এ ভরা দহন, এ পোড়া সহন

সরোজ দরবার




মূর্তিগূলো ভেঙে যাচ্ছে। এক এক করে। ভাঙনের ইতিবৃত্ত পাঁজরের ইতিহাস ঘেঁষে ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছে পরিচ্ছেদ। বাইরে, ভিতরেও। আর টকাস গলে যাচ্ছে ব্রণ। কৈশোর-পুঁজের নির্গমণ। ব্যথার মুক্তি। শুধু কালো ছোপটুকু থেকে যায়। সেটুকুই ভুলতে দেয় না। মনে করিয়ে দেয় অতীত এবং ঈশ্বর। ভুলতে দেয় না কী তুমি পেয়েছিলে, কী পাচ্ছ। আর কীইবা পেতে চাইছ। ফলত দহন। আগুন লেগে দাউদাউ। পলাশের বন নয়, মন গনগনে চুল্লি। তবু রাখঢাক। ভিতর পুড়ে খাক। বাইরে পোশাকে দাগ লাগে না, কর্পোরেট আশ্বাসে, অভ্যাসে। কেবল বুকপকেটে জমা কিছু ভাঙাচোরা দীর্ঘশ্বাস, আমার আমি, ভগ্নাংশে। এ শহরে কিছুতেই আর তা জোড়া লাগে না।
আমি ও আমার মূর্তি দুইই তাই ভাঙছে, এই মুহূর্তে। লেনিনকে যাঁরা ভালবাসতেন, পেরিয়ার বা আম্বেদকরকে তাঁদের অনেকে চেনেননি বা চিনতে চাননি, এককালে। ঐতিহাসিক আত্মশুদ্ধিতে পরে তা স্বীকার করেছেন। বুঝেছেন দেশের কাস্ট স্ট্রাকচার চিনে নেওয়ার মধ্যে বড় গরমিল থেকে গিয়েছে। এই যে না-চেনা, এই যে স্বেচ্ছায় অস্বীকার তার নানা ব্যাখ্যা মিলবে। কতকটা জোয়ারের টান, কতকটা আবার মতাদর্শে অন্ধবিশ্বাস। অথবা আর আর যা যা পণ্ডিতের ব্যাখ্যান, ছিল-আছে এবং থাকবেও, আমি বলি, এও এক মূর্তি ভাঙা। অস্বীকারের জোরে, না-চাওয়ার জোরে ভেঙে যাওয়া মূর্তি। লাঠি নেই, সমালোচনা নেই, প্রতিক্রিয়াশীল বলে তেড়ে ওঠা নেই। তবু তো ভাঙা, গোপনে। লালন করা তো নয়ই, বরং মনে মনে তছনছ করে এগিয়ে যাওয়া। তারপর জীবন গিয়েছে চলে কত কত বছরের পার। এখন একযোগে ভেঙে যাচ্ছে লেনিন- পেরিয়ার- আম্বেদকর। কী অদ্ভুত সহাবস্থান! এবার কি তবে দেশের কাস্ট স্ট্রাকচার স্থির হল এক বিন্দুতে বা এক সারণিতে? এবার কি তাহলে সেই সেদিনের স্বপ্ন, কাঙ্ক্ষিত বিপ্লব সম্ভব, আসন্নপ্রায়? আরে আরে রাম রাম! সে গুড়ে বালি। এই ফাঁপা, না মেলা হিসেবেই শর্ট সার্কিট। যে কোনও আগুন লাগার প্রাথমিক অনুমান।
বাইরের কথা থাক। ঘরের কথা পাড়া যাক। এই যে ব্রণকাল পেরিয়ে এলাম, সেই নিস্তরঙ্গে, নিভৃতিতে, একান্তে বুকের ভিতর তো আমিও কিছু মূর্তি তৈরি করেছিলাম। কিছু বইয়ের মলাটে আঁটা স্টিকার। কিছু দেওয়ালের পোস্টার। আর বাকি যা বস্তুতে অপ্রকাশ্য, সেই মাটি ছেনে বুকের চাতালে আরাধ্য নির্মাণ। একটা গিটার কিংবা একটা মাউথ অর্গ্যান। একটা শার্ট খোলা জামার ঔদ্ধত্য। একটা মাইক্রোফোন ধরা হাত কত স্বপ্ন না দেখিয়েছিল! মনে হয়েছিল, অনেক কিছুই সম্ভব। তারপর একদিন ব্রণ গলে, বয়স বাড়ে। আমি বুঝে যাই, পয়সা দিয়ে সবই পাওয়া যায়, প্রফেশনাল রাগ-ঔদ্ধত্য কিংবা মূর্তির