এই গান মৃদু-মন্দ বেজে যাবে তোমাদের ঠোঁটে

উপল বড়ুয়া





“তুমি আসবে বলে তাই/আমি স্বপ্ন দেখে যাই/আর একটা করে দিনে চলে যায়/সুদিন আসবে বলে ওরা আগুন জ্বালায়/আর হাজার হাজার মানুষ মরে যায়।”

[অঞ্জন দত্ত।পুরনো গীটার]


শীতের মাঝামাঝি থেকে একটা নিরুদ্দেশি হাওয়া বয়ে যাবে পৃথিবীতে। ঈশদুষ্ণ শীতের ভেতর পাতারা ঝরে যাবে। পাতারা মরে যাবে। তখন আপনি ছুটে যাবেন কোন এক রেলজঙশন। সবুজ-শীতল ঘাস পায়ে দলে রেলের স্লিপারে অনেক্ষণ ধরে হাঁটতে থাকবেন। ধরেন, ঐ জায়গার নাম ষোলশহর জঙশন। অনেক মানুষের ভীড় ঠেলে এবার আপনাকে যেতে হবে ছাতিমতলায়। তার নীচে দেখবেন এক অন্ধ বুড়ো লোক। আশি ছুঁই ছুঁই বয়েস। ময়লা শাদা পাঞ্জাবী ও লুঙ্গি পরা। হাতে নিজের তৈরি দোতরা নিয়ে গান গাইতেছেন-‘আমার কেহ নাই রে/আমার কেহ নাই।’ তাকে ঘিরে আছে দশ-বারজন শ্রোতা। আপনিও দাঁড়িয়ে পড়ুন। শুনুন শিল্পী কি শোনায়।

এইসব লিখতে লিখতে হঠাৎ বাবাকে মনে পড়ছে। বাবা ছিলেন বাঁশিঅলা। নদীপাড়ে বসে বা সোনালু গাছতলার ছায়ায় বাঁশি বাজাতেন একধ্যানে। আমরা পুকুরপাড়ের সোনালু ফুল গায়ে জড়িয়ে পাগল সাঁজতাম। মুখে রঙ মাখতাম। মাথায় গুঁজে দিতাম সোনালু ফুল। কোন এক বসন্তে বাবা কৃষ্ণচূড়ার তলায় আমাদের জন্য একটা দোলনা টাঙিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের বড় হওয়ার সাথে সাথে দোলনাও একদিন বুড়ো হয়ে যায়। তবু বাবা বাঁশি বাজাতেন নিমগ্ন চিত্তে। আর মাঝেমধ্যে ফেরারী হয়ে যেতেন। আমার বড় ভাই যেবার মানুষের দাগা খেয়ে ফেরার হয়ে যায় সেবারও বাবা ফেরার। আদতে আমরা সবাই ফেরারী। একমাত্র মা ছাড়া।

“আমার ভাই ছিল ফেরার, আমার মাসিমা যখন মারা যান।/ চারদিকে ছুটছিল বাজি, কালীপুজোর রাত।/ হাসপাতালের. বারান্দাও কেঁপে উঠছিল আনন্দে ।/ তালে তালে জাগছিল হিক্কা, শেষ সময়ের নিশ্বাস।”

[হাসপাতালে বলির বাজনা। শঙ্খ ঘোষ]

মানুষের ক্ষূধা লাগে কেন? গান শুনলে যদি ক্ষুধা মিটে যেতো- খোদা! একদিন ক্ষুধার ক্ষুরধার যন্ত্রনায় অতিষ্ট হয়ে সবাই খাদ্যের পেছনে ছুটে। এই ছুটাটাই মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি। যদি ছুটতে না হতো, যদি ক্ষুধা লাগলেই পাওয়া যেত গরম ভাত, যদি হেঁটে যেতে যেতে মানুষ ছিঁড়ে খেতে পারতো পাকা রসালো ফল। যদি করা যেতো যেমত ইচ্ছা!

খাওয়া যাবে না। ছোঁয়া যাবে। যাবে না পাশে বসা। আইন আছে। দেশে আছে পুলিশ। আমি দেখেছি ক্ষুধার যন্ত্রণায় মানুষকে দশ বছর বয়সে বড় হয়ে যেতে। আবার চল্লিশের পরেও অনেকে থাকে কিশোর। একদিন ক্ষুধা ও খাদ্যের পেছনে ছুটতে মানুষ গান শুনতে ভুলে যায়। মুভ্যি দেখতে ভুলে যায়। ছবি আঁকতে ভুলে যায়। এমনকি ভালবাসতেও ভুলে যায়। তখন একটা বয়সের পরে পুনরায় বাবাকে মনে পড়ে। কিন্তু মনে পড়তে পড়তে এতো দেরি হয়ে যায় যে; ততোদিনে বাবারা আর থাকেন না কোথাও। বাবারা তখন হয়তো শিশু। মাটিতে বসে উদাস তাকিয়ে থাকেন আকাশে কিংবা হাফপ্যান্ট পরে বর্ণমালা পড়তে থাকেন। তখন একদিন কোন নিরর্থ দুপুরে আচম্বিৎ আপনার হুঁশ ফিরে। পুরনো টেপরেকর্ডারের গায়ের ধুলো মুছতে থাকেন। তারপর দীর্ঘশ্বাসের ঢঙে গেয়ে উঠেন-

‘ও গানওয়ালা/আরেকটা গান গাও।/আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই/কিচ্ছু করার নেই।”

[কবীর সুমন/গানওয়ালা]