মুখ

ম্যারিনা নাসরীন

স্যাখন আমি ক্যাবল ডাঙ্গর হইছি। বাপজানের সাথে ক্ষেতির কামে যাতি মন করেনা। খালি ঘোম আসে আর ভাল ভাল খাবার মন চায়। কিন্তুক গরীব মাইনষের খাতি মন চালি তো শুধু হবিনা। আব্বা এসব কনে পাবে? আমাগের মন্ডল পাড়ায় সব হাড় হাভাতের দল। নুন আনে তো পান্তা ফুরোয়। জোয়ার্দার পাড়ায় কয়েক ঘর ভদ্দরনোকের বাস। তারমদ্যি জোয়ার্দার চাচার বাড়িত পেত্যেক দিন কাড়ি কাড়ি ভাত তরকারীর আয়োজন হয়। মাঝে সাঝে আমি চাচীর কাম কাজ কইরে দে আসি। চাচী ভালোমন্দ খাতি দ্যায়। মারে কলাম, আমি আর ক্ষেতির কামকাইজ করতি পারবনানে আমারে জোয়ার্দার চাচার বাড়িত কামে নাগায়ে দে। মা মুখ ঝামটা দে ওঠলে, ধাড়ি মাগী হইছির, তোরে বে থা দিয়া নাগবি না? মাইনষের বাড়িত কামে গেলি তরে বে করবেনে কিডা? আমিও মুখ নাড়ায়ে মারে জবাব দে দিলাম, আমারে কামে দিলি দে নালি সোবহানের সাথে বারায়ে যাবানে দেহিস। সে সুময় আমি ছাড়া এমুন সাহসের কতা কবার সাহস ছিলনা মন্ডল পাড়ার কোন মাইয়ের। মা আমার ঝাঁটা দে যে মাইরডা মাইরলো সে আমি জেবনে ভোলবো না। কিন্তুক মাও আমারে চিনত। যা কইছি তাই কইরে ছাড়বানে জানে। সোবহান আমাগের পাড়ার আলাভোলা ছাবাল। সোবহানরে যদি কই আমার পাওখান টিপে দে তালি তাই করবি। কিন্তুক এসব আমার কিছু দরকার ছিল না। আমার প্যাটে নাজ্যির ক্ষিদে। প্রায় পেত্যেক দিন মা বাইগুনের সেক্সি রাইন্দে থোয় আর ইরির চালির ভাত। বাপজান ক্ষেতির কাজে যে কপয়সা পায় তাতে চাইল কিনাই হয়না বাইগুন ছাড়া আর কি আছে ভাইগ্যে? ছেলেপিলে তো মাশাল্লাহ আমারে দিয়ে ছয়খান। এইসব চিন্তেভাবনা কইরে মা আর কিছু কয় না। দুদিন বাদে আমারে জোয়ার্দার বাড়িত নিয়া চাচীরে কলো, ‘বুজান, মাইয়ে দে গেলাম দেইকে শুইনে নাইখো’
জোয়ার্দার চাচা এজমালি গেরস্থ। তিন ভাইয়ের সুংসার একসাথে। তাগের আবার একগাদা ছেলেপিলে। নাজ্যির কাম। সেই বিহান বিলায় উইঠে কামে নাগি সারাদিন এট্টু জিরোনের সুময় পাইনে। আমি ছাড়া আরো তিনজন ঝি মাইন্দের খাটে। বিহানে উইঠে কলপাড়ে বইসে একগাট্টি থালবাটি ছাই দে মাইজে ঘইষে ঝকঝকে করতি কম সুময়? তারমধ্যি জোয়ার্দারের মা বুড়ি আইসে কলপাড়ে পাছার নিচে পিড়ি ঠেকনা দে বইসে থায়ে। ওই হাড়ির কান্দে ময়লা, বাটির পুটকিতে কালি নাইগে আছে ক্যান? গিলাসের মধ্যি হাত দে মাইজে নে। কত খবরদারী। মাঠের মতন বড় উঠোন। ঝাট দিতি দিতি কোমর নাইগে আসে। তারপর আটটা গরুর গোবর পইষ্কার কর, নানদায় পল পানি খইল দ্যাও। তো এসব কামকাজে আমার ভয়ডর নেই। গায়ের শক্তি মেলা।প্যাটে ভাল মন্দ খাবার পড়লি কাম ঠেইলে করতি পারি। জোয়ার্দার চাচি সিডা জানে বইলেই সগলের মধ্যি আমার থালে খাবারডা এট্টু বেশি বাড়ে।
দুদিন বাদে বাদে মা আসে আমার খোঁজ নিতি। আমার শইল হাতায়, মায়ের চোখ ছলছল করে, চাচীরে কয় মাইয়েডা আমার খাতি পছন্দ করে বুজান। তুমার বাড়ি থাইকে কেমুন ডাঙ্গর হই গেছে। চাচী হাসে,
‘তুমার মাইয়ে তো খাবার কোলা। এত দেই থই পায় না।’
সন্ধ্যা হলি রাজি খালা বইসে ত্যাল নাগাইয়ে আমার চুল বাইন্ধে দেয়। ঘুটঘুটে আন্ধারের মইধ্যেও খালা পুজুলী ড্যাঙ্গর আইনে নকের আগায় থুয়ে পট্টাস করে ফুটোয়। রাজি খালার কাজ শুধু রান্দাবাড়া করা। চৌপর দিন পাক ঘরেই কাটে তার। ধান তোলার গোণে বিহানে পিরাই দশজন কামলা খায় । আর সারা বছর তো দুই পাঁচজন নাইগেই থায়ে। একেকজন এক কেজি চালের ভাত খাতি পারে। তো সে জোয়ার্দার বাড়ির কেউ কামলার ভাত নে ভাবে না। চার চারডে গোলা ভরা ধান। একটা ঘর ভর্তি খালি চালের কোলা। রাজি খালা ধামা ভইরে চাইল বাইর কইরে আনে আর বড় বড় ডেগে সেই ভাত রান্না হয়। বাড়ির পাশে তরকারীর খ্যাত। মুলো বাইগুন সীম নাও কত কি! ক্ষ্যাতের ডাইল। কিডা কতডা খায় হিসেব নাখে কিডা?