রং। একটা করে মুখ কৃষ্ণচূড়ার মতো ঝরে ঝরে পড়ে। স্বপ্নের পথ লালে লাল। তারপর একটু বয়স্ক বাতাস খেলে যায়, আনমনে, বা উদ্দেশ্য পূরণে। সময়েরই ষড়যন্ত্র। দেওয়াল লিখন পড়তে ভুল করে আমার মূর্তিরা, কারণ স্থবিরতা, কেননা জঙ্গমতা ততদিনে ঢেকেছে মূর্তির চোখ। পাপড়িগুলো উড়ে যায়। কালো রাস্তা দাঁত বের করে হেসে ওঠে। আমি দেখি, মূর্তিগুলো সেই কালোর উপর বসে পড়েছে কোন্দলে। আর স্বার্থ ঠোকাঠুকিতে ভেঙে গেল আমার সাধের মূর্তি। কে তার দায় নেবে! কেউ না। মূর্তি তো কেউ বানাতে বলেনি। ভাঙার দায়ও তাই কারও নয়। আমি একা একা পুড়ে যাই দহনকালে।
এ এমন একটা সময় যখন কিছুতেই কম্পাস মেলে না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যখন যাঁরা যে সময়ের মধ্যে বাস করেন, তখন তাঁদের কেইবা এ ধরনের অনুভূতির শরিক হন না? ব্যক্তিগত কম্পাসের রোজনামচাগুলো হাতে পাওয়া গেলে, কমবেশি সববয়েসি মানুষই হরেদরে একই কথা বলবেন। তবু নয় নয় করেও কিছু তো ছিল। এই যে আম্বেদকর, পেরিয়ারকে না চেনার মধ্যেও লেনিন ছিলেন, তীব্রভাবে। বেঁচে থাকার বিশ্বাস ছিল। হেমাঙ্গ বিশ্বাস এবং দেবব্রত বিশ্বাসও তো ছিলেন। কিন্তু এখন সব মূর্তিই ভাঙা। ঘরে এবং বাইরে। আজ আর কারও কাছে গিয়ে দাঁড়াবার জায়গা নেই। ফলে জল নেই। অন্তর জ্বলছে, কিন্তু নিভছে না। অহরহ লঙ্কাকাণ্ড। অথচ এই বিশ্বাস করেই আমাকে বেঁচে থাকতে হয় যে, পৃথিবীর তিনভাগ জল। কী ভণ্ডামি! কী চরম অবিশ্বাসের ভিতর আমার শ্বাসবায়ুর কেবল যাওয়া-আসা। স্রোতে ভাসার অবিশ্যি জো নেই।
সুতরাং অন্ধকারে হাতড়ে মরা। আলো নেই। কেন নেই, কে বলল? হিসেবমতো দেশের সব গ্রামে তো বিদ্যুৎ পৌঁছে গিয়েছে। সস্তার ইন্টারনেট দেওয়া হয়েছে, তুমি ইন্সটাগ্রামেও ঝলমলে। ক্রেডিট কার্ড দেওয়া আছে, চাইলে যাওগে শপিং মলে। খাও-দাও, বেডরুমে বাতকম্মো করো। তোমার আবার ক্রাইসিস কীসের হে! নাছোড় মাছি শুধু কিছু তথ্য। বলে, একটা গ্রামের মোট বাড়ির সংখ্যার দশ শতাংশ ঘরে বিদ্যুৎ গেলেই খাতায় টিক পড়বে। আলোকায়িত, আলোকায়ন। আমার ঘরটা যদি তাতে অন্ধকার থেকে যায়! দেশের তাতে কী হে! এই জন্যই সব তথ্য ঝেঁপে দিচ্ছে থার্ড পার্টি অ্যাপ। পলিটিক্যাল পার্টি যেখানে কেঁচো, স্বদেহে সঙ্গমরত, খায় আর খেতে দেয়, সেখানে তথ্য হাতিয়ে নিয়ে পালাবে না তো কী! আজকের বেওসা নাকি? সেই কবেকার। সবাই সব জানত। শুধু কুমীরের চোখে গ্লিসারিন দিতে হবে লাইভ করে, দুনিয়া দেখবে কিনা! মোদ্দা কথা, এসব ভাবলেই কোষ্ঠকাঠিন্য। বরং দেখ, মেজরিটি কী করছে, কী ভাবছে। তুমি যদি প্রশ্ন করো, গণতন্ত্র কী? মেজরিটি চুপ করে থাকবে আর ফিকফিক হাসবে। তোমাকে বুঝে নিতে হবে, উত্তরটি