ভুলের শ্রম নিয়ে প্রশ্নবান : একটি ফ্রি এসোসিয়েশন

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

ভুল নিয়ে লিখতে বসা এই ভুল লেখা ততটাই ফ্রি এসোসিয়েশন , যতটা মুক্ত , ফ্রি এসোসিয়েশন আদৌ হতে পারে । ফ্রি এসোসিয়েশন জিনিসটাই তো একটা ভুল , আমাদের এসোসিয়েশন আদতে কখনো ফ্রি নয় ... সেখানে যুক্তির এক জটিল চেইন থেকেই যায় । আর এই চেইন আবার ভুল বিষয়টা থেকে খুব একটা বিছিন্ন নয়। আমরা খানিক এমনটাই হয়ত দেখব ।

ভুলে যাওয়ার মধ্যে কি কোনো ভুল আছে? 'ভুলে' শব্দের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে থাকা ' ভুল ' শব্দটা বিস্মরণের ভেতর কি ধরণের ইঙ্গিত নিয়ে আসে ? তবে কি স্মৃতির ভেতরেই রয়ে গ্যাছে এমন কোনো ' ঠিক ' যা বিস্মৃতির কবলে পড়ে ' ভুল ' হয়ে যায় ? ভুল শব্দটিকে যখন ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয় ' mistake ' শব্দ দিয়ে , তখনও এমন এক শাব্দিক প্রশ্ন তৈরী হয় :
' mistake ' কেন ? ভুলের মধ্যে এমন কি রয়েছে যা শুধুই নেওয়ার
ক্ষেত্রে ( take ) প্রযোজ্য অথচ দেওয়ার ক্ষেত্রে নয়? ভাষান্তরে গেলে ' ভুল ' শব্দ লেনদেন নিয়ে এরকম এক বেয়াড়া প্রশ্ন করে বসে !

আমরা কখনো কখনো ' ভুল 'কে ' Slip ' শব্দ দিয়েও অনুবাদ করে থাকি আর সেক্ষেত্রে প্রশ্ন
ওঠে , ভুল কি পিছলে যায়? কতটা সর্পিল হতে পারে তার আঁকা বাঁকা চলন ?

ভুল ইংরেজি ' Misgive 'ই বা নয় কেন? ' Misgiving ' এর মধ্যে দুঃসংবাদের ভয় থেকে যায় ! কিন্তু দুঃসংবাদ মানেই তো আর ভুল সংবাদ নয় ! ইতিহাসে আমরা দেখি সুসংবাদের মতোই , এমনকি কখনো কখনো সুসংবাদের থেকেও , দুঃসংবাদ এক্কেবারে সঠিক সংবাদ হয়ে ওঠে । বার্লিন ওয়ালের পতন হয় , প্যারি কমিউন একা জেগে থাকে , ১৯৬৮ এর ফ্রান্সের ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের ' ভুল ' শুধরে নিয়ে যে যার জীবনে ফিরে গিয়ে বুড়িয়ে আসে , জীবনের পথে মৃত্যুর দিকে আরো এগিয়ে যায় ক্রমে ক্রমে ।

একটা প্রজন্ম শেষ হয়ে আসে । আমাদের সময়ের সব থেকে বড় পলিটিকাল সিনিক অথচ সব থেকে বড় পলিটিকাল ফাইটার নবারুণ ভটচাজ বিদায় ন্যান । তাঁর বিদায়ের দায় সময়ের মুখে যেরকম আঁকিবুঁকি কেটে যায় তাতে মনে হয় যেন তাঁর গোটা জীবনটাই ভুল করে করে
কেটেছে । আমাদের ভদ্রসমাজে তাঁর মত 'পলিটিকালি ইনকারেক্ট' লোক তো পা থেকে মাথা পর্যন্ত আদ্যপান্ত একটা ভুল ।

