মায়ের শীতলপাটি

উমাপদ কর



তুমিই কি সেই আদি যার অন্ত নেই! সেই আদ্যক্ষর যার অপেক্ষায় থেকে থেকে শেষে একদিন স্লেটে খড়িমাটির আঁচড়ে মুক্তি পাও। তুমিই কি সেই আদি প্রতিচ্ছবি যার আদল আয়না ফেরত আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অমৃতের দিকে। ব্যস্ত পৃথিবীতে জটিল সংসারে আর কীই বা অমৃত হতে পারে!

আনন্দের হাত ধরেই তো এই পৃথিবীর তাপে আর শীতলে জলে আর ডাঙায় নিঃশ্বাসে আর প্রশ্বাসে এলাম। আনন্দ কখনো আমাকে ছেড়ে যায় না। গেলেও নিরানন্দের কাছে আমাকে জিম্মা রেখে যায়। আমি বিয়োগে শোকে ব্যথায় বিহ্বল হলে আবার আনন্দ এসে আমার আরেকটা হাত ধরে টেনে তোলে। বলে— মুষড়ে পড়ো না। আগামি সময়টাকে রসে বশে উপভোগ কর। আ যে দিব্যানি ধামানি…।

অমৃতের পুত্র আনন্দের হাত ধরে এসে মাটির মায়ায় পড়ে যায়। ইত্যবসরে তার কোমল হাত-দুটিতে এই গোলকের ঘূর্ণায়ময়তা প্রথম তার আবেশ সহ এসে ধরা দেয়। ইরা খুলে ধরে তার বিচিত্র সুন্দর ডালি। সেই সুন্দরে উদ্ভাসিত হয় জীবনের তরঙ্গ। আর এক ইন্দ্রধনু দিগন্তে তার অস্তিত্বের জানান দেয়।

ঈশান কোণে দাঁড়িয়ে আছে এক লপ্ত বন। আমি তার পায়ের কাছে এসে বসি। খোঁজ করি এক শান্ত অনুভূতি যা আমাকে ঈপ্সার উপান্তে নিয়ে যাবে। ঈপ্সা বা অভিলাষের তো শেষ নেই। অতিরিক্ত অভিলাষ ডেকে আনে কাঙালেপনা। ঈশ্বর বলে তখনই নিজেকে সামলাতে হয়। আমার ঈশ্বর তোমার ঈশ্বর তার ঈশ্বর সকলের ঈশ্বর। এক দ্বৈরথ। চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে। প্রবৃত্তি আর নিবৃত্তির মধ্যে।

উচ্ছ্বাস বা প্রবল ভাবাবেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি মাঝেমাঝেই। উচাটন মন ব্যাপ্ত হতে থাকে সর্বত্র। উজ্জীবনই মন্ত্র।বিচিত্র কল্পনার বাঙ্ময় রূপ কবির কাব্য। বাঙ্ময়ী তার বীণায় যে তান তোলেন তাতেই ধ্বনি মঞ্জরিত হয়ে চিন্ময়ের সুর। আমি তার বিচিত্র ছলনাজালে বারবার হই আবিষ্ট। প্রাণে যেমন তুফান বয়ে যায় তেমনি আন্দোলিত হই নিরবধি ঊর্মিমালায়। বলি, এই-ই জীবন, চলমান, রূপে আর অরূপে।
বাংলা বর্ণমালার প্রথম পাঁচটি নিয়ে এরকম একটি মুখবন্ধে তৃপ্ত হতে পারিনা। জীবনের প্রবহমানতা কিছুটা পরিস্ফুট হলেও তার বহু-বিচিত্র রূপের কতটুকুই বা ধরা পড়ে! তবুও অক্ষর এক সত্য যা দিয়ে নির্মিত শব্দ ও বাক্য সত্য হওয়াই উচিৎ। কিন্তু সবসময় তাই হয় কি? অক্ষর থেকে ভাষাও এক সত্য। ভাষা এক জনগোষ্ঠীর শুধু যোগাযোগ আর বিনিময়ই নয় তারও চেয়ে অনেক বেশি কিছু। জীবনে ভাষাকে মা বলে চিহ্নিত করা হয়। মা এই শব্দটি একটা অনুভবের নাম। মা শুধু জন্মে সীমাবদ্ধ নয়, মা মানে পুষ্টি মা মানে বৃদ্ধি মা মানে আনন্দময় অপার জীবন।
একুশ শতকে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সগর্বে পালিত হবে আমি জানি। আমি জানি বিভিন্ন ভাষাজনগোষ্ঠীর মানুষ তার স্ব স্ব ভাষা নিয়ে গর্বে আর আনন্দে মেতে উঠবেন। আবার অনেক ক্ষেত্রেই নিজস্ব ভাষার ওপর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করবেন কিছু মানুষ। মাকে লাঞ্ছিত হতে দেখলে কারই বা ভালো লাগে!
একুশ শতকে এসে আমার চারপাশের অবস্থা ও অবস্থান দেখে কি তরাস জেগে ওঠে না মনে? যে আনন্দের কথা বলা হল প্রথমে, সেই আনন্দ কি কর্পূর হয়ে যাচ্ছে না? যে জীবনের প্রবহমানতার কথা বলা হল তা কি প্রতিরুদ্ধ হয়ে উঠছে না? কে দেবে এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর? নিজের মধ্যেই তাই হাতড়ে বেরাতে হবে। আর হাতড়ে বেরিয়ে খুব যে সদুত্তর কিছু পাওয়া যাবে তা আদৌ নয়। এমন একটি আবেগের একটি ভাবনার অনুভূতি কেমন হতে পারে তা চেষ্টা করা যাক না ধরার।
ফিরিয়ে দিও না ভেতর গলির চৌরাস্তা
আমাকে নাও
তোমার কক্ষে আলতো ঘুরিয়ে দাও
সাবাস বলে
ঘুরতে থাকি
মা দাঁড়িয়ে রয়েছেন চৌকাঠে
উদ্বিগ্ন,
ফিরি নি বহুদিন
বহুদিন ওই হাত কপাল ছুঁয়ে দেখেনি
তাপ আর শীতলতার মধ্যেখানে
ঝুলতে থাকা অনন্ত উদ্ধার
আমি যে বেরিয়েছিলাম ফেরার সংশয়ে
কেউই আর ফিরছে না ঠিকঠাক
ফিরছে কি?
কত মা দেখছি চোখের নীচে কালি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে
হাতের আলো তুলে মাঝেমাঝে দেখছে
এল কিনা দুনিয়ার শুশ্রূষা
আর যে সত্যি ফিরে এল না অসহিষ্ণু মানুষের রিপুদোষে
ভাবছি তার হয়ে দাঁড়াব কি মায়ের কাছে
আলো ফেলে দুহাতে আমার কপাল চিবুক
কি যেন কেমন স্পর্শে শুধু কাঁপতেই থাকে
কত মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়াব
আমি যে সবারই সন্তান
আশ্বাস আর পেতে থাকা প্রশ্রয়
এতদিন আমার শিয়রে তুমি জেগে আছ মা
আজ না হয় তোমার মাথার কাছে
ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকব আমি
আর আমাদের সামান্য দূরত্ব পাহারা দেবে
আমারই ক্লান্তিহীন অনুসন্ধিৎসু আলো
মা তবু জেগে থাকে
তাঁর ঘুম আসে না…

আবার তোমার কাছেই আসি, মা। শীতলপাটি বিছিয়ে রেখেছো। কত মানুষ এসে বসেছে। আমিও এক কোণায় বসে তোমার শান্ততা অনুভব করছি।