রাজি খালার মনে অনেক দুক্ষু। মার প্যাটে থাকতি বাপে মরিছে। আর য্যাখন নয় বছর বয়স ত্যাখন মাও চইলে গেল। তারপর থে বড় বইনের কাছে মানুষ। এক বুড়োর ধারে ভিন গিরামে বে দেছিল বইনে। কিন্তুক কয়দিন পরেই হ্যায় বুড়ো খালারে খ্যাদায়ে দেল। গিরামের লোকে তখন কানাঘুষা করলো যে বে হবার আগেই খালার প্যাটে সন্তান ছিল। সেই সন্তান নাকি খালার বুনাইয়ের।
আমারে এসব কতা সব কইছে বুলবুলি। আমার সাথেই জোয়ার্দার বাড়ি কাম করে। আর একখান কতাও কইছে। রাইতে নাকি খালার ঘরে জোয়ার্দার চাচা আসে। সে কিন্তুক আমিও জানি। পাক ঘরের পাশে একখান খুপরি ঘরে আমি আর খালা থায়ি। দোরে শুধু একটা হুড়কো নাগানো। একদিন নাইতে খুব পেচ্ছাব চাপলো। বাইরে ঘুটঘুটে আন্ধার। খালারে ডাকতি যাব অমনি শুনলাম বিটা মাইনষে চুপচুপ কইরে খালার সাথে কথা কতিছে। গলা শুইনেই আমি বুঝে গিছি এ জোয়ার্দার চাচা। আমি ঘাপ মাইরে শুয়ে তাগের কান্ডকারখানা দ্যাকলাম। আজ অব্দি কাউরে কিচ্ছু কইনি।
কিন্তুক বুলবুলির মুখ বড় খারাপ। ও রাজী খালারে দেইখে চুপিচুপি শ্লোক গায়,
আগ্ ধুমসি
বাগ ধুমসি বাবুর ব্যাডা লো
ছেনাল মাগির কোচ্ছে শুয়ে পেরেম কত্তিলো
গা টেপলো
পা টেপলো গলায় দেলো হাত
ছেনাল মাগির জড়ায় ধরে কাটায় দেলো নাত।
জোয়ার্দার চাচারা তিনভাই। গিরামে তাগেরে খুব সুনাম। ভাইয়ে ভাইয়ে এত মিল। জায়ে জায়েও কোনদিন কেউ ঝগড়া ফ্যাসাদ দেকেনি। কুনডা চাচী কুনডা মা তাগের ছ্যালেপিলেগুলোন সিডা বুঝতি পারেনা। সুংসারে জোয়ার্দার চাচী যা কবে তাই। ছোট দু জা তারে আপন বড় বইনের মত মান্যিগুন্যি করে। দেবর দুজনেও সেইরাম। ছোট চাচা কদিন হইলো বে করিছে। ছোট চাচীর চেহারা একদম মা দুগগোর মতন। গায়ের ফটফটা রঙ য্যান নক্ত ফাইটে পড়তিছে। ছোট চাচী গা ভর্তি গয়না পইরে যহন উঠোনে হাঁইটে বিড়ায় গয়নায় গয়নায় নাইগা ঝুমুর ঝুমুর কইরে ওঠে।
এত সুকের মদ্যি একদিন এককান কান্ড হইয়ে গেল। নাইতে রাজি খালার সাথে ঘুমোয় ছিলাম। ঘোমের মধ্যি মনে হইলো কিছু একটা ফ্যাসাদ হতিছে। চোখ খুলে যা দ্যাকলাম তা বিশ্বাস করতি কষ্ট হয়। জোয়ার্দার চাচা মাটির দির মুখ কইরে চুপ মাইরে বইসে নইছে আর চাচী আঙ্গুল উঁচু কইরে দাঁড়ায়ে আছে। আমার পাশে রাজি খালার মুখ এম্বা ঝুইলে নইছে যে দেহা যায়না। আগে কি হইছে কতি পারবনানে কিন্তুক দ্যাকলাম চাচী একটা কথাও কলে না আস্তে আস্তে ঘর ছাইড়ে চইলে গেল। কিছুবাদে চাচাও বারাইয়ে গেল। আমি খালারে কলাম,
‘খালা এইসব খারাপ কাম কত্তি তুমার নজ্জা নাগে না?’
