গোপন ও সংবেদ্য বেদনার মুখ

নাহিদা নাহিদ



শ্ৰীমদ্ভগবদগীতার কথায় 'বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্নাতি নরোহপরানি' অর্থাৎ মানুষ পুরনো বস্ত্র পরিত্যাগ করে পরিধান করে নতুন বস্ত্র যেন বা পুরোনো মায়াঘর ছেড়ে কাঠদেয়ালে গড়ে তোলে পিষ্টক প্রাচীর। 'শরীরানি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী'। নবজন্মে নতুন রূপে জীর্ণতা ভুলে যুগে যুগে শরীর সাজে নতুনে।
শরীর তো শরীর সময়ে পাল্টায় পৃথবীর রূপ, প্রাত্যহিক আচরণ অথবা ভাষিক খোলস। বিবর্ণ ধূলোর দেয়ালেও প্রয়োজন পড়ে মাটির প্রলেপ। সময়ঘড়ি জন্মান্তর না দিলেও পাল্টে দেয় সকল চেনা অবয়ব। নব রূপায়ন।
পাল্টে যাক সব ক্ষতি নেই, বদলে যাওয়া সময়ের ধর্ম তবুও কিছু মুখ, চেনা স্বর আর প্রেমের অক্ষর পাল্টে গেলে বুকে বিঁধে, মন পোড়ে, শুরু হয় অপরিচয়ের সংঘাত! ভাষা তেমন এক আবেগের নাম । হয়তো রোজকার ব্যবহারে চোখ চায় নতুন কিছু , জিভও চায় নতুন স্বাদ, কর্ণও চায় শ্রুতিতে নতুন সংলাপ। এই নতুন অন্বেষায় জীর্ণতার খোলস পাল্টে নতুন রূপে সাজে ভাষা বার বার।
প্রাণের আবেগের কণ্ঠবানীর এই পবিত্র স্রোতের এ সাজঘর বহু বিচিত্র রংয়ে হয় রঙিন। কখনো বিপ্লবে হয় টকটকে লাল, কখনো হলাহলে নীল। কখনোকখনোবা বিষাাদে গাঢ় ধূসর। প্রথম ছাড়লো ভাষা খটমটে শরীর, সাধুতায় মুখর পাঠ্যকথায় এলো তন্বী শ্যামার নরম সুরে। সহজ কথন। আমরা পেলাম আয়নায় দেখা নিজমুখের সেই সহজ কথাকলি। মায়ের শেখানো বোল।
প্রেম আসে গীত হয়, নব নব হিল্লোলে দোলে কথা শাখায়-শাখায়। পুরনো কথাদের সুখ নেই তবু। খোকা ঘুমায় পাড়া জুড়ায় বর্গী আসে দেশে। বর্গী হয়ে নতুন শব্দরা আসে ঝাঁকে ঝাঁকে, দখল করে মাঠ ঘাট নদী। আমাদের সিন্দুক সাজে বিলাতি অলংকারে। ভরে যায় ঠাঁই নেয়। পরিত্যক্ত বউটির মতো দাওয়ায় বসে কাঁদে কেউ যেন নতুন ভ্রমরী এসেছে অন্য কোন বাড়ির বুড়িঘর ছুঁয়ে। মশলা স্বাদে জাফরানি ভালোবাসায় প্রেমময়ী প্রেয়সী ভাষা আমার হয়ে যায় বাদশাহি মা, বেগম শাহজাদি।
দূর ভীন গাঁ থেকে এরপরও জাহাজ বোঝাই মানুষ আসে, কার্তুজ আসে, কামান আসে, বসে হাট-বাজার, রেস্তরাঁ। কোম্পানির কুঠিঘরে বাণিজ্য হয়, নিলামে ওঠে কত কথা । মা আমার কেমন করে। অচেনা ঠেকে তার সব । আর্শিতে রাখেন না চোখ, তর্জনীতে ছিবুত লাগানো পান খাওয়া ঠোঁটে খোঁজেনা পুরনো লোহার ছরতা। বউয়ের কাকই এর নাম হয় চিরুনি, চুল বাধে না সে । খাপরায় থেকে আমানি খেয়ে ঢেঁকিঘর যায় কোন মেয়ে, শব্দ শোনে লোহার কলের। জালৌকার কামড়ে কথারা ছেয়ে যায় নতুন বিষে। কে এলো আমাদের উঠোনে। কামড়ে রেখেছে কণ্ঠনালী। মুখের ভাষায় লাল চাই। টকটকে গাঢ় লাল উৎসবের আয়োজন চলে। রাজপথে মিছিল। সুউচ্চ মিনার নিয়ে তবুও দাঁড়িয়ে থাকে সেই পুরনো ভাষা, মাঝখানে মা দুইধারে তার সন্তানেরা।
চলে কথার ইতিহাস এমনি করে, রাত ফুরোয়, দিন ফুরায়। ভাষার রাজনীতি হয় সাহিত্য । দলাদলি হয় কত, মাঝে পড়ে কাঁদে আমার মা। সেই মা, সেই সর্বংসহা ভাষা নামের মা। সে তো যত্রমানবী নয়। রূপের বাহারে সে যদি হয় কন্যা জায়া, ভগিনি তবে মানা যায় কিন্তু সে যদি সাজে মচমচে চটকদারি কর্পোরেট সাজে, কথা কয় ভীনদেশি প্রেয়সী হয়ে ভিন্নস্বরে তবে? আমাদের প্রেমের কথারা আজ হাই- হ্যালো করা রেডিও-টিভির জলসা সংবাদ । যুগযুগান্তর পেরিয়ে তার রূপ দেখি আজ আমরা; ডাট ভাঙা পাপড়ি ছেঁড়া ফুল। রংমহলে নেচে চলছে কেউ, কেন নাচছে? ঝুঙুর বাজছে ঝুম ঝুম! অমন রঙ্গিনী রূপ চোখ ধাঁধায়।
দেহিনোহস্মিন যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা।
তথা দেহান্তরপ্রাপ্তিধীরস ্তত্র ন মুহ্যতি।।
জীবাত্মার দেহ শৈশব যৌবন বৃদ্ধাবস্থা শেষে অন্য শরীর প্রাপ্ত হয়; ধীর পুরুষ বিচলিত হয়না তাতে।
হইনি তো, হয়তো তাই সত্যি কথারা আজ শৈশব কৈশোর বার্ধক্য শেষে শরীর পাল্টেছে।। মরেনি, বেঁচে আছে, শ্বাস নিচ্ছে নেচে নেচে । অবাক আনন্দে গোপনে কান রাখি বাতাসে। আহা চারপাশ এমন কেন, এত হা-হুতাশ! মন বলে আমার প্রাণের কথারা কাঁদছে নিভৃতে নির্জনে। এই তার চুপচাপ গোপন দীর্ঘশ্বাস।