ডলের মা

শল্মা ঘোষ



শ্রীরূপা বলেছিল
- মিতা, একটা কথা মনে রাখবি, কখনো বাচ্চার জন্য নিজের জীবনে বড় কোনো স্বার্থত্যাগ করবিনা। তাহলেই আক্ষেপ থেকে যাবে, আর একটা সময় আসবে যখন মনের এইসব ক্ষোভগুলো অবিরত ছেলেমেয়েদের ওপর আছড়ে পড়বে।
সুমিতা অবাক হয়ে শুনছিল শ্রীরূপার কথাগুলো।
- কিন্তু সবাই তো উল্টোকথা বলে রে। বাচ্চাকে বড় করার জন্য মা বাবাকে অনেককিছু নাকি ছাড়তে হয় জীবনে!
- কখনোই না। শ্রীরূপা দুম করে টেবিলে একটা ঘুঁসি মেরে বলল।
দুই বন্ধুর এমন কথপোকথন আজকাল প্রায়ই চলে। আসলে সুমিতা সদ্য সদ্য মা হয়েছে, আর শ্রীরূপা একটা বাচ্চাদের NGO তে কাজ করার সুবাদে বাচ্চা মানুষ করা সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান অনবরত সুমিতাকে দিয়ে চলেছে।
কথাগুলো একটু কানে কেমন স্বার্থপরের মত শোনালেও মনে রেখেছিল সুমিতা। তাই যখন অনিরুদ্ধ র সঙ্গে সম্পর্কটা একেবারেই নষ্ট হয়ে গেল আর ন’বছরের সংসারজীবনটা ছেড়ে বেরোনোর সিদ্ধান্ত নিল সুমিতা, তখন প্রতিটা আত্মীয় স্বজন মুখ ফিরিয়ে নিলেও সন্তানের কথা ভেবে ‘স্বার্থত্যাগ’ করেনি সুমিতা। বরং পাঁচ বছরের কন্যা আদৃতাকে জিজ্ঞেস করেছিল
- মামমাম যদি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, ছোট্ট ডলসোনা কী করবে? এখানে থাকবে? মাঝেমধ্যে মামমামের সঙ্গে দেখা করতে যাবে?
খেলনা গাড়ি চালাতে চালাতে ডলের উত্তর
- মামমাম তো বলেছে ডলসোনা নাকি মামমাম পেটু কেটে বের হয়েছিল।
- হ্যাঁ তো।
- তবে তো ডলসোনা আসলে মামমামের টুকরো। মামমামের টুকরো কি মামমামকে ছেড়ে থাকতে পারে?
তারপর খাটে উঠে সুমিতার গলা জড়িয়ে গালে গাল ঠেকিয়ে ওইটুকু মেয়ে প্রবোধ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলো
- মাম্মা, তুমি যেখানেই যাবে আমি তোমার সঙ্গে যাবো। তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও থাকবোনা।
এরপর সিদ্ধান্তগুলো নিতে সুমিতার আর দেরী হয়নি।
তবে কখনোই সুমিতা আটকায়নি ডলকে। অনিরুদ্ধর কাছাকাছিই একটা ফ্ল্যাট নিয়েছে, যাতে বাপমেয়ের সম্পর্কটা অটুট থাকে, ডল যাতে কখনোই নিজের বাবাকে অবহেলা না করে। আর অনিরুদ্ধ সুমিতার যতই ঝামেলা হোক, অনিরুদ্ধ তো মেয়ে অন্ত প্রাণ।
যখন প্রিয়াংশুর সঙ্গে পরিচয়টা ঘন হল, দুজনে একসঙ্গে থাকবে সিদ্ধান্ত নিল, তখনো সুমিতা সবার প্রথম মেয়েকেই জানিয়েছিল, অবশ্যই তার মত করে।
ডল বলেছিল
- এটা তো তোমার ইচ্ছে মামমাম। আর আমি তো চিনি আঙ্কেলকে। তুমি কিছু বলোনি বলে আমি জিজ্ঞেস করিনি।