খালা শাড়ির খুঁটে চোখ মুছতি মুছতি সেই যে ঘর থেইকে বারায়ে গেল আর কুনুদিন তারে কেউ দ্যাকেনি।
কনে গেছে কেউ কতি পারেনা। আইজ পন্ত রাজি খালার জন্যি আমার কষ্ট নাগে।
এরপরথে চাচী কেমুন জানি হইয়ে গেল। ঠিকমত কারুর সাথে কতা কয়না, খায়না। সুংসারের ওপর তার য্যান অরুচি হয়ে গেছে। চাচার সামনে তো যায়ই না। মাইঝে চাচীর হাতে সুংসারের সব ভার দে খালি নামাজ কালাম আর তসবিহ নে পইড়ে থায়ে।
দিন তো থামি থায়ে না। জেবন চলতি থাইয়ে যেমন চলতিছে আমাগের গাং। জোয়ার্দার বাড়ি আইছি পিরায় তিনবছর হল। মা আমার বে দিবার জন্যি পাগল হয়ে গেছে। ছাবাল পায় না। ছাবাল পালিও তারা যা চায় তা দিবার সামর্থ্য আমার আব্বার নেই। জোয়ার্দার চাচী কলে পেয়ারাবানুর বের খরচ সব আমি দেব। ছাবাল ঠিক কর।
শুইনে আমার কইলজের মধ্যি য্যান কেউ খামচায়ে ধরল। মুখ ফুইটে কাউরে কতি পারিনে এই বাড়ির ইজাবুল ভাইয়ের সাথে আমার ভালোবাসা। কাজের মাইয়ের সাথে মালিকের ভাইগ্নের ভালোবাসা? কাইটে দুডোরেই গাঙ্গে ভাসায়ে দেবেনে। ইজাবুল ভাইয়েরও কিছু কবার সাহস নেই। মাঝে মধ্যি আমারে কয়,
‘সুময় হোক আমি চাচারে কইয়ে তোরে বে করব। চিন্তা করিসনে।’
কিন্তুক চিন্তা তো মাথায় ধরে না। কবে য্যান রাজি খালার মতন আমারেও চাচি ধইরে ফেলে। জোয়ার্দার চাচার মরা বুনের ছাবাল ইজাবুল ভাই। সেই ছোটকাল ধইরে এই বাড়িত মানুষ। কোন কিলাস পন্ত পইড়ে ছাড়ান দিছে। চাচার ব্যবসা দ্যাকশোন করে। বয়স হইছে মেলা কিন্তুক বে করতি গরজ নেই। ইজাবুল ভাই কয়, চাচা ইচ্ছে কইরে বে দেয়না। যদি ইজাবুল ভাই চইলে যায় ব্যবসার ক্ষেতি। ফি নাইতে ইজাবুল ভাই আর আমার বেউদ্দেশ চৈত বৈশেখের ঝড়ঝাপ্টায় কাটে। বিহান নাইতে য্যাকন নেতায়ে পড়ি, ত্যাকন চিন্তায় মাথা খায়, যদি প্যাট বাঁধে? এন্দুর মারা বিষ খাতি হবি নালি গলায় দড়ি দিতি হবি। ইজাবুল ভাই কয়,
‘প্যাট বাঁধলি ফেইলে দিবি। এত ভাবনা করিস ক্যান? আমি তো আছি। বে করব তোরে। কদিন সুময় দে।’
বেশ অনেকদিন ধইরে দেকতিছি বাড়ির মদ্যি জোয়ার্দার চাচার ভাইয়ে ভাইয়ে কি য্যান শলাপরামর্শ চলে। আস্তে আস্তে কতা কয় সেসব আমি কিছু বুঝতি পারিনে। জ়োয়ার্দার চাচার বড় ছাবাল স্বপন ভাইজান। ঢাকা থায়ে পড়ানেকা কইরতো, সেও বাড়িত চইলে আইছে।স্যাক পাড়ার মনিরুদ্দি, সামাদ, গিয়াস আমাগের মন্ডল পাড়ার মাইন্দের খাটা জোয়ান ছাবাল সাজু, আইজুদ্দি এরা সগলে মিলে দহলিজ ঘরে কি যে গুজুর গুজুর করে কিছু কতি পারিনে। একদিন ইজাবুল ভাইরে জিজ্ঞেস করলাম,
‘গিরামের জোয়ান জোয়ান ছাবালেরা সব এই বাড়ি ক্যান? আগে তো কোনদিন এইরাম আসা যাওয়া করতি দেকিনি।’
ইজাবুল ভাই যা কলো তাতে তো আমি দিকদিশা কিছু পালাম না।যুদ্দু আবার কি? ইজাবুল ভাই কয়
‘দ্যাশে যুদ্ধ বাধিছে।’
জোয়ার্দার চাচীরে কলাম,
‘চাচী, যুদ্ধু কি?’
চাচী কলো,
‘কি সে আমি কি জানি? যেদিন দেকপি সেদিন বুঝতি পারবি। এত চিন্তা করতি হবিনা।’
চিন্তা করতি হবিনা কলি তো হলোনা। চোখের সামনে যা দেকতিছি সেসব কনে যাবে? কদিন ধইরে পেত্যেক নাইতে অন্তত দশ কুড়িজন অচেনা মানুষ খায়। আস্তে আস্তে জোয়ার্দার বাড়ির সবকিছু বইদলে গেল। ছোট চাচী উঠোনে ঝুমুর ঝুমুর কইরে হাঁটে না। মাইঝে চাচী আগের মতন ছাইলেপিলের সাথে চিল্লাচিল্লি করে না। ছাইলেপিলে গুনো কেমুন জানি থির হয়ে গেছে। জোয়ার্দার চাচার ছোট দুই ছাবাল সোহাগ, শিমুল বন্দরের মতন দুষ্টু। সারাদিন খালি সাইকেলে ঘোরবে আর চিল্লেপাল্লা করবে তারাও কেমন কইরে ঘরে বইসে থাইয়ে। আমার আর কি! রান্দাবাড়া আর কাম কাজ করতি যায়ে বাড়ির বাইরে যাতি পারিনি কতদিন!
