ভ্রমক্রমণিকা

সংহিতা সান্যাল

ষোড়শ শতক । নদীয়া ভেসে গেল বুঝি বা ! না , গাঙে বান আসে নি ।
প্রেম এসেছে , মহাসমারোহে । সে কি দৃশ্য ! একই দাওয়ায় বসে আদ্বিজচণ্ডাল অন্নগ্রহণে রত । ডাকাতের সর্দার উদ্বাহু সংকীর্তন করছে , গালে ঝরে পড়ছে ভাললাগার শুদ্ধতোয়া । রথ টানছে ধনিক , তার পেছনেই মুচির ছেলের পেশি ফুলে উঠছে । সকাল সন্ধ্যা শুধু নামগান , শুধু লীলাকীর্তন । আনন্দ , আনন্দ , আনন্দ । দূরে নেচে চলেছে সুকুমার মানুষটি , শিশুর মত মুখে । মস্ত বড় পণ্ডিত , ডাকাবুকো ছেলে ... মায়ের কোল আঁধার করে , যুবতী বউ কাঁদিয়ে সন্ন্যাসী হয়েছে সে । তারই ডাকে সবাই মিলেছে । হিন্দু ব্রাহ্মণদের চোদ্দরকম ঘটাপটা নেই , মুসলমানদের জাত বদলের হাতছানি নেই , বৌদ্ধদের আলোআঁধারি রকমারি মন্ত্রতন্ত্র নেই – একেবারে সহজ ব্যাপার । শুধু কৃষ্ণ বল , সঙ্গে চল । কেউ উঁচু নয় , কেউ নিচু নয় । সবাই এক । সবার জন্য এক নিয়ম , এক আচার , এক সমাজ । সবার জন্য সবাই । কে বাছবিচার করছে ? ওকে বাদ
দাও ... ওর মন নেই । কে দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে ? ডেকে নাও , ওরই আছে ।

“ নীচ জাতি হৈলে নহে ভজনে অযোগ্য ।
সংকুল বিপ্র নহে ভজনের যোগ্য ।।
যেই ভজে সেই বড় অভক্ত হীন ছাড় ।
কৃষ্ণ ভজনে নাহি জাতিকুলাদি বিচার ।। ”

এই যে কৃষ্ণ , যাকে ওই মানুষটি তুলে আনছেন সচলতার উপায় হিসাবে ... তিনি কোনও হিন্দু দেবতা নন । তিনি ভাগবতের কৃষ্ণ নামে বটে, আচারে নন । তিনি বংশী বাজান । প্রেমে মাতেন রাধার সঙ্গে , অনুষঙ্গ হয়ে গোপিনীরা নাচতে থাকে । তিনি মূর্ত প্রেম , যাকে সুফি খোঁজে ইবাদত – এ , সাধু খোঁজে সাধনায় , গৃহী খোঁজে গার্হস্থে আর ঘরছাড়া খোঁজে সর্বত্র । তিনি ভারতের সর্বকালের সেরা রোমান্টিক হিরো । চতুর্ভুজ নন , দশাবতারের এক নন , পার্থসখা নন , লক্ষ্মীকান্ত নন ।
“ চেতোদর্পণমার্জ্জনং ভবমহাদাবাগ্নিনির্দ্ব াপনং
শ্রেয়ঃ কৈরবচন্দ্রিকাবিতরং বিদ্যাবধূজীবনম্‌ ।
আনন্দাবুধিবর্দ্ধনং প্রতিপদং পূর্ণামৃতাস্বাদনং ,
সর্দ্বাত্মস্নপনংপরং বিজয়তে শ্রীকৃষ্ণসংকীর্ত্তনম ্‌ ।। ”
আর যে মানুষটি এই এক নামকে বিপ্লবের মন্ত্র করে তুললেন , তিনি চৈতন্য । নামের মতই অমোঘ । কৃষ্ণনামমাত্র সম্বল করে , জনমনোহারী ব্যবহারে , সপ্রেম স্পর্শে জাগিয়ে তুললেন গনচেতনা । পিছিয়ে পড়া কাঁধে হাত রাখলেন , উদ্ধত কাঁধেও । কেউ নম্র হল বিনয়ে , কেউ ঋজু হল ভরসায় । এ পর্যন্ত কোনও ভুল নেই ।