নবারুণের গল্পের যে লোকটা সারাজীবন বলে যায় " আমার কোনো ভয় নেই তো " আর ভয় পেতে পেতে লুম্পেনদের হাতে একদিন বেকার মরে যায় , সে নিজেই একটা ভুল । হারবার্ট সরকারের ভুজুং ভাজুং প্ল্যানচেট তথা 'মৃতের সহিত কথোপকথন ' আরেকটা ভুল যা তাকে আত্মহত্যার মাধ্যমে কত সহজেই না নিজের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায় ! যেন মৃত্যুর পর এবার সে তার সময়ের রাজনৈতিক প্রেতদের সাথে ফ্যাতাড়ু বিপ্লবে নামতে পারবে ! মৃত্যুর পর আচমকা বিস্ফোরণে ইলেকট্রিক চুল্লীর ভেতর কি সে আরো একটু বেশী পুড়ে যায় ? রাষ্ট্রযন্ত্র বুঝতে পারে না এই রহস্যময় বিস্ফোরণ , প্রশাসন হারবার্টের উদ্ভট সুইসাইড নোট নিয়ে ভেবে কুল পায় না । হারবার্ট ততক্ষণে বীনুর কাছে । ৭০ এর দামাল এক রাতে বীনু যখন ঐসব ডিনামাইট লুকিয়ে রেখেছিল হারবার্টের খাটের ভেতর , তাও তো ভুল করেই রয়ে গেছিল এতগুলো বছর , ভুলে যাওয়ার বিস্মৃতিতে এতোগুলো দশক সক্রিয় থেকে যায় সেইসব বিস্ফোরক যতক্ষণ না হারবার্ট সরকারের মৃত্যু ঘনিয়ে আসে প্ল্যানচেট নামক আরেক ভুলের হাত ধরে । এইসব ভুলই তো সর্ববোদ্ধা রাষ্ট্রযন্ত্রের বোধশক্তির বাইরে থেকে যায় ।


ঋত্বিক ঘটককে স্মরণ করতে গিয়ে কয়েক বছর আগের এক বক্তৃতায় নবারুণ বলেছিলেন পলিটিকালি কারেক্ট আধুনিক বঙ্গসমাজে ঋত্বিকের মতো লোকেরা হলেন একেকটা
' উদ্বৃত্ত মানুষ ' । নবারুণ কি নিজেও ঋত্বিকের মতোই এক ' উদ্বৃত্ত মানুষ ' নন ? এক ভুল মানুষ নন ? যা কিছু পলিটিকালি ইনকারেক্ট , তাই তো ভুল ? নয় কি ? শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'ছেলেটা' কবিতায় লিখেছিলেন ,

" ছেলেটা খুব ভুল করেছে শক্ত পাথর ভেঙে ,
মানুষ ছিল নরম , কেটে ছড়িয়ে দিলেই পারতো "

কি ভুল করেছে ছেলেটা ? যদি সে ' শক্ত পাথর না ভেঙে ' , ' নরম মানুষ'কে কেটে ছড়িয়ে দিতো তবে কি তা ঠিক হত ? শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শ্রমের ওপর আস্থা তো আর পলিটিকাল কারেক্টনেস নয় , কিন্তু তাতে নিজের শ্রেণীচরিত্রের মধ্যে গুটিয়ে থেকে যাবার এক সম্ভাবনা রয়ে যায়। ছেলেটা তার শ্রেণীচরিত্রের বাইরে বেরিয়ে সমাজ পরিবর্তনের কথা না ভেবে শক্ত পাথর ভেঙ্গে পথ বানিয়ে চলে । সুমন তার ' হো – চি – মীন ' গানে অমনই এক শ্রমিকের
কথা বলেন : " আমি গান গাই , আর খোয়া ভেঙ্গে যান হো – চি – মীন " ।
" বিহারের গ্রাম থেকে চলে আসা বুড়ো হো – চি – মীন " ... যার নামটা গায়কেরই রাখা " দূর থেকে মুখখানি দেখে , ছোট ছোট দুটো চোখ , থুতনি - দাড়িটা মনে রেখে " । বিহারের গ্রাম থেকে আসা শ্রমিকের এহেন নামকরণ কি গায়কের নিজের বুর্জোয়া শ্রেণীচরিত্রের হদিশ দ্যায় না ? সুমনের গান তো কোনদিনই তার বুর্জোয়া বিপ্লবী শ্রেণীচরিত্র অস্বীকার করেনি , করেনা ? গায়ক তার শ্রেনীর নৈতিক প্রতিনিধি হয়ে রোমান্টিসাইজ করেন সর্বহারা শ্রমিককে , তাকে ' হো-চি-মীন ' নামের ঐতিহাসিক প্রতিস্পর্দ্ধায় দীক্ষিত করেন, তবে কি তিনি ভুল করেন ? অন্যদিকে শক্তির ছেলেটার যেন কোন নামই নেই ... হতেও পারে না । ' হো – চি – মীন ' এর বিপরীতে সে যতটা অনমনীয় , ততটাই অনমনীয় । শক্তির ছেলেটা কিম্বা কবীরের বুড়ো শ্রমিক কি শক্ত পাথর বা খোয়া ভেঙে সত্যিই কোনো ভুল করেন ? দুটি শ্রেনীর দুটি নির্দিষ্ট চরিত্র , স্বভাব ও ক্রিয়ার মধ্যে দুপক্ষ আটকা পড়ে থেকে যায় ? কিন্তু এদের মধ্যে কি ভুল আর কি ঠিক ? এখানে কি কোনো পলিটিকাল কারেক্টনেস কাজ করে ? সুমন লেখেন হো – চি - মীনের " ভাগ্য হোচট খায় তিনশো পয়ষট্টি দিন "। এই নিয়তি কি তার শ্রমের অভ্যাস নাকি তার ' ভুল স্বর্গ ' ? শহর থেকে শহরান্তরে , এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে আইনের বৈধতা-অবৈধতায় যে সব মানুষ নোম্যাডের মত তাদের শ্রমের যাযাবর অস্তিত্ব কাটিয়ে যেতে থাকে , তার মধ্যেই কি শ্রেণীবিভক্ত সমাজের ভুল লুকিয়েচুরিয়ে দেখা দিয়ে যায় না? শ্রমিক " ইঁট ভেঙে ভেঙে খোয়া বানিয়ে চলেন সারাদিন " আর আমাদের গায়ক অপেক্ষা করেন দিন বদলের জন্য :