এরও কদিন পর দ্যাকলাম বাড়ির পেছনের মাঠে ছাগল গরু আর মাইনষে হুটপাট কইরতো সব ঠান্ডা মাইরে গেছে। গরু গুলান হাম্বা হাম্বা করে ছাগলের ভ্যা ভ্যা, মানুষ আগোয় আসে ন। এসব আমার ভাল ঠেকে না। একদিন মা আইসলো। চাচীরে কলো,
‘বুজান, পেয়ারাবনুরে বাড়িত নে যাই তুমাগের বাড়িত কোন সুময় কোন বিপদ আইসে পড়ে কিনার নেই।’ আমি হাঁসফাঁস কইরে চিল্লোয় উঠি,
‘কিসের বিপদ মা? আমি বাড়িত যাবনানে।’
‘মাগী তুমার বড় বাড় বাড়িছে। হুটুপাটা শুরু হইছ। বড়লোকের বৌ বেটিগোরে খানেরা ধইরে নে যাতিছে তুমি জানো না? এ বাড়িত ঢুকলি তুমারে থুয়ে যাবে? সর্দার পাড়ার রজব আলির যুবতী দুই মাইয়ে ধইরে নে গেছে।’
আমি মার কোন কথা বুঝতি পারিনে। হুটুপাটা কি? তার সাথে বৌ বেটিগের কাজডা কি সিডাও আমি বুঝতি পারলাম না। চাচী কলো,
‘পেয়ারা বানু বাড়িত যা।’
আমি গেলাম না। মারে কলাম,
‘তুই বাড়ি যা, চাচীগেরে ধরলি আমারেও ধরবি।’
ভকর ভকর করতি করতি মা চইলে গেলি চাচী আমারে ডাইকে কলো,
‘তুই ভালো করলিনে পেয়ারা। আমাগের এখন বিপদের দিন । তুইই বিপদে পইড়ে যাবি দেহিস।’
এরপর বুদোয় দুদিনও যাতি পারিনি একদিন বিহানে উইঠে দেহি সব সুনসান। বাড়িত জোয়ার্দার চাচা ছাড়া বিটা মানুষ নেই। চাচীরে জিজ্ঞাস করলি কলো,
‘সগুলি কাজে গেছে শহরে কদিন বাদে আসপে।’
ওমা এইরাম ঘটনা তো বাবার জন্মে দেকিনি। না খাইয়ে ইরা শহরে চইলে গেল সগুলে মিলে এত নাইতে? বিলা গড়তি গড়তি দুই চাচীর বাপের বাড়িত্তে দুকোন গরুর গাড়ি আইসলো। তারাছাইলে পিলে নে চইলে গেল বাপের বাড়ি। আমি কোন দিশ করতি পারিনে। কি হতিছে এসব? চাচী খুইলে কিছু কয়না । শুধু কলো,
‘কেউ যদি তোর কাছে এগের কতা জানতি চায় কবি শহরে গেছে কাজে।’
আমারে আর কিডা জিজ্ঞাসা করবি? কাজের মাইয়ে আমি। জোয়ার্দার বাড়ি উঁচু পাঁচিল দে ঘিরা। বাইরের কোন বিটা মানুষ বাড়ির মধ্যি আসতি পারে না। সব আইসে বাইরে দহলিজঘরে বসে। আর মাইয়ে মানুষ আগে কেউ কেউ আইসতো এখন আর কেউ আসেনা। আমি বাইরে যাতি চাইছি কিন্তুক চাচি সাফ কইয়ে দিছে,
‘এই পাঁচুলির বাইরে গেলি একবারে বাড়িত চইলে যাবি।’
যাইনি। ইজাবুল ভাই না ফেরা পন্ত এই বাড়ি ছাইড়ে নড়তি পারব না আমি।
দিন য্যান কাটে না। ইজাবুল ভাইয়ের সাথে কদ্দিন দেকা নেই। সে ছোট চাচাগের সাথে গেছে কিনা তাও কতি পারিনে। বুকের মদ্যি ফাঁপা বাতাস য্যান তুফান তুইলে যায়। কাম কাইজ কিছুই ভাল ঠ্যায় না। মন খালি ইজাবুল ভাইয়ের জন্যি আঁকুপাঁকু করে। বুড়ি দাদী মরিছে বছর হইলো। চাচীও ক্যাম্বায় হয়ে গেছে। কি রান্তি হবি, ছোট ছাবাল দুটো, চাচা কি খাবি কিচ্ছু চাইয়ে দ্যাহে না। সারাদিন হাতে তসবিহ নে জপ করতিছে আর বিড়ালের মতন কইরে ঘর বাইর করতিছে। চাচা চৌপর দিন নিজের ঘরে শুইয়ে থায়ে আর এট্টু পরপর হাত টিপ্যা দ্যাও পা টিপ্যা দ্যাও।
সেদিন তখন সক্কাল হইছে। উঠোনবাড়ি ঝাটঝুট দে চুলো ধরাইছি কেবল। চাল ধুয়ে চুলোয় দেব এরাম সুময় বাইরে ফটাস ফটাস শব্দে কান মাথা তব্দা মাইরে গেল। ও আল্লাহ, কেয়ামত আইসে গেল নাকি? কনে ভাত, কনে চুলো। আমি পড়িমড়ি কইরে চাচীর ঘরে দৌড়ুলাম। চাচীও দুই ছাবাল নে বারায়ে আইছে।
চাচী চিল্লায়ে কলে,
‘ওরে মিলিটারি আইছে বুদোয় তাড়াতাড়ি দোর বন্ধ কর। শিমুল, সোহাগ তোরা খাটের নিচে ঢুইকে যা।’