এরপর , ১৫৩৩ সাল , ২৯শে জুন । শ্রীক্ষেত্র । আষাঢ় সপ্তমী শুক্লা । কী হল কেউ বলতে পারে না । কেউ বলে, “ জগন্নাথে লীন প্রভু হইলা আপনে ।। ” ( লোচনদাস ) কেউ আবার মনে করেন , রথের দিন পা কেটে যাওয়ায় টিটেনাস ইনফেকশন । কারা যেন আবার দেখেছে , নীল সমুদ্র দেখে কৃষ্ণনামে মাতোয়ারা চৈতন্য ছুটে গেলেন । শেষ বারো বছর নিজেকে পুরোপুরি রাধা ভেবেছেন কিনা ! নিন্দুকে এও বলে ... খুঁজলে হয়তো মন্দিরের আশেপাশেই মাটির নিচে এখনও পাওয়া যেতে পারে তাঁকে । আমরা জানি না কী হয় এঁদের । সত্যিই যীশুর পুনরুত্থান হয় না তিনি আদৌ ক্রুশে মরেননি, নেতাজির কি হয়েছিল ... কেউ জানে না । যে সব মানুষ সমাজটাকে এলোমেলো করে মিশিয়ে দেন , কোনও জাত – ধর্ম - বর্ণ রাখেন না , কোনও ভিক্ষাবৃত্তির ধার ধারেন না , তাঁদের কী হয় কেউ জানে না । ভগত সিং -এর লাশও তো জ্বলে গেছিল লোকচক্ষুর আড়ালে । লোকে জানল , চৈতন্যের তিরোধান হয়েছে । মেনে নিল । ভুল । প্রথম ভুল ।

