ভিতর বাহিরে অন্তরে অন্তরে আছ তুমি হৃদয় জুড়ে...

নীতা বিশ্বাস

একঝাঁক স্বার্থপর বাতাস তোমার ছায়া সরিয়ে দিতে উন্মাদ হয়ে উঠেছিল একদিন। কি অসুখ যে তোমার গায়ে গুমরে মরছিলো সেদিন! তোমার কন্ঠরোধ করতে রাজনীতির দখলদার হাতগুলো হুমকি শানাচ্ছিলো অস্ত্রের জৌলুষে। আর তুমি আরো জননী হয়ে উঠছিলে; বুকে টেনে নিয়েছিলে নিঃস্ব হয়ে উঠতে যাওয়া তোমার সন্তানদের। শেখালে প্রতিবাদের ভাষা। সন্তান কে মায়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিলে মায়ের প্রতি সন্তানের ভালোবাসা আরো গভীর হয়ে ওঠে—এই সরল তরল সত্যটি উপেক্ষা করলে তা যে কতবড় ভুলের মহিরুহ হয়ে উঠতে পারে, লোভসর্বস্ব চালাকি তা অনুমান করতে পারেনি। তুমি চেনালে সেই মহান সত্য। বুঝতে পারলাম নিজের ভাষা নিজের সবচেয়ে বড় আইডেন্টিটি।
#
বিশ্বইতিহাসের পাতা খুলি। চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় তিনটি আন্দোলন। তিনটিই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন। তিনটিই বাংলাভাষার জন্য। প্রথমটি ব্রিটেনের আয়ারল্যান্ডে, দ্বিতীয়টি পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা তে আর তৃতীয়টি ভারতের (অসমের) শিলচরে। তিনটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম—শুধু ভাষাজননীকে ভালোবেসে। মাতৃভাষার ধর্ষণ-প্রচেষ্টাকে বার বার প্রতিহত করে মনুষ বুঝিয়ে দিয়েছে, ধর্ষণের কলঙ্ক ধর্ষিতার নয়, ধর্ষকের। এবং এটাই একমাত্র সত্য।
#
আজ নয়। ১৯৫২ সালে নয়। ১৯৭১ সালেও নয়। বাঙালির মুখের ভাষা ছিনিয়ে নেবার চক্রান্ত শুরু হয়েছিল আরো অগে, ১৯৪৭ সালে। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে স্বাধীনতার প্রাক্কালে, পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের একমাস আগেই বাংলাভাষার ওপর মৃত্যু পরোয়ানা জারীর শঙ্কায় দুলছিল বিপুল বাংলাভাষী জনগনের মন। কারণ আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড.জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাংলা ভাষাকে উর্দু ভাষার প্রতিপক্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন ওই সময়ে। পূর্বপরিকল্পিত এই ঘোষনায় তিনি বলেছিলেন এই দ্বিখন্ডিত দেশে ভারত হিন্দি ভাষাকে তার রাষ্ট্রভাষা করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে উর্দু ভাষাকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা করা উচিত। কি যুক্তহীন এই কথা! বাংলাভাষাকে ছিনিয়ে নেবার চক্রান্তের সেই শুরু। যুক্তি অবশ্য তিনি একটা দিয়েছিলেন। তখন থেকেই ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের কথা তাঁরা ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন। তিনি যুক্তি দিলেন, উর্দু হচ্ছে শিক্ষিত অভিজাত মুসলমান সমাজের কথ্য ভাষা। তাই উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। অসন্তোষ তখন থেকেই ধোঁয়াতে থাকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী মুসলমানের মনে। অবিভক্ত ভারতে এতদিন ধরে তারা বাংলা ভাষাকেই মুখের ভাষা বলে জেনে এসেছে। এই ঘোষণা তাদের সেন্টিমেন্টে আঘাত করেছে। এইভাবে বাংলাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রকে তারা কেমন করে মেনে নেবে! তাদের মনের ভাষা রাজদরবারে পৌঁছে দিতে কলম ধরেন অবিভক্ত বাংলার ভাষাবিদ ড.মহম্মদ শহিদুল্লাহ। সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় তিন লেখেন, যে ভাষা সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসীর ভাষা, সেই ভাষাই সেই রাষ্ট্রের মাতৃভাষা হওয়া উচিত। পুর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিশাল সংখ্যক মানুষের কথ্য এবং লেখ্য ভাষা বাংলা। সেই হিসাবে বাংলা ভাষাই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পাওয়ার অগ্রগণ্য। যদি ভবিষ্যতে কোনো দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষার প্রয়োজন হয়, তখন উর্দুর কথা বিবেচণা করা যেতে পারে। কিন্তু বিদগ্ধজনের ও দেশবাসীর মতের কোনোরূপ মর্যাদা তো দূরের কথা, বলা যায় পাত্তা না দিয়ে তলে তলে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রভাবশালী সুযোগসন্ধানীদের খেলা চলতে থাকে। এবং ১৪ই আগষ্ট মধ্যরাত্রে ভারত ভেঙে যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়, দেখা যায় তার কোনো অঞ্চলের মুখের ভাষা ও লেখ্যভাষা উর্দু ছিল না। পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তান মিলিয়ে এক বিশাল মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। পশ্চিম পাকিস্তানের ভাগে আসা পঞ্জাব এর মাতৃভাষা পাঞ্জাবী, সিন্ধ এর মানুষের ভাষা সিন্ধি, বেলুচিস্তানের ভাষা বেলুচ আর উত্তর-পশ্চিমে আফগান সীমান্তে প্রচলিত ছিল পখতুন। আশ্চর্য! কোনো অঞ্চলেই উর্দু ভাষা নেই। তবু উর্দু’কে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব ও ঘোষণা কি করে সম্ভব হয়???
