বৃষ্টি ও ম্যাগনোলিয়া'র সংলাপ

এমদাদ রহমান




... এবং দীর্ঘ এক অপেক্ষা ছিল!
জীবনানন্দ লিখছেন-
'জানি পাখি, শাদা পাখি, মালাবার ফেনার সন্তান,
তুমি পিছে চাহো নাকো, তোমার অতীত নেই, স্মৃতি নেই, বুকে নেই আকীর্ণ ধূসর
পাণ্ডুলিপি; পৃথিবীর পাখিদের মতো নেই শীতরাতে ব্যথা আর কুয়াশার ঘর।
যে-রক্ত ঝরেছে তারে স্বপ্নে বেঁধে কল্পনার নিঃসঙ্গ প্রভাত
নেই তব; নেই নিম্নভূমি-- নেই আনন্দের অন্তরালে প্রশ্ন আর চিন্তার আঘাত...
আমাদের মুখে লিস্টারিনের সৌরভ! বৃষ্টি পড়ছে। ভিজিতেছে আমাদের গভীর মনের ম্যাগনোলিয়া। তারা কথা বলছে... কথা বলছে... কথা বলছে...
অপেক্ষার কথা বলছে।
... কত অদ্ভুতভাবেই না আমরা বেড়ে উঠি একেকটি জায়গায়; বহুপুরোনো শ্যাওলা, ঝুলকালি, মাকড়শার জাল, ছেঁড়া ফোটোগ্রাফ; ভাঙাপুতুল, থ্যাঁতলানো ফুল; কোথাও কোনও গাছের পাতায় শত বছরের ছাপ, কোথাও প্রাগৈতিহাসিক পাথর, এবং কান্না; ফুল- হয়তো গন্ধরাজ কী ম্যাগনোলিয়া; কোথাও থাকে এক উইনচেস্টার স্ট্রিট; ভায়োলেট এভিনিউ; কোথাও থাকে এক অদ্ভুত মানুষ যে চোখ বন্ধ করলেই বেজে ওঠে বুকের ভিতরের বেহালাটা; কোথাও থাকে খালের মতো এক নদী- এন্টন- বুকে যার শ্যাওলা ও নুড়ি...
আবার কোথাও, জায়গাটা দেখলেই মনে হবে বিলুপ্তির স্মৃতি দিয়ে ঘেরা এক প্রান্তর- আমরা নিজেকে যে প্রান্তরে হারিয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম; কোথাও হয়ত এক হাসপাতাল- যেখানে গভীর রাতে অন্য এক ঘোরলাগা পৃথিবীর উড়ে চলে যান আমাদের মানুষেরা- যাদের কাছ থেকে আমরা জন্ম নিয়েছিলাম; একদিন অবধারিত এক নিয়মে আমরা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলাম।
এবার, সামনে শুধু ব্লু-লেভেল, সীমারেখা লীন- মহাসমুদ্র!
এবার, হে শিল্পী, নতুন করে সৃষ্টি করো নিজেকে; জন্ম নাও।
কিন্তু আমরা তো হারিয়ে গেছি। নিরুদ্দেশ।
চারপাশে শুধু মাটি; মাটিই একমাত্র ধ্রুব; এসো- জন্ম নিই।
না। আমরা তো হারানো মানুষ!
আমরাই মাটি।
আমরা তো অপেক্ষা করছি।
আস্তাবলের ঘোড়াগুলিও বুড়ো হয়ে গেছে!
আমরা তাহলে মরে গেছি!
মৃত্যুর অপেক্ষায়... উইনচেস্টার স্ট্রিটে একদল যুবক সিগ্রেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নিঃসঙ্গতার গান গেয়ে ওঠে-
I see trees of green, red roses too
I see them bloom for me and you

And I think to myself what a wonderful world
I see skies of blue and clouds of white
The bright blessed day, the dark sacred night
And I think to myself what a wonderful world

The colors of the rainbow so pretty in the sky
Are also on the faces of people going by
I see friends shaking hands saying how do you do... অদ্ভুত অন্ধকার এক রাত- স্ট্রিটলাইটগুলি যে রাতের বুকে মাথা পেতে দিয়েছে। একাকী উইনচেস্টার স্ট্রিট ধরে চুরুট টানতে টানতে হেঁটে আসছেন লুইস আর্মস্ট্রং! বিস্ময়কর রাত তাকে অভিবাদন জানাচ্ছে...
Yes, I think to myself
What a wonderful world... গান থেমে গেলে চরাচর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তখন কান পাতলেও কিছু শোনা যায় না। যেন পৃথিবী গভীর দুঃখে ডুবে গেছে। তখন আমরাই নিঃসঙ্গ! একা মানুষ। তখন আমরা হয়ত ছুটে চলেছি দূরে কোথাও; একটু পরেই নেমে পড়ব নাম না জানা কোনও ইস্টিশনে- হয়ত পাতা ওলটাতে ওলটাতে আমরা ঝুম্পা লাহিড়ীর গল্পটি পড়তে শুরু করব-
'চলো আমরা ওইরকম করি,'- শোভা হঠাৎ বলে উঠল।
'কী করব?'
'অন্ধকারের মধ্যে পরস্পরকে কিছু একটা বলি... হয়ত তখন ভয়াবহ একাকীত্বের বোধ আমাদেরকে গ্রাস করতে চাইছে; তখন একটু মুক্তির জন্য আমরা অপেক্ষা করলাম পিয়ানোটা আপনা থেকেই বেজে উঠুক।
আর সেটা বাজতে শুরু করল!
কিংবা চাইলে বেজে উঠুক বুকের গভীরের বেহালাটা আর মুহূর্তেই এক অদৃশ্য হাত এসে বাজাতে শুরু করল যেন তোমাকে বাজাচ্ছে। তুমিই সুর হয়ে ভেঙে পড়ছ আবার গড়ছ নিজেকে; প্রবল ভাঙনের মুখেও আমরা গড়ে তুলবার আকাঙ্ক্ষাকে আঁকড়ে ধরতে ভুলে যাই না!
অন্ধকারের মধ্যে পরস্পরকে কিছু একটা বলি... ঝুম্পা'র গল্পের সংলাপটা মগজে গেঁথে যায়। অন্ধকারে পরস্পরকে কী কী বলা যায়? সেন্সোডাইন ব্রাশে কোলগেট পেস্ট, তারপর লিস্টারিনের গার্গল... তারপর কয়েকপাতা হুইটম্যান কিংবা জীবনানন্দ, কিংবা-
হ্যাঁ... এক দেশে দীর্ঘ এক অপেক্ষা ছিল... আর ছিল হাতিশালে রাত ঘোড়াশালে দিন; আর ছিল স্মৃতির রঙিন সব বেলুন... ম্যাগনোলিয়া বলে-
আমাদের আস্তাবলের ঘোড়াগুলি বুড়ো হয়ে গেছে...
বৃষ্টি বলছে- ভিজবি? আয়!