এলোমেলো শাঁখ

সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

মা গো! ও মা! তুমি কোথায়? মাআআ! ও মা!
চিৎকার কর তুই! কেন যে একে পেটে ধরেছিলাম, ঊফফ! আজ না থাকলে কোন ঝামেলা পোহাতে হত না। বাড়ি থাকলেই মা আর মা! যেন মা-ই সব। উত্তেজনার চাপ প্রবল হলে সময় নাকি খুব দীর্ঘ হয়ে যায়, কিন্তু যতই দীর্ঘ হোক না কেন, এক সময় তা ফুরিয়েও যায়। লিপির মন নেই কোথাও। জানলা দিয়ে দূরে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। “ ঝকঝকে সোনা রোদে কী সুন্দর মা পাখিটা তার বাচ্চাকে ঠোঁটে করে খাওয়াচ্ছে...ওই তো! ওই তো! বাবা পাখিটাও এসে পাশে বসেছে। গাছে গাছে বসন্তের উঁকি ঝুঁকিতে পাখিগুলো মত্ত।” আনমনা হয়ে গেল লিপি। জুয়োলজি নিয়ে মাস্টার্স করার জন্য ছেলে আর মেয়ে পাখিদের ও একটু ভাল করে দেখলেই বিশ্লেষন করতে পারে। পাখিদের মধ্যেও ছেলে পাখিরা মেয়ে পাখিদের প্রেগ্ন্যান্ট করেই মুক্ত জীবন যাপন করে। মেয়ে, নারী, অবলা......হুম!
বিছানা থেকে নেমে চার বছরের ছেলে কাঁদতে কাঁদতে এসে পেছন থেকে মা -কে জড়িয়ে ধরল। একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল শরীরে। তাকে জড়িয়ে ধরল বুকের মাঝে।
ও মা! ওমা! কি করছ? লাগছে আমার।
না রে পল । আদর করছিলাম। মা-এর আদর তো। মা কে ছেড়ে কোনদিন যাবি না তো, আগে বল?
তুমি বকবে না, তাহলে যাব না তোমাকে ছেড়ে।
নাহ! না! আর বকব না। আজ থেকে আর বকব না, দেখিস!
-প্রমিস! কচি কচি হাত তুলে High five করল।
প্রমিস! চল এবার। আমি বিছানা ঠিক করি আর তুই ব্রাশ করে আয়।
মা তোমার চোখে জল কেন?
ওহ! কিছু না। আমি তো উইমেন। তাই। জানিস পল! যখন তখন উইমেনদের চোখে জল আসে। তুই যখন বিগ বয় হবি উইমেনদের চোখে জল আসতে দিস না , কেমন?
ছেলে কি বুঝলো কে জানে? মাকে এবার নিজে থেকেই হাগ করল। মায়ের হাতের তেলোয় চুমু খেলো।
আজ তোমার ছুটি মা?
হ্যাঁ! রে সোনা! আজ আমার ছুটি। ছেলে ব্রাশ করে এসে খাবার টেবল এ বসতে না বসতেই লিপি ছেলের প্রিয় খাবার পরোটা, চিনি আর এক গ্লাস মিল্ক চকলেট এনে সামনে রাখল। ছেলের পাশে বসে তাকে খাইয়ে দিল ঠিক সেই মা পাখিটার মতন।
-জানো মা! কাল স্কুলছুটির পর বাস ড্রাইভার আমাকে বলল, “ রণির সাথে নামতে।” তুমি বলেছিলে ড্রাইভারকে আমাকেও ওর সাথে নামিয়ে দিতে? তাই আমি আর রণি এক সাথে নামলাম। ওর মা বাসস্ট্যান্ডে আমাদের নিতে এসেছিলেন। ওর পাপা তো ডাক্তার। তাই অফ ডিউটিতে ছিলেন বাড়িতে। পাপা আমাদের দুজনকে খুব ভালোবাসলেন। পাপা খুব ভালো জানো তো মা। আমাদের দুজনকে দু পাশে বসিয়ে কত কিছু শেখালেন। আর রণির মা-কে আমার খুব ভালো লাগে। দিম্মা কে যেমন দেখতে, ঠিক ওইরকম। কপালে একটা বঅড় রেড কালারের টিপ পরা। মা তুমি কেন পরো না?