হয়। স্বার্থ সিদ্ধির জন্য হন্যে হয়ে উঠলে এইসব বিচারবিবেচনাহীন ঘোষণা সম্ভব হয়। এখানেও এক মুষ্টিমেয় প্রভাবশালী অভিজাত মানুষের স্বার্থরক্ষার চাপে সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু বলে ঘোষিত হয়ে গেল! আসলে মধ্যযুগের মুসলমান শাসকদের মধ্যে ঠেট হিন্দি আর পাঞ্জাবী ভাষার সংমিশ্রণে একটি সুন্দর সুশ্রাব্য লিরিক্যাল ভাষা কবি আমির খুসরুর সময়ে গড়ে উঠেছিল। খানদানি এই উর্দু ভাষায় অতি মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষিত অভিজাত মুসলিম পরিবার পরস্পরের সঙ্গে কথোপকথন করতেন।স্বল্প সংখ্যক মানুষের মধ্যেই এই কাব্যিক ভাষাটি সীমাবদ্ধ ছিল। এ কোনো রাজদরোবারের ভাষা নয়। অথচ এই শ্রেণীর মুসলমান পশ্চিম পাকিস্তানে এসে নিজেদের গন্যমাণ্যতার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রের শাসন পরিচালনার গুরুভারটি নিজেদের হস্তগত করেন। (এ ভাষা কোনো দিনই প্রচলিত ভাষা ছিলনা) এবং কৌশলে স্বল্প সংখ্যক মানুষের এই উর্দু ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে তাঁরা (নিজেদের স্বার্থে) ঘোষণা করিয়ে নেন। সেই থেকেই তাঁরা ভাষাকে তাঁদের ধর্মের সাথে মিলিয়ে দেবার চেষ্টা করেন। এটি করতে তাদের বিবেকে বাধেনি। বরং প্রশাসক হয়ে তারা সাধারণ জনগনের ওপর উর্দুকে চাপিয়ে দিয়েছেন এবং মেনে নিতে বাধ্য করেছেন। অন্য প্রদেশ গুলো ভয়ে এই ফরমান মেনে নিলেও পূর্বপাকিস্তানের বাংলাভাষী বিশাল মুশলিম সমাজ তা একেবারেই মেনে নিতে পারেনি। বিশেষত, পাকিস্তান রাষ্ট্রগঠনের মাত্র তিন মাস পরেই পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান করাচি শিক্ষা সম্মেলনে উদ্দেশ্যপ্রনোদিত ভাবে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবটি সুচতুর ভাবে পাশ করিয়ে নেন। বাংলা তো নয়ই, অন্য কোনও ভাষার কথা তার বলেননি। এমনকি আরবি ভাষার কথাও তাদের বিবেচনায় আসেনি, উর্দুর আগে যে ভাষাটির কথা তাদের ভাবা উচিত ছিল। অসন্তোষের আগুনে ঘৃতাহুতি পড়েছিল সেই থেকে।
#
মাতৃভাষা লাঞ্ছিত হ’লে কোন সন্তান না মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়???
