মা তুমি...

শিবু মণ্ডল

আবার ফিরে এসেছে সেই রাত। আতঙ্কিত গ্রামের সবাই ছুটে পালাচ্ছে দূরের গ্রামের দিকে মৃত্যুর থেকে দূরে। কোলে দু’বছরের ভাইটিকে কাঁখে নিয়ে বড়দি ছুটছে ভিড়ের পিছনে পিছনে আর দিদির পিছনে পিছনে এক ভাইয়ের হাত ধরে মেজদা ও সে।কোনদিকে যাচ্ছে জানে না, শুধু এটুকু অনুভব করে যে সবাই পালিয়ে বাঁচতে চায়। তাই সেও সবার সাথে সাথে ছুটছে। পেছনে ধাওয়া করছে আগুন।
অপারেশন সার্চলাইট কী সেই দশবছরের মেয়েটি তো জানে না, নামই তো শোনেনি। সে শুধু তার ছোট্টদুটো চোখ দিয়ে দেখেছে গ্রামের সবার চোখেমুখে এক ভয় লেগে থাকে সবসময়। বাড়িতে বাবাকে রোজ তার জ্যাঠা- কাকাদের বলতে শোনে আজ কোথায় কোথায় গণ্ডগোল হল। মাকে বলে-“দরকারি জিনিসপত্র যতটা পার পুটলায় বাইন্ধ্যা রাইখো, অবস্তা খারাপ হইলে যহন তহন পলাইতে হইতে পারে।”
গত আট মাসে আরও তিনবার পালাতে হয়েছিল তাদের। আজ আবার! এই ভয় আর এই বাঁচার তাগিদে পালানো যেন দৈনিক অন্যান্য ক্রিয়াকর্মের মত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। চারদিকে গণ্ডগোল, আর গণ্ডগোল মানে পাশবিক অত্যাচার,মৃত্যু আর আগুন ! আগুনের কথা মনে হতেই পিছনে ফিরে তাকায় সে দেখে নিতে চায় তাদের বাড়িটিকেও কি আগুন এসে গ্রাস করেছে কি না। সে দিক খুঁজে পায়না অন্ধকারে, কোনদিকে তাদের গ্রাম? সে তো দিকটাই ঠিক করতে পারছেনা। কোনটা পূর্ব, কোনটা উত্তর আর কোনটা দক্ষিণ। আর কোন দিকে পালাবে বলে বেরিয়েছিল সেটাও মনে করতে পারছে না যে। নিকষ অন্ধকারের ভিতর কোনো বাড়ি আছে কিনা, কোনও গ্রাম আছে কিনা, কোনও দেশ আছে কিনা সে ঠাহর করতে পারে না। কার্তিকরাতে শুধু দেখে ওই দূরে জোনাকি আর জোনাকি, জ্বলে আছে নেভেনা আর।