লিপি চুপ করে গেল। বেশী কথা বললে আবার কী প্রশ্ন করে বসে। তাই তাড়াতাড়ি বলল, 'আমি তো অফিসে যাই। আর এদেশে ওসব টিপ, শাড়ি পরে না কেউ। পরে কি? তোমার ম্যা্ডাম পরেন কি?'
-রণির মাও তো অফিস যায়। তাহলে?
'বাড়িতে আছে তাই পরেছে। তুমি তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। একটু শপিং সেন্টারে যাব আজ।'
- তুমিও তো বাড়িতে আছো -পরো নি তো।
'এইবার আমার কিন্তু রাগ আসছে। I promised I will be quiet.'
পল চুপ হয়ে গেল। খেয়ে নিল। মা-এর মুখ দেখেই বুঝতে পারল যে, মা আবার রেগে যাবে। মা উইমেনদের মতন কাঁদবে। মা ও যে উইমেন! ভেবেছিল আরো একটা প্রশ্ন করবে। নিজের মনেই বলল, ' নো, নট নাও।'
ওরা দুজনে বেড়িয়ে পড়ল শপিং সেন্টারের উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে আর একটাও প্রশ্ন করে নি ওপাল। গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে লিপির মনে কত কিছু দুম দুম করে এসে বসে পড়ল। গাড়ি স্ট্রীট লাইনের বাইরে বেড়িয়ে যাচ্ছিল মাঝে মাঝে। ছেলে ঠিক ধরেছে, 'ও মা! ঠিক করে ড্রাইভ করো না।” কোন কথা বলে নি আর লিপি। প্রমিস করেছে ছেলের কাছে। আর রাগবে না সে। শপিং মলে সব কাজ সেরে বাড়ি ফিরে এল। রাতের ডিনার সেরে আজ একটু তাড়াতাড়ি বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ল ছেলের সাথে।
ছোট্ট এক রুম পরিষ্কার এ্যপার্টমেন্ট। রাত বেশ হয়ে আসে। জানালা দিয়ে ভেসে আসে রাতের অন্ধকার। ফাঁকা লনটায় শুধু কালোর পর কালোর অনুবৃত্তি। সংসার ভেঙে পড়ার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। এর জন্য অনেক সংগ্রাম করতে হয়। মন তৈরী করতে হয়। পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। এই ভিনদেশে এসেছে প্রায় ছয় বছর হল। কত স্বপ্ন, কত আশা আর ভালবাসার একটা রঙিন মন নিয়ে। কানপুরে লেডিস হস্টেলে থাকতে বান্ধবীদের পাল্লায় পড়ে পলক কে বয়ফ্রেন্ড করেছিল। সবার বয়ফ্রেন্ড ছিল, শুধু তার ছিল না। সে ছোটবেলা থেকেই একটু কেরিয়ারিস্ট। স্বপ্ন ছিল হাইয়ার স্টাডি করতে বিদেশে যাবে। কিন্তু বয়ফ্রেন্ড না থাকাটা নাকি একটা স্ট্যাটাস সিমবল-কে ফাঁকি দেওয়া আজকাল।
