মা

জয়া চৌধুরী

Madre llévame a la cama / Miguel Unamuno
মাগো, আমায় বিছানায় নিয়ে চলো/ মিগেল উনামুনো ( স্পেন)

মাগো, আমায় বিছানায় নিয়ে চলো।
মাগো, আমায় বিছানায় নিয়ে চলো,
আমি তো পায়ে দাঁড়িয়ে নেই।
আয়, খোকা, ঠাকুর তোর মঙ্গল করুন
আর তিনি যেন মাটিতে তোকে পড়ে যেতে না দেন।
আমার পাশখানি ছেড়ে যেয়ো না মাগো,
সেই গানটা শোনাও না মা।
মা সেই গান গেয়ে শোনাতো-
সেই ছোট্ট খুকির গানটা ভুলে গেছিলাম মা,
তুমি যখন আমায় বুকে জড়িয়ে ধরলে
তক্ষুনি মনে পড়ে গেল তা।

গানটা কি বলত
কি তার অর্থ মাগো?
কিছুই সে বলে না, বাছা, প্রার্থনা করে।
মধু শব্দের নামজপ করে সে-
স্বপ্নের শব্দ জপ করে শুধু
তাঁকে ছাড়া আর কিছুই বলে না যে ওরা।

তুমি কি আছো, মাগো?
আমি তো পাই না দেখতে তোমায়...
এখানেই আছি সাথে নিয়ে তোমার স্বপ্ন-
ঘুমোও, বাছা আমার, বুকে বিশ্বাসটুকু রাখো।