বিশ শতাব্দী গেল , একুশেরও মহরৎ হবে
পাল্টায় সাল বলো, দিনগুলো পাল্টাবে কবে
এই দিনগুলো ভেঙে , গড়া হবে মানবজমিন
আমি লিখি গান , আর খোয়া ভেঙে যান ,
হো- চি - মীন, বিহারের গ্রাম থেকে চলে আসা বুড়ো
হো – চি - মীন ।

শ্রমিকের শ্রম আর দিন - বদলের প্রতীক্ষার ভেতর এখানে যেটা যোগসূত্র হয়ে কাজ করে তা হলো ভাঙ্গণ বা বিয়োজন । শ্রমিক যেমন ইঁট ভাঙেন , গায়ক তেমন ' ভাঙাচোরা দিনগুলো কোথায় চলেছে ' দেখে নিতে চান ; ওই ' দিনগুলো ভেঙে 'ই ' মানবজমিন ' গড়া হোক এমন প্রত্যাশায় পথ চেয়ে থাকেন । স্লিপের এই ভুল সরণে ' ভাঙা ' শব্দ স্লিপ করে যায় আক্ষরিক থেকে মেটাফোরিকে অর্থাৎ ' ইঁট 'এর ভাঙ্গণ থেকে দিনের ভাঙ্গণে । ভাঙ্গণ শব্দই এখানে সেতুবন্ধের কাজ করে । ভাঙ্গণই যেন জুড়ে দ্যায় কিছু একটা , কোথাও । সুমনের গান হো – চি - মীনের পাথর ভাঙার মধ্যে প্রতিরোধ এবং দিনবদলের সম্ভাবনা খুঁজে পায় কিন্তু শক্তির কবিতায় ছেলেটার ওই একই শ্রম তার ' ভুল ' বলে চিহ্নিত হয় । বিপ্লবের ঠিক বা আরো ভুল সম্ভাবনা সেখানে নিহিত থাকে ভায়োলেন্সের লেন্সে : " মানুষ ছিল নরম , কেটে ছড়িয়ে দিলেই পারতো " । কোনটা ঠিক আর কোনটাই বা ভুল এই প্রশ্নটা মীমাংশার পথে হাঁটে না , মাঝরাস্তায় থমকে দাড়ায় ।


শক্তির কবিতাতে ফিরলে দেখা যায় :

অন্ধ ছেলে , বন্ধ ছেলে , জীবন আছে জানলায় !
পাথর কেটে পথ বানানো , তাই হয়েছে ব্যর্থ |
মাথায় ক্যারা , ওদের ফেরা ... যতোই থাক রপ্ত
নিজের গলা দুহাতে টিপে বরণ করা মৃত্যু ...