পলক ধামুয়ার ছেলে। কিন্তু পড়াশুনা সব খড়গপুর আই আই টি। কম্পিউটার ইঞ্জিনীয়ারিং এ পিএইচ ডি করতে আই আই টি কানপুরে এসেছে। দুজনেরই দুজনকে ভালো লাগে একাডেমিক কেরিয়ারের জন্য। দুজনের-ই স্বপ্ন এক। দেখতে দেখতে ওরা দুজনেই এপ্লাই করল হাইয়ার স্ট্যাডিজ -এর জন্য। পেয়েও গেল, কারণ দুজনেই যে ব্রাইট স্কলার।
একদিন হুউউউস করে উড়ে এল এক ব্যাগ স্বপ্ন নিয়ে। টেক্সাসের শহর হিউস্টনে রাইস ইউনিভার্সিটিকেই বেছে নিয়েছিল। নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সির ঠান্ডাতে যাতে কষ্ট না পেতে হয়। বেশ চলছিল দিনগুলো। স্কলারশিপ আর অড জব করেই দুজনের দিনগুলো গতানুগতিক হিসেবে গম গম করে কেটে যাচ্ছিল। হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করল, আরেকজনের উপস্থিতি নিজের শরীরে। সে ত এখনই কোন গেস্ট কে চায় নি। কি করে হল? এখনও স্বপ্ন পূরণ হয় নি। কলেজ ক্যাম্পাস এর ডাক্তারের রিপোর্ট এনে পলক কে দেখাতে , পলকের উত্তর...' চলো লিপি দেশে ফিরে যাই। আমি একটা ভালো জব ও পেয়েছি কলকাতায়। এখানে তো আমরা H-1 ভিসায় আছি। আমি তো পাশ করে জব পেলাম না; পারমানেন্ট ওয়ার্ক পারমিট নেই বলে। কত পড়ব বলো? কোনদিন বলবে, পাত্তাড়ি গোটাও। তখন কিন্তু অগাধ জলে সাঁতড়াতে হবে আমাদের। Lets go back Lipi.'
'কি বলছ? জানো তুমি? আমরা এখনও ফিনিস করিনি আমাদের লক্ষ্য! এখনই ফিরে যাব? না! না! পলক! তা হয় না। হতে দেব না আমি। তুমি ভালোভাবে নিজেকে বোঝাও। আমার কিন্তু একটাই ডিসিশন 'উই ওন্ট গো ব্যাক টু প্যাভিলিওন'। লিপি কলেজে বান্ধবীদের কাছে প্রশ্ন রাখলো। কি করা উচিত তার। “Tell me about it. I just go, where I am told”.
দু-পক্ষ তৈরী হল।
এক পক্ষঃ চলে যাও। তুমি প্রেগ্ন্যান্ট! ভুলে যেও না। Baby wants parent.
অন্য পক্ষঃ না তুমি যাবে না। এ সুযোগ বার বার আসবে না। তুমি মনে রেখো তোমার বেবি ইউ এস সিটিজেন হবে। আর তার ১৮ বছর হলেই তোমরাও হয়ে যাবে উইদাউট এনি ক্যারোস। দ্যাটস দ্য ল' ! এই স্বর্গ ছেড়ে যেও না।' শুধু একজন চুপ করে বসে রইল তার নাম টিজান কোনর। “Whats your Dicision about me, Tijan?'
