আমার ভাষা, বাংলা ভাষা

প্রশান্ত গুহমজুমদার


কাল ১৯৪২-৪৩ এবং বর্তমান। স্থান অবশ্যই এই বঙ্গ তথা ভারত। পাত্রের কাছে এসে গুলিয়ে যাচ্ছে। ৭৫ বছর আগের দেশটাকে দেখব, নাকি জায়মান যাপনে মায়ের ভাষার সংকট? সে সময় আর বর্তমান, সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির আসমান-জমিন ফারাক। তবু এই আমার দেশেই তো ১৯৪২-৪৩এ ঘটেছিল ঘটনাটা। ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ তছনছ করে দিয়েছিল এই দেশের কয়েকটি প্রদেশের মানুষের জীবন। কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। তবু অন্তত ৩৫ লক্ষ মানুষ অনাহারে, বিভিন্ন মহামারীতে মারা গিয়েছিল। স্রেফ বাঁচার তাগিদে মূল্যবোধ, সংস্কার ভেসে গিয়েছিল। জীবনানন্দ গভীর শোকে লিখলেন, ‘...এইসব গৃহ মাঠ ছেড়ে দিয়ে কোন্‌ দিকে কোন্‌ পথে ফের/ তোমরা যেতেছ চলে পাইনাকো টের।’ এই যে জীবনের ক্ষুধা আকাঙ্ক্ষা নিবৃত্তির জন্য চলে যাওয়া, মৃত্যুর শব্দ শুনতে শুনতেই, বস্তুত মৃত্যুর দিকেই, সে ইতিহাস এখনো কি আমাদের আমূল নাড়িয়ে দেয় না! বর্তমানে ভাষাসংকটের চেহারাটা কেমন? প্রযুক্তিগত মাপকাঠিতে আমরা সেদিনের পরাধীন অবস্থার তুলনায় যোজন এগিয়ে। খাদ্যে প্রায় স্বয়ম্ভর। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তেমন আতঙ্কজনক নয়। তা হলে সমস্যাটা কোথায়! যদি মাথার উপরে ছাদ থাকে, পরিধানের ন্যূনতম প্রয়োজন মিটে যায় নানান জনহিতকর প্রকল্পের মধ্যে দিয়ে, দু বেলা দু মুঠো অন্নের সংস্থান সম্ভব হয় কায়িক শ্রমের বিনিময়ে, তা হলে আমার মায়ের ভাষা, আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি- এ সব কি বড়োই জরুরী বেঁচে থাকার জন্য! এটাই আজ খুব বড় প্রশ্ন, মাতৃভাষার মধ্যে লালিত হওয়া, তাঁকে লালন করা, নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে অমান্য করা, তাঁকে পার্থিব প্রয়োজনে ছেড়ে যাওয়াও কি এক প্রকারের সংকট নয়? মাতৃভাষার মধ্যে লালিত হওয়া, তাঁকে লালন করা, নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে বহন করে আত্মসম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকাও কি ঐহিক যাপনের জন্য জরুরী নয়? নশ্বরতাকে অতিক্রম করে যাওয়া নয়! তার ব্যতিক্রম ঘটলে তাঁকে সংকট ব্‌লা যাবে না? এও তো এক মন্বন্তর!
