে? আপনি তো পরম ধার্মিক, জ্ঞানী, আপনি জানেন?
না, উইন্সন গ্রিন, বার্মিংহ্যামে আর দাঙ্গা হয়নি। ইমামসাহেব, এবার কি মিল পাচ্ছেন কোনও? আশা করি ধরতে পেরেছেন কেন বলেছিলাম আসানসোল আর বার্মিংহ্যামকে আমার খুব দূরে মনে হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর দরাজ সার্টিফিকেট, স্বয়ং রাজকুমারের ছুটে আসা, প্রাইড অফ ব্রিটেন-হাঃ, তুচ্ছ, তুচ্ছ, ইমামসাহেব। সমস্ত অর্থহীন। আপনাকে চুপিচুপি বলি, এখন জানেন তো, মাঝেমাঝে মনে হয়, সেদিন চেয়েছিলাম আইন আইনের কাজ করুক, সেটা বোধহয় ভুল করেছিলাম। পশ্চিমী দুনিয়াতেও বিচারের নামে প্রহসন চলে! যাইহোক...
হ্যাঁ, সবকিছুতেই আমরাই যাইহোক দিয়ে শেষ করি। আমি, আপনি, আরও যারা আমাদের মত। ধামাচাপা দিয়ে দেওয়ার একটা মরিয়া অভ্যেস, অভ্যেস ছাড়া আর কীই বা বলি বলুন একে! সেই অভ্যেসের বশেই তো বেঁচে থাকা।
মরে বাঁচা! আমি, আপনি, আরও যারা...
-ইতি,
নমস্কারান্তে, তারিক