আমার পারিজাত, আমার কন্যা, আমার মা

সুবন্ত যায়েদ

আমাদের কন্যা
হাওয়ায় চুল ওড়াবে বলে বায়না নিয়ে আসে যদি
তুমি তখন মাতাল হাওয়া কোথায় পাবে?
বললাম, আমি রোজ রোজ দুটো পয়সা জমানো কৃষাণ।
আমার আছে ফালি ফালি সবুজ ধানের মাঠ।
সেখানে কখনো অকৃপণ হাওয়া এসে সবুজ সুরের ঢেউ তোলে।
আমার কন্যার নামে না হয় লিখে দেবো সমস্ত হাওয়াবিকেল, সন্ধ্যা দুপুর।

আমাদের কন্যা এলে, আমি তাকে ডাকলাম পারিজাত। আমি যার স্বপ্নে বিভোর ছিলাম জীবনের সচেতন সকল মুহূর্তে। অবশেষে সত্যিই সে চোখ মেললো। যেনো বসরাই গোলাপের পাপড়ি। আলতো করে আমি ছুঁয়ে দেবো ভাবতেই কোথায় যেনো বাঁধা পড়লো। আহা, এই পাপড়ি কি ছুঁয়ে দিলে ঝরে পড়ে! যেখানে এই দুটো হাতের সকল কীর্তি পরিচ্ছন্ন নয়। তাই আমি কিভাবে ছুঁই পবিত্র এই পাঁপড়ি। আমি তাই শীত রাতের মতো গুটিয়ে যেতে যেতে বিচারের মুখোমুখি হলাম। পবিত্র সময়ে নশ্বর চিন্তা যে পাপের মতো কাজ। এই কথা মনের রাজ্য দখল নিয়ে নিলে, আমি আমার কন্যার পায়ে মাথা ঠেকালাম। তখন মনে হলো, আমার মনে আসলে শীতপ্রবণতা নাই। মাঝে মাঝে অসংলগ্ন মুহূর্ত যখন আসে, তখন কেবল গুচ্ছ গুচ্ছ শীতের হাওয়া এসে ঘুরে যায়। আমার মনের আধ ভাঙা ঘরে কতোদিন যে মেরামত নাই। কিংবা মেরামত করতে কোনো দিন শিখি নাই বলে, স্বপ্নে বলেছিলাম আমার পারিজাত চাই। যে আমার সত্ত্বার পূর্ণ রুপায়ণ।

পারিজাত, যে আমার কন্যা, কিংবা আমার মা। কিন্তু তাকে আমি মা বলে ডাকি না। কন্যা বলে বুকে তুলে নিই না। আমি বরং পারিজাত ডাকি তাকে। এই নামে ডেকে ডেকে তার আঙুল নিয়ে খেলা করি। তার চোখ ছুঁয়ে দেখি গাল ছুঁয়ে দেখি। আহা, এতো কোমল হয় মানবের দেহ। আর এতো ফুরফুরে চুলগুলো। হাওয়ার সাথে এর দারুণ সখ্যতা হবে সেটা নিয়ে সন্দেহ হয় না। শুধু হাওয়া কেনো, যে আসলে নিসর্গের ফুল, তার জীবনে নিরঙ্কুশ হয়ে উঠবে নৈসর্গিক আবহ সত্য তো সেটাই। যার চলার পথজুড়ে ছড়িয়ে যাবে ঝিঙেফুলের স্নিগ্ধতা। ঘাসফুলের পবিত্রতা। কার্তিকের নাতিশীতোষ্ণতায় ভরে যাবে আমাদের গ্রীষ্মীয় উঠোন। আমি জানি, আমার সাধনা বৃথা যেতে পারে না।

পারিজাত বেড়ে উঠতে থাকলো একটু একটু। এখন আকাশ বরাবর স্থিরচোখে তাকিয়ে থাকে কম। এখন ঘাড় ঘুরিয়ে নীল পাখিটার দিকে তাকায়। সবুজ পাতাটা নড়ে উঠলে আঙুল ছড়িয়ে হাতটা বাড়ায়। আর সাদা বেড়ালটা সুরসুর করে তার দিকে এগিয়ে এলে থাবা দিয়ে ধরে কোলের ভেতরে টেনে নেয়। আর এসব দেখে আমার মনের নিভৃতে কুসুম ফোটে। পাপড়ির বিস্তৃতি ঘটলে স্নিগ্ধ গন্ধ ছড়ায়। তখন আমার কপোলজুড়ে নোনা পৃথিবী রাজত্ব করলে রোদ ঝলমল উঠোনখানা আরো প্রশস্ত হয়।
পারিজাত বেড়ে উঠলো ফুলের অধিক আদরে।
ভোর হলে যখন ফুলেরা ঘোমটা খোলে, পাখিরা সমস্ত রাতের আলস্য ঝেড়ে গান ধরে। তখন সে জেগে উঠে ফোকলা মুখে মুচকি হাসে। আমি তখন বাইরে আনি তাকে। পশ্চিমে তখন আকাশ লালিমা করে সূর্যের সৃজনশীল বেদনাপর্ব চলে। আমি তাকে লাল আকাশ দেখাই। ফুলের নোয়ানো ডালটার কাছে এনে গন্ধ শোঁকাই। চেনা দোয়েলের ডাক ডেকে শোনাই। আর পারিজাত ফোকলা মুখে শুধু মুচকি মুচকি হাসে।