- “For me!! You should follow ur sweet heart, lipi.” লিপি দেখে তার দু চোখের কোলে টলমলে জল। ' এখানকার পারমানেন্ট রেসিডেন্টের কার্ড পাওয়ার পরেই ইন্দর আমাকে ছেড়ে দেয়। আই ডোন্ট ফিল এনি বদারেশন। আই নো আই এম ব্ল্যাক! এন্ড ব্ল্যাক ইজ ব্ল্যাকডেটেড এভরিহোয়ার। বাট নাও আই মিস ইন্দর। উই হ্যাভ আ বেবি গার্ল! শী ইজ আস্কিং মি, “আই ওয়ান্ট মাই বায়োলজিক্যাল ড্যাড।” আই ম্যারেড মাইক, বাট হি ডাজ নট লাইক মাই বেবি। মাই বেবি ডাজ নট লাইক হিম, টু। শী ইজ জাস্ট লাইক হার ড্যাড! আউটলুক এন্ড ইনার ওরিয়েন্টেশন। সো, লিপি, প্লিজ! আন্ডারস্ট্যান্ড মি। ফলো ইয়োর হাবি।”
শুনে লিপির মাথায় বাজ ভেঙ্গে পড়ল। পলক তো কালই চলে গেল দেশে। কিন্তু সে তো হার মানার মেয়ে নয়। সে একাই মানুষ করবে ওপাল কে। তার প্লাস পয়েন্ট! ওপাল জানে না তার বাবা কে। জিগ্যেস করলে বলে দেবে যে, তার ড্যাড ইজ নো মোর। তার দায়িত্ব শেষ হবে কি? এমনও শোনা যায়, ছেলে বড় হয়ে বাবাকে খুঁজে পেয়েছে।
ওপাল আজ রণির পাপাকে পাপা বলছে, আজ ছোট তাই। কিন্তু? যদি বড় হয়ে কোনক্রমে জানতে পারে তার মা মিথ্যে কথা বলেছে তাকে, তখন সেই যন্ত্রণা কি সহ্য করতে পারবে? আর পল কোথায় পাবে তার পাপার স্নেহ? সে আর চিন্তা করতে পারছে না। পলক তো একবারও তার কাছে জানতে চাইত যে, তার ছেলে না মেয়ে হয়েছে? এখন তো যান্ত্রিক যুগে এক সেকেন্ডের ব্যাপার এই সব। এত কি তার অভিমান? তার কি কোনই দায়িত্ব নেই সন্তানের প্রতি। সে তো জেনেই গেল যে, সে বাবা হচ্ছে? তাহলে...? দেখতে দেখতে পল এখন চার বছর ...
রণির মা -এর মধ্যে পল খুঁজে পেয়েছে তার দিম্মাকে। তার মানে আজ এই একুশ শতাব্দীর ছোট্ট শিশুও চায় নরম, স্নিগ্ধ, শাড়ির আঁচলে অভিমান ঢাকার আশ্রয়? তার এই চার বছর বয়সে, এই আধুনিক দেশে জন্মেও এ কি তার অভিপ্রায়? নাঃ! ঘুম আসছে না আর। পুবের জানলা দিয়ে দেখে গাঢ় কমলা রঙের এক রেখা পুব থেকে দক্ষিণে সমান্তরালে চলে যাচ্ছে। এই রংরেখা-টা কি থাকে জীবনের শেষ দিক পর্য্যন্ত?
উঠে পড়ল, আই প্যাড এ লিখে ফেল্ল কয়েক ছত্র। ছিঁড়ে ফেল্ল...আবার লিখল। আবার ছিঁড়ল। গোল পাকিয়ে বৃত্তের মত করে মাঝখানে আঙুল দিয়ে একটা গর্ত করল। দেখল গর্তের ভেতরটা অন্ধকার আর বাইরেটা আলোয় আলোময়। সেই আলোয় রণির মা হাসছে স্বামী আর ছেলেকে নিয়ে। সত্যি তো রণির মা চিনি কাজ করত এখানকার স্টেট অফ নিউ ইয়র্কে এনভাইরণমেণ্টাল সায়েন্টিস্ট হিসেবে। এখানেই বড় হয়েছে। কিন্তু সে তার দেশের মানসিকতাকে হারিয়ে ফেলে নি বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়েও। সে স্বামী-পুত্র নিয়ে সুখী। তার ছেলেও ভালবেসে ফেলেছে চিনির বাহ্যিক আবরণকে।
স্বামী তাকে বাপের বাড়ির কারও সাথে সম্পর্ক রাখতে দেয় না, তাও সে সুখী। কি তার সুখের রেমিডিজ? তার বাড়ির সবাই এখানে। কিন্তু তার সাথে কোন সম্পর্ক নেই তাদের। হয়ত জানে যে, একদিন তার স্বামী নিজের ভুল বুঝতে পারবে যখন ছেলেও ঠিক সেইভাবে তার পাপাকে বলবে। সিটিজেনশীপ পাবার পরেই রণির বাবা হাতে স্বর্গ পেয়েছিল, ভেবেছিল এইরকম করলে নরম মনের মেয়ে চিনি তাকে ছেড়ে গেলেও কোন অসুবিধা হবে না তার। সে একাই রাজত্ব করতে পারবে। চিনির বড়লোক বাপের বাড়িকে টেক্কা দিতে পেরেছে চিনির বর। চিনি কি রণির ভবিষ্যৎ ভেবেই নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে?
