সাত আসমানের দিন রাত

ভাস্বতী গোস্বামী


সাত আসমানের যে কোন একটা ধইরা টান দিমু। আকাশ ফসসা। রতি মুছছে শেলেট। ভোরের লালগোলা। ছুটছে। দিন-রাত্তির বাঁধা থাকে। নৈহাটিতে প্ল্যাটফর্ম বদলাও, গাড়ী বদলাও। ফোঁটা ফোঁটা রক্ত আসমানে। রক্তের ছিটা লাগছে পরণের কাপড়েও। ঘুরিয়ে কাপড় পরে মা। তবু গন্ধ ঘোরে না। গন্ধঘোর। প্রবল হচ্ছে সাত টানের প্রথমটি। কাপড় আলগা দেয় মা। ঠোঁট-গলা-নরম জিভে, আমার মা নামছে। গলগলে উষ্ণ। কবেকার চেনা পাওয়া যায়। পিছোতে গিয়ে এক জলের নৌকো।
ওম দিতে দিতে মায়ের বুকটা কোমল তুলতুলে হয়ে যায়। আর অজস্র পালক ঝরতে থাকে। ঐ পালকের রঙবেরঙ নিয়ে আমি একদিন রাজা হবো। আমার ফ্যাকাশে মায়ের ঠিকানা বদলে যায়। প্রতিদিন অভ্যাসের কথাগুলো জমে ওঠে মায়ের বুকে। কোয়ার্টজ হয়, মাইকা হয়। মা কি তবে ফসিল হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে? গুগল সার্চ করি। নাহ্, মা’কে মমি বানানোর রীতি ছিল না কোথাও। মা আসে,যায়। বারান্দার টবে ফুল আসার চেয়েও নীরব তার আসা-যাওয়া। আমি দেখি, আমি দেখি না। মা চন্দ্র সূর্য গড় করে। পরিবর্তে মা’র প্রেশারের ওষুধ আনতে ভুলে যাই আমি।
আমার ঘরে একটা বিশাল জানলা আছে। শীতে রোদ দেয়, বর্ষায় জল। আমি ওখানে বসে কবরখানাটা বেশ দেখতে পাই। কত রকমের মানুষ আসে। পাখির মতো ঠোঁটে ক’রে সুর, শিষ আনে সেইসব মৃতদের জন্য। ডানায় থাকে যাপনের গল্প। শিস বা গল্পগুলো তারা খুব সুন্দর ক’রে সাজিয়ে রাখে মৃত্যুর পাশে লাইন ধ’রে। তারপর কেউ কেউ গানও গায়। সন্ধ্যের নিয়মে পাখিরা বাসায় ফেরে। এইভাবে জানলার পাশে বসে রোজ আমি মৃত গুনি। মৃত্যুর জন্মলগ্ন কিভাবে আসে, তার ব্যাখ্যা পাওয়ার চেষ্টা করি। আচ্ছা, যে তারা জন্মালো না তারও তো মৃত্যু লেখা থাকে কোথাও। নিজের ভিতরেই দফন করি, না-জন্মানো এক মৃত্যু। জানলাটা তখন চাঁদ ফুঁড়ে তারার আকাশে ঝুঁকে পড়ে। কানে কানে বলে, চিনতে পারো কোনটা? আমি আমার শার্সি মেলে পেড়ে আনি তাকে। আমার ঘুম পায়, আমার ঘুম পায় না। আর সবাই ঘুমিয়ে থাকে।
একশো কিলো শূন্যতা মাড়িয়ে মা নেমে আসছে তারাঘর থেকে। ছুঁয়ে ছুঁয়ে এক তারা থেকে অন্য।
হাত বাড়িয়ে তারারাও ছুঁতে চাইছে মা’কে। রাত জমছে মায়ের চুলে, চোখের পাতায়, নাভি, যোনি, পায়ের নখে। অথচ, দিনের মাড় দেওয়া পরিপাটিতে আমি ‘মা’ ডাকতে চাইছি। যেন সমস্ত লেবুপাতার ঘ্রাণ পেরিয়ে ভ্রুণ হয়ে আবার দেখব আমার মায়ের গর্ভ।