কওয়াই সারা। কেউ আর ঘরে ঢুকতি পারিনি। আমার চোখের সামনে মানুষগুলান পাখির মতন ছটফট করতি নাইগলো। চাচি, শিমুল, সোহাগ। পুলিশের কাপড় পরণে এক বিটার হাতে নলের মতন কি য্যান। সেই নলের মুখ দে আগুন ছুইটে ওগের বুকে চোখে মাথায় যায়ে নাগিছে। এডিরে বুদোয় বন্দুক কয়। চাচীর মুখে শুনিছি। ঘরের ছাইসে নক্তে ভাইসে গেল। আমি অথপ্পের মতন দাঁড়াই নইছি। না পারতিছি কানতি না পারতিছি ওগেরে জড়ায়ে ধরতি। সোহাগ অনেক সময় ধইরে ছটফটাইলো। আমার কাছে বুদোয় পানি খাতি চাইলো। আমি একপা আগুতি পারলাম না। ইজাবুল ভাই আমারে সরতি দেলে না। চোখ বড় কইরে কলে,
‘খবরদার একপা বাড়ালি তোরেও শেষ কইরে ফেলাবানে।’
ইজাবুল ভাইয়ের চোখ দুটো রাঙ্গা আমের মতন নাগতিছে। আমি ভাইবে কূল কিনারা করতি পারিনে যে মামু তারে নিজের ছাবালের মতন পাইলে পুইষে বড় করলে তার এত্তবড় সব্বনাশ করতি পারলে? মামিও তো ইজাবুল ভাইরে কম আদর যত্ন করিনি। কদিন আগে ইজাবুল ভাইয়ের জন্যি কষ্টে বুকের মধ্যি ফাঁপা বাতাস বইয়ে যাইত। তারে দেখপার জন্যি চোখ দুটো কাঙ্গাল হইয়ে গেছিল আর আইজ ওই মুখের দিক চাইয়ে মনে হতিছে এক খাবলা ছ্যাপ ফেইলে দেই মুখের মদ্যি।
চিল্লেপাল্লা শুইনে চাচা ‘কিডারে’ কইয়ে ঘরেত্তে বারায়ে কেবল চৌকাঠ ধইরে দাঁড়াইছে ইজাবুল ভাই আংগুল উঁচা কইরে কলো,
‘মুক্তিকা বাপ। দো ভাইও মুক্তি,হুজুর।’
শুধু ভাই বাপ এইটুকুন বুঝলাম। কিন্তুক মুক্তি কি কিচ্ছু বুঝতি পারলাম না। মনে করলাম ইংরেজি কতা। ইজাবুল ভাইয়ের কথা শেষ না হতি আবার ফট্টাস। সেই বিটার হাতের বন্ধুক দে আগুন ছুইটে গেল চাচার দির। চাচা দোরের গোড়ায় কলাগাছের মতন দড়াম কইরে পইড়ে গেল তারপর একদম থির। চাচার বুকের মধ্যিখানি ফুটো হয়ে গেছে সেদিক দে বইল্কে বইল্কে নক্ত বারুয়ে চাইরপাশ ছিটকে পড়তিছে। আচানক আমার মাথার মধ্যি ঘুর্ণি মাইরে উইঠলো চাইরপাশ আন্ধার হয়ে আইসলো । এরপর য্যাকন চোখ খুলিছি আমি আমার ঘরে। সবকিছু মনে পইড়ে বুকেরমধ্যি ভাইঙ্গে যাতি নাইগলো। চোখ বাইয়ে দরদর কইরে পানি পড়তিছে। গায়ে এক ফোটা বল নেই । আস্তে আস্তে উইঠে আমি দোর খুলতি যাইয়ে দেখি দোর বাইরে দে বন্ধ। কি করব বুঝতি পারতিছিনে। ওগেরে মাইরে ফেলিছে আমারে ক্যান মাইরলো না জানিনে। কিন্তুক আমিও যে এগের হাত থেইকে বাঁচতি পারবনা সে বুইঝে গিছি। আমি আর কোন সাড়াশব্দ না কইরে দোরে খিল দে শুয়ে থাকি। কতসুময় পর জানিনে দোরের তালা খুলার শব্দ হইলো। ভয়ে আমার বুক শুকুয়ে এয়েছে। কিডা কে জানে? আমি খিল খুলিনি। কছু সুময়ের মধ্যি দোরে দড়াম কইরে লাত্তি দে ইজাবুল ভাই চিল্লোয় ওঠে,
‘পেয়ারা দোর খোল নালি ভাইঙ্গে ফেলবানে।’
আমি দোর খুইলে দেবার সাথে সাথে ইজাবুল ভাই আমার ওপরে ঝাঁপাইয়ে পড়লে। আগে কত নাইত আমাগের এমন কাটিছে সেগুলোন ছিল সুখের। আইজ মনে হইলো আমার শরিলে কেইন্নো কিলবিল করতিছে। ভয়ে ঘেন্নায় দাতমুখ নাগায়ে মটকা দে পইড়ে থাকলাম।
সুখ মিটায়ে উঠে ইজাবুল ভাই কলে,
‘শোন তুই যদি আমার কথা শুইনে চলিস তালি মারবনানে। কিন্তুক যদি তেড়িবেড়ি করিস, দেকলি তো মামু মামানীর হাল। একটা মাত্র গুলি খরচ করব।’
আমি ভয়ে ভয়ে কলাম, ‘এই কাজ কেন কইরলে ইজাবুল ভাই, চাচা চাচী কত যত্ন কইরে তুমারে ছোটকাল ধইরে মানুষ করিছে।’
‘যত্ন করিছে না? আমি এই বাড়ির মাইন্দের ছাড়া কিছু না। গাধারমত খাটাইছে । বে পন্ত দেলে না। আবার একন সবগুলান মুক্তি সাজিছে।’
‘মুক্তি কি?’