কতটা মৃত্যু সে ছেড়ে এসেছে( সে নয় তারা) আর কতটা বাঁচার দিকে এগোল সে তার আঁচ পায়না। হঠাৎ সে অনুভব করল সে যেন গড়িয়ে যাচ্ছে একতাল কাদামাটি হয়ে। ভাইটি দিদির কোল থেকে ছিটকে গিয়ে চিৎকার জুড়েছে। কোনমতে সামলে নিয়ে উঠে ভাইটিকে হারানোর হাত থেকে বাঁচায়। সে জানে সামনে পা ফেললেই গ্রামের শেষে খাল। বর্ষার জল নেই গলাজল আছে। ভয় থেকে তারা যেন একে একে সাঁতার হয়ে যায়। এ নস্যি খাল পাড়ি দিতেই যেন আবার ভয়ে এসে ভিজে থাকে হাড়হিম। দশবছরের ওইটুকুন মস্তিষ্কে চিন্তার তরঙ্গ কেঁপে কেঁপে ওঠে। সে কি মৃত্যু পেরল! অন্যের চিন্তায় কি খেলছে সে জানতে পারছে না বলে সেও ধরে নিচ্ছে তারা সবাই একটা মৃত্যু পেরল।তবে কেউ যদি না পেরতে পারে তবে এই ভিড়ে জানাও যাবে না।
পূবদিকের দিগন্তে যে আলোর শিখাগুলো কাঁপছে তা তাদের গ্রামের নয়। খালের ওপারটাতেই তো তাদের বারতা। তাহলে এখনও তাদের ঘরবাড়ি আস্ত আছে। আগুন যদি আসেও এখনও দেরি আছে।তবে তারাও বেঁচে থাকার দিকে নামমাত্রই এগোতে পেরেছে, যতটা তার ছুটতে ছুটতে মনে হয়েছিলো ততটা নয়। ভিড় ঠেলে ওঠে! দিদি কোথায় ? ভাই, দাদা ছিলো তো! আর সবার আগেতো ছিল আরএক ভাই কোলে মা আর মেজদি। তারাও কোথায় গেল? গলা-বুক যেন চেপে আসতে চাইছে। সে যেন চিৎকার করে কেঁদে উঠল, কিন্তু সেই কান্নার আওয়াজ সে শুনতে পারছে না কেন? সে বড়দি বড়দি করে ডাকছে, মা মা করে হাহাকার করছে, কিন্তু সে তো নিজেই শুনতে পারছে না , মা কি শুনতে পারছে, দিদিই বা কি করে শুনতে পাবে!
একটা হাত এসে টেনে ধরে “ বইন নুরাইয়া চ, নুরাইয়া চ,আমার পিছন ছাড়বি না।”
সে সাঁতারের পর আবার একটা দৌড় পায়। দৌড়ের মধ্যে পায় কত কত খেত,মাঠ খুব কম।
খালি খালি পায়ে পায়ে পায় অঘ্রাণের ধানগাছ কাটা মোথা।
সেইসব কাটা মোথাদের মায়া ছেড়ে এখনও অনেক ধানেরা মাঠ ছাড়েনি। পায়ের পাতাতে তাদের
আঁচড় লাগে। কত কত ধানগাছ শুধু লাশ হয়ে পড়ে আছে স্তূপ হয়ে...
বুটের লাঞ্ছনা এঁটেল মাটিতে এঁটে আছে যেখানে সেখানে
তারপর আসে জনহীন গ্রাম। তারপর আসে শূন্য শূন্য পাড়া, রক্তে রক্তে ভরা
কোনটির সীমানা দিয়ে যেন এখনি হেঁটে গেছে ধর্ষকামী সেনার টহলদারী
রি-রি রক্ত দিয়ে লেপে দিয়েছে উঠোন কত কত নারী!