স্পেনের ১৮৯৮ এর প্রজন্মের খ্যাতনামা সাহিত্যিক দার্শনিক মিগেল উনামুনোর এই কবিতাটা প্রথমেই মনে পড়ল একুশ শতকের মা” বিষয়ে লেখাটা লিখতে গিয়ে। উনবিংশ শতকের এই লেখকের অনুভূতির সঙ্গে কি একটুও তফাৎ পেলেন আমার আপনার মনের কথার? প্রাণীর জীবনে ‘মা’ কোন স্থানে বিরাজ করেন সেকথা প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত জ্ঞানী গুণীরা কম তো বলেননি। এ অধমের কলমে তার চেয়ে বেশিই বা কি ফুটবে! পৃথিবীর আদিমতম কিছু ভিত্তি যদি থেকে থাকে প্রাণীকুলের তা হল মা ও সন্তানের। মানুষও মা হয় পশুপাখীও মা হয়। তবু মানুষ মায়ের দায় স্বাভাবিক কারণেই অনেক বিস্তৃত ও মহিমময়। কেননা মানুষই স্থির করতে পারে ন্যায় অন্যায়ের তফাৎ মানুষই পারে সমাজের উপযোগী আগামী প্রজন্মকে গড়ে তুলতে। সমাজটি তো আর স্থবির কোন বস্তু নয়। প্রতিটি মুহূর্তে ভাঙ্গা গড়া চলছে তার। মধ্যবিত্ত সমাজের মা মানেই যে চালচিত্র আমাদের সাহিত্যে চলচ্চিত্রে সর্বত্র তার রূপরেখা বদলাচ্ছে প্রতিদিন তবুও মূল স্থানটির গুরুত্ব এতটুকুও কমে যায় নি। “বিশ্বাস”- শব্দটির পার্থিব রূপ হল “মা”। এই আদিগন্ত বিস্তারী পৃথিবীতে যেখানে মরে যাওয়াই ধ্রুব সত্য আর বেঁচে থাকাটি প্রতিপলের কীর্তি সেখানে একলা মানুষ বড় ভঙ্গুর বড় অসহায়। তার হাতটি ধরে একা স্বাবলম্বী করে তোলে তো মা-ই। একুশ শতকের মা মনে হয় না আর আগের মত কাপড়ের দোলনায় শিশু দুলিয়ে গান ছড়া পড়ে শোনাতে পারে। এই মায়েরা ঘরের বাইরে পা রেখেছেন। নিরন্তর সন্তানকে সাহচর্য দেবার সময় তাদের নেই। তা বলে কি মায়েরা গান শোনান না? শোনান তো। সিডি কম্পিউটার ইত্যাদি হাজার অপশন তাদের সামনে। মায়েদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাচ্ছে কিন্তু সন্তানকে বেড়ে তোলার জন্য কতখানি মনোযোগ দেওয়া দরকার সে সম্পর্কে সচেতনতা কিছু কম নয়। শিশু পুত্র ও কন্যার মধ্যে ভেদ এখনকার মায়েরা আগের মত করেন না ঠিকই, তবুও ভুল হয় হচ্ছেও। এখনকার সন্তানদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করে তোলার দিকে মায়েদের যত ঝোঁক, পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ানোর যত ঝোঁক, সঠিক মানুষ করে গড়ে তোলার ধারণাটি ততও স্বচ্ছ থাকছে না। সব বিষয়েই অতিরিক্ত চাওয়া, তজ্জনিত উদবেগ আঁকড়ে রাখার স্বভাব ক্রমে মা ও সন্তানের সম্পর্ক জটিল করে তুলছে। আসলে বিজ্ঞের মত দূর থেকে মন্তব্য করাটা কোনভাবেই সমীচীন নয়। ভাবনার অবক্ষয় এখন খুব দেখা যাচ্ছে মনে করেই এইসব আশংকারা গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসে। মা হয়ে কতক্ষণ কাছে থেকে সঙ্গ দিচ্ছি তার চেয়েও কত মূল্যবান সময় দিচ্ছি। এই ভাবনাটি অনেক কর্মরত মা ভাবলেও সে “অনেক” সংখ্যা প্রকৃত “অনেক” এর তুলনায় সামান্যই। সন্তান কিসে সঠিক গড়ে ওঠে সে দায় কেবলমাত্র মায়েদের যে নয় সে কথা ভাবতে পারে কজন? শিশুর পরিবেশ এবং শিশুর নিজস্ব সংস্কারও সমান গুরুত্বপূর্ণ এক্ষেত্রে। তবুও মায়ের কথা আলাদা সে হল ‘নাড়ির টান’।
শ্রীশ্রী মায়ের একটি বাণী “আমি সত্যিকারের মা, কথার কথা মা নই, সত্য জননী”-কে না জানেন। কথাকটি যতই ভাবা যায় এর গহন গভীরতার ব্যাপ্তির কূলকিনারা খুঁজে পাই না। মহাভারতে গান্ধারী যখন পুত্র দুর্যোধনকে বললেন স্নান করে নির্বস্ত্র হয়ে তাঁর সামনে আস্তে, তিনি চোখ দিয়ে আশীর্বাদ নিষিক্ত করবেন সন্তানকে। দুর্যোধন সব বস্ত্র ছাড়লেই চিরবাসে উরু দুটি ঢেকে এলেন মায়ের কাছে। এবং সেই উরুই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অন্তিম লগ্নে ভীম চূর্ণ করলেন গদাঘাতে। যে দুর্যোধনের কোন অন্যায় গান্ধারী মেনে নেন নি সারাজীবন, যার ফলে তিনি যথেষ্ট স্নেহ করেন না পুত্রকে এমন অভিযোগে স্বয়ং দুর্যোধন তাঁকে বিদ্ধ করেছিল, তাকেও অমরত্বের বর্ম পরিয়ে দিতে চেয়েছিল জননী হৃদয়। শেষরক্ষা হয় নি দুর্যোধনেরই মুর্খামিতে। তবুও “মা” যে এক বিচার যুক্তির ঊর্ধ্বে কিছু সে কথা বলে বোঝাতে হয় না কাউকেই। মা – তো সেই কালিকা শক্তি যিনি এক হাতে আশীর্বাদ করেন ও অন্যহাতে সংহারক। সংহার অন্যায়কে দুর্বলতাকে অন্ধকারকে, আর আশীর্বাদ ও পালন করা কল্যাণের ন্যায়ের আলোর। যেমনটি সৃষ্টির আদিতে আজকের মায়ের ক্ষেত্রেও সেটি সমান সত্য। তবে এখন যে দোষ দিয়ে দেওয়া হয় চট করে যে আধুনিক মা আগের মত আর সন্তান পালন করেন না সেসব বাজে কথা বলেই মনে হয়। আসলে জীবন দর্শন কালে কালে পালটায়। আদিম মা শিকার করা মাংস কাঁচা খাওয়াত সন্তানকে। লেখাপড়া স্কুল কলেজ ডিপ্রেশন ইত্যাদি সমাজ সৃষ্ট ঝামেলা তার দর্শনে ছিল না তাই তিনি সেভাবে সন্তান পালন করতেন। আধুনিক মা ডিগ্রি, স্টেটাস ইত্যাদির গুরুত্ব বুঝে সেদিকে ঝোঁক দিচ্ছেন সন্তান মানুষ করবার সময়। কিন্তু অন্তরের ইচ্ছেটি একইরকম অকৃত্রিম রয়ে গেছে। যে যাকে গর্ভে লালন পালন করে জন্ম দিয়েছি তার যেন সরবোচ্চ কুশল হয়। মায়েদের পথ যদি কিছু ভুল হয়ও মনের প্রাণের টানে যখন কোন বদল ঘটে নি এই পৃথিবীতে সন্তানের তবে ভাবনা কিসের!