অনতিঅতীতে ভাষা দিবস উদ্‌যাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত একটি প্রাসঙ্গিক আলোচনাচক্রে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে প্রাসঙ্গিক কিছু কথার মধ্যে বাংলা ভাষার অস্তিত্বের সংকট, তার বানানবিধি, পুনরুজ্জীবন, প্রসার ইত্যাদি নিয়েও সুধীজনের সম্ভাষণ শুনেছিলাম। মূল্যবান ছিল সে সব উচ্চারণ। এই সব আর তারও আগে বাংলা ভাষার ব্যবহার,সাংস্কৃতিক ধারা, অন্য ভাষার আগ্রাসন, ভাষাপুলিশ বিষয়ক প্রস্তাব এবং বহুতর উদ্বেগ শোনা গিয়েছিল। ৭৫ বছর পূর্বের মর্মান্তিক মন্বন্তরের ইতিহাসকে স্মরণে রেখেও বর্তমানে এই সব উদ্বেগজনিত আলোচনা সচেতক এবং সময়োপযোগী মনে হয়।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে স্বৈরতান্ত্রিক, একদলীয় বা বহুদলীয়, যে ব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়েই শাসনব্যবস্থা বহাল থাকুক না কেন, তাবৎ আয়োজনই যেহেতু ব্যক্তিমানুষকে নিয়ে, আমরা দেখেছি, দেশকালনির্বিশেষে ব্যক্তির মুখের ভাষাও কিন্তু রাজনীতির অন্যতম বোড়ে হয়ে উঠেছে বারবার। কখনো গুরুত্বহীন করে তোলার মধ্য দিয়ে, কখনো বা ভাষাসংক্রান্ত আবেগকে অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদান করে। আর এ সব যখন আমাদের দেশেই করা হয়েছে, সে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পূর্বে বা অথবা পরে, বিভিন্ন পরিসংখ্যান ( যেগুলি বহু সময়েই ত্রুটিহীন নয় ) ইত্যাদিকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক প্রয়োজনে গৃহীত সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমন অপপ্রয়াস থেকেই বাংলা ‘সংস্কৃতি’ এবং ভাষাকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন করা হয়। ক্রমে আমরা দেখলাম, ভাষা যে সংস্কৃতির মেরুদন্ড, সে সত্যকে পাঠানো হল অন্ধকারে, ‘মাতৃভাষা’ শব্দটি হয়ে দাঁড়াল কেবল আনুষ্ঠানিক। সময়ের দাবী, প্রগতির স্বার্থ, বিশ্বায়ন ইত্যাদি শব্দের ভার আপামর বাঙালী জনমানসে চাপিয়ে দেওয়া হয় সুচারু পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে। কোন জাতীয় শিক্ষানীতি ব্যতিরেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ কে করে তোলা হয় একমুখী, প্রচার ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে মানুষকে বোঝানো হতে থাকে, এই ধরাধামে আর্থিক পুষ্টির জন্য একটি বিশেষ ভাষা (অবশ্যই আমার মাতৃভাষা বা মাতৃদুগ্ধ নয়) সেবন করাই বিধেয়, সর্বোত্তম। এও কি এক অনন্য মৌলবাদ! ফলত, বিভিন্ন ধরনের মৌলবাদ যখন আলোচিত হয়, ভাষা বা সাংস্কৃতিক মৌলবাদের ভয়ও সামিল হয় সেখানে। ঘটনাচক্রে দেখা হয়ে যায় আমাদের, সংস্কৃতি, মাতৃভাষা- এমন শব্দ রাজনীতির কটাহে মশলারূপে কি চমৎকার ব্যবহৃত হচ্ছে! বিশেষ বিশেষ ভাষামাধ্যমের বিদ্যালয়ে দীর্ঘ হয় ভিড়, বিচিত্র বিজ্ঞাপনে ঢেকে যায় ক্ষেতিবাড়ি বলদের পাশে বেঁচে থাকা প্রান্তিক মানুষের মুখের ভাষা, কুয়োতলা একা একা আকাশ দেখে। তার ভাষা বোঝার মানুষ আর কই! রবীন্দ্রনাথ সক্ষোভে বললেন ‘...আর আমাদের হতভাগিনী প্রথম পক্ষটি, আমাদের দরিদ্র বাংলা ভাষা, পাকশালার কাজ করেন – সে কাজটি নিতান্ত সামান্য নহে, তেমন আবশ্যক কাজ আর আমাদের আছে কিনা সন্দেহ, কিন্তু তাঁহাকে আমাদের আপনার বলিয়া পরিচয় দিতে লজ্জ্বা করে।...’ ।