‘ও তুই বুঝবিনে। মোসলমানের দ্যাশটারে হিন্দুর দ্যাশ বানায়ে ফেলতি চায়। মাইঝে মামু, ছোট মামু, স্বপন সগলে মুক্তিতে নাম লেখাইছে। যুদ্ধ করবি, দ্যাশ স্বাধীন করবি। এত সুজা? খানেরা নামিছে আগুন জ্বালায়ে মারবি সবগুলানরে।’
আমার বুকির মধ্যি য্যান ঝড় উঠিছে। ইবলিশের চাইতে খারাপ ঠেকতিছে ইজাবুল ভাইরে। কিন্তক কিচ্ছু কতি পারিনে। শুধু জিজ্ঞাসা করি চাচীগের দাফন করিছ?
‘কিসের দাফন? মাটি চাপা দে থুইছি।’
আল্লাহ গো এ কোন পরীক্ষা নিতিছ? মুখ দে কতা বেরোয়না তাও কই,
‘চাচারা সগুলি মইরে গেছে?’
‘মরবি মরবি, মামুর গুষ্টি সব মরবি । এই ক্ষ্যাত বাড়ি সব আমার হবি। বাদ দে। এতকিছু তোর জানা লাগবি না। তোরে খেদাব না। এখন যিরাম কাজ করতিছিস, আমি মালিক হলিও সেইরাম করবি। আর শোন, রাইতে তোর ঘরে খানেরা আসপি ওগেরে খুশি কইরে দিবি। কোনরকম ফাইজলামি করলি লাশ পড়বি তোর। দোর খুলা রাখেক।’
শালা বেজন্মা কুনহানের? ইজাবুল ভাই বারায়ে যাবার সাথে সাথে এক খাবলা ছ্যাপ ফেলি মাটির মাইঝেতে। সারাদিন কিচ্ছু খাওয়া নেই। প্যাটের মধ্যি পোকে কামড়াতিছে। কিন্তুক বাইরে যাবার সাহস হয়না।
শরিল ভাইঙ্গে চুইরে শুয়ে ছিলাম । চোখ খুলা। দোরে জোরে একটা শব্দ হতি ছটফট কইরে উঠে বসলাম। আজদাহা দুই বিটা। ইজাবুল ভাই কইলো মেলেটারি আসপি। ইরা তারা? একজন মেলেটারি আইসেই আমার ওপরে শকুনের মতন হামলাইয়ে পইড়লো। আর একজন দাঁড়ায়ে খ্যাক খ্যাক কইরে হাসতিছে। আল্লাহ গো, মানুষ এত্ত খারাপ হয় কেমনে? সেই নাইতে কজন আসিলো আমি মনে করতি পারিনে। পিরাই অজ্ঞান হইয়ে ছিলাম। পেচ্ছাবের রাস্তা ছিড়ে নক্ত নক্ত হয়ে গেল। আল্লার কাছে মনে মনে শুধু কইছি,
‘আল্লাহ আমারে এই দোজখ থেইকে তুইলে ন্যাও। আল্লাহ কি আমার কতা শুনিছে? শুনিনি। প্রেত্যেক নাইতে এইরাম দোজখের আজাব ভোগ করিছি। দিনের বেলা বিশ পঁচিশ জনের রান্না আর নাইতে আট দশজনে আমারে ছিড়ে খাইছে। বুক ঠোঁট কাইটে ছিঁড়ে ফুইলে গেছে।
জোয়ার্দার চাচাগের সবগুলান ঘর ইজাবুল ভাই দখল কইরে নেছে। মাইঝা চাচা, ছোট চাচা, স্বপন ভাই কনে গেছে আমি কতি পারিনে। আমার সাথে কারো দেখাও হয়না। কেমনে হবি? বাড়ির মধ্যি সব ঘরে মেলেটারি থায়ে। পাঁচুলির চারপাশে হাতে বন্ধুক নে দাঁড়ায়ে থায়ে। কতবার ভাবিছি পলায়ে যাব সাহসে কুলোয়নি দেখলি গুলি কইরে দেবে। মেলেটারিরা যেসব ঘরে থায়ে সেদিকে আমারে যাতি দেয়না। রান্না হয়ে গেলি ইজাবুল ভাই আর ছিদরুল গাজির দুই ছাবাল ভাত তরকারী ওগের ঘরে দে আসে। সারা দিনে নাইতে ভট ভট কইরে গাড়ি আসিতিছে যাতিছে। কার কারা অচিনা লোকজন আসে যায় আমি আড়ালে দাঁড়ায়ে সব দেখি। একদিন একদম কোনার দিকে ঘরের পেছনে কাঠ আনতি গেলাম। মাইয়ে মাইনষের কান্নার শব্দ পাইয়ে আগুয়ে গেলাম ঘরের দির। জানালার ফাঁক দে যা দেখলাম তাতে আমার শরিলের রোম্বা খাড়া হইয়ে গেল। পাঁচ ছয়জন মাইয়ে মানুষ উঁবু হইয়ে বইসে রইছে। কারো গায়ে কাপড় নেই। শব্দ পাইয়ে জানলার দিকে ওরা আগুয়ে আলি দেখলাম আমার মতন ওগেরো ঠোঁট কাটা বুকে কালো কালো ছোপ ছোপ। ওরা আমারে কলো, ‘আমাগেরে বাঁচাও।’ আমি ওগেরে বাঁচাতি পারিনি। নিজেই তো মইরে ছিলাম। প্র্যেত্যেকদিন কান্না শুনিছি আমিও জানালার ধারে দাঁড়ায়ে ওগের সাথে কান্দিছি। মাঝে মদ্যি খাবার দিছি কিন্তুক বাঁচাতি পারিনি। মাইনষে বন্ধুক হাতে চৌকি দেয়। ইজাবুল ভাইয়ের সাথে গিরামের আরো কজন ঘুরাফিরা করে। ওগের ভাইগ্যে পরে কি হইছে আমি কতি পারিনে।