শক্তির ছেলেটা অন্ধ হয়ে আছে, বন্ধ হয়ে আছে , শক্ত পাথর ভাঙায় । ধর্ম নয় , শ্রমই তার ওপিয়াম যেন ! পাথর ভাঙতে ভাঙতে কি ওই পাথরের মধ্যে কোনো জানলা দেখতে পায় সে ? এমন কোনো জানলা যার গরাদ সে ভাঙার চেষ্টা করতে পারে , শক্ত পাথর ভাঙা বন্ধ করে ? তার জীবনের আসল ধুকপুকুনিটা রয়ে গ্যাছে ওই জানলায় ; ' পাথর কেটে পথ বানানো , তাই হয়েছে ব্যর্থ' ; আর যা ব্যর্থ তাই তো ভুল ? তাই না ? তাই কি ? কি ' ক্যারা ' ছেলেটার মাথায় ? এই অজানা ' ক্যারা 'ই কি তাকে ভুলের খাদের দিকে নিয়ে যাচ্ছে ? মাথায় ক্যারা চাপিয়ে একদিন কি ছেলেটা ' নরম মানুষকে ' কেটে ছড়িয়ে দিতে পারবে ? ' ওদের ফেরা ' ? কাদের ফেরা ? কাদের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে ছেলেটার প্রতিস্পর্দ্ধী ক্রিয়া ? সুমনের গানের গায়ক - কথকের মতই শক্তির কবিতার কথকও তার চরিত্রকে অপেক্ষমান হিসেবেই দ্যাখে । বিপ্লবও তো সবসময়ই কারোর না কারোর জন্য , কিছু না কিছুর জন্য অপেক্ষা করে ? কে বা কি সেই রহস্যময় নাম না জানা লক্ষবস্তু , সেই আদর্শ বিপ্লবাত্মক পরিস্তিতি ? তা কি কখনো নির্দিষ্ট করে জানা যায় ? কার ফেরার পথ চেয়ে বসে থাকে আমাদের ছেলেটা ? তার এই অপেক্ষাও কি এক ভুল অপেক্ষা
নয় ? মাথার পোকাগুলোকে রাগিয়ে বেরিয়ে পড়ে না কেন ? কেন উল্টে ' নিজের গলা দুহাতে টিপে বরণ করা মৃত্যু ' কেই

রপ্ত করে ন্যায় ? অভ্যাস রপ্ত করে নেবার এই রপ্তানিই কি তার ভুল যা বদলের পথে বাধ সাধে ? কবিতাটি শেষ হয় এইভাবে :

মানুষ ছিল নরম , কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো |
পথের হদিস পথই জানে , মতের কোথা মত্ত ...
মানুষ বড় শস্তা , কেটে , ছড়িয়ে দিলে পারতো !

ছেলেটা একটা পথ বানিয়ে চলেছে শক্ত পাথর ভেঙে ভেঙে আর আরেকটা পথ জানলার বাইরে , চক্রব্যূহের বাইরে থেকে তাকে হাতছানি দিচ্ছে।সেই পথের হদিস পথই জানে , যেমন রাস্তাই হতে পারে একমাত্র রাস্তা । এই দুই পথের পথান্তরে প্রশ্ন তৈরী হয় কোন পথটা মতের ? আর কোনটা মত্ততার ? কোন পথটা ঠিকের আর কোনটা ভুল ? শ্রমিকের শ্রমের পথ কি তার মতের পথ? আর শ্রেণীচরিত্রের উর্দ্ধে উঠে যখন সে রুখে দাঁড়ায় তখন তা কি তার মত্ততার পথ ... নরম মানুষকে কেটে ছড়িয়ে দেবার পথ ? ' নরম মানুষ ' শক্তির শেষ পংক্তিতে ' শস্তা ' বিশেষণে বিশেষিত হয় । কে শস্তা ? ছেলেটা ? না তার প্রতিপক্ষ ? নাকি আমাদের বুর্জোয়া কাব্যপথ ? কে ঠিক আর কিই বা ভুল এখানে ? ভুল মানে যদি ' Slip ' হয় যার মধ্যে ' lip ' শব্দটা চুপ করে বসে থাকে , তবে ' মত ' শব্দ থেকে ধ্বনি যখন ' মত্ততা ' ( মত – তো – তা ? ) র দিকে গড়িয়ে যায় তখন আমরা আবার একাধিক ভাষার জায়নবিন্দুতে মানে ' ভুল ' আর ' S – lip ' এর সংযোগস্থলে কিম্বা একই ভাষার মধ্যে , ' মত ' আর ' মত্ততা 'র যৌথ যাপনবিন্দুতে এক অন্য ভুলের বিস্তার দেখি ।