কিন্তু ভুল কখন অপরাধ হয় ? যখন তার কাজ কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যের প্রণোদনা । চৈতন্য গেলেন, কিন্তু রেখে তো গেছিলেন এক গণ-আন্দোলনের উত্তরাধিকার ! রেখে গেছিলেন তাঁর অগুন্তি ভক্তদের , যাঁদের হাতে বৈষ্ণব ধর্ম পেতে পারত সঠিক গণ - অভিমুখ । কিন্তু তা আদৌ হল না । শ্রীরূপগোস্বামী স্বয়ং মহাপ্রভুরই আদেশ অনুসারে রসশাস্ত্র নিরূপণ ও লুপ্ত তীর্থের উদ্ধার-প্রচার করবেন বলে বৃন্দাবনে আসেন । কিন্তু তিনি যাকে বৈষ্ণব দর্শন বলে তৈরি করলেন, তা আর যাই হোক , চৈতন্যের মনোবাসনা ছিল না । গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন তত্ত্বে রাধাকৃষ্ণ আছেন বটে , কিন্তু তাঁদের সর্বধর্মসমন্বয়ী সত্ত্বা নেই । মহাপ্রভুর ধর্মকে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী প্রমাণ করতে গিয়ে তিনি হিন্দু ধর্মের আওতায় বৈষ্ণবদের এনে ফেললেন । এতই মনোগ্রাহী ছিল সে ব্যাখ্যা , যে তার পরে কেউ আর তার থেকে সরে এল না । এই ব্যাখ্যা থেকেই বেরতে থাকল অচিন্ত্যভেদাভেদ তত্ত্ব , রাধাবাদ , রাগানুগা ভক্তিবাদ ... আর সসম্মানে হিন্দুত্বকে জায়গা ছাড়তে থাকল চৈতন্যের সাধের স্তরান্তরিত সচলতা । এমন পর্যায়ে চলে গেল ব্যাপারটা – পরিভাষা না জানলে আর বৈষ্ণব ধর্ম বোঝা যাবে না ! যা ছিল মূর্খ , নাস্তিক , ভিন্নধর্মীদের প্রাণের জিনিস ... তা কিছু তত্ত্বজ্ঞ পণ্ডিতের কুক্ষিগত গূঢ় সাধনায় পরিণত হল । কেউ বাধা দিল না । কেউ কি দেয় ? রাজা দেখছেন শ্রেণীবিহীন সমাজ তাঁকে মানবে না । ব্রাহ্মণ দেখছেন সমন্বয় তাঁদের ছাঁদায় টান দেবে । মুসলিম দেখছেন , নীচুতলার মানুষকে ধর্মান্তরিত করার সব ছুতো নষ্ট হচ্ছে । চৈতন্য বেঁচে থাকতে কুৎসা রটিয়েও তাঁকে থামান যায় নি । মৃত্যুর পরেও নিছক কুৎসা দিয়ে থামান যাবে না । মহাপুরুষদের জীবনের চেয়েও বেশি কিংবদন্তী হয় জীবনের উদ্দেশ্য । একজন যখন ভুল করে তাকে সুবিধাজনক দিকে চালান করেই দিয়েছে ... বাকিরা থেমে থাকে কেন ? ভুল ছিল ... জমে জমে প্রচণ্ড অন্যায় হয়ে উঠল । নদীয়ার সিংহাসনে এলেন শাক্ত রাজা কৃষ্ণচন্দ্র । দুর্গা – কালী - জগদ্ধাত্রীর আরতির সিঁদুরে মুছতে থাকল আদি বৈষ্ণবদের শেষতম অভিজ্ঞান । অবশেষে কিছুটা তন্ত্র , কিছুটা বাউল দেহতত্ত্ব এবং অনেকখানি হিন্দুত্ব নিয়ে বিকৃত হয়ে জেগে থাকল বৈষ্ণব ধর্ম । উচ্চবর্ণের যে মানুষরা এই হিন্দুত্ব - মিশ্রিত ‘ অভিজাত ’ বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করলেন , তারা নিজেদের পদমর্যাদা ভুলতে পারেন নি । যারা মূল ধারা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা
করলেন , তারা সমাজ - বহির্ভূত হয়ে গেলেন । বৈষ্ণবদের মধ্যে শালগ্রাম শিলা পূজার পদ্ধতি ঢুকে এল । স্মার্ত রঘুনন্দনের বিধান চৈতন্যের আদর্শের চেয়ে বেশি মান্যতা পেল । এমনকি , ‘ গোঁসাইগিরি ’ অত্যন্ত ভালো ব্যবসা হিসেবে বিবেচিত হতে থাকল । কারণ খুঁজেছেন অনেকেই । শ্রীচারুচন্দ্র দত্ত একটা জরুরি বিশ্লেষণ করেছেন । দেখিয়েছেন , কিভাবে তত্ত্ব আস্তে আস্তে প্রয়োগকে আচ্ছন্ন করে ফেলে । চৈতন্যের যে
‘ applied ’ ধর্ম , যা কিনা আদ্বিজচণ্ডালকে এক সারিতে আনছে ...তাকে তত্ত্বে ভুল সুরে বাঁধার পরেই চ্যুতি থেমে থাকে নি । ঐ ধর্মকে নিয়মিত কার্যক্রমে বেঁধে রাখা জরুরি ছিল , যা কেউ করেন নি । কাজের স্রোত হারালে তত্ত্বের বিকার অনিবার্য । ফলে ভেতরে বাইরে ঝাঁঝরা হয়ে চৈতন্যের সাধের বৈষ্ণব ধর্ম ‘নেড়ানেড়ির কীর্তন’ হয়ে বেঁচে থাকল । ফুরিয়ে গেলেও হয়ত লোকের কৌতূহল জাগত । থেকেও না থাকলে কেউ আর প্রশ্ন করে না । আজ ২০১৪ সাল পর্যন্ত কোনও বাংলা পাঠ্যপুস্তক প্রশ্ন করল না – কেন এই চ্যুতি ? কিসের এত ঔদাস্য ? বরং কলেজে বেশি বেশি করে সাজেশন আসে ‘ চৈতন্য পরবর্তী বৈষ্ণব ধর্ম আন্দোলন ’ – যার কিনা অস্তিত্বই নেই কোথাও ! ফতেমা , রেহানরা মাথা কুটে সেসব মুখস্থ করে । তারাও প্রশ্ন তোলে না ... যবন হরিদাস যে কৃষ্ণনামে মাতোয়ারা ছিলেন , সে কৃষ্ণ তত্ত্বে কোথায় ? যে নাম নাকি শূদ্রের জিভে , যবনের কানে , চণ্ডালের মনে রণন তুলে ভেদভাব দূর করে ... তাকে কি করে ধরবে রসশাস্ত্রে ,সদ্‌ - চিদ্‌ -হ্লাদিনীর পরিভাষায় ? আর কেনই বা ধরবে ? যার মানসসন্তান , তিনিই কি ধরেছিলেন ? এভাবেই কি যুগে যুগে খুন হয়ে যায় না , আন্দোলনের স্বপ্নগুলো ? ভুল করে , ভুল বুঝে বা বুঝিয়ে ?

