রেস্তোরাঁ

শান্তনু ভট্টাচার্য




এই কোণে আলো ও অন্ধকার অনুপাতে সমান-সমান। আলো-অন্ধকারের এই সঙ্গ যাপন আমাদের ভালো লাগে।ভালো লাগা থেকেই এই কোণটা আমরা বেছে নিয়েছি এবং সন্ধ্যা ঘন হলে এখানে এসে বসি।বলা যায়,আলো-অন্ধকারটুকুই আমাদের এখানে টেনে আনে।
আমি : তারপর বলো,বিষয়টা নিয়ে কী ভাবলে?কী সিদ্ধান্ত?
সে : কিছুই না।
আমি : কেন!
সে : ভাবনাটা মাথায় জমাট বাঁধছে না।
আমি :তোমার কি খুব শীত করছে? এত গুটিয়ে বসে আছ!
সে : হ্যাঁ,গতকাল মাঝরাত থেকেই একটা শীত-অনুভূতি আমার গায়ের ওপর চেপে বসেছে।
আমি : মনে হচ্ছে আমার শরীর জুড়েও শীত নামছে!
হাঁক পেড়ে ওয়েটারকে ডাকলাম আমি।পানীয় অর্ডার করলাম,সঙ্গে মাংস।মদ-মাংসে শীত কাটে।অন্যের সঙ্গে আলোচনা ও অভিজ্ঞতায় আমি তা বুঝেছি।
আমি : তুমি তো কোনো বিষয়ে এতটা সময় নাও না!
সে : ঠিকই,নিই না।কিন্তু এ-বিষয়টাতে আমি থেমে গেছি,এগোতে পারছি না আর।
ওয়েটার গেলাস-বোতল,সঙ্গে দু-প্লেট ভর্তি মাংস সামনে রেখে গেল।
আমি বোতল থেকে গেলাসে মদ ঢালতে গিয়ে চমকে উঠলাম!কালো বোতল থেকে গড়িয়ে নামা মানুষের তাজা লাল রক্তে ভরে যাচ্ছে গেলাস।এতক্ষণ লক্ষ্য করিনি,প্লেট-ভর্তি মশলা ছড়ানো সদ্য কাটা মানুষের কাঁচা মাংস!
মানুষের রক্ত-মাংস আমি যে খুব ভালো চিনি! আমি তার দিকে তাকালাম।সে কী যেন ভাবছে দূরে তাকিয়ে! আমি ভয়ে,বিস্ময়ে প্রায় চিৎকার করে কথাটা বললাম। ভাবলেশহীন ভাবে সে প্রথমে আমার দিকে,তারপর মদ-মাংসের দিকে তাকাল।কোনো কথা না বলে বড়ো টুকরো থেকে মাংস ছিঁড়ে গালে ফেলল, তারপর রক্তে চুমুক দিল।মুখের ওপর তৃপ্তি ছড়িয়ে বলল--স্বর্গীয় স্বাদ! আসলে এ তো আমাদের উত্তরপুরুষের রক্ত-মাংস!
--উত্তরপুরুষের!
--উত্তরপুরুষের।এতদিন যে মাংস আমাদের সাজিয়ে দেওয়া হত তা ছিল আমাদের পূর্বপুরুষদের,যা বাসি,পচনশীল! যে মদ দেওয়া হত তা ঘোলাটে, কালচে,mস্বাদহীন।
আমার ভিতরটা গুলিয়ে উঠছে,এতদিন আমি পূর্বপুরুষদের রক্তমাংস খেয়েছি,খেয়ে উল্লাস করেছি!যা আমি বুঝতেই পারিনি, বুঝেছে আমার পরের প্রজন্মের একজন!
সে মদে চুমুক দিল,হাড়ে জড়ানো একটা বড়ো মাংসের টুকরো হাতে তুলে চিবতে শুরু করল।জড়ানো গলায় বলল--খান,দারুণ স্বাদ!
আমি তার কথা মানলাম,সত্যি,এ-মদমাংসে র স্বাদ যেন তুলনাহীন।সারা বুক জুড়ে তৃপ্তি ছড়িয়ে পড়ছে।শীত কেটে যাচ্ছে।
সে : এই মদ-মাংসের স্বাদ না পেলে হয়তো আমি ভাবনাটার এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকতাম।তার শেষে পৌঁছতে পারতাম না।
আমি চাপা স্বরে বললাম--তুমি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছ ?
সে : হ্যাঁ।
আমি : কী ?
সে : আর আমি কখনও আপনার কাছে আসব না।কোনো পূর্ব বা উত্তরপুরুষের মুখোমুখি হব না।শুধু নিজের মুখোমুখি হব।
আমি : তুমি আমার বুক থেকে একটা পাথর নামিয়ে দিলে;আমিও এটাই চাইছিলাম।
খাদ্য-পানীয় শেষ করে আমরা 'সম্পর্ক' নামক রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে এলাম।হাঁটতে লাগলাম দুজন দুদিকে। আমার মনে ভীষণ আনন্দ,হয়তো তার মনেও। আমাদের কাউকে আর কারও জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।
আমরা দূরত্ব বাড়িয়ে অন্য পথে হেঁটে যাচ্ছি। রেস্তোরাঁটা অনেক পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।