সেদিন কাজের মেয়েটার কাছেও সে শুনলো একলা সন্তান মানুষ করার মধ্যে অনেক হ্যাপা। তার কথা শুনলো একদিন। মনিটারী প্রবলেম, সিকিউরিটি, ফিউচারের আলো খুব দরকার সিঙ্গল প্যারেন্টসদের। আজকাল যে কি হয়েছে তার... খালি শুনতে চায় সে যা করেছে বা করছে, সব পারফেক্ট কিনা। কিন্তু কই পৃথিবীর কেউই তো সঠিক উত্তর দিতে পারে না। সারোগেটেড মাদার হলে তাও যুক্তিযুক্ত, কিন্তু তার মতন মায়েরা? তাই যাকেই দেখে সিঙ্গল মাদার; প্রশ্ন করে ফেলে নিজের অজান্তেই। তার মানে নীতি দিয়ে আর যুক্তি দিয়ে কিছু মাপা যায় না। ধরে নিতে হবে সবই ঘটনাচক্রের উপর নির্ভর করে। কিন্তু পরিবর্তন তো যুক্তি-তর্ক-গল্প মেনে চলে না। আজ এই সকালের পৃ্থিবীটাকে দেখল কেমন যেন খড়ের ঢিপির মতন।
বাড়ির কাজের মেয়েটার নাম 'কয়না'। মেক্সিকো থেকে তিনটি ছোট ছোট মেয়ে আর এক কোলের ছেলে নিয়ে অবৈধভাবে এসে পৌঁছেছিল শান্তি আর নিরাপত্তার খোঁজে। এসে উঠেছিল মেক্সিকোর বর্ডার টেক্সাসের এক শহরে। যে স্বা্মীর হাত ধরে অজানা অচেনা দেশে এসেছিল, সেই স্বামী সু্যোগ বুঝে কেটে পড়তে একটুও দ্বিধা করে নি। একবারও ভেবে দেখে নি যে, কিভাবে এই ছোট ছোট বাচ্চাদের মানুষ করবে অল্পবয়সী সুন্দরী মা। ফরসা রঙ, অপরূপ সুন্দর মুখ মা-এর। বহু পুরুষের আকাঙ্খিত-এর জিনিস। বাবা তবুও নিজের সুখের সন্ধানে সব ছেড়ে বেড়িয়ে পড়তে একবারও দ্বিমত করে নি। সেই কয়না কিন্তু তখন মা দুর্গার রূপ ধারণ করে -। মা বুঝেছিল, “আমি যা করব আমার ছেলেমেয়েরা তাই দেখে আমার দৃষ্টান্ত অবলম্বন করবে। আমি যদি ভাল না হই, তবে ওদের পক্ষে এবং আমার পক্ষেও মন্দ।” সেই মায়ের আপ্রাণ চেষ্টা, “যদ্দুর পারি ভালভাবে জীবন যাপন করে যাব।” তাই বেছে বেছে ভাল ভাল লোকের বাড়ি আর বড় বড় দোকানে অমানুষিক ভাবে ঝাড়পোঁছের কাজ করে উদয়-অস্ত। বৈধভাবে চাকরীর সু্যোগ না থাকায় আর ইংলিশ কথোপকথনের অনভ্যাসে খুব অল্প বেতনেই কাজ চালিয়ে নিতে হয়। ঠকেও যায় মাঝে মাঝে নিজের ভুল অংকের হিসেবে। সন্তানদের লালন পালন আর নিজের রক্ষণাবেক্ষণ শুরু করে। এইভাবেই ধীরে ধীরে নিজের পায়ের মাটি মজবুত করে ফেলে। মেয়েদের স্কুলে পাঠায় আর ছেলেও ততদিনে স্কুলে যাবার উপযুক্ত হয়ে পড়েছে। যে দেশের যা নিয়মঃ সতেরো-আঠারো বছর বয়সের দুই মেয়েরা নিজেদের স্বাবলম্বী করেই আসতে আসতে নিজেদের পথ বেছে নেয়। মায়ের