মেঘ থেকে সাড়ে তিন ফার্লং দূরে...

তমাল রায়



মেঘ থেকে হাফ ফার্লং দূরে...ওই যে ট্যারেট থেকে পাখি উড়ে গেল, ওই যে সর্বাঙ্গে দগ্ধ চিহ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে। হুঁ ওটাই আমাদের বাড়ি ছিল! হয়ত এখন তাহাদের নিবাস। যাদের গাছ বলেই চিনেছি। সেই গাছ, গাছেরা, আর অনেকটা কুয়াশা- সেই যখন কুয়াশা ঘনাতো, মানুষকে মানুষ বলে ঠিক ঠাহর করা যেত না! হয়ত সেই তখন তাহারা বৃহন্নলা! বাড়িঘরগুলো কালো, ঝাপসা হতে হতে একরৈখিক। হয়ত ইঁট কাঠ পাথর, কিন্তু রিফিউজ নয়! আলোর খুব অভাব। দ্রুত পালটে যাচ্ছে পোশাক। লাল থেকে সবুজ, অথবা সবুজ থেকে গেরুয়া। পুরুষ পুরুষ নয়। স্ত্রী স্ত্রী নয়...রাত পার্টিতে যেভাবে হাঁ করলেই বেরিয়ে আসে আঁধার...আর সবাই তখন নাচছে, সুরা, সুরাইয়া, হুল্লোড়...

মেঘ থেকে এক ফার্লং নীচে, সেখানেই তাহাদের ঘোরা ফেরা চলন, আর কে'না জানে চলন মানেই বক্র। প্রতিটি পদক্ষেপ, ঘর্ষণ, সামান্য চ্যুতি, কোণ বদলে যায়, যে সোজা যাবে ভেবে এতটা সময় ব্যয় করল, সে ভুলে গেল সূচনাক্ষণ। ডিজএরেড হয়ে চলেছে ক্রমশ, ধর সে যদি পেছন ফেরে, না আর দেখা যায় না, যাত্রাবাড়ীর প্রথম প্রতিশ্রুতি! সেই তখন নেমি দোরজি বা কেউ হয়ত পাহাড় ভাঙছে, পিঠে পর্যটকের ব্যাগ, পাশে পর্যটক! আর, পাহাড়। লক্ষকাল ব্যাপী তার নির্মাণ ধারাবাহিক... ভেতরে কম্পন, প্লেট পাল্টাচ্ছে প্লেট, সেই তখন তাহাদের পর্যটকও থামতে, উঠতে, থামতে বেয়ে উঠছে পাহাড়। প্রতিটা দিন আদতেই এক পাহাড় বয়ে নিয়ে চলা, কপালে ঘাম, হাঁ মুখ প্রশ্বাস ছাড়ছে দ্রুত... তবু চলা, ওই দূরে হয়ত মায়াবী কাঞ্চন; কাঞ্চনজঙ্ঘা। ভোরের আলো এসে পড়বে বরফে মোড়া শৃঙ্গে, মুখে হাসি। ভোর হয়? আলো আসে? মেঘ থেকে কতটা দূরে এসব ওঠা নামা, ঘাম রক্ত, কাম ক্রোধ, আর আলোয় না ভেজা পাহাড়! নেমি আর পর্যটক। মুখ দেখা যায় না। কবন্ধ। কবন্ধ সেই তখন, গড়িয়ে নামছে কবন্ধ সময়...