সুমিতা অবাক হয়ে গেছিল সাড়ে ছ বছরের মেয়ের এমন সুঠাম উত্তরে।
তার কিছুদিন পরে সুমিতার প্রথমপক্ষের স্বামী অনিরুদ্ধ আবার বিয়ে করে। ডল রীতিমতো হৈ হৈ করে বরযাত্রী যায়। অনিরুদ্ধর নতুন স্ত্রী পাপিয়ারও একটা কষ্টের অতীত আছে। সে অকালে বিধবা হয়। বেচারির আগেরপক্ষের মদ্যপ বর লিভার পচে মারা গেছে বেশ কবছর। পুত্র ছোট্ট অর্ককে নিয়ে যখন পাপিয়া দ্বিতীয় স্বামীর ঘর করতে এলো তখন সবচেয়ে আপন মনে হয় এই পুঁচকে ডলকেই। আর ডল তো মহাখুশি অর্কর মত একটা গোটাগুটি ভাই পেয়ে। সুমিতার সঙ্গেও পাপিয়ার সুসম্পর্ক, অনিরুদ্ধ আর প্রিয়াংশুও মৌখিক হৃদ্যতাটুকু সবসময়ই বজায় রাখে। আর আদৃতা একটা বড়সড় পরিবারে বড় হচ্ছে।
ওর কথা অনুযায়ী
“Sunday মানেই তুমি আর বাবা ঝগড়া করতে। উফ্ আমি ভাবতাম Sunday গুলো কেন আসে। তার থেকে এখন আমি খুব খুশি।“
শ্রীরূপার সঙ্গে হোয়াটস্ আপে মেসেজের মাধ্যমে কথোপকথন চলছিল সুমিতার। চিরকালের ডাকাবুকো শ্রীরূপার নতুন নেশা চেপেছে ট্রেকিংয়ের। হিমালয়ের কোলে কোন এক সুদূর গ্রামে বর্তমানে আস্তানা গেড়েছে শ্রীরূপা আর তার দলবল। কখনো সখনো নেটওয়ার্ক পেলে দুটারটে কথা হয় দু’বন্ধুতে।
সুমিতা সেদিন এক দীর্ঘ চিঠি লিখেছিল শ্রীরূপাকে।
“জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আমরা অহেতুক “ লোকে কি বলবে “ সেটা ভেবেই জীবনটা আরো জটিল করে ফেলি রে। বাচ্চারা জীবনটাকে অনেক সহজ করে দেখে বলে ওদের দৃষ্টিভঙ্গিটাও স্বচ্ছ। সব দোষ মায়েদের ওপর চাপিয়ে লাভ আছে? যত এগোচ্ছি তত জীবনযাপন কঠিন হচ্ছে । তার মধ্যেই যতটা সম্ভব ভারসাম্য রেখে আজকের মায়েদের চলতে হয়। তা বলে তাদের নিজের জন্য বাঁচাটুকুকে তো ছেড়ে দিতে বলা ঠিক নয়। তাদেরও তো কিছু চাওয়াপাওয়া আছে। তবে বাচ্চাদের সঙ্গে যদি ছোট থেকেই একটা স্বচ্ছ সম্পর্ক বজায় রাখা যায় তবে ওরা কিন্তু যথেষ্ট সাহায্য করে সব পরিস্থিতিতেই। তুই একসময় যে উপদেশটা দিয়েছিলে সেটা আমার জীবনে এমন বড় করে দেখা দেবে তখন বুঝিনি জানিস। কিন্তু মনে রেখেছিলাম, আর সে’জন্যই আমার কোনো ক্ষোভ নেই জীবনের চাওয়া পাওয়াগুলো নিয়ে। ডলসোনাও বোধহয় সেই কারণেই একটা খোলামেলা পরিবেশে বড় হতে পারছে, ওর মধ্যে কোনো দ্বিধা নেই, সত্যটাকে কোনোরকম ভণিতা ছাড়াই ও গ্রহণ করতে শিখেছে।“
গভীর রাতে উত্তর এসেছিল,
- জানি রে। আর এটাও জানি... তোর মত মায়েরা কিন্তু দশভুজাই আছে।