য্যান কত বছর কাইটে গেছে। বাপ-মা ভাই-বুন কারো কোন খোঁজ পাইনে। ইজাবুল ভাইয়ের চোখে সবসময় খুন। আমি ভয়ে কিচ্ছু জিজ্ঞাসা করতি পারিনে। দুমাস ধইরে মাসিক হয়না। বমি হয়, ঘোম পায়। কারে কি কব? তাতেও নটির ছাবালেরা নাইতের পর নাইত আমারে ছাড়ে না। তল প্যাট ছিঁইড়ে আসে। আমি য্যান আন্ধার দুনিয়ায় একলা মানুষ। দুনিয়ার কেউ আমারে চেনেনা আমিও কাউরে চিনিনে। এই পাঁচুলির মধ্যি আমার দুনিয়াদারী। কোন কোন সুময় বাগানে বইসে চিক্কুর দে কান্দি। মেলেটারিরা দেহে আর লাত্থি দেয়। গালাগালি কইরে চইলে যায়। এগের কতা আমি কিচ্ছু বুঝিনে।
এরাম চলতি চলতি একদিন শুনলাম গুড়ুম গুড়ুম শব্দ হতিছে। আকাশ বাতাস কাঁইপে উঠতিছে। ত্যাখন কেবল আকাশ ফর্সা হইয়ে আইছে। ভারী প্যাট নে নড়তি কষ্ট। আস্তে কইরে উইঠে দোর খুলে দেখি মেলেটারিরা পাঁচুলি টইপকে দৌড়ুই বিলের দিকে পলাতিছে। আমি কিচ্ছু বুঝতি পারার আগে কয়েকজন জোয়ান জোয়ান ছাবাল গুলি করতি করতি বাড়ির মধ্যি চইলে আইসলো। ও আল্লাহ! এ দেখি স্বপন ভাই। আমি ছুটে যায়ে স্বপন ভাইয়ের পা জড়ায়ে ধরি,
‘ভাইজান আমারে বাঁচাও।’
‘পেয়ারা, সবাই বাঁচবে। আগে বল আর্মিরা কই?’
‘ওই যে বিলের দিক পলাইছে।’
স্বপন ভাই আরো কজন সেদিকে ছুইটে চইলে গেল। ইজাবুল ভাই কোনদিক গেছে কিছু বুঝতি পারিনি। কিছুসুময়ের মধ্যি য্যান জোয়ার্দার বাড়িত গিরাম ভাইঙ্গে পইড়লো। মাইয়ে মানুষ, বিটা মানুষ। সগুলির মুখে কত হাসি, আনন্দ! বিলা উঠতি উঠতি আমার আব্বা মা আইসলো। মা আমারে বুকের মধ্যি জড়ায়ে ধইরে কাইন্দে কাইটে সারা। কিন্তুক আমার প্যাটের দিক চাইয়েই মার চোখের পানি নিমিষে শুকোয় গেল।
‘মাগী প্যাট বাধাইছির কিরাম কইরে?’
‘মাগো মেলেটারিরা আমার ইজ্জত নিছে।’
‘খানকি মাইয়ে, খুব শখ ছিল না প্যাট ভইরে খাবি? খাইছির? আমি নিতি আসলাম ত্যাকন গেলিনে। একন পেটে বাইচ্চা নে কনে যাবি? আমার বাড়িতে জাগা হবিনা । গলায় দড়ি দে মরগে। নালি গাঙ্গে ডুইবে মর।’
আমার চোখির সামনে দে চইলে গেল আব্বা মা। যারা যারা ছিল সগলের চোখ আমার প্যাটের দিকে। আমি এই প্যাট কনে নুকাব?
আস্তে আস্তে আবার জোয়ার্দার বাড়ি ফাঁকা হইয়ে গেল। কেউ নেই। আমি ভূতের মতন পইড়ে আছি। ভাত চাইল ডাইল আলু সব আছে। খাই আর শুয়ে থায়ি। ইচ্ছে করলি একন যেদিকে দুচোখ যায় চলি যাতি পারি। কিন্তুক এই প্যাট নে যাব কনে? প্যাট ফুইলে ডোল হইয়ে গেছে। কোন বেজন্মার বাচ্চা প্যাটে জন্মিতিছে আল্লাহ জানে। দুদিন পর স্বপন ভাই, মাইঝে চাচা ফিরে আইসলো। দুজন গলাগলি কইরে ডুকরে কাইন্দে উইঠলো। ছোট চাচা যুদ্ধ করতি যাইয়ে মইরে গেছে। ছোট চাচী আর ফিরে আইসলো না। আহারে কি সুন্দর ছিল মুখটা! সগুলি কয় দ্যাশ স্বাধীন হইছে। স্বাধিন কারে কয়? কেমুন দেখতি আমি জানিনে। আমার চিন্তা প্যাট বড় হতিছে যে কোনদিন বেদনা ওঠপে আমি কি করব?
একদিন বিহানে খবর আইসলো, গাঙ্গের ওইপারে ইজাবুল ভাইয়ের গলাকাটা লাশ পাওয়া গেছে। মুক্তিরা নাকি মারিছে। শুইনে আমার মুখ ভইরে শুধু এক খাবলা ছ্যাপ উইঠলো। মাইঝে চাচী ছাবাল মাইয়ে নে ফিরে আইসে সংসার হাতে নেছে। কিন্তুক আমারে আর কাজে রাখপিনা সাফ কয়ে দিছে। পা জড়ায়ে ধরিছি,
‘চাচী আমার কি দোষ?’
কইছে,
‘বেজন্মারা তোরে নষ্ট করিছে তোর হাতের রান্না হারাম খাব?’