যেমন এক রাত্রে লেনিনের লেখা পড়তে পড়তে খুন হয়ে গেছেন শঙ্কর গুহনিয়োগী । যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন সমস্ত ছত্তিসগড় রাজ্যের খনিতে শ্রমিকের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে । যিনি একের পর এক সফল আন্দোলনে ভেঙে দিচ্ছিলেন মালিক পক্ষের মেরুদণ্ড । তাঁর আদর্শে গড়ে উঠছিল নেশামুক্ত গ্রাম , স্বনির্ভর সমাজ । আদিবাসীদের সঙ্গে নিজের মেধার ফারাক বহুগুণ হলেও হার না মেনে তাদের হয়ে লড়ে গেছেন । বাইরে থেকে সহযোগীদের ডেকে আনতেন । মতবিনিময় হত । লড়াই হত । এক কারখানার শ্রমিকদের
খাইয়ে - পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখত অন্য শহরের শ্রমিকদল । যত মজবুত হত মালিকের হাত , তত
শ্রমিক - ঐক্যের চাপ বাড়ত । যদি মানুষটা অমন অগোছালোভাবে খুন না হয়ে যেতেন, হয়তো মানুষগুলো জিতে যেত ,সত্যিই ।

খুনই হয়েছিলেন কিনা , সন্দেহ হয় । নতুন বাড়িতে এসে নিজেই বলেছিলেন – “ এই খোলা জানলা দিয়ে ওরা আমায় গুলি করবে । ” যেদিন সকালে বুলেটপ্রুফ নেট বসার কথা , তার আগের রাত্রেই পল্টন মোল্লার বুলেট তাঁর কাঁধ ফুঁড়ে যায় , ঐ জানলা দিয়ে এসে । অথচ ইতিপূর্বে ভাড়াটে খুনিরা এই মানুষেরই পায়ে হাত রেখে বলে গেছে ... “ সাবধানে থাকবেন , আমাকে আপনার সুপারি দেয়া হয়েছিল ।” শুনেছি , যখন ত্রিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে মালিক-শ্রমিক টানাপড়েন চরমে , তখন নিজেই এক সহকর্মীকে জানিয়েছিলেন গভীরতম দুঃখ । “আমি চাইলে এখুনি এইসব মিটিয়ে দিতে পারি , কিন্তু তাতে আবার গুলি চলবে । আর কত শ্রমিকের জান নেব ? ” হয়ত ভেবেছিলেন,তিনি নিজে শহীদ হলে দেশজুড়ে ঝড়
উঠবে । সেই ঝড়কে কারখানার দিকে , খনি অফিসের দিকে বইয়ে দেবে সাথীরা । স্বপ্নের ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে যাবে । হয়তো তাই ... খোলা জানালার দিকে পিঠ ফিরিয়ে বসেছিলেন ! যার জিপের ড্রাইভার জানতো না তিনি কোথায় যাবেন ... কি সহজে মৃত্যু তাকে জেনে ফেলেছিল ! ঝড় উঠেছিল তারপর । সত্যিই । কেডিয়া – সিমপ্লেক্স - বি.কে . - দের অভিমুখে তাকে নিয়েও গেছিল । কিন্তু সেই ভুল । চুক্তির টেবিলে সাংগঠনিক দ্বন্দ প্রকাশ করে ফেলায় এক পলকে সব শেষ হয়ে গেল । নিজেদের ব্যাখ্যাকে সবার ওপরে রাখার জন্যে অনেক বিনিদ্র চোখের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছিলেন কয়েকজন । আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি ছত্তিসগড়ের শ্রমিক আন্দোলন । আজ আমরা সবাই জানি, কিভাবে নিয়োগীর স্পর্ধার রেশটুকু মুছে দিচ্ছে ও রাজ্যের সরকার । জানছেন বিনায়ক সেন , সোনি সরি । সেদিন যারা সহযোগী ছিলেন , আজ তাদের অনেকেই শাসক দলের অগ্নিময় চোখ হয়ে উঠেছেন । যারা পারেন নি, তারা মুছে গেছেন । অনুপ সিং নিরুদ্দেশ । শহীদ হাসপাতাল চলছে কোনরকমে । শঙ্কর গুহনিয়োগীর সন্তানেরা যার যার মত আলাদা আলাদাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন । ছত্তিসগড় মুক্তি মোর্চা আজও সুধা ভরদ্বাজের নেতৃত্বে কাজ করে চলে, কিন্তু সেই সংগঠন নেই আর । যে বিপুল শক্তি নিয়ে এক পা আহত অবস্থাতেও একা মানুষটি ভিলাই-দল্লিরাজহারার মালিকপক্ষের ত্রাস হয়ে উঠতেন , তা আজ কারোর
নেই । আজও সে দেশে খাদান দখল করতে আসছে জিন্দাল । রোজ আদিবাসীরা মারা যাচ্ছে । মাঝে মাঝে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে তরতাজা তরুণ - তরুণী । কিন্তু নানা মতে টুকরো হয়ে ভেঙে গেছে আন্দোলন – একটা ভুল ব্যাখ্যা যেন প্রতিটি কশেরুকা গুঁড়িয়ে দিয়েছে । ভিলাই অফিসে আজ শুধু তাকিয়ে আছেন গুহনিয়োগিজী , কলাদাসজীর ভাইয়ের আঁকা ছবি হয়ে ।