পারিজাত বেড়ে উঠতে উঠতে যখন এই সত্য জানলাম, তখন আমার উঠোনে আর ঝলমলে রোদ নাই। আহা, আমার প্রশস্ত উঠোনখানা। জীবনের সমস্তটাজুড়ে যে নোনা পৃথিবীর রাজত্ব চলে, এই সত্য কখনো কখনো আড়াল পড়ে যায়। যখন আড়ালটুকু উঠে গেলো, আমি তখন পারিজাত বলে কাঁদলাম। কন্যা বলে বুকে তুলে নিলাম আর মা বলে পায়ে মাথা ঠেকালাম। তবে, সত্যিই সে কথা কইবে না কোনো দিন? জানে কি এই সত্য চঞ্চল পাখি, ভোরের আধফোটা ফুল? কিংবা তার নৈসর্গিক সকল সঙ্গী? হা, পারিজাত কথা কইবে না কোনো দিন। তার মুখে বোল ফুটবে না কোনো দিন। কিন্তু বোল না ফুটলেও নৈসর্গিক সঙ্গ থেকে সে সামান্য বঞ্চিত হবে না জানি। আমার অফুরান বেদনা আর ভয় হলো, সে কখনো আমার পারিজাত ডাক শুনতে পাবে কিনা, জানি না আমি।

তবুও তো চললো দিন। আমি এখন তাকে পারিজাত ডাকি না শুধু। কন্যা ও মা ডাকি সময় সময়। আর আমার পারিজাত, আমার কন্যা, আমার মা, দুটো সামান্য গজিয়ে ওঠা দাঁত নিয়ে ভূবন ভোলানো হাসি হাসতে থাকলো। আর আমি কখনো হাসলাম কখনো কাঁদলাম। এভাবে তার এক বছর পূর্ণ হলো যেদিন, সেদিন ফাগুনের অষ্টম দিনের ভোর। আমি তার হাত ধরে আমাদের বাগানে এসে দেখলাম অসংখ্য পাখিরা গল্পখেলায় মেতে উঠেছে। আর ফুলগুলো হালকা হওয়ায় নাচের মতো দুলছে। পারিজাত আমার এই দেখে দারুণ খুশি হয়ে ছুটে গেলো ফুলেদের দিকে, পাখিদের দিকে। আর হাত বাড়িয়ে স-ব-র-জ-শ মতোন শোনা যায় তেমন অস্ফূট কি যেনো বলতে থাকলো। আমার আনন্দ হলো বাঁধ ভাঙা। কান্নার বাইরে আর কোনো শব্দ আমি তার গলায় শুনি নাই। তাই আমি কোলে তুলে আমার পারিজাতকে বুকের সাথে জড়িয়ে নিলাম। তখনো সে ফুলেদের দিকে পাখিদের দিকে হাত বাড়িয়ে স-ব-র-জ-শ বলতে থাকলো। আমার বিশ্বাস হলো, পারিজাত আমার নির্বাক হয়ে থাকবে না। পাখিদের মতো স্বরে তার মুখে বোল ফুটবে দ্রুত।

আমার সাধনা বৃথা গেলো না সত্যি। তার মুখে পাখিদের মতো স্বরে বোল ফুটলো। পারিজাত, সত্যিই হয়ে উঠলো নিসর্গের ফুল। আর আমার জীবনটা ভরে ভরে উঠলো। কিন্তু একদিন, ফাগুনের অষ্টম তারিখে পারিজাতের বয়স যখন বায়ান্ন হলো, তার মুখে আঁধারের ছায়া দেখে আমি কাঁদলাম। আর পারিজাত আমার আহতের মতো পড়ে থেকে অস্ফুট স-ব-র-জ-শ শব্দ করলো। সেদিন সন্ধ্যা হলে সালাম-বরকত-রফিক-জব্বার -শফিকের সংবাদ শুনে আমি আরো কাঁদলাম। আমি আর পারিজাত জড়াজড়ি করে কাঁদলাম।