স্বপন ভাই আমারে কোন এক জাগায় নে গেল। গিরাম থেকে সে অনেক দূর। বাসে কইরে যাতি নাইগে বমি করলাম কবার। সেই জায়গায় তিন চাইরটে ঘরে অনেক গুলান মাইয়ে মানুষ। পিরায় সগুলির প্যাট ফুলা। আমি কিচ্ছু বুঝতি পারিনে। স্বপন ভাই কলে, কি য্যান নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র । এইটা আমি বুঝতি পারিনি কি। একজন সাদা মহিলা বিটা মাইনষের মত কাপড় পরা। আমার আর সব মাইয়ে মাইনষের শরিল দ্যাকলো, ওষুধ দেল। দুমাস মতন কাইটে গেল সেকানে। কত জনের কত দুক্ষু! একদিন বিহানে তলপেটে বিষম বেদনা উইঠলো। পানি ভাইঙ্গে পা বাইয়ে পড়তিছে। এর আগে আরো অনেক মাইয়ে মাইনষের এরাম হতি দিকিচি এই জায়গায়। সারাদিন বেদনা হবার পর সন্ধ্যে বেলায় প্যাট ছিঁইড়ে য্যান নাড়িভুড়ি বারায়ে আইসলো। সিস্টার আপা ডাকতাম একজনরে। সে কলো,
‘তোমার ছেলে হয়েছে।’
বাচ্চাডারে আমার চোখের সামনে ধরলো। আমি সেই ছাবালের মুখে কার চেহারা দ্যাকপো? নাইতের পর নাইত যারা আমার ইজ্জত মারিছে তাগের কজনের চেহারা? মেলেটারি, ইজাবুল ভাই নাকি ছিদরুল গাজির ছাবালের? আমি দ্যাকলাম, ছোট্ট মুখটাতে য্যান এক গাদা শয়তান খলবল করতিছে।
আমার দুধ আমি কদিন খাওয়াইছি সেই ছাবালে্রে। সিস্টার আপা নাম রাখিছে স্বাধিন। এইডা আবার কি নাম? একদিন একজন একটা সুন্দর মতন মহিলা আইসে কলো,
‘তোমার ছেলেকে কি তুমি বাড়ি নিয়ে যেতে চাও?’
আমি কি কব বুঝতি পারিনে। অনেক্ষণ পর কলাম, ‘না।’
সেই মহিলা আবার কলো,
‘আমরা তাহলে তোমার ছেলেকে কানাডার একজন মহিলাকে দিয়ে দিচ্ছি। তিনি তোমার ছেলেকে ছেলে হিসেবে গ্রহণ করতে চেয়েছেন। তোমার আপত্তি নেই তো?’
আপত্তি আবার নেই? বুকটা যে ভাইঙ্গে যাতিছে আমার। ওইটূকুন ছাবাল মার দুধ ছাড়া থাকপি? কিন্তুক ওর মুখে যে আমার চেহারা ভাসেনা? যাগের চেহারা ভাসে তাগের মুখে যে ছ্যাপ দিতি ইচ্ছে হয়? তাছাড়া আমি কনে নে যাব? কি খাওয়াব? কলাম,
‘আপত্তি নেই।’
বাড়িত আমি যাইনি। যে মা বিপদে আমারে ফেলাইয়ে দেছে সে মার কাছে আবার যাব? জোয়ার্দার চাচার বাড়ীতে আইসে আবার কাজে নাগিছি। মাইঝে চাচী কদিন নাগ করিছে ঠিকই কিন্তুক আমার হাতে সংসার ছাইড়ে নিশ্চিন্ত হইছে।
পঁচিশ বছর পর আইজ আবার সেসব কতা মনে হতিছে। আমি মনে করতি চাইনি। সগুলি মিলে মনে করাইয়ে দিছে। জোয়ার্দার বাড়ির সামনে নাজ্যির মানুষ আইসে ভইরে গেছে। কত্তগুলান গাড়ি। কত্তজন আমার ফটুক তুলতিছে। আমার কাছে যুদ্ধের কত কথা জিজ্ঞাসা করতিছে। কতকি নেইকে নিতিছে। আমি নাকি বীরাঙ্গনা। তারা আমারে জিজ্ঞাসা করে,
‘আপনার অনুভুতি কি? আমি কি কব? অনুভূতি কারে কয়? বীরাঙ্গনা কারে কয়? এগের সাথে ঢাকা থেকে স্বপন ভাই আইছে। আমি স্বপন ভাইরে কলাম,
‘ভাইজান বীরাঙ্গনা কি?’
স্বপন ভাই কলো,
‘বীরাঙ্গনা কি সেটা জানার দরকার নেই, পেয়ারা বানু। এস, তোমার সাথে একজনের পরিচয় করিয়ে দেই।’
‘কিডা?’
‘আরে এস। দেখতো, একে চিনতে পারো?’
আমার সামনে উঁচা লম্বা ফর্সা সাহেবের মতন একটা জোয়ান ছাবাল দাঁড়ায়ে নইছে। আমি হা কইরে তার দিকে চাইয়ে থাকি।
স্বপন ভাই কয়,
‘এ হলো স্বাধিন। তোমার ছেলে স্বাধীন। কানাডা থেকে শুধুমাত্র তোমাকে খুঁজতে বাংলাদেশে এসেছে।’
আমার বুকের মধ্যি গরম বাতাসের ঝড় বইয়ে যাতিছে। চোখে পানির বান ডাকিছে। ঝাপসা চোখে আমি আমার ছাবালের মুখের দিকে তাকাই। ওই মুখে আইজ আমার চেহারা ছাড়া কারোর মুখই ভাসেনা।