হয়তো গাফিলতি ওই তরফেও ছিল । এত ক্রান্তদর্শী মানুষ ... কেউই দেখতে পাননি যে ওদের পর কেউ নেই । ‘ One Man Army ’ ছিলেন দুজনেই । একা হাতে সমাজ পাল্টাতে গেছিলেন । ভেবেছিলেন , ভবিষ্যৎ নিজের পথ চিনে নেবে । কিন্তু ... ভুল । চৈতন্যের ধর্মের চ্যুতির পর কেউ তাঁর ছাত্রদের উত্তরীয় চেপে ধরেছিল কিনা জানা নেই । কিন্তু ত্রিপাক্ষিক চুক্তি বাতিল হবার পর একজন মানুষ মাটিতে আছড়ে পড়ে কেঁদেছিলেন । সামনে নিথর দাঁড়িয়েছিলেন চুক্তি বানচাল করে দেওয়া এক সহকর্মী । তিনি শেষমেশ কাঁপা গলায় জানিয়েছিলেন ... এই প্রথম তাঁর সিদ্ধান্তকে কেউ পাত্তা দিয়েছে , তাই অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই শ্রমিকস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন । সহকর্মীদের স্বীকৃতি দিতে খেয়াল না করা নেতার ভুল ছিল নিশ্চয়ই । কিন্তু কেউ তো এগিয়ে এলেন না পতাকা হাতে নিতে ! পূর্বজের ভুল কে
শোধরায় , উত্তরাধিকারী ছাড়া ? কেউ তো হয়ে উঠল না আন্দোলনের মুখ ! দুটো অসাধারণ জীবন তো বটেই , অসাধারণ মৃত্যু ব্যর্থ হয়ে গেল । বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস আজ চাইলেও পাল্টানো সম্ভব নয় । ভুলটুকু স্বীকার করে নেওয়া যায় বড়জোর । আজ আর মহাপ্রভু জন্মান না ... ঘেন্নায় বোধ করি । মানুষজনও ‘ money ’ ব্যতীত অন্য কোনও নামে উন্মত্ত হয় না । কিন্তু একটা আদর্শের চুরি হয়ে যাওয়া এবং তার প্রতিবাদ না করা... এ ভুল আজও হয় । হয়েই চলে । আগামীর ইতিহাস না পাল্টানোকে কী নাম দেবে মানুষ ? ভুল ? “স্বপ্নের সব পথই ভুল ছিল...?”