আজ আমার মায়ের ভাষা, পূর্বসূরীর চেতনা, সংস্কৃতি, যাপন---সব কিছুই বাহুল্য। প্রকট কেবল বর্তমানে বেঁচে থাকার জন্য লড়াই। এই আজীবন দৌড়ের কারণ কিছুটা হয়ত বোঝা যায়। কিন্তু নিজের মায়ের সম্মান বিনষ্ট করে! এমনটাই যদি উদ্দিষ্ট হয়, তবে ভৌগলিক, রাজনৈতিক, সার্বভৌমত্ব নির্বিশেষে দেশে দেশে এমন বিনষ্টি তো পরিলক্ষিত হয় না! সেখানে কি তবে ঐ ‘জীবনযুদ্ধ’ অনুপস্থিত! প্রাকৃত আকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ নিবৃত্তি ঘটে গিয়েছে সেখানে! আশঙ্কা হয়, এমন খোঁজের উত্তর যথেষ্ট সদর্থক হবে না। তাই জাপান, বাংলাদেশ ইত্যাদি বহুতর দেশে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষাবিষয়ে ভূমিপুত্রদের মমতাময় ইতিহাস-সচেতন রক্ষণশীলতা অন্য ধরণের সদর্থক চিত্র তুলে ধরে বিশ্বের সামনে। তার মানে তো এই নয় যে, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, মাতৃভাষার অর্থই বদল হয়ে যাচ্ছে এক দেশ থেকে অন্য দেশে।
একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর সংস্কার বিশ্বাস মূল্যবোধ জীবনযাপন ভাষা নিয়েই সেই জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতিতে একদিকে যেমন সংহত থাকে তাবৎ আহরিত জ্ঞান, বিশ্বাস এবং লোকাচার, অপরদিকে এই সংস্কৃতি মানুষকে শিক্ষার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের দিকে এবং পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তাবৎ অর্জন তুলে দিতে এগিয়ে নিয়ে যায়। সাধারণভাবে তা হলে বোধহয় ভাবা যায়, একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর ভাষায়, সংস্কৃতিতে থেকে যায় ব্যক্তি তথা সমষ্টিগত মূল্যবোধের চেতনা, প্রথা, প্রতিষ্ঠান, জীবনদীক্ষা এবং শিল্পকর্ম।
এ প্রসঙ্গে মানবেতিহাসের প্রাচীন কয়েকটি বহু আলোচিত পৃষ্ঠা সামনে নিয়ে আসা যেতে পারে। যেমন, প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা, মায়া, ইনকা, মিশরীয়, রেড ইন্ডিয়ান সভ্যতা, সংস্কৃতি। আজ এরা অতীত। কিন্তু মানবসভ্যতায় এদের অবদান কি ভাবে অস্বীকার করা যাবে! এরা যে হারিয়ে গেল, সে কোন আঘাতে, কোন প্রয়োজনে! কালের নিয়মে? তাই যদি সত্য হয়, তবে সে “কাল” বহন করে এনেছিল কারা? মানুষ এনেছিল। আপেক্ষিকভাবে উন্নত বাইরের কিছু মানুষ প্রাকৃত প্রয়োজন নিবৃত্তির মানসে মুছে দিল জনপদ, ধারাবাহিক পদ্ধতিতে তার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, তার ভাষা। নিজস্বতা তাদের আর কোথাও রইল না। ঐ সকল সভ্যতারই অদূরদর্শী অথচ অধিকতর সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের দায়ও কিছু ছিল এই অবলুপ্তির প্রেক্ষাপটে। কিছু চাহিদা, কিছু প্রাপ্তি তাদের প্ররোচিত করেছিল ঐ কালের গহ্বরের দিকে হেঁটে যেতে। আমাদের মত বহুকথিত উন্নতিকামী দেশগুলিরও ‘উন্নত’ হওয়ার তাগিদে এমন পরিণতির সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হচ্ছে কি? এক দিকে বহুভাষী বিচিত্র সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে ঐক্যময় এক বর্ণবহুল মানবসমাজের অতীত অস্তিত্ব, অপর দিকে একটি ভাষার, অদ্বিতীয় এক সংস্কৃতির, উন্নততম মানবসমাজ নির্মাণের অলীক প্রয়াস। আত্মবিচ্ছেদ ঘটে যাবে না তো! নিজস্ব ভৌমতার খোঁজ এবং বর্তমানের সঙ্গে, বহুত্বের সঙ্গে নিবিড় যোগ, এমন প্রয়াস একই সঙ্গে শুরু হওয়াই তো যথার্থ। এ ভাবেই ব্যক্তি সমাজ সংস্কৃতি হয়ে উঠবে স্থিতিস্থাপক। অবসানের আশঙ্কা অমূলক হবে। আমাদের নিজস্ব ভাষাসংস্কৃতি অবিচ্ছিন্ন থাকবে জায়মানতার সঙ্গে। অপ্রয়োজনীয়, বাহুল্য হয়ে পড়বে না কখনোই।