মেঘ থেকে সাড়ে দু ফার্লং পশ্চিমে, পাহাড় উলটে আছে। আর হ্যানা ত্যানারা গোল করে মশগুল। গুপ্ত পরামর্শের মত মশার গুঞ্জন। তাহাদের পোকামাকড়রা যেভাবে ডেরা বাঁধে। ডেরা থেকে পাঠানো হয় সংকেত। সংকেত > সাংকেতিক > সংকেত অভিমানের পশরা সাজিয়ে পিকনিক চলছে! নালে এবং ঝোলে এখন সুসংবাদের মত রাত! তাহাদের পিকনিক স্পটের নাম পার্লামেন্ট। হ্যানারা ত্যানারা যে শতরঞ্চি বিছিয়ে মৌজ করে বসে, নামিকা রাজত্বে, তারও একটা পোশাকি নাম আছে - সংবিধান। আপাতত মাটি ওপরে, আকাশ নীচে। ওরা আকাশে বসে মুরগি রাঁধছে, বন ফায়ার। ওরা মানুষ ছিল! এখন লাল, সবুজ, গেরুয়া। কে যেন সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। মুখে বলল- আহা মৃত্যু। জ্বালানী দেশলাই কাঠি বেখেয়ালে, না'কি খেয়ালেই আকাশের গায়ে পড়ল। তাহাদের ধূমপানের সঠিক পদ্ধতি হয়ত এটিই! এবার ঘৃণার মত বাতাসের মত আগুন, অবশ্যম্ভাবী আগুন ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে... হ্যানারা তেনারা হাসছেন। হাহা হিহি হোহো... কিছুটা দূরে ধর্ম ঠাকুরের গায়ে নামাবলী। আগুনই তার প্রিয় বাহন। ওপরের বস্তিতে এবার ছড়িয়েছে আগুন। আগুন দাবানল হলে হোসপাইপ দিয়ে ধর্ম ছড়ানো দস্তুর! আকাশিয়া পিকনিকে এবার রাজ অভিষেক। হ্যানা আর ত্যানারা দুম দাম পটকা ফাটাচ্ছে। আগুন - আহত পক্ষীর নাম, বিবেক। সে উড়তে উড়তেই মলত্যাগ করল। রুটি আর করোটি, সুরা আর অ-সুর। মণিহীন চক্ষু থেকে এবার তাচ্ছিল্যের আগুন নামলো। এতক্ষণে তথাগত, আর যীশুর ঘুম ভেঙেছে। মাটিতে দাঁড়িয়ে তারা কিসব বলছেন! মাঝে গোরু, ভেড়া আর শুয়োরের পাল চলেছে আকাশের গা বেয়ে। সামনে মেষ বালক গ্যালিলিও, আর বালিকা জোয়ান অব আর্ক। তারাও কিসব বলছেন। যেহেতু আকাশ আর মাটির মাঝে বহমান বাতাস খুবই কম, তাই শোনা যায় না। ঈশ্বরওতো মহাশূন্যে স্থবির। যেমন মাধ্যমহীনতায় শব্দ দুর্বোধ্য! মাংস পোড়া গন্ধ আসছে। সংবিধানে বসে, পার্লামেন্টে ওরা চিবোচ্ছে হাড়গোর মাংস, চিবনো চলছে...

মেঘ থেকে তিন ফার্লং উত্তরে, না কোনো ধ্রুবতারা নেই। অবিবেচক রেতঃপাতের মতই থম মেরে আছে কবিতা। গার্হস্থ হাড়ি পাতিল ছড়ানো ছিটনো, এখানে পিকনিক হয়েছিল। ছড়ানো হাড়, মাংস টুকরো, ছাইভস্ম। দূরে নারীরা, যারা ওঠা বা নামার চেষ্টায় ছিলেন, তারা প্রস্তরীভূত। সারা শরীরে রক্ত - আলপনা। পোশাকআশাক নেই। সে প্রবল দহন আর গ্রীস্ম, আর বলাৎকার এর মত তাহাদের মধ্যযামে আবরণহীন ধরিত্রী। পুরুষদের ক্লীবতার দীক্ষাগুরু, স্যাভিয়ার অব দ জেন্ডার স্যর এডলফ হিটলার! মার্কিন ব্ল্যাক উইচের কাছ থেকে আকাশে উড়েছিল একটা ম্যাজিক পাপোশ। আকাশ যখন মাটি। মাটিই আকাশ। আর পাপোশ তো আকাশেই উড়বে ভীরু স্কেপটিক পায়ের স্পর্শে এপোক্যালিপ্টিক বাতাসে, ম্যাজিক পাপোশ পাখির মত উড়তে উড়তে তাহাদের পুরুষদের ঘাড় নাড়া বৃদ্ধ বানিয়ে ছেড়েছে। তারা ঘাড় নাড়ে আর বলে আগুন - আগুন। ভয় - ভয়! কৌপিন, কমন্ডলু, তাগা, তাবিজ, মাদুলি আর কালো জোব্বা পরিহিত কারা মন্র পড়ে দিচ্ছে... প্রজাপতি নেই, চৈতন্যর কলসি ভাঙা। আর উষ্ণায়ণ, ঘাম, নুন। শোনা যায় দুনিয়া নির্মাণের সময়ও নাকি এমন লবণিমাময় ছিল কুসুম। কে যেন হাঁক পাড়ছে...কুসুম...কুসুম...কু সুম...