দিকে তাকাবার তাদের সময় থাকে না। তার জন্য মা কিন্তু পরের জনদের সাথে একটুও খারাপ ব্যবহার করে নি বা নিজের সুখের জন্য বিপথে পা বাড়ায় নি। তাদেরও আগের দুই মেয়ের মত করে মানুষ করছে। কিন্তু আগামীকে নিয়ে সেও চিন্তিত! নির্জন রাতের তারাদের দিকে তাকিয়ে একবার নিজের আগামীর কথা চিন্তা করে কি কয়না......?
সেদিন বাড়িতে এসে কাজের শেষে হঠাৎ বলতে শুরু করে তার কষ্টের দিনের কথা...ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংলিশে জানায় তার প্রতিবেদন... কি তার ভবিষ্যত সে জানে না তার ঠিকানা। ভবিষ্যত বলে কিছু আছে, তাও সে মনে করে না। বর্তমানকে নিয়েই তার জীবন। যে কোনদিন মার্কিণমুলুকে অবৈধভাবে থাকার দরুণ হয়ত ধরা পড়তে পারে। সেদিন হয়ত তার শেষ দিন হবে জীবনের। ...তাই লড়ে যাচ্ছে সেও... তার কথার ভাষায় যতটুকু বুঝেছিলাম...বলগাহীন উন্মত্ত মুক্তির স্রোতে হয়ত উন্মাদনা আছে কিন্তু সুস্থ মানসিকতা কোথায় আছে, জানা নেই সমস্ত পৃথিবীর মা দুর্গাদের।তার প্রশ্নঃ বর -রা কি বর্বর হয়? না মায়েরা মর্মর মূর্তি? উত্তর আমার কাছে একটাই ছিলঃ
“Raising a child by oneself isn't always easy. You should know that We women are all strong and capable. We may even laugh a few times. Isn't it?” যদিও এটা বোঝাতে আমার বেশ খানিক সময় লেগেছিল।
যখন পলকের সাথে এমিরেটস এ দুবাই হয়ে আসছিলাম, তখন মেয়েদের টয়লেট এ আলাপ হয় তানিয়ার সাথে। সে সূর্য্যের আলোয় নতুন জীবন পাবে বলে এক মানুষের হাট ধরে দুবাই তে পৌঁছায়। দিন কাটছিল ভালোই তারপর একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে যার সাথে মা বাবার কথা না শুনে এই দুবাইতে এসেছিল। সে লাপাতা। তার আর দেখা নেই এক মাস হয়ে গেলেও। তখন সে তিন বাচ্চার মা। পরে খবর পায় তার সেই বর আবার বিয়ে করেছে। তার ভাষায়, “তাই আমি নিজের আর বাচ্চাদের পেটের ক্ষিদের কথা চিন্তা করে এই শরমের কাজ করছি, আপা। পয়সা নেই যে, কোর্টে যাব? বলতে পারেন কেন এরকম হল??”
-কিছুই বলতে পারি নি সেদিন। আজ হলে বলতাম, আমরা যে নারী। আমাদের জীবনে ঝড় আসে-যায়...উত্তাল সমুদ্র ধেয়ে আসে পাগলের মত...আমরা সামাল দি সব কিছুতে।
সেদিন আবার কলেজে গেছি, হঠাৎ আমার ইন্সট্রাকটর আমাকে বললেন একটু হেল্প করবে একটা মেয়ের। আমি বল্লাম, “সিওর, হোয়াই নট?'