কিন্তু কি ক্ষতি হয় এ প্রকার নিমজ্জনে? সময় তো গড়িয়ে চলেছে। প্রযুক্তির তীব্র আলোয়, বাজারায়নের সমূহ আহ্বানে, উন্নততর পর্বে উন্নীত হওয়ার স্বপ্নে পৃথিবীর অনুন্নত/উন্নতিশীল দেশ সে বাঁশিতে আপ্লুত। আমরাও। এগোচ্ছি আমরা সবাই, শুধু একই সঙ্গে দাহ করে চলেছি পিছনের সেতুগুলি। আমরা বিস্মৃত হচ্ছি গতকাল, গত দশক, গত শতাব্দীর মানুষের বৈচিত্রময় ঐতিহ্য। এক ছাঁচে, এক ধাঁচে, একই প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত হওয়ার আমাদের আপ্রাণ অথচ সকরুণ প্রয়াস। কিন্তু শিকড়বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো মানবগোষ্ঠী যথার্থ উন্নত হতে পারে! এ কারণেই অতীতকে অস্বীকার না করে বাংলা ভাষা, তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য লালনের উদ্দেশ্যে বর্তমানে কেমন প্রবহমানতা বাঞ্ছিত, সে বিষয়ে সার্বিক মনষ্কতা এবং তদনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ বোধ করি অনতিবিলম্বে জরুরী।
কোন হেতু দৃশ্য বা অদৃশ্য থাকলেও মাতৃভাষার জন্য ভালবাসা, আবেগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশকালনির্বিশেষে মাতৃভাষা হারিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক থেকেই উদ্ভূত অভিমান পরিবর্তিত হয় একটা জাতির রোষে। মাতৃভাষাকে, মুখের ভাষাকে অবহেলা করার, তাচ্ছিল্য করার যে প্রয়াস, সেই চক্রান্ত প্রতিহত করা, নিজস্ব মাতৃভাষাকে স্বভূমিতে পুনরায় স্থাপন করা হয়ে ওঠে এক স্বাভাবিক কর্তব্য। আমরা মনে করতেই পারি, বাংলাদেশের কথা। বাংলা ভাষার জন্য, তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে উপযুক্ত সম্মান প্রদান করার জন্য শুরু হয়েছিল ভাষা আন্দোলন। এমন আন্দোলন ইতিপূর্বে উঃপূর্ব ভারতেও আমরা দেখেছি। বাংলা তথা মাতৃভাষার জন্য এই সব আন্দোলনে কিন্তু অন্য কোন ভাষাকে অবহেলা করার লক্ষ্য ছিল না। এটাই তো সুবিবেচনা। আমি আমার মাতৃভাষাকে, আমাদের সংস্কৃতিকে নতুনের আলোয় লালন করব ব্যক্তিজীবনে, সামাজিক জীবনে। কিন্তু তার অর্থ তো এই নয় যে, অন্য ভাষা বিষয়ে আমরা হয়ে পড়ব শ্রদ্ধাহীন।
কিন্তু ক্ষয়টা যদি শুরু হয় ভিতর থেকেই। আজ দেখি, সিঁড়ি ভাঙার দৌড়ে এগিয়ে থাকার অভিপ্রায়ে সমাজের তথাকথিত আলোকপ্রাপ্ত সুবিধাভোগী কিছু মানুষ সরিয়ে ফেলতে চায় বাংলাভাষাকে, নিজের ‘মা’কে, মাতৃভাষাকে, আপন সংস্কৃতিকে, আত্মপরিচয়কে। ‘আ মরি বাংলা’ হয়ে উঠছে ক্রমশ এক অন্ত্যজ ভাষা। কবি শামসুর রাহমানকে বহু বেদনায় বলতে হয়, ‘তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার?...’। তবু, আমরা দেখি, প্রান্তিক জীবনেও সংখ্যালঘু মানুষই আজ বাংলা ভাষাকে আদরণীয় মনে করছেন না। আর করবেনই বা কেন! জীবনের যে কোন সাফল্যের প্রয়োজনে অন্য ভাষার ব্যবহার যদি অতিরিক্ত সুবিধা দিয়ে থাকে, বিভিন্ন কৌশলে অন্য ভাষাকে যদি অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদান করা হয়ে থাকে, তবে কেবল ‘মাতৃভাষা’র শিরোপা পরিয়ে বাংলাভাষার পুনরুজ্জীবন কতদূর সম্ভব? মনে পড়তে পারে, কবির কয়েকটি শব্দ, ‘... এখন তাঁদের গ্রন্থিল শরীর থেকে কালেভদ্রে সুর নয়, শুধু ন্যাপথালিনের তীব্র ঘ্রাণ ভেসে আসে...’