মেঘরেণু

অপরাহ্ণ সুসমিতো

লোকটা সরাসরি মেয়েটার শরীরের দিকে তাকায় । তাকানোতে কোনো রাখঢাক নেই । সরাসরি বুক হয়ে নিচের দিকে তরল নেমে যায় । পানি যেমন নিচের দিকে গড়ায় । এ দৃষ্টিও নিচের দিকে নামলো পিচ্ছিল ।
লোকটার কোনো সমস্যা নেই,সমস্যাটা হয় যার দিকে এরকম দখলদার তাকায়,তার ।
ঘরের ভেতর দুটো ফ্যান চললেও গরম আছে সরকারী দলের মতো । বিরোধী দলের মতো কিছু লোকজন আছে লোকটার চারপাশে । তাতে অবশ্য তার মাথা ব্যথা নেই । হাল্কা ভিড়ের এই উটকো বিরোধী দল না থাকলে সে হয়তো মেয়েটাকে খানিকটা কোলে নিয়ে বাতচিত করতেন । তা হবার নয় । আফটারঅল তিনি পরিচালক ।

হ্যাঁ,তিনি এ নাটকের পরিচালক । এলাকা কাঁপানো পরিচালক ।

মিল এলাকায় বাৎসরিক দুটো নাটক হয় । যাত্রার মতো । মিল এলাকার খেলার মাঠে বিশাল মঞ্চ,প্যান্ডেল টানিয়ে নাটক । শ্রমিক কর্মচারীদের বিনোদনের ব্যবস্থা । বিশাল বাজেট । এসব নাটকে নায়িকা,সহ নায়িকার চরিত্রে স্থানীয় কোনো মেয়ে অভিনয় করে না বা সুযোগ দেয়া হয় না । শো এর আগে অন্য এলাকা থেকে প্রফেশনাল অভিনেত্রী ভাড়া করে আনা হয় । কেউ কেউ সদ্য ছায়াছবিতে মাত্র চান্স পেয়েছে বা কেউ এক্সট্রা । এদের ভাড়া অনেক । মহড়ার সময় এদের আনা হয় না খরচ বাড়বে বলে । ফাইনাল রিহার্সেলের আগে দুই একবার এইসব অভিনেত্রীরা আসেন । চরিত্রানুযায়ী মহড়া দেন । আর আসেন শো এর দিনে ।

পরিচালক খুব মন দিয়ে এসব অভিনেত্রী পরখ করেন । পরখটা শুরু হয় শরীর মাপায় । প্রফেশনাল অভিনেত্রীরা অনেকে এই পরিচালকের সাথে নাটকে কাজ করেছেন । অতএব তার এই তাকানো,গায়ে হাত টাত পাত্তা দেন না । কেউ কেউ তাকে খানিকটা প্রশ্রয় দেন । শোনা যায় চলচ্চিত্র পরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আনোয়ারের সাথে এই পরিচালকের দহরম মহরম । এদের কেউ কেউ সিনেমায় নায়িকা হবার ঘোর অপেক্ষায় আছেন ।

যদি পরিচালক এল.কবির তাদের একটু সুপারিশ করে দেন । তার নাম লুতফুল কবির । তিনি মিল এলাকায় এল.কবির নামে পরিচিত । তবে তার নিন্দুকেরা তাকে লুচ্চা কবির বলে আড়ালে ।

শো এর কয়েকদিন আগে থেকে এলাকায় ছানু মিয়া রিক্সায় মাইক লাগিয়ে নাটকের তীব্র প্রচার শুরু করে । ছানু মিয়াও নাটকের একটি সহযোগী চরিত্র । অস্থায়ী শ্রমিক । মাস্টার রোলে কাজ করে । লম্বা বাবরী চুল । কন্ঠ ভালো । মাউথপিস হাতে নিলেই তার ভেতর কাব্য এসে ভর করে । ভরাট কন্ঠে প্রচার শুরু করে;

হই হই কান্ড রই রই ব্যাপার ...
প্রিয় ভাই ও বোনেরা আগামী ১৯ ও ২০ তারিখ রাত ১০ ঘটিকায় প্রখ্যাত নাট্যকার এল. কবিরের রচনা ও পরিচালনায় সামাজিক অ্যাকশন নাটক মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছেএএএ..

মা কেন দাসী...
মা কেন দাসী...

আরো আছে পর্দা কাঁপানো,চলচ্চিত্রে সাড়া জাগানো নায়িকা মিস জবা কুসুম । আপনাদের মনোরঞ্জন করতে আরো আসবেন প্রিন্সেস জরিনা..থ্রি নট থ্রি জরিনাআআআআআআআ..,
আরো আছে একঝাঁক ডানাকাঁটা পরী...

হই হই কান্ড রই রই ব্যাপার...

