দ্য ফাইল ডাজ নট এগজিস্ট…

মেঘ অদিতি



টের পাচ্ছি …আমার শরীর বলে কিছু নেই। কী আশ্চর্য, না চাইতেও অতি সূক্ষ্মতায় মিশে যাচ্ছি জলে, মিশছি অবারিত হাওয়ায়, অথচ তুমি বুঝছো না। ধূলিকণা হয়ে আমি তোমার কাছে পৌঁছে যাচ্ছি। সাব-এটমিক পার্টিকেলে তোমারই অগোচরে প্রতিনিয়ত ঘুরে বেড়াচ্ছি তোমার বুকের ওমে, চুলের ফাঁকে, শরীরের সমস্ত খাঁজে, স্নায়ুতে..

তুমি কি ফিল করছো? চর্যা?

সবুজে ধূসর ফোটে। স্নায়ুতে প্রবল জার্কিং। স্বপ্ন? কিজানি! শুরুতে সফর সুহানা অথচ কোনো স্বপ্ন ঠিকঠাক জায়গায় তো শেষ হয় না। কোথাও পৌঁছানো হয় না।

মাথার ওপর অদৃশ্য চিলেরা ডানা ঝাপটে চলে। গোলাপের গন্ধে চারপাশ ভারি। এই আজানুলম্বিত ছায়া, এই অবারিত সায়াহ্নকাল..চোখ খুলতে ইচ্ছে করে না। দ্রুত শ্বাসপতনের শব্দ ফিরে আসে নিজের কাছে। আর চোখে অনিবার্য জল.. অন্ধকারে মনের কুয়াশা সরে কবিতার গোপনতা ছিঁড়ে মুহুর্মুহু জাগে দু'টো চোখ। আলোছায়ার এক ক্যাফেতে কবিতাযাপনে দূরবর্তী ছায়া, আবারও সেই দুই চোখ। মেয়েটা অচেনা। আলোকিত মুখটি তরুণ কবির। সে কি দেখতে পায় দীর্ঘসময় ধরে তারই দিকে নিবদ্ধ সে দৃষ্টি? লোরকার জানা ছিলো কি উনিশেই, জীবন নিয়ত খেলাঘর.. তুমি, জানো?

কখন কে আসে, কখন যায় চলে..

চলে যাওয়াটা ধর্ম।

প্রতিদিন একটা গ্রাইন্ডারের ভেতর নিজেকে সেঁধিয়ে স্যুইচ অন করা..

জীবন।

সিস্টেমের কাছে নিয়ত হেরে যাবার নাম..

মৃত্যু।


অনেক অনেক কাল আগে রোদে দানা খুঁটে খেতে উঠোনে নামতো এক শালিক! যেদিন দানা ছড়ানো হয়নি সেদিন সে এক পায়ে ভর করে লাফিয়ে চলছে উঠোন জুড়ে। পালাতো না। সে দিনগুলোতে সময় ছিলো কততো দীর্ঘ। সপ্তাহের শেষ দিনটিও সহজে আসত না। সময় পালালে ঘুম ভাঙা মন চলে হাজার হাজার কিলোমিটার পিছনে। পালাবে না পালাবে না করে পালিয়ে যায় সব ওম। এই যে বৈচিত্র্যহীন শীতকাল, কথার সাথে কথার যুদ্ধ, তুষারের বল নিয়ে লোফালুফি খেলার হারজিত এ সবই আসলে অস্থির সময়ের প্রোপাগান্ডা। বাতাসে বিষ, মাটিতে ধুলো-বালি-কাঁকড়, তবু লড়াই করতে করতে চলা। আর এ একক অভিজ্ঞানে কেউ নিজেকে বলে আমি নষ্ট মানুষ। কেউ হয়ত আঙুল তুলে বলে যান নিজের ফুলের যত্ন নিন। মগজ কি সিরিয়াল কিলারের ভূমিকায় তখন, অত ড্রোন সার বেঁধে নইলে কেন চলে মাথার ভেতর। শুরুতে যে যত্ন ছিল প্রতিটি পাপড়িতে আজ কেন অযত্ন এত। অত রুখুসুখু ভাব, সহ্য হয়?