রাজনৈতিক ঠিক - ভুলের অনির্ণেয় এই দ্বান্দ্বিকতা থেকে এইখানে আমরা উত্তীর্ণ হই একটি ভাষার ভেতর কিম্বা দুই ভাষার লেনদেনে এক অন্য ভুলের ধারণায় । এই ভুল ঠিকের উল্টোপিঠ নয় , এই ভুল মানে ' slip ' , পিছলে যাওয়া , একটু একটু করে সরে যাওয়া , যেমন
' মত ' শব্দটা একটু সরে গিয়ে ' মত্ততা ' শব্দের সাথে বন্ধুত্ব পাতায় , একটা সংঘ তৈরী করে যেন । এই ভুল এমন এক অনন্ত slipping বা সরণক্রিয়া যার মধ্য দিয়ে একটি ভাষার ভেতর ও বাইরে যেখানে অন্যান্য ভাষা থাকে , সেখানে এক শব্দ তার ধ্বনি বা ফোনিমের সেতু ধরে নিজের বা অন্য ভাষার আরেক শব্দের কাছে চলে আসে । দুটো শব্দ মিলেমিশে একটা কমিউন গড়ে তোলে ; একটা শব্দ বদলে যায় আরেকটা শব্দে , যতক্ষণ না সেই শব্দটা তৃতীয় কোনো শব্দের দিকে যাত্রা করে , নিজের বা অপরের ভাষায়। ভুল এখানে বদল নিয়ে আসে , নিয়ে আসে শব্দের মিলন ও পরিবর্তনসম্ভাবনা ।

শব্দের এই প্লাস্টিসিটি তাকে প্রতিরোধমুখী করে তলে । অলংকারশাস্ত্র যাকে ' পান ' (' pun ' ) বলে চিহ্নিত করে থাকে তাও কিন্তু এক ধরণের ভুল যা আমরা রাত্রদিন করে থাকি একটা শব্দের জায়গায় ধ্বনিগতভাবে তার কাছাকছি থাকা অন্য কোনো একটা শব্দ বলে ফেলে । মনে করা হয় যিনি ভালো পানিং করতে পারেন তিনি ভাষার ওপর একরকমের দখলের পরিচয় দ্যান , কিন্তু এই পানিং স্লিপের থেকে খুব একটা দূরত্বে থাকে , এমনটা নয় । ফ্রয়েড সাহেব এই সব স্লিপকে অবচেতনের চিহ্ন হিসেবে দ্যাখেন । কিন্তু আমরা ওপথে যাব না ; আমাদের কাছে যেটা ইন্টারেস্টিং তা হলো এই ' পান ' এর ' অবাক জলপান ' এর মধ্য দিয়ে এক বা একাধিক ভাষার ভেতর - বাইরে শব্দদের এক চেইন তৈরী হয় , এক ধরণের কমিউন তৈরী হয় যেখানে কোনো স্থবিরতা থাকে না , ক্রমাগতই চলতে থাকে সরণ , দিগন্তের অনন্ত বিন্দুর দিকে । এক শব্দ বদলেই চলে আরেক শব্দে , এক ভাষা আরেক ভাষায়। ভুল থেকেই এই স্বতত : পরিবর্তনশীল ভাষাসংঘ তৈরী হতে পারে ।

জেমস জয়েসের 'ফিনেগান্স ওয়েক ' , ভাষার এহেন ' ভুল' ( ' slip' ) কে ব্যবহার করে একাধারে বিভিন্ন ভাষায় রচিত এক উপন্যাস যেখানে একটি বাক্য ' And he war ' এ ' war ' শব্দটা ইংরেজি ভাষার ' যুদ্ধ ' থেকে জার্মান ভাষায় অস্তিত্বসূচক ক্রিয়াপদ ' war ' বা ' হওয়া 'র দিকে ঝুঁকে যায় । শব্দের এই ভুল ঝোঁকে অস্তিত্ব আর যুদ্ধ সমার্থক হয়ে ওঠে তো বটেই , তা ছাড়াও ইংরেজি ও জার্মান ভাষার মাঝে সেতু হয়ে ' war ' শব্দের এই অবাক জল - পান এক শ্রেণীহীন সংঘের প্রতিশ্রুতি ছুঁয়ে থাকে । ' And he war ' বাক্যের ভেতর থেকে শক্তির
ছেলেটা , কবীরের ' হো – চি – মীন ' এবং নবারুণ ভটচাজদের মত সব উদ্বৃত্ত এবং শস্তা মানুষরা উঁকি দিয়ে যায় । তারা সারাজীবন আরো আরো ভুল করে যায় , যেমন স্যামুয়েল বেকেট বলেছিলেন , " My errors are my life "।