মসজিদের পাশ দিয়ে রিক্সা ক্রশ করার সময় ছানু মিয়া সতর্ক হয়ে ওঠে । আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে । দ্রুত তার ভাষণ প্রচার থামিয়ে দেয় ।

শো এর দিন সন্ধ্যা থেকেই স্থানীয় মাঠে এলাকার শ্রমিক কর্মচারীর ভিড় বেড়ে ওঠে বাণের আদলে । পাহাড়ী এলাকায় এই মিল । বিনোদেনর তেমন কিছু নেই । অনেকে সারা বছর এই নাটকের অপেক্ষা করে । কেউ কেউ চাদর মুড়ি দিয়ে প্রিন্সেস নাচ দেখতে যায় । দিনে দুপুরে মুসল্লী হিসেবে তাদের একটা সুনাম আছে । এই ঝাঁকি নাচ দেখতে যাচ্ছে তা এলাকায় চাউর হলে বদনাম হবে বলে চাদর মুড়ি দেয়া...

পরিচালক সাহেব সারাদিন ধরে এই সুবর্ণ ক্ষণের অপেক্ষা করেন । এক অলৌকিক শিল্প উত্তেজনা । আবেগ টেনশন থরো থরো । টেনশন কাটাবার জন্য সন্ধ্যা থেকে খানিক পান করেন । চারচোয়ানী তার খুব প্রিয় । চারচোয়ানী এক ধরনের স্পেশাল মদ । উপজাতীয় অধিবাসীদের বানানো । বেশ দাম । একদম ডিস্টিলড ওয়াটারের মতো,কোনো বাজে গন্ধ নেই । অর্ডার করে আনান তিনি । একটু একটু তিনি পান করেন আর অপেক্ষা করেন কখন তাকে নিতে গাড়ি আসবে ।

এক ঝাঁক ডানাকাটা পরীদের নাচ শেষ হয়ে যায় । যন্ত্রীরা ঢাকনাবিহীন হারমোনিয়াম,ঢোল বাজিয়ে সমস্ত দর্শকদের প্রস্তুত করে নিচ্ছে । মঞ্চ জুড়ে আধো অন্ধকার । কোনো কোনো দর্শক শিস দিচ্ছে বেয়াড়া কিসিম । গ্রীণরুমে এক ধরনের অস্থির হয়ে আছে এল.কবির । আধো নেশা আধো শৈল্পিক আবরণে তিনি ধনুকের ছিলার মতো টানটান..

কবির নায়িকা জবাকুসুমের দিকে পৃথিবীর তাবত সুষমা নিয়ে তাকায় । নায়িকা ঠাণ্ডা পাথর হয়ে আছে অভ্যস্ততায় । তার অবয়বে প্রফেশনালিজম । সে জানে সকাল হলেই তার পেমেন্ট আর রাত্রি জাগরণের ক্লান্তি মেক আপ ঘষে ঘষে তুলবে । আবার বাসে করে দূর পাল্লার বাড়িমুখে যাত্রা..

অন্ত:হীন যাত্রা,অভাবী তিনরঙা যাত্রা ।

এল.কবির খুব ধীর পায়ে নায়িকা জবাকুসুমের সামনে এসে দাঁড়ান । মুখে এলাচ লবঙ্গের সুবাস । মদ খেয়েছেন বলে তিনি এলাচ লবঙ্গ মুখে দেন । কবির আলগোছে নায়িকার হাতটা ধরেন,কানের কাছে ফিসফিস করে বলেন;
: একটু আমার গায়ের সাথে মিশে থাকো । আবার তোমাকে কবে পাব..কে জানে..। কাছে আসো গো..

বাসনার মরাল ধ্রুপদে কবির নিজের ভিতরে থরো থরো কাঁপতে থাকে । জবাকুসুম অনিমেষ করুণ মেক আপ চোখে কবিরের দিকে তাকায় । কুসুম উষ্ণ স্বরে উচ্চারণ করে যন্ত্রীদের চড়া সুর ছাপিয়ে;
: কবির ভাই আমি প্রেগন্যান্ট ..

পরিচালক কবির মুহূর্তে থমকে যান অবরোধের সরণীর মতো । মনে হয় তার পায়ের নিচে শিকড় গজালো কিলবিল । তিনি সেই কবেকার বইয়ে পড়া মহেঞ্জোদারো সভ্যতার মতো সিন্ধু স্থবির হয়ে পড়েন । জলছবির মতো তার চোখের নেশালু ছায়ার পাশ দিয়ে মেঘরেণু ভেসে যায় সেই কবে ছোট্ট মেয়েটির পরবে ..

মেঘরেণু কবিরের মেয়ে । সেই কবে মেয়েটি সাত বছর বয়সে ম্যালেরিয়ায় মারা যায়..।

মঞ্চে বিবেক উঠে গেছে । যন্ত্রীদের বাজনা থেমেছে কখন । বিবেকের উদাত্ত গানের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছে চৌপর দর্শকের কানে কানে :

তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়?/দু:খের দহনে করুণ রোদনে তিলে তিলে তার ক্ষয়../আমি তো দেখেছি কতো যে স্বপ্ন মুকুলেই ঝরে যায়/শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি বাজে কতো সুর বেদনায়..

কবিরের কানে আর কিছু নেই । বিশাল দর্শক রাশি,প্রিয় নাটকের চরিত্রগুলো,আকর্ষণীয়া জবাকুসুম সব ছাপিয়ে তার মগজে বাজতে থাকে তার সেই ছোট্ট মেয়ে মেঘরেণু’র পালক কন্ঠধ্বনি;

বাবা ...বাবা ..চলো চলো..মায়ের কাছে যাবো।