বললেন, “থ্যাঙ্কস, লিপি। ওই যে কোণের চেয়ারে বসে আছে, ও ফ্রান্স থেকে এসেছে। ইংলিশ বলতে অসুবিধা হয়, তবে বুঝতে পারে। আমাদের এখানে ফ্রেঞ্চ ল্যাঙ্গুয়েজের সাবস্টিটিউট টিচার হিসেবে জয়েন করেছে। ওকে ওর রুমে একটু ড্রপ করে দাও প্লিজ!”
বললাম, 'সিওর। আমি গ্লাডলি ওকে ওর রুমে ড্রপ করে দেব। আই উইল বি প্লিজড।' থ্যাঙ্কস বলে ওই মেয়েটিকে হাত নেড়ে ডাকলাম।
গাড়িতে বসে একটিও কথা বলল না। ওকে ড্রপ করে দেওয়ার পর ও আমাকে ওর রুমে আসতে বলল। গেলাম। ঢুকেই দেখি ওর টেবিলের ওপর দুটো ছেলের ছবি।
জিজ্ঞেস করলাম, “এরা কারা”/ ভাঙ্গা ইংলিশে বলল ওর দুই ছেলে।
প্রথম হাজবেন্ডের এক ছেলে আর একজন নেক্সট হাজবেন্ডের ছেলে। প্রথম হাজবেন্ড বাচ্চা হবার পর অন্য মেয়ের সাথে ভাব করে। আমাকে ডিভোর্স দিতে বলে, আমি দি নি। তখন আমাকে মার ধোর শুরু করে। বাধ্য হয়ে ডিভোর্স দিতে হয়। তারপর আবার বিয়ে করি নিজের সুরক্ষার জন্য, এও আগের হাজবেন্ডের মতন। আমাকে দেখো এত মেরেছিল, বলেছিলাম ডিভোর্স আমি দেবো না তাই। তাই আমার দুটো ছেলে। ওদের মানুষ করতে হবে তাই কলেজে সাবস্টিটিউট প্রফেসর হিসেবে কাজ করছি। একটু টাকা জমলে গাড়ি কিনব। আবার এক শিক্ষা নিয়ে নিজের ডর্মে ফিরে এলাম।
এই আমেরিকাতে সিঙ্গল মা-দের মধ্যে সাতান্ন শতাংশ টিনেজ মা। সন্তান পালন করতে তাদের সব চেয়ে বেশি বাধা মনিটারী প্রবলেম। কিন্তু আমরা শিক্ষিতেরা কেন এই ভাইরাসে ভুগছি? ছেলেকে ঘুম পাড়াচ্ছি কিন্তু সেই ছোটবেলার গান “ঘুম ঘুম লক্ষ্মীটি...” , আর ছেলে সেই গানের সুরে ঘুমিয়ে পড়ছে। পরেরদিন আবার সেই গান শুনতে চাইছে... তাহলে? দোষতা কি শুধুই আমাদের মেয়েদের।
কি করব—তার সল্যুইশন আজও খুঁজে চলেছি...ফিরে যাব পলক-এর কাছে? না জীবন থেকে একেবারে তাকে আলাদা করে পল কে মানুষ করব 'সিঙ্গল মাদার' উপাধি নিয়ে? তারপর? জীবন সায়াহ্নে ছেলেকে কি কৈফিয়ৎ দেবো? নিজেদের কেরিয়ার আর একরোখার -এর জন্য ছেলেকে তার পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছি? না, পলক কে বোঝাই ছেলে দুজনার। এসো হাত মেলাই! এই সল্যুউশন টা কেবলই মেয়েরা ফলো করবে?