নবারুণের লুম্পেন প্রলেতারিয়েত , শক্তির ছেলেটা কিম্বা কবীরের হো – চি – মীন , এদের সবের মধ্যেই কোথাও যেন ঠিক - ভুলের বাইনারি ভেঙ্গে গিয়ে ঠিক - ঠিক অথবা ভুল - ভুলের আরেক ধরণের ডায়ালেক্টিক তৈরী হয় । আর এই ডায়ালেক্টিক যেন ট্রাজেডির ইঙ্গিত বহন করে আনে যেখানে উভয়্পথই ঠিক বা ভুল । " যাবার পথ নেই তেমন , পাবার পথ নেই তেমন , ফেরার পথ নেই তেমন , ফেরারী দিনে তুমি এলে সহসা " !

শ্রমিক মানুষ যখন তার শ্রেণীচরিত্রের ভেতর থেকে অহোরাত্রি শ্রম করে যায় তখন তা কি ঠিক না ভুল ? শক্তির কবিতায় কবি তাকে ভুল বলেন কারণ এই শ্রম ওপিয়ামের মতই প্রতি - বিপ্লবী থেকে যায় । আর কবীর হো – চি - মীনের ওই ইঁট ভাঙাকেই দিন বদলের হাতিয়ার করে তুলতে চান । তাঁর কাছে সেটাই ঠিক । হয়ত আরো ঠিক কবি ও গায়কের নিজস্ব শ্রেণীচরিত্র যার ভেতর থেকে তাঁরা সর্বহারাকে রোমান্টিসাইজ করতে থাকেন । ঠিক যেমন আমি এখানে নিজের বুর্জোয়া শ্রেণীচরিত্রের ভেতরে থেকেই এই (আন-) ফ্রি এসোসিয়েশন জাতীয় লেখাটা লিখছি এবং আমার ভুল , স্লিপ এবং পানিং এর প্রতর্ক আমার উস্কানিমূলক ' ইন্টেলেকচুয়াল ' শ্রেণীচরিত্রকে ফাঁস করে দিচ্ছে ।

শ্রেণীচরিত্রের এই রিজিডিটি ঠিক না ভুল ? এই রিজিডিটি স্বত্বেও মানুষকে তার শ্রেনীর বাইরে থেকে এসেই শিক্ষা দিয়ে বিপ্লব্মুখী করে তুলতে হবে , লেনিনের এই চিন্তা কতটা ঠিক বা কতটা ভুল ? কে বা কারা এই ' মানুষ ' ? কারা এই ' অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল ' , কারাই বা সর্বহারা ? কি তাদের শ্রমের মূল্য ? তারা কি আদতে উদ্বৃত্ত? শস্তা? ফেলনা? তারা তাদের শ্রম দিয়ে কিভাবে রুদ্ধ বা চালিত করতে পারে পুঁজির গতিকে ? পুঁজির সেই চলনও কি এক অনন্ত স্লিপিং এর অনন্ত ভুল নয়? স্বাধীনতার হাতছানি ঠিক কোথায় থাকে ? সর্বহারার শ্রমের ভেতর নাকি শ্রমের বাইরে যেখানে সে বিপ্লবের সহিংস পথের হাতিয়ার বেছে ন্যায় ?

১৯৬৮র ফ্রান্সের প্ররোচক চিন্তাবীদ মরিস ব্লাশোর ' On One Approach to Communism' প্রবন্ধে মার্ক্সবাদ যাকে 'মানুষ' বলে থাকে , তার সাথে শ্রমের জটিল মেটামর্ফিক সম্পর্কের এক বয়ান দিয়ে এই প্রশ্নবান শেষ করি :

Power must be given to him , to this man : the man of labor , the productive
man , that is , not immediately man , but labor itself , anonymousand impersonal , and the things produced by labor , the works in their becoming in which man,subjected to violence and responding with violence , would come to himself , to his real freedom.

মানুষকে ক্ষমতাশালী করলে মানুষ নিজেই শ্রম হয়ে ওঠে , হয়ত তখন সে আর মানুষ থাকে না , হয়ে ওঠে অনামনীয় এবং ব্যক্তিহীন এক শ্রম – একক । তখন সেই শ্রমের পাহাড়ের ভেতর সে নিজেই একটা প্রশ্ন হয়ে জেগে থাকে ।

সে মানুষ না শ্রম ? ঠিক না ভুল ? অপরিহার্য না উদ্বৃত্ত ?

এই সকল প্রশ্ন 'হওয়া' থেকে ' হাওয়া 'র দিকে বেঁকে যায়

...

স্লিপ করে যায় ।