শুরু হয় তীব্র প্রতিবাদ। পূর্বপাকিস্তানের বিশাল বাংলাভাষী ছাত্রসমাজ ১৯৪৭ সালের ৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রাজপথে মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে নামে। তাদের তীব্র বিক্ষোভের ফলে পার্লামেন্টে ব্যবহারের ভাষা হিসাবে ইংরাজী ও উর্দুর সাথে বাংলা ভাষাটিও মনোনীত হতে পারতো, কিন্তু এই বিষয়ে যে সংশোধনী প্রস্তাবটি আনা হয়, পাকিস্তানের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান তা অগ্রাহ্য করায় ২৬শে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ সালে ঢাকায় ছাত্রছাত্রিরা এর প্রতিবাদে ধর্মঘটে সামিল হয়। আবার ১১ই মার্চ থেকে ১৫ই মার্চ লাগাতার প্রতিবাদ ও তীব্র সংগ্রামের ভয়াবহ রূপ দেখে পূর্বপাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষার দাবিটি তখনকার মতো মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু চাপের মুখে ও গদি হারানোর ভয়ে তিনিই মুসলিম লিগের জনসভায় খোলা মঞ্চে ফের উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষনা করেন। এর ফল যে কত সুদূরপ্রসারী হতে পারে, তিনি হয়তো কল্পনা করতে পারেননি। সমস্ত পৃথিবী সাক্ষী ছিল সেই দীর্ঘ সংগ্রামের। এবার শূধু ছাত্রসমাজই নয়, পূর্বপাকিস্তানের জনগনও এই ঘোষণার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আন্দোলনে ফেটে পড়ে। সেই থেকে মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে ক্রমাগত আন্দোলন চলতে থাকে দীর্ধদিন। অবশেষে---
#
অবশেষে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে ছাত্র-জনগনের এক শান্তিপূর্ণ প্রতবাদ মিছিলে সরকারী পুলিশবাহিনী বিনা প্রোরোচনায় গুলি চালায়। এবং ফলে পৃথিবীর ইতিহাসে যে ন্যক্কারজনক ঘৃণ্য ঘটনাটি ঘটে তা সারা বিশ্ব কোনোদিন ভুলতে পারেনি ও পারবেও না! মাতৃভাষার ন্যায্য দাবিতে ঢাকার রাজপথকে রক্তাক্ত করে কয়েকটি স্বভাষা প্রেমী তরুণের প্রাণ কেড়ে নেয় শাসকের রক্তচোখের গুলি। রাজাকাররা ভেবেছিল বুঝি এভাবেই বিক্ষোভ প্রতিবাদ আন্দোলনে জল ঢেলে দেওয়া যাবে। কিন্তু যা তার ভাবতে পারেনি, তাই সত্যি হয়ে উঠলো। ভাষার ন্যয্য দাবিতে যারা বিনা দোষে প্রাণ দিলো তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে পূর্বপাকিস্তানের আপামর জনগন এক বৃহৎ ব্যাপক হার-না-মানা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লো। সারা বিশ্ব সেই অভুতপূর্ব আন্দোলনের সাক্ষী থাকলো।
#
সংগ্রাম যখন মা-সদৃশ মাতৃভাষার প্রতিষ্ঠার জন্য, সেই ‘স্ট্রাগল ফর নোবেল পারপাজ’ কখনো পিছিয়ে যেতে জানেনা। সেই সংগ্রাম কখনও ব্যার্থ হয়না। সেই সংগ্রাম কখনও হারতে জানেনা। ভাষা-শহিদদের রক্ত জনগনের রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। বিদ্রোহের আগুন। সংগ্রামের আগুন। আর সেই আগুনে মশাল জ্বালিয়ে নিয়েছিল দীর্ঘজীবী বিপ্লব। অবশেষে ১৯৭১ সাল...
ভয় পায়নি সংগ্রাম। আন্দোলনের মিলিত মুষ্টিবদ্ধ হাতের দৃঢ়তা দেখে ভয় পেয়েছে সরকার। জীবন পণের এই ভাষারক্ষার আন্দোলন কত দূর যেতে পারে দেখিয়ে দিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। দীর্ঘ দিনের অরাজকতা তাদের আন্দোলনের পথ বন্ধ করতে পারেনি। বরং যত বাধা পেয়েছে ততই স্বতঃস্ফুর্ত হয়েছে। আর এই দৃঢ়তার কাছে হার মেনেছে সরকার। ভয় পেয়েছে। অতঃপর উর্দুর সঙ্গে বাংলা ভাষাকেও দেশের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে। ভাষা আন্দোলন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা হয়ে উঠেছে। মাতৃভাষাভিত্তিক একটি স্বাধীন দেশ যে সম্ভব, বিশ্বে প্রথম বাংলাদেশ তা করে দেখিয়েছে।
#
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির রক্তঝরা কলঙ্কিত দিনটি স্মরণে রেখে আজ সারা বিশ্বের ২৫কোটির বেশি বাংলা ভাষাভাষী মানুষ শ্রদ্ধাবনত। ১৯৯৯ সালের ১৭ই নভেম্বর জাতিসংঘের ৩০তম অধিবেশনে ২১শে ফেব্রুয়ারি “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। প্রত্যেক ২১শে ফেব্রুয়ারি মা-ভাষার জন্মদিন। একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বের সব মাতৃভাষাপ্রেমীদের কাছে মা-ভাষার মর্যাদা রক্ষার পবিত্র দিন।মা-ভাষার স্বীকৃতি উপলব্ধির পবিত্রতম দিন হিসাবে চিহ্নিত।
.২০০০ সালের প্রতিটি একুশে ফেব্রুয়ারি ১৮৮টি দেশে প্রচলিত ৬০০টি মাতৃভাষার জন্য একটি মহান ও পবিত্র দিন।
ধর্ম ও রাজনীতিকে শাসনযন্ত্র যখনই ভাষার সাথে জোর করে বেঁধে সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠতে চাইবে, ভবিষ্যৎ এই সত্য জেনে রাখুক, তখনই দেশে দেশে আরো বিদ্রোহী একুশে ফেব্রুয়ারি জন্ম নেবে। জাব্বার সালাম সামাদ রফিক বরকত মতিউরের রক্ত বিফলে যাবেনা কোন দেশেই...
তথ্যসুত্র—জোয়তির্ময় দাশ।