হল ধোঁকার টাটি। অর্থাৎ আসলে কিছুই নয়, ক্ষমতার ক্ষমতায় থাকার একটা দু ছক্কা পাঁচ হল গণতন্ত্র। সেই-ই আসলে মুষ্টিমেয় কিছু কঞ্চিকে এক বান্ডিলে বেঁধে বলে, এই দেখ মেজরিটি। এই বান্ডিলই ক্ষমতাকে নির্বাচিত করে। ক্ষমতা গণতান্ত্রিক শুদ্ধিকরণে বাহারি জ্যাকেট পরে বিদেশভ্রমণে যায়, আলিঙ্গন করে, বিরিয়ানি খায়। এই সহজ সত্যিটা বুঝে গেলে, ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হওয়া নিয়ে আর বিশেষ ভাবার কিছু থাকে না। দেশের টাকা হাওয়ালা হয়ে বিদেশ থেকে ফিরছে কিনা আর বিয়ার কোম্পানির মালিক পরবাশে ‘ এ স্বদেশে রবে কে...’ গাইছেন কি না, এসব নিয়ে মাথাব্যথার কোনও দরকারই পড়ে না। সবকিছুর বেসরকারীকরণ হবে কিনা, লালকেল্লা ডালমিয়াদের দত্তক সন্তান হল কেন, এসবও গৌণ হয়ে পড়ে। সোজা হিসেব, ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন। তুমিও যাও। কিন্তু ঐ যে হাড় জ্বালানে বাতাস। যে কিনা আমার কৃষ্ণচূড়ার পাপড়িগুলো উড়িয়ে দিয়েছিল। সেইই ক্রমাগত বয়ে বেড়ায়। আর আগুন ছড়ায়। অস্থি থেকে মজ্জায়।
মাজা ভেঙে গেছে বলেই আসলে দাঁড়াতে অসুবিধা হয়। এ দেশটাকে শুষতে এসেছিল একটা বেসরকারি সংস্থা। তারপর পরাধীনতা। সেই যে বিষ ঢুকল, আর নামল না। ঝাড়ফুঁক দেদার হল। নীলচে ভাবও কেটে গেল। মনে হল যেন, সুস্থ। কিন্তু আদতে দেখা গেল বিষের সূক্ষ্ম ক্রিয়ারা সব মজ্জায় ঢুকে মাজা ভেঙে দিয়েছে। ফলে আজও কিছু বেসরকারি সংস্থাই ছিনে জোঁক। রক্তের দেখা নেই। অতএব প্রতিরোধ নেই। অবাধ এক্সপ্লয়টেশন। তুমুল জনবিস্ফোরণ। নো ইউনিয়ন। কোন এক অদৃশ্য সুতোয় সব বাঁধা। উঠছে, নামছে, খাচ্ছে-দাচ্ছে, সঙ্গম করছে কিছু মানুষ-পুতুল। তাদের বেশি কিছু ভাবার নেই। ভাবার সময়ও দেওয়া হয় না। যাতে ভাবতে না পারে সেদিকে বিশদ নজর দেওয়া হয়। হ্যাঁ, ভাবনা ছাড়া মানুষ বাঁচে কী করে! ভাবুক, সকলে একসঙ্গে ভাবুক, এক রাস্তায়। সোনা লিখলে কী করে লাল হল, গোপনে কে আমাকে সারহাতে শুয়োরের বাচ্চা লিখে পাঠাল, তা নিয়ে রগ চেপে বসে পড়ো...সেই বা কম বড় ভাবনা কী! আর কোথাও বেচাল দেখলে, উলটো স্রোত হলেই বয়কট করো। অর্থাৎ আমরা যা ভাবাচ্ছি তাই ভাবো, যেরম ভাবাচ্ছি সেরম ভাবনায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠো- মেনে নাও সিরিয়ায় হামলা মানবজাতির স্বার্থে প্রয়োজন ছিল এবং কাঠুয়ায় কোনও গণধর্ষণ ইত্যাদি হইনি। এভাবে মেনে নিলেই তোমার শিরদাঁড়া তুঁষ হয়ে ঝরে যাবে, আর একদিন তুমি চমৎকার বায়বীয় হয়ে উঠবে। আর যদি প্রশ্ন করো? মাও দমনের নামে কত কোটি বরাদ্দ হয়, জানোনি বুঝি? আচ্ছা, ওসব ছাড়ো। বলি, ধার্মিক মহাযোগীও যে এনকাউণ্টারে দড় সে কথা ভুলে গেলে! ফেক এনকাউন্টার থেকে ফেক কথাটা তুলে নিউজের আগে চাপিয়ে দিলেই সব বৈধ। তাজমহল আসলে তেজোমহলই ছিল এবং মহাভারতের যুগে ইন্টারনেট ছিল, এ তুমি মানবেই মানবে।
মেনেই তো নিচ্ছি। এক মুখে আমি আর কত কথা বলব! তবে হ্যাঁ, মুখপত্র আছে। কিন্তু সামনে জ্যোতির্ময় দে এবং গৌরী লঙ্কেশের দুটো ছবিও টাঙানো আছে। ওদের চিনতে আর নিজেকে চিনে নিতে ভুল কোরো না। কত ধানে কত চাল! ছাড়ো, বরং আইপিএল- কোহলি আর চাহাল, ফ্রন্ট পেজ, মন্দ কী! পেটোয়ারা প্রশ্ন করে না। প্রশ্নকারীরা পেটো দেখলেও ডরায় না। সুতরাং ওই জ্যোতির্ময় বা গৌরী। সাংবাদিকদের স্বাধীনতার সূচক কমছে। তাতে দেশের কী? তাহলে দেশটাই কী? দেশ সেটাই যতক্ষণ আমি সেটার ক্ষমতায় আছি। আমি সরে গেলেই সে আর আমার দেশ নয়, আমার বিরোধিতার ভূমি। আমার ক্ষমতা দখলের মল্লযুদ্ধের আখড়া। সুতরাং ভবিষ্যতে কী হবে না হবে তা নিয়ে ভেবে লাভ নেই, আমার ক্ষমতাকে আমি তো পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করবই। এর মাঝখানে আবার প্রশ্নের ডেঁয়ো পিপড়ে কেন? কেন সৃষ্টির চোঁয়া ঢেকুর! সৃষ্টি সেটাই, যেটা আমার কথা বলবে। দরকারে আমি পুরষ্কার দেব। এই আমার মনের বাত। বুঝলে বোঝো, নইলে ফোটো। ‘এ দেশ তোমার-আমার’, কে বলল ভাই? দেশ আমার, তোমাকে বাস করার ভূমিটুকু দিয়েছি মাত্র। আর মনে রেখো তোমার কোনও মূর্তি নেই, আরাধ্য নেই। সুতরাং তোমার দহনে কোনও জল নেই। সয়ে নাও, যতটুকু মেনে নিতে পারো।
তবু একদিন সহনের মোম গলে। ক্ষয়ে ক্ষয়ে টেবিল ক্লথের প্রান্তে গিয়ে পড়ে। এবার একটা অগ্নিকাণ্ড হবে? উশখুশ করে মন। চক্রব্যুহে ঢুকে তবু বেরনোর মন্ত্র থাকে না। পিত্তি জ্বালানো সেই বাতাসটা ফিরে এসে আগুন নিভিয়ে দেয়। জানত না, তাতে শাপে বর হবে। মোমপড়া নাকি মনপড়া তীব্র কটূ গন্ধে ভরে ওঠে বাতাস। পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে পড়ে ঘর থেকে ঘরে। এ ভরা দহন, এ পোড়া সহন, তবু দেওয়াল আর পিঠ এক হলে, ঘুরেই দাঁড়ানো। আমি বুঝি, ওই ঘুম ভেঙেছে। ওই আবার কৃষ্ণচূড়া ঝরছে, পথ লালে লালে। ওই আবার বুকের দালানে তৈরি হচ্ছে প্রতিমা। হয়তো এসবই আবার সময়ের আবর্তে সোনার হরিণ হবে। তবু এই মুহূর্তে এসবই হচ্ছে। সশব্দে ফেটে যাবে বলে কিছু যেন অপেক্ষা করছে। কিছু একটা হবে, হতেই হবে, কিছু একটা হোক। লাগে সময় লাগুক, সেই অবসরে কবচের ভিতর তুলোট কাগজে আমি লিখে রাখি,
সন্তানকে বলে যাবো, ঘৃণা কোরো তাকে
যে তোর পিতার আত্মা কিনে নিয়েছিল
যে পিতা রক্তাক্ত অন্ন দিয়েছিল মুখে। (শিশিরকুমার দাশ)

অবলুপ্ত চতুর্থ চরণেই আমার আগামীর জন্ম। আমার আর কোনও মূর্তির দরকার নেই। আর কোনও ভয় নেই আমার।