। উত্তর-প্রজন্মের এমনই যেন অনুভব মাতৃভাষা বিষয়ে। হায়, মায়ের ভাষা এখন তাদের কাছে জীর্ন হতে হতে মর্গে শায়িত কিছু স্মৃতি মাত্র, কেবলই ন্যাপথালিনের তীব্র গন্ধ। কোন মাধ্যমেই তাঁদের জন্য ঐতিহ্যর সুবাস, আকর্ষণীয় নতুন উপস্থাপন আজো সম্ভব হয় নি। ভারতের তাবৎ ভাষার শিল্পসাহিত্যের উন্নত অনুবাদ বাংলায় যেমন কাঙ্ক্ষিত, অপরদিকে বাংলাভাষার ক্ষেত্রেও তেমনই তৎপরতা প্রয়োজন। পরিবর্তে দুর্নিবার নকল, ডাবিং, রিমেক মাতিয়ে দিল তাদের। দেওয়ার অক্ষমতা আর গ্রহণের অনিচ্ছা আজ কেবলই আগ্রাসী অভ্যাস। ‘দিবে আর নিবে , মেলাবে মিলিবে’ এ স্বপ্ন বোধ করি ফুরিয়েই গেল।
‘ভাষাপুলিশ’-এর ধারণা কি কোন ভাবে কিছু সাহায্য করতে পারবে! সমস্যা তো অপরাধজনিত নয়। বহিরঙ্গে কিছু আপাত পরিবর্তন হয়ত তাদের পক্ষে ঘটানো সম্ভব, কিন্তু দৃষ্টির আদ্যন্ত পরিবর্তন কি তাদের পক্ষে ঘটানো সম্ভব! এমত পরিস্থিতিতে যদি মনে করি আমরা, আমাদের ভাষা বিপন্ন, আমাদের সংস্কৃতি আহত, ঐতিহ্য থেকে বিচ্যুত আমরা, তবে মনে হয় ভিতরে বাইরে, দু দিক থেকেই অন্তর্মুখী চাপ তৈরি প্রয়োজন। ভিতর থেকে ধীরে, সুবিবেচনায়, সহনীয় ভাবে, প্রাজ্ঞজনের সুপরামর্শে। বানানবিধির আড়ম্বরহীন রূপ নিয়েও ভাবা দরকার। লোকশিল্প, লোকাচার, লোকগান, লোককথা সংরক্ষণ আরো মনীষা দাবী করে। সামাজিক জীবনে বাংলাভাষার ব্যবহারকে আর এড়িয়ে যাওয়া চলবে না। পাঠ্যবিষয়ে, জীবিকা অর্জনে বাংলাভাষাকে যথোচিত সম্মান দেওয়ার জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামোগত অভ্যাস গড়ে তোলা আশু প্রয়োজন। একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি বহু ভাষা পারদর্শী হতেই পারেন, কিন্তু বাঙ্গালীর প্রথম শর্ত হোক বাংলাভাষায় ভাববিনিময়। আর বাইরে থেকে, সমস্ত সরকারী বেসরকারী করণে বাংলা ভাষার ব্যবহার করে তোলা হোক কঠোরভাবে আবশ্যিক। প্রতিশব্দ নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। প্রয়োজনে অন্য ভাষার ব্যবহার হতেই পারে, তবে নিতান্ত আবশ্যিক হলেই, বাংলা হবে মুখ্য।
এই বঙ্গের বাইরে বসবাসকারী বাংলাভাষী মানুষ বিরুদ্ধ পরিস্থিতিতে মাতৃভাষাকে, নিজস্ব সংস্কৃতিকে যে মমতায় লালন করেন, তার আবগের উষ্ণতা কি এ বঙ্গের মানুষকে উতরোল করে! আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-এর সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলাই যায়, কোনটাই তার স্বভাবের অন্তর্গত হতে পারে নি। দ্বিচারিতায় আমরা এতটাই সাবলীল!
এমন অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য, এই বিচ্ছিন্নতা দূর করার জন্য, বাংলাকে স্বভাবে গ্রহণ করার জন্য, ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় স্মৃতি উজ্জীবিত এবং সঞ্চারিত করার উদ্দেশ্যে নিরন্তর আলোচনা হোক সমস্ত স্তরে। সব ধরণের উন্নাসিকতাকে দূরে সরিয়ে। এই বিশ্বাস, এই আস্থা রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হোক যে, ‘...তথাপি বংগসাহিত্যে এমন একটি সময় আসিয়াছে যখন সে আপন ভাবী সম্ভাবনাকে আপনি সচেতনভাবে অনুভব করিতেছে...।‘ এ যাবত ভাষা আন্দোলনের সমস্ত ঋত্বিকের জন্য নিবেদিত হোক নিগূঢ শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা। বিনিময় হোক নতুনে, প্রাচীনে। কিন্তু কেবল আনুষ্ঠানিকতায় নয়, দিনবিশেষে নয়, যাপনের প্রতি আয়োজনে, বিনিময়ে আমাদের স্মরণে থাকুক বাংলা। সে পথেই তবে হবে তাঁদের প্রতি, মাতৃভাষার প্রতি আমাদের প্রকৃত প্রণাম। ----