অন্ধকার কাটিয়ে জেগে ওঠে অতীতের আদার ফোল্ডার। কিজানি কবে সেখানে ঘাপটি মেরে ছিল প্রিয় বর্ণমালা। কে জানতো, দীর্ঘ সময় জুড়ে টাইমলাইনে কেউ লিখে রাখবে প্রিয় নাম, চর্যা। চর্যাই কি? না কি দেখা না-দেখায় জন্ম নেয় যে প্রত্যাশা তাকে জয় করার তীব্র আকাঙ্খা .. তাকেই কি কেউ চর্যা ভেবে জানলা খুলে বসে থাকে বছর বছর.. লগইনের কোমল পরশে শব্দগুলো ফুলের মতো ছড়িয়ে যায় চারদিকে।! মোবাইল স্ক্রিনে সময় সন্ধ্যা সাতটা পঁয়ত্রিশ। ফ্লাইওভারে গাড়িগুলো উঠে যায় হুশহাশ। আজ কি উইকএন্ড, জ্যামবিহীন রাজপথ? ফ্লাইওভার থেকে ছুটন্ত গাড়ির আওয়াজ হামলা করছে কানে, উইকএন্ডগুলো কি কারো ব্যক্তিগত প্রার্থনার দিন?


কেউ ভালবেসেই তো খুঁজে বেড়াতো চিত্র। চিত্রকরের সন্ধানে ছিলো অন্যকেউ। রঙ ছিলো না, তুলি ছিলো না, ছিলো না ইজেল। তবু পারসিস্টেন্স অব মেমোরি ভেবে শূন্য থেকে শূন্যে ছোঁয়ালে রঙের প্যালেট অভিমান আসতো। পিয়া তেরা ক্যায়সা অভিমান…

অভিমানের রঙ আসলে মালবেরি। অথবা লাইলাক! না, আকাশ কাঁদছে না। বদলে বদলে যাচ্ছে কেবল অভিমানে। এসব সময়ে প্রবঞ্চময় শীতের অনুভূতিমালারা গান গেয়ে যায়। ক’দিন আগেও ঘুম ভেঙে প্রথম সকালে শরীর মনে লেগে থাকতো আনচান, তাতে ক্যাটালিস্টের কাজ করতো আবার একটা মিষ্টি মর্নিং টেক্সট, আজকাল সেখানে লেখা থাকে, টেক কেয়ার। ছোট্ট শালিকের বুক ধুকপুক ওটুকুই তো ছিলো তার বেঁচে থাকা। ওই ছটফটানো কখন স্তূপ স্তূপ বরফের নিচে চাপা পড়ে গেলো।

তবুও সকাল আজও নিয়ম মেনে নিয়ে যায় তাকে দুপুরের কাছে, দুপুর রোদ্দুরে তা ঠিকঠাক গলে হয়তো বসন্ত আসবে।

দুপুর বারটা পঁয়তাল্লিশ: জমার খাতা থেকে জীবন খরচ হয়। নিরন্তর বাড়তে থাকে কাঁটাঝোপ।

ঘড়ির টিকটিক আসলে জীবন থেকে হারিয়ে ফেলা দিনের অভিসম্পাত।

বারটা সাতচল্লিশ.. আটচল্লিশ.. ঊনপঞ্চাশ..

ঘড়ি এবার মেল্ট করে যাচ্ছে..সেকেন্ডের কাঁটা, মিনিটের কাঁটা গলে গলে পড়ছে পায়ের কাছে.. উফফ…

সিম্বলিজম!!

রাত বারটা একচল্লিশ.. রাত এক কি এখন লিগ্যাল আউটলেট, চর্যা?

রাত দুটো সাতচল্লিশ.. শব্দ ভারী হয়ে উঠছে। চারপাশের কোমলতায় কাঠিন্য আসছে। চোখে ফের সায়াহ্নের অনিবার্য জল..

টের পাচ্ছো, যা চাইছো তা মিলছে না। যেভাবে পৌঁছাতে চাইছো তা লাগছে না ঠিক সুরে..

চর্যা, ঠিক কী চাইছো, তাও কি বুঝছো? একটা একটা দিন চলে যাচ্ছে, তুমি ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ছো হয়তো এই কালরাত ঘুচে যাবে। সকাল আসবে পূর্ণতা নিয়ে। অথচ তুমি এও ঠিক জানো, দিন আসবে দিন যাবে। রাত আসবে, রাত যাবে। টাইমস্পেস কার্ভেচারে ঝুঁকে পড়বে আরও দীর্ঘ অভিমান…

দিগন্তে তখন হয়তো গোধূলি। রঙের সাথে রঙ মিশে তৈরী হবে যে অরোরা, প্রাপ্তির খুব কাছে দাঁড়িয়ে তাকে ফিরিয়ে দিতে দিতে চর্যা, তুমি হয়তো ভাববে রঙের হ্যালুসিনেশনে জীবনে ফিরে ফিরে আসে রিভেরার সেল্ফ পোর্ট্রেট..