মা-র থেকে যখনই তার দেশের কথা, ছোটবেলার কথা শুনতে চাই, তখনই এই গল্পটি দিয়েই প্রতিবার শুরু করে মা। আমি বলি জান মা এই যে তোমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াই এইটা কিন্তু শুরু হইছে বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার লড়াই দিয়া। শত্রুদেশ চাইছিল বাঙালির ভাষা কাইড়া নিতে!
কি জানি আমরা অতশত বুঝতাম না। কারও মুখের ভাষা আবার কেউ কোনদিন কাইড়া নিতে পারে নাকি? সম্পত্তি কাইর‍্যা নিতে পারে, দেশ কাইর‍্যা নিতে পারে, কথা কওয়ার ভাষা আবার কেমনে কাইর‍্যা নেয়!
দেশ কারা ভাগ করে আর কারা তাদের ভোগ করে সেইকথা ইতিহাস ভালো জানে মা ! কিন্তু ভাষার কথা কে ভাবে ?

মায়ের কথা কিন্তু ভেবেছিল বড়মাসি ! তারপর তারা আবার একসাথে ছুটতে লাগলো। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম, এক জনপদ থেকে আরেক জনপদ ! চলতে চলতে তারা একটা অন্ধকার ক্রমশ পেরিয়ে গেল ! বারতা থেইকা বোয়াইল, বোয়াইল থেইকা রাজাবাড়ি, রাজারাড়ি থেকে নয়ারহাঁট – সব গ্রামগুলি যেন এখনও চোখে ভাসে! সে চোখে শুধু অন্ধকার ! এভাবেই রাত্রির শেষে একটা কাঠের ব্রিজ পেরিয়ে ক্লান্তির ভোরে আসে আবদুল্লাপুরে ! ভিনধর্মী এক বাড়িতে আশ্রয় নেয় তারা ! তারা আগুন জ্বেলে দেয়! সে আগুনে শরণার্থীদের শরীর-মন থেকে হিম-ভয় গলে গলে পড়ে। ছোটো ভাইটির এখনও কোনও ভাষা জন্মায়নি, তাই কান্না থামছে না ! বড়দিদি একটু গরম গরম ভাত চেয়ে আনে যৌথ উনুনের হাঁড়ি থেকে!
এই যে এত এত মানুষ প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বেড়ানোর পথে তারা অজান্তেই একটা পুঁটলিতে তাদের প্রিয় মাতৃভাষাটিকে আঁকড়ে বেঁধে নিয়ে চলেছে। তারা হয়ত জানে না এই যে সংগ্রাম এ যতটা না দেশের জন্য তার থেকেও বেশি শুধু মাতৃভাষার জন্য। দেশ তো আপেক্ষিক মাত্র। কিন্তু ভাষা কি তাই? মুখের এই প্রিয় ভাষাটি না থাকলে কে তাদের বুকে বল যোগাতো, কি করে তারা প্রতিবাদ- প্রতিরোধ কি সেটা জানত ! কীভাবে তারা সেইসব দুর্দিনের দিনগুলোতে একে অপরকে উষ্ণতার আঁচ দিয়ে আরও সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে উঠতে পারত? একমাত্র মাতৃভাষাই তাদের সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা এনে দিতে পেরেছে শেষ পর্যন্ত !



জীবনের পথে আমরা কখনও কখনও শত্রুদের কাছাকাছি চলে আসি। তখন লড়াকু স্বত্বাটি যেন আরও বেশি করে চাগার দিয়ে ওঠে। কিন্তু মার বর্তমান বয়সে দেখি যেন এক নির্লিপ্ত ভাব। দুচোখে শত্রু বাসা বাঁধতে শুরু করেছে।
মাকে বলি “ মা- এই যে বেশ কয়েকবছর হল আমার চাকরীসূত্রে ভিনপ্রদেশে আসা যাওয়া করো, তো সেই ভিন ভাষাটিও শেখ না কেন? গ্লকোমায় ক্রমশ আবছা হয়ে যেতে থাকা চোখদুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে।
চেষ্টা তো করলাম,পারলাম কই রে বাবা !
এটাই বোধহয় প্রকৃত লড়াই যা মজ্জাগত! যা আমাদের নত হবার ইচ্ছা সত্ত্বেও সেই লড়াই তা হতে দেয় না !
আমি মনে মনে একটা কবিতা বাঁধি মায়ের থেকে সেই লড়াইয়ের ভাষা ঋণ নিয়ে ! মা আমি যতটা তোমার কাছে ঋণী ততটাই তোমার ভাষার কাছেও ঋণী......

আমি মননশীল কারণ আমার মাতৃভাষা
অক্ষরে অক্ষরে সুদৃঢ় মেরুদণ্ড
চেতনায় তুমি জাগ্রত
আমার বাংলাভাষা ।

ভুলিনি আমি একুশে ফেব্রুয়ারি
ভুলিনি আমি শহিদ হয়েছে যারা
শিখেছি আমি আমার মাতৃভাষা
এনে দিতে পারে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা !