মন্দ মা

শতাব্দী দাশ



১.

‘মারবে নাকি বাচ্চাটাকে?’

রাবেয়ার শাশুড়ি খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে ওঠে কলেজদিদিমণির বিস্ফারিত দু’চোখে চোখ রেখে।

‘পেট যিনি দেচেন দিদি, তিনিই রাখবেন!’

মইদুলের মোটরভ্যান তখন একটা খন্দে পড়ে, ঝাঁকুনি খেয়ে, আবার লাফিয়ে উঠে এসেছে পিচ-রাস্তায়। এ রাস্তার পুরোটাই এরকম টালমাটাল। এই অঞ্চল থেকে সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন পৌঁছতে মোটরভ্যানই ভরসা। স্কুলকলেজের স্যার-ম্যাডাম হোক বা চাষাভুষো, সবার এক গতি। ওঁরা অবশ্য সামনের সিটে বসে পা দোলান। লোকালরা অলিখিত নিয়মে মাঝে পা গুটিয়ে বসে, বা পিছনে। তবে মইদুল বলে, তাতে সুবিধে এই যে, ওয়াঁরা গায়ে গতরে ভারি... পিছনে বসলে গাড়ি উল্টোনোর ভয় ছিল।

পিছনে এককোণে পা ঝুলিয়ে বসা বোরখাটিও ভারি প্যাংলা। তার উপর, শরীর অদৃশ্য হয়ে এখন জেগে আছে শুধু পেট।

দিদিমণিরা আলোচনা করেন,

‘থার্ড ট্রাইমেস্টার?’

‘ হবে। এই অবস্থায় ভ্যানে এরকম সমারসল্ট!’

পেটসর্বস্ব রাবেয়ার পেটের খানিক উপরে বুকের মধ্যে কিছু দুরুদুরু করে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইঞ্জেকশন নিলে পোয়াতিকে টাকা দেয়। মোটরভ্যান ছাড়া যাবে কেমন করে সে টাকা আনতে! শীর্ণ দুটো হাত দিয়ে সে বোরখা-ঢাকা তলপেট চেপে ধরে।

মায়ের কথা মনে পড়ে। অনেকগুলো মরা ভাইবোন বিইয়েছিল মা, বছর-দুবছরে একটা করে বিয়োতো। রাবেয়ার এই প্রথমবার।

দিদিমণি বলেন, ‘দিজ পিপল!’

-------------------------

২.

রাতে ল্যাপটপে কাজ করতে করতে দেওয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল শ্রুতি। ঘুম ভেঙে প্রথমেই মনে পড়ল, মশারি টাঙানো হয়নি। পাশেই তরী ঘুমোচ্ছে অঘোরে। তরীর গালে একটা ভারিক্কি মশা। রক্ত শুষে শরীর ফুলিয়েছে! শ্রুতি ঝাঁপিয়ে হাত নেড়ে সরিয়ে দেয় মা অ্যানোফিলিসকে। টয়লেট থেকে সুদল এনে লাগিয়ে দেয় ঘুমন্ত মেয়ের গালে।

মশারি টাঙাতে টাঙাতে শ্রুতি ভাবে, কি প্রচণ্ড খারাপ মা সে! সবাই সেসব জানে অবশ্য। সংসার টিকিয়ে রাখতে পারেনি মেয়ের মুখ চেয়ে। চব্বিশঘণ্টা সাহচর্য দিতে পারেনা মেয়েকে। এমনকি সকালে খুব তাড়া থাকলে তরীকে স্কুলের টিফিনটুকুও বানিয়ে দেয় না। সব ভার ন্যানির হাতে দিয়ে ছূটতে ছুটতে অফিসের গাড়ি ধরে। বাড়ি ফিরে তরীর হোমওয়ার্ক নিয়ে ঘন্টাখানেক বসতে না বসতেই তার মাথা টিপটিপ করে। সে মশারি না টাঙিয়ে ঘুমিয়েও পড়ে। তার খিদে পায়, ঘুম পায়, ক্লান্ত লাগে, কাজে ভুল হয়ে যায়। ভালো মায়েদের তা হয় কি? তার নিজের বাবামাও জানে, মা হিসেবে সে স্রেফ ফেলিওর। আসন্ন সন্তানের মঙ্গল চেয়ে তরীর রক্ত শুষছিল যে মশাটা, সে-ও তার চেয়ে দায়িত্বশীল মা।

বাবার দায় দায়িত্বের কথা অবশ্য কেউ বলেনা। ভিজিটিং রাইটস অনুযায়ী মাসে একবার দেখা। গিফট, আদর। জগত সংসার সাক্ষী, কত ভালো বাবা!

মশারির প্রান্ত গুঁজে শ্রুতি বালিশে মাথা রাখে। ঘুমন্ত তরীকে দেখে এক দৃষ্টিতে। বড় হলে তরীও কি তাকে খারাপ মা বলে জানবে?

ভাবা মাত্র ছোট ছোট যাদু-হাত তার গলা জড়িয়ে ধরে। ঘুম-জড়ানো স্বর বলে, ‘মা!’ দেয়ালায় ভিজে যায় শ্রুতি।

--------------------------

৩.

টুকটুকি বড় ঘ্যানঘ্যানে হয়ে উঠেছে ক’দিন ধরে, নাদিরা খেয়াল করে।

‘বাড়ি যাব! আমাদের কেমন সোন্দর বড় টিভি! নানির টিভি পেটমোটা!’

প্রথম কদিন টুকটুকি ঠাহর করতে পারেনি, আম্মি চলে এসেছে আব্বুকে ছেড়ে, একেবারে। নানিবাড়ি আসতে কার না ভালো লাগে! প্রথম হপ্তায় মাসিদের সাথে সে বোসপুকুরের মেলায় ঘুরতে গেছিল দু’বার। চরকি, বেলুন পেয়ে খুশি। দ্বিতীয় হপ্তায় বায়নাক্কা শুরু হল।

এই মেয়ের সামনেই তাকে চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে উঠোনে টেনে চ্যালাকাঠ দিয়ে পিটিয়েছিল আনোয়ার। দু’রাত বাড়ি না ফেরায় জেরা করেছিল নাদিরা। শাস্তি।

সারা পাড়া অবশ্য আগে থেকেই জানত, মেয়েটার নাম জুঁই। রেলের ধারের ঝুপড়িতে ভাড়া নিয়ে এসেছে। এমনকি টুকটুকিও তাকে চেনে। সেবার আনোয়ার সেই মেয়েকে পিছনে বসিয়ে রেস্তরাঁয় খেতে গেল বাইক চেপে। সামনের সিটে টুকটুকি। ‘মাসিটা কি সোন্দর! বাবা ওকে মুকে তুলে তুলে চাউমিন খাওয়ালো।’ ফিরে এসে গল্প করেছিল মেয়ে।

মারধোর আগেও বিস্তর খেয়েছে নাদিরা। এতদিনে বুঝল, আর কিছু হওয়ার নয়।

পাড়ার লোক বলল, ‘মেয়ের তালাক নিয়ে আবার বিয়ে দাও। কতই বা বয়স?’

আনোয়ার ফোন করে জানালো- তালাক দেবে, মেয়েকে ফেরত দিলে।

টুকটুকির ঘ্যানরঘ্যানর বাড়ে দিন দিন।

-আব্বু থাকলে এগরোল দিত।

- আব্বু বিকেলবেলা ক্যানাল পাড়ে বেড়াতে নিয়ে যেত।

-আমার আব্বুর মোটরবাইক আছে…

টুকটুকির চোখদুটো ওর আব্বুর, আর রোখও । নাদিরার অসহ্য লাগে। কল টিপতে টিপতে ভাবে নাদিরা, সব্জিওয়ালা শাহিদুল গত পরশু সন্ধে নামলে গলির মুখে তার হাত ধরেছিল। নিকা করতে চায়। একলা বাঁচা বড় দায়! কে কোথায় অন্ধকারে খপ করে হাত ধরে আবার,কে জানে!

রাতে মাকে সে জানায়, টুকটুকিকে নিয়ে যাক তার বাপ। নাদিরার মা সালমা, ফ্ল্যাটবাড়ির ঝি, অবাক দৃষ্টি মেলে তাকায়। মেয়ে নাতনীকে চোখে হারায়। বুকে জড়িয়ে ঘুমায়। রাগের মাথায় এসব কী বলছে!

সালিশি বসল একমাসের মাথায়। পঞ্চায়েতপ্রধান নিজে ছিলেন। গয়নাগাটি-সাইকেল-পিতল র ঘড়া... কিছু ফেরত পাওয়া গেল, কিছু গরমিল হল। বাবার বাইকের সামনে হাসি হাসি মুখে উঠে বসল টুকটুকি।

নাদিরা শুন্যদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। টুকটুকি মাকে টা টা করতে গিয়ে কেমন ফ্যালফ্যালে হয়ে গেল। বাইক স্টার্ট নিতেই টুকটুকি হঠাৎ ‘মাগোওও’ বলে কেঁদে উঠল। বাইক থামল না। টুকটুকির চিলচিৎকার শুনতে শুনতে নাদিরা থপ করে বসে পড়ল বটতলায়।

----------------------

৪.

-তারপর আমরা তো প্রথম ইমিউনাইজেশনটার জন্য গেছি, বুঝলি! ডাক্তার বললেন, আপনার ছেলে তো আপনার গলার স্বরই চেনে না।

- মানে?

-মানে ওর বাবার গলার আওয়াজ পেলেই এদিক ওদিক তাকায়। আমার গলার আওয়াজ পেলেও পাত্তা দেয় না।

- তুমি ঠিক ওই টাইপ নও। তোমাদের ইয়েটা, মানে, প্ল্যানড ছিল, নাকি হয়ে গেছে গো?

-প্ল্যানড। কিন্তু আমি ভয় পেয়েছিলাম। দেন হি কনভিন্সড মি দ্যাট ইটস গোয়িং টু বি ‘আওয়ার প্রেগ্ন্যান্সি।’

- ভালো তো। মাতৃত্ব একটা কনসেপ্ট বৈ তো নয়। মে বি হি ইজ আ বেটার এমবডিমেন্ট অফ দ্যাট কনসেপ্ট দ্যান ইউ।

-কিন্তু আজকাল আমার ঈর্ষা হয়! আমার কাছে শুধু খেতে আসে পুচকেটা। বাকি সময় বাবার সাথেই লেপ্টে আছে দ্যাখ!

বক্তার চোখে অবশ্য শ্রোতা ভালোলাগা ছাড়া কিছু দেখতে পায় না। কোথায় ঈর্ষা টির্ষা?

পুবের জানলা খুলে তখন শিশুকে সবুজ দেখাচ্ছিল এক পুরুষ।

----------------------

৫.

এত ছোট বাচ্চার থ্যাঁতলানো শরীর আসলে আগে দেখেনি ও.সি। হাড়গোড়ও তো পোক্ত হয়নি মালটার। অস্থিমাংসরক্ত সব মিলে মিশে এক দলা আলুভাতের মতো পড়ে ছিল। প্লাস্টিকে মুড়ে এইমাত্র নিয়ে যাওয়া হল পোস্টমর্টেমে। ব্যস্ত হাসপাতালে আপাতত কারো রক্ত ধোয়াধুয়ির সময় নেই।

জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, অপরাধীর পাশের বেডের রোগিণী মাঝরাতে খসখস আওয়াজ পেয়েছিল। কিন্তু স্যালাইনে ঘুমের ওষুধ মেশানো থাকায় ঘটনা ঠিক মালুম হয়নি। ডিউটিরত নার্সও ওয়ার্ডের বাইরে ঢুলছিল।

জানা গেছে, অ্যাডমিট হওয়ার দিন থেকেই অপরাধীর ভাবগতিক ভালো ঠেকেনি। কথাবার্তা বলত না। সিস্টার প্রশ্ন করলে সিলিংপানে তাকিয়ে থাকত।

তদন্তে আরো প্রকাশ, অপরাধীর নর্মাল ডেলিভারি হয়েছিল পরশু রাতে। সুস্থ,স্বাভাবিক শিশু। তবে ওয়ার্ডের মহিলারা গতকাল বিকেলে শ্বশুড়বাড়ির লোকজনকে তড়পাতে দেখেছে। মৃদু শাসানি। শাশুড়ি, সঙ্গে দেওর। মেয়েটির স্বামী দূরের খাদানে কাজ করে।

ওয়ার্ডে গোলোযোগ হচ্ছিল বলে নার্স এসে তাদের থামিয়েছিল। তবে সে সাধারণ গোলমাল। সংসারে মেয়ে বাচ্চা জন্মালে যেমন একটু আধটু অশান্তি হয়েই থাকে।

গতকাল রাত দুটোয় সেই মেয়েকে তিনতলার ম্যাটার্নিটি ওয়ার্ড থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল তার মা। মনোচিকিৎসক এসেছেন আপাতত। রিপোর্ট লিখছেন পুলিশি প্রয়োজনে।

তদন্তে অপ্রকাশিত যা,তা হল- মা কোলে নিতে গেলে সদ্যোজাত কেঁদে উঠেছিল মৃদু। ওর খিদে পেয়েছে ভেবে পাগলীটা দুধ তুলে দিয়েছিল মুখে। মাধ্যাকর্ষণের টানে দ্রুত নেমে আসা শিশুটি অভুক্ত ছিল না।

---------------------