আজ বিশ্বাস করতে পারছি না দুজনের সব ভরসাকে, বিশ্বাসকে আকাশ ছোঁয়া ভাবনাকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিতে পারে বোধহয় একমাত্র পুরুষ। এখন রঙিন গুজবের ফানুস উড়বে। মুহূর্তেই আগুনে জ্বলে পুড়ে নেমে আসবে মাটির পৃ্থিবীতে। গুজব শুধু গুজব হয়েই থাকবে। এই বিশ্বাস, এই বিশ্লেষণ -এসবই বোধহয় নিজেকে সান্ত্বনা দেবার জন্য। তার ভালোবাসার মানুষ পলক, তার সন্তানের জনক পলক যে সত্যি সত্যি একদিন সাগর ছেড়ে নদীতে ঝাঁপ দেবে? তা ছিল তার স্বপ্নের অগোচর। মায়ের অনেক কথা, অনেক সিদ্ধান্তের সাথে একমত না হতে পারলেও কোথায় যেন মা-এর সাথে তার মিল খুঁজে পেয়েছে। লিপি এখন পাহাড়ি ঝরনার মতোই সব সময় প্রাণচঞ্চল থাকবে, না আবার নদী হয়ে বয়ে যাবার সংকল্প করবে? আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও তো সিঙ্গল মা-এর উপযুক্ত সন্তান! প্রেসিডেন্ট! সাদা সিঙ্গল মা -এর সন্তান। বাবা নাইজিরিয়ান। তবে??? তার কেন এত প্রশ্ন নিজের কাছে? এক একবার প্রশ্নের ঝড় উঠছে আবার উপযুক্ত যুক্তিতে সেই ঝড় নেতিয়ে পড়ছে। আজ আবার মনে একটাই প্রশ্নঃ এলোমেলো শাঁখ কি কখনও মাইক্রোচিপসে বাজে? কোথায় যেন পড়েছিল দেশে থাকতে...
বাবা ছাড়াও একটা পূর্ণ পরিবার হয়। সেটা যে কোথাও অসম্পূর্ণ নয়— সেটা বুঝে নেওয়া এবং গ্রহণ করার সময় বোধহয় এসে গিয়েছে। বাবার উপস্থিতি নেই মানেই আক্ষেপ, মানেই বেচারা, মানেই খামতি, সেটা বোধহয় আর থাকল না। বাবার পরিচয়, বাবার সান্নিধ্য থাকলে তবেই দারুণ। কেবল মায়ের সান্নিধ্য আর মায়ের পরিচয় থাকলে ব্যাপারটা করুণ— তা মোটেই নয়। সে-ও পূর্ণতা। অন্য রকম পূর্ণতা।
এই অন্য রকমটাকে মেনে নেওয়া আর সম্মান করার শিক্ষাটাই তো এগিয়ে যাওয়া, তাই না? আসলে নানা বিষয়ে আমরা কেবল একটা ধরণকেই মানতে শিখি, সেটাকেই perfect বলে ধরে নিই। একটু চোখ মেলে দেখলেই হয়তো নানান ধরণ আমরা দেখতে পাই। কিন্তু মনের আর মস্তিষ্কের দরজা এমন একটেরে ভাবে খুলতে শিখেছি যে অন্য রকম কিছু করতে গেলেই মনে হয় এই বুঝি সবটা ভেঙে পড়ল। আসলে কিন্তু তা পড়ে না। ওটা মনের ভুল।
এই মনের ভুলগুলোকে সরিয়ে, একটু ঘষেমেজে, একটু ভরাট করে একটা ‘অন্য রকম’কে সম্মান করতে শিখি? কী বলেন?
তবে সন্তানটি যদি বড় হয়ে কখনও মায়ের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে, মা আপনি তৈরি থাকবেন কিন্তু!
তাই লিপির মতন মায়েদের একমাত্র প্রার্থনাঃ “Don't close the doors of Women, don't close the humanity.”