আমাদের মা ডাক, আমাদের বাবারা ডেকে ওঠে

শুভ আঢ্য

আর তারপর আমরা ভাষার কাছে যাই... হে আদিম, হে অনন্ত কার্পাসহীনা ভাষা... সে বসে আমাদের গুহার দেওয়ালে, যেখানে আমাদের কথোপকথন থাকে না, আমাদের সুখ, দুঃখ থাকে না, আমাদের বোধ আর ছায়ার মত হতে হতে একটা সময় আমাদেরই মত মানুষ অথবা জন্তু হয়ে ওঠে। আমরা বলি। বলি সেই জান্তব ভাষা, আঁকি ছবি। একটা ঘর জুড়ে অনন্ত নৈঃশব্দ, আমাদের মা ডাক, আমাদের বাবারা ডেকে ওঠে। আমাদের সন্তানেরা সেই ভাষার তলায় ঘুমোয়, তাদের পা থেকে অক্ষর বেরিয়ে এসেছে, তাদের ঘাড়ে নেকড়ে মায়ের ভাষা লেগে ওই থাকে লালার মত। ওহ্‌, ভাষার আস্তিন, লুকোনো যুক্তাক্ষর, লুকোনো ধ্বনি, বেড়ে ওঠে, গান হয়। সে গান গাইতে গাইতে দেখি তুমি আমি পেরিয়ে যাচ্ছি নীরবতা, অথচ আমাদের বলা তো হল না কিছুই। গায়ে তো পড়ল না সেরকম কিছু ভাষার চাদর যা দিয়ে শীত ঢাকা যায়, যা ফুল খুব ফোটায় গতরে।
অর্থাৎ এই আমাদের আলো। আলো অরুণার দিক থেকে বয়ে চলে ভাষার পাহাড়ে, হে মাধ্যাকর্ষণ, ক্ষমা করো, এসো আমরা ওই টিলার ওপরে দাঁড়িয়ে খুলে দিই ভাষার আগল আর সমগ্র ধাতুরূপ ঝড়ে পড়ে যেন এক প্রচণ্ড ঝর্ণাকলমের দিকে চেয়ে ওই আছি আমরা কবেকার সেই মায়ের মুখের মত, যেন সেই অক্ষরস্তন থেকে বেরিয়ে এসেছে মাধব-মাধবী, বেরিয়ে এসেছে সেই বোবা জিরাফের গান, তার চিৎকার... ওহে ভাষা, সেখানেও বড় করে আছো তুমি বিজ্ঞাপনের মত... কবি দেখে, বোঝে তার প্রতিটা অক্ষর। আমাদের বোঝা হল না তো, তবু স্বীকারের পরে আছো তুমি, অস্বীকারের ঘ্রাণটুকু নিয়ে, তার অনন্ত ইচ্ছেটুকু যেভাবে মায়ের ডায়াফ্রামের ভেতরে থেকে থাকে।
এসো সতী, এসো সাত্ত্বিক সুন্দর, নন্দনের বনে আমরা ছাড়াই তোমায়। এসো নগ্নতা, এসো ভাষার ফাল্গুন মাসে কোনো রায় কবি যে কিনা ফাল্গুনী হয়ে চিনে রবে ভবিষ্যতে, তাঁকে ডাকি। খুব করে ডাকি আমাদের গান দিয়ে, আমাদের জান্তব ভাষা যা আমাদের সাথে শোয়, যা আমাদের লিঙ্গের কথা বোঝে, আমাদের নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরে তাকে ভালবাসি মাসিকের দিনে। অহো, এই তো নির্ঝরের ভাষার আদল, তুমি মানো না, তবুও তো ফিরে যেতে হয় সেই ভাষার বাগানে মভ রঙের ফুল যেখানে ফুটেছে শরীরে, কবিতায় ফুটেছে, তার ডাক ফুটেছে সদ্যোজাত সন্তানের মত... শুধু বল এই মা’কে অস্বীকার করার কথা, একবার! বলো এই ভাষা ছেড়ে সৃষ্টির কথা ভেবে তুমি পেয়েছো কী অসীমে? সুতরাং, এসো নন্দনের বাগানে তছনছ করা ভাষার ভেতর আমাদের উদোম হবার দিন আগত।
কী বা আছে আমাদের উদোমডাঙাতীরে ভাষা ছাড়া! ভাবো যে আধারে তার কথা, সে’ও তো ভাষা কোনো, না কি আমাদের আধারের ধারণাট্টুকু শুধু হাওয়ায় মিশে আছে? শুধুই মিশে আছে মায়ের স্তনের তলায় ছোট্ট শিশুটির দাঁত, সেখানে দুধের ভাষা পড়ছে গড়িয়ে? অ্যাডামের ভাষার আপেলে কামড় বসাছে ইভ, এই তো স্থানান্তর, সেইই তো ভাষার প্রকরণ যা এক থেকে অপরে জারিত।
একুশ বলে চেনা যা কিছু আর অক্ষররূপ, লিপি, সবই তো ভাষার আদলে। হে নৈঃশব্দ তাদের মৃত্যুর ভাষা, তাদের মায়েরা চিনেছে, তাদের কান্নার ভাষা আমাদেরই মত জলরঙের। তারাও তো প্রাচীনতা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে, তারাও তো নবীন ভাষার স্বাদটুকু খুলে আম পাবার জন্য তাকিয়ে রয়েছে, দেখো। তাদেরও মা ডাক অনূদিত হয়েছে অপর ভাষায় কোনো। তারাও মা ডাকে চিঠি তো লিখেছে, ভাষার ওপর... ভাষাতেই