এবং, শক্তির নিত্যতা সূত্র

তমাল রায়

কব্জিগুলো কি করে যেন, ঘড়ি থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছিলো। প্রতিটা টিলা থেকে ছিটকে পড়ছিলো পর্যটক। যেভাবে জীবন ছিটকে পড়ছে অসময়ের পাদানি থেকে...থুড়ি থুক্কুড়ির সীমানা পেরোতেই সেই যে বকুল গাছটা,ফুল ছড়িয়ে আছে সাদা,তার পাশ দিয়ে চলে গেছে যে নয়ানজুলি,তার পাশেই এগোলেই লঙ্কা ক্ষেত,সেখানেই দেখা হয়ে যায় মা’র সাথে। যা কিছু ইস্পাতসম,কেন্দ্রাতিগ, তা থেকে ছিটকে বের হচ্ছে অপরাজেয় এক শক্তি। 'শক্তি অবিনশ্বর। ধ্রুব। রূপের বদল ঘটে,কিন্তু তা অজেয়,অক্ষয়।' কথাগুলো বলতেন ফিজিক্সের পল্টু স্যর। স্যর সে রাতে বাড়ি ছিলেন না,কে এক আত্মীয়কে পোড়াতে দু তিন গ্রাম পাশের শ্মশানে,সকালে বাড়ি ফিরে জানলেন রেপড হয়েছে,তার বছর পনেরোর কন্যা,শ্যামলী। বাড়ির উঠোনে শুইয়ে রাখা,তার দেহ! গলায় মোটা ফাঁসের দাগ। জিভ বেরিয়ে আছে। পল্টু স্যারের স্ত্রী এই সারাটাক্ষণ ধরে আছাড়ি পিছাড়ি। ছিঁড়েছেন বই খাতা জামা কাপড়,সারা উঠোন জুড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে শক্তির নিত্যতা সূত্র...ফ্যাকাশে মুখে থমকে দাঁড়িয়ে পল্টু স্যার। এবার স্যারের স্ত্রী হাতে তুলে নিলেন ধারালো দা। আর সাঁই সাঁই করে ঘোরাচ্ছেন।
ঘুর্ণায়মান ড্যাগারে ফোকাস করে ফেড আউট...
লাইট,একশন,ফেড ইন...

অবাক আমি তাকিয়ে দেখি,মাথার চারপাশ জুড়ে অনেকটা কালো,তখন কি সন্ধ্যা? বাতাসে কি বিপ্লবের পূর্বাভাস ?
বিপ্লব,বা তার আগুনে পূর্বাভাসের আগে যে কথা বলা দরকার,আমার মা সব জানতেন না। কারো মা'ই...তবু কি করে যেন ব্ল্যাকহোল,আর কিছুটা দূরে শ্রুডিংগারের বেড়াল,আসলেই সব জানতে নেই । আপাতত বলা যাক প্রতিটি গূঢ় রহস্যের মত কিনারাহীন খাদ,আর সে নেমে যাচ্ছে দ্রুত। প্রতিটি আবিস্কারের উল্টোপিঠে যেমন প্রযুক্ত আঁধার। পরে ভেসে উঠবে হয়ত অশান্ত মাথা ভরা নক্ষত্র আর ক্রমাগত উল্কা পতন। গান ফিরে চলেছে কোথাও,বিশুদ্ধ বাতাসের মত। এখন বিশ্রাম। বারুদের গন্ধ আসছে। আর,পালং শাকের গায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে পোকা,সিমের সাথে যেমন বেগুন,নলেনগুড়ের সাথে আধ্যাত্মিকতা। নদীর সাথে যেমন নৌকা। কেউ চিৎ হয়ে শুয়ে কেউ তার ওপর রোমান্টিক দুলুনি,সত্যি কি অদ্ভুত রোমান্টিক? অথচ জড়িয়ে যাওয়াই তো। ধর বিকেল,আর কি করে যেন আকাশের রঙে জড়িয়ে যাচ্ছে মৃদু আতঙ্ক,অথচ সব কিছুই তো আপাত নিশ্চিন্ত,বিষাদও। বিদায়ী বিকেল আর আতঙ্ক,মানায়? অথচ জড়িয়ে যাচ্ছে তো,কোনোভাবে...যেভাবে ভোরের ট্রেন আর জিয়নো মাছ। আর টেঁপির মা’র প্রায় ঘুমন্ত ব্লাউজের নীচে বিদায়ী যৌবন...তবু মা! কিছু পর সকাল ছড়াবে,ঘামের ন্যায় প্রাচুর্য নিয়ে লোক ছড়িয়ে পড়বে শহরের অলি গলি রাস্তায়,একলা টেঁপি হয়ত তখন জড়িয়ে পড়ছে কোনো এক অযাচিত সিন এ...বাইরে সকাল তখন হলুদ আলোর দিকে,অসহ্য দুপুর যাপনে... ছড়িয়ে জড়িয়ে যাচ্ছে বিকি কিনির আরও কত কি! তবু তো মা! আর, আর ঘুম নেই! থাকে না আসলেই। ঝিঁঝি পোকার ডাকের সাথে যেভাবে জড়িয়ে যায় রাত,গ্রামীন রাত! শহর গিলে নিচ্ছে গ্রাম, সময় গিলে নিচ্ছে সম্পর্ক। ভার্চুয়ালে আঙুল তবু আঙুল খুঁজছে। তবু মা! আর আলো? বৈষ্ণবীর মত উদ্ভাসিত কিন্তু দুঃখী। অথচ জড়িয়ে রেখেছে সকল উন্নতি,আর প্রতিবিধান। আসলে প্রতিবিধান এক মিথ অথবা মিথ্যা। ক্রমে পাটশাক,আর জমা জল। পেঁয়াজ আর নিরামিশাষী ওই জড়িয়ে যাওয়াই। আর ধরতাই মেলে না। এক বাঁও মেলে না,দুই বাঁও।
আর মা শব্দের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে কত কি,হুঁ জড়িয়ে যাওয়াটুকুই...এই প্রবল অস্থির ক্যানভাসে, অসহিষ্ণুতার আলোয় বড় অসহায়,কিন্তু মা’তো। যেমন একুশ। বাসাংসি জীর্ণানি।তবু আমার ভাষা...তবু জড়িয়ে যেতে যেতেই পথ চলা...কারণ ওই যে আ সোলজার নেভার কুইটস...কুর্নিশ আমৃত্যু সেনানী পৃথিবীর সমস্ত মা’কে। নইলে,এত অসহায়তা,জড়াইবো কাহারে...
প্রকাশিত হল মা'এর ভাষার জন্মদিনে,এক শক্তিকে ফিরে দেখা,অনেক দোলাচল...
তবু বাসাংসি জীর্ণানি...
এত অন্ধকার,তবু কোথাও আলোর সন্ধান...