মেঘ থেকে সাড়ে তিন ফার্লং পুবে বসে দালি আঁকছেন টাইম। ভাঙা চোরা, গলে যাওয়া সময়, সেই তখন তাহাদের সময়ে খুব উষ্ণতা, দহন। বেদব্যাস কলম খুলে বসেছেন। লিখছেন দহন - মহাকাব্য, ইনফার্নো। সেই তখন খুব উষ্ণতা। দহন! মহামতি ওপেন হাইমার এটমিক বম্বার্টমেন্ট করার আগে ফের বলে উঠছেন - আই এম বিকাম ডেথ। দ ডেসট্রয়ার! তবু, তাহাদের আকাশেই ট্রান্সডেন্টাল...কে যেন ফের ডাক পাড়লো কুসুম কুসুম...ভিক্ষা দাও। জল দাও...
বৃদ্ধ সক্রেটিস নিজেও দগ্ধ। তবু তাহাদের এম্পিথিয়েটার থেকে বার করে আনছেন একে একে পুড়ে ঝলসে যাওয়া সময়দের।
সকলের অলক্ষ্যে পুর্বদিগন্তে চে'র মত সাড়ে তিন ফার্লং মেঘ। কে যেন আবার ডাকলো কুসুম কুসুম ভিক্ষা দাও, জল দাও, বিপ্লব।
এক ফোঁটা জল এসে পড়ল। এতদিন অপেক্ষার পর, জল নামছে বারিধারায় । দ্বৈপায়ন হ্রদ। না'কি কৃষ্ণগহ্বর থেকে ইত্যবসরে বেরিয়ে এলো কালী, না'কি মহাকাল।
হু হু করে ঠান্ডা ঢুকছে এবার। বরফ। বরফ। ঢেকে যাচ্ছে সব। তাহাদের নেমেসিস...
ওই যে ট্যারেট থেকে পাখি উড়ে ছিল, সে এখন ফ্রিজড। ওই যে সর্বাঙ্গে দগ্ধ চিহ্নে বরফের পলেস্তারা নিয়ে দাঁড়িয়ে। হুঁ ওটাই আমাদের বাড়ি ছিল! পরে, অনেক পরে, হয়ত জমা বরফ গলবে। জেনেসিস। নোয়ার নৌকো আসবে। এতটা দহন শেষে একটা প্রেইরী অঞ্চল নির্মাণ হবে ফের।
তাহাদের লাল, সবুজ, গেরুয়া হ্যানা ত্যানাদের ফিউনেরাল প্রস্তুতির মাঝে, ধর্ম আর অসহিষ্ণুতা নামক টিকরমবাজিকে অগ্রাহ্য করেই, বেয়াদবি মাফ করবেন, গুস্তফি মাফ করবেন, এবার অনলাইনে আমাদের ঐহিক 'দহনকাল' শেষের প্রত্যাশায়। অনেক নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ, অনেক হতাশার আগুন, তবু একটি ফিনিক্স পাখির স্বপ্নওতো দেখে মানুষ! কি বলেন ওস্তাদ?

নদী বইছে কতদিন পর এই উলটানো সময